Fast Fiction

শেষে আমার হাতই লাগল #2

ট্রলি ধাক্কা খেয়ে র্যাকের কোণায় আড়াআড়ি আটকে গেল, সারি ভরে রাখা কৃষি সারের বস্তা আর বীজের কার্টন একসঙ্গে কেঁপে উঠল, আর মেহরীন হাত বাড়াতেই রাশেদ চাবির রিংটা মুঠোয় তুলে বলল, “আপনি কিছু ধরবেন না। রিলিজ আমি দেব।” তার গলায় এমন এক মালিকানা, যেন তিন নম্বর লেনের তালা, স্ক্যানার, লোডিং তালিকা—সবই তার বাপের সম্পত্তি।

ঢাকার গুদামঘরটা ঈদের আগের সপ্তাহে এমনিতেই গরম কড়াই। বাইরে ড্রাইভাররা গাড়ির কেবিনে বসে হর্ন না বাজিয়ে গালি চেপে থাকে, ভেতরে কাগজের মোড়ক খসখস করে, ভেজা কার্টনের গায়ে মার্কার দাগ ছড়ায়। তিন নম্বর লেন আজ ভোর থেকেই জ্যাম। কোন র্যাক আগে খুলতে হবে, কোন জেলা-গামী চালান আগে ছাড়তে হবে—এটা মেহরীনের মাথায় নকশার মতো থাকে। কিন্তু আজ মাস্টার চাবি রাশেদের কাছে। গত রাতে দেরিতে ফেরত দেওয়া সেই চাবি; অফিসঘরের ছোট আলমারিতে থাকার কথা ছিল, ছিল না। এখন সে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারণ মালিকপক্ষের এক দূর-আত্মীয়ের সঙ্গে তার আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, আর এ গুদামে ওই জানাশোনাই অনেককে সাময়িক সিংহ বানিয়ে দেয়।

মেহরীন ট্যাবলেটের স্ক্রিনে আটকে থাকা রিলিজ তালিকা দেখে ছোট গলায় বলল, “র্যাক এইট আগে খুলুন। খালিশপুরের মাল পেছনে, শেরপুর আর মানিকগঞ্জের গাড়ি আগে যাবে।”

রাশেদ শুনেও পাশের লেবারদের দিকে আঙুল তুলল। “এই যে, নয় নম্বর থেকে নামাও। সামনে যা আছে, আগে ওটাই বের হবে। এত উপদেশ দেওয়ার দরকার নাই।”

মেহরীন এক সেকেন্ডও তর্ক করল না। সে এগিয়ে গিয়ে জ্যামে থেমে থাকা দুটো ট্রলির মাঝখান থেকে লাল ট্যাগওয়ালা কার্টন টেনে উপরে তুলল, যাতে চালান নম্বরটা সবাই দেখে। “এটা বিকেলের গাড়ি,” সে উচ্চস্বরে বলল। “সকালের চালান আটকে আছে পেছনে।” কথাটা রাশেদের দিকে নয়, ড্রাইভার, লেবার, ক্লার্ক—যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের সবার দিকে ছুড়ে দিল। প্রথম ছোট ফাটলটা সেখানেই পড়ল। সাব্বির, নতুন ছেলে, থমকে গিয়ে রাশেদের মুখের বদলে কার্টনের ট্যাগ দেখল।

রাশেদের চোয়াল শক্ত হল। “আমাকে শেখাতে হবে না। তোমার কাজ এন্ট্রি দেখা, অপারেশন চালানো না।”

“অপারেশন থামলে এন্ট্রিও থামে,” মেহরীন বলল, কিন্তু স্বর ঠান্ডা। তার ওড়নার কোণে গুঁজে রাখা অর্ধেক ভাঁজ-করা বাজারের রসিদটা কাঁপছিল; সকালে আম্মা ফোনে বলেছিল, বাসার ভাড়ার সঙ্গে ছোট ভাইয়ের কোচিংয়ের বাকি টাকাও আজ দিতে হবে। এই শিফটের ওভারটাইম না পেলে মাসের হিসাব বসবে না। সে জানে, এখানে মুখের জোরে নয়, মিনিটের দামে মানুষ হারায়।

রাশেদ ভুল র্যাক খুলে জ্যাম আরও বাড়িয়ে দিল। পেছনের গাড়ির মাল সামনে এসে পথ বন্ধ করল, সামনে যাওয়ার মাল লেবেল-চাপা পড়ে গেল। কাগজের চালান-পত্র এক লেবারের হাতে মুচড়ে উঠল; শুকনো খসখসে শব্দে মেহরীনের স্নায়ু টনটন করল। সাব্বির ফিসফিস করে বলল, “আপা, এভাবে গেলে বারোটার ডিসপ্যাচ মিস হবে।”

রাশেদ শুনে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে গলাটা চড়াল, “যার যার কাজ করেন। আর মেহরীন, আপনি একটু সীমা জানেন। বাইরে কী কথা ওঠে জানেন তো? মেয়ে মানুষ গুদামের মাঝখানে বেশি গলা তুললে ভালো দেখায় না।” তারপর আরও নিচু স্বরে, যাতে আশেপাশের দুইজন ঠিকই শোনে, বলল, “খালা রওশনও বলেছেন, চাকরি করেন ঠিক আছে, কিন্তু লাইন বুঝে।”

খালা রওশন তার মায়ের খালাতো বোন। গত সপ্তাহে বাসায় গিয়ে একই কথা বলে এসেছে—রাশেদ “নিজেদের লোক”, বেশি লাগতে নেই, না হলে বিয়ের কথাবার্তায় খারাপ শোনাবে। মেহরীন তখনও চুপ ছিল। এখানেও সে চুপ রইল, কারণ জ্যামের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষেরা নীতিকথা শোনে না; তারা দেখে কার হাতে চাবি, কার হাতে সময়।

উপরে অফিসফ্লোর থেকে ফোন নেমে এল। মালিকের ছেলে আরিব সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে বলল, “চট্টগ্রামের ট্রাক লাইনে আছে। বারোটার আগে বের না হলে ওদিকে ফেরিঘাটে আটকা খাবে। কে দেখছে তিন নম্বর?”

রাশেদ মাথা তুলে এমন ভঙ্গিতে উত্তর দিল যেন সব নিয়ন্ত্রণেই আছে। “হচ্ছে ভাই, একটু ভিড়।”

ঠিক তখনই স্ক্যানারে লাল আলো জ্বলে উঠল। ভুল চালান খোলা হয়েছে, আর সামনের গাড়ির রিলিজ কোড তালাবদ্ধ। ট্যাবলেটের পর্দায় সতর্কবার্তা উঠে সবার চোখে পড়ল। মেহরীন একবার স্ক্রিন, একবার আটকে থাকা র্যাক, একবার সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ানো আরিবকে দেখল। বারোটার আগে আর এগারো মিনিট।

সে সোজা রাশেদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “মাস্টার চাবি দিন।”

রাশেদ হেসে উঠল, কিন্তু হাসিটা ফাঁপা। “এখন নাটক করার সময় না।”

মেহরীন সাব্বিরকে বলল, “দুই নম্বর ট্রলি সরাও। হলুদ ট্যাগগুলো ডানদিকে। কেউ আট নম্বরের সামনে দাঁড়াবে না।” তারপর আরিবের দিকে না তাকিয়ে বলল, “ভুল র্যাক খুলে কোড লক হয়েছে। এখন যদি আট নম্বর না খুলি, শেরপুর, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম—তিনটারই লাইনে আগুন লাগবে।”

আরিব নিচে নামতে শুরু করল, কিন্তু রাশেদ তখনও চাবি পেছনে সরিয়ে রেখেছে। “আমি খুলছি,” সে বলল, তাড়াহুড়োয় সঠিক চাবিটা গুলিয়ে ফেলতে ফেলতে। প্রথম চাবি ঢুকল না, দ্বিতীয়টা অর্ধেক গিয়ে আটকাল, তৃতীয় চাবি দিয়ে সে তালায় এমন চাপ দিল যে ধাতব শব্দে পাশের লেবাররা তাকিয়ে উঠল। তালা খুলল না।

মেহরীন তার কব্জি চেপে ধরল না, কেবল হাতটা নিচে নামিয়ে দিল। “সরে দাঁড়ান।” কথাটা খুব আস্তে বলা, তবু এত কড়া যে রাশেদের পেছনের দুইজন নিজে থেকেই এক পা সরে গেল। আরিব এখন লেনের মুখে। তার চোখ প্রথমবার স্ক্রিন থেকে সরে মেহরীনের মুখে স্থির হল।

রাশেদ দাঁত চেপে চাবি ঘোরাতে গেল আবার। এবার চাবি ঘুরে থেমে গেল, রিং কাঁপতে লাগল। “হচ্ছে তো—”

“চাবির মাথা উল্টো,” মেহরীন বলল। “এই লকটা গত মাসে বদলানো হয়েছে।”

এক মুহূর্তের জন্য সব শব্দ আলাদা হয়ে গেল—ফর্কলিফ্টের বিপ-বিপ, দূরে ড্রাইভারের গলা, কাগজের মচমচ শব্দ, আর রাশেদের ব্যর্থ হাত। আরিব বলল, “চাবি দিন।”

রাশেদ এবারও সঙ্গে সঙ্গে দিল না। ওই এক পলকের জেদেই তার সব মুখোশ খুলে গেল। সে চাবি নিজের হাতে রেখেই তালা খুলতে গেল, ভুল দিকেই। তালা নড়ল না, বরং রিংয়ের এক পাশে ছোট চাবিটা বেঁকে গেল। সাব্বির ফিসফিস বন্ধ করে সরাসরি বলল, “ভাই, সময় নাই।”

আরিবের কণ্ঠ নেমে এল, ঠান্ডা ও ছোট। “চাবি. এখনই।”

রাশেদ হাত বাড়াল, কিন্তু আরিব তার তালু থেকে চাবির রিং তুলে সরাসরি মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। লোকজনের চোখের সামনে। কোনো ঘোষণা নয়, কোনো সভা নয়—লেনের ধুলো, কার্টনের গায়ে ছোপ, দাঁড়িয়ে থাকা ড্রাইভার, ঘামে ভেজা লেবারদের মাঝখানে। ধাতব রিংটা মেহরীনের হাতে পড়তেই শব্দ হলো—খাঁটাস করে, যেন ভুল হাতে আটকে থাকা কিছু ঠিক জায়গায় ফিরে এল।

মেহরীন এক সেকেন্ড নষ্ট করল না। সঠিক চাবি বেছে তালায় ঢুকিয়ে আধা ঘুরতেই ক্লিক। “সাব্বির, আট নম্বর খুলো। লাল ট্যাগ বাঁয়ে, সাদা ট্যাগ সোজা। কেউ নয় নম্বর ছুঁবে না।” তার নির্দেশে কথার বাড়তি চর্বি নেই। সে নিজে প্রথম ট্রলিটা কাত করে এমন কোণে আনল যে পথ খুলে গেল। “খালিশপুর পেছনে রাখো। আগে শেরপুর। তারপর মানিকগঞ্জ। চট্টগ্রামেরগুলো শেষ ট্রলিতে একসঙ্গে।”

দুজন লেবার একই সঙ্গে নড়ল। তৃতীয়জন রাশেদের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর চোখ নামিয়ে মেহরীনের বলা দিকেই গেল। আটকে থাকা র্যাক থেকে সঠিক কার্টন নামতে লাগল, স্ক্যানারের লাল আলো সবুজে বদলাল। ট্যাবলেটে একটার পর একটা রিলিজ খুলে গেল। লেনের জমে থাকা ট্রলিগুলো সাপের মতো মোচড় খেয়ে সামনে চলল। যে ড্রাইভার এতক্ষণ কেবিনে বসে ছিল, সে নেমে এসে নিজে হাতে দড়ি ধরল।

রাশেদ মুখ বাঁচাতে গলা তুলল, “এই, আগে শেরপুর—” তারপর থেমে গেল; কারণ কথাটা সে বলছে মেহরীনের ঠিক পরেই, আর সবাই শুনেছে কে প্রথম বলেছে। তার নির্দেশ এখন প্রতিধ্বনি, আদেশ নয়।

মেহরীন পেছন ফিরে তাকাল না। “সাব্বির, রিলিজ কোড পড়ো।”

“শেরপুর—দুই শ’ তিন। মানিকগঞ্জ—দুই শ’ সাত।”

“ভালো। দেরি করা চালান আলাদা রাখো, পরে হিসাব হবে।”

আরিব এবার রাশেদকে নয়, মেহরীনকেই জিজ্ঞেস করল, “আর কী লাগবে?”

“তিন নম্বর লেন ফাঁকা না হওয়া পর্যন্ত কেউ রুট বদলাবে না। আর সামনের রেজিস্টার টেবিলে ভুল খোলা র্যাকের নোট লিখে রাখুন।” সে চোখ তুলে প্রথমবার আরিবকে দেখল। “যার হাতে চাবি থাকবে, রিলিজও তার হাতেই থাকবে। না হলে আবার জ্যাম হবে।”

রাশেদের মুখে তখন এমন রং, যেন ঘষা ধাতু। সে এগিয়ে এসে বলল, “আমি তো ছিলাম—একটু মিস—”

মেহরীন তার দিকে তাকিয়ে কেবল হাত বাড়াল। “রিলিজ খাতা।”

রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে দিল না। ছোট খাতাটা বগলের নিচে চেপে রেখেছিল। আরিব নিজেই খাতাটা টেনে নিয়ে মেহরীনের হাতে দিল। “এখন থেকে এই লেন আপনি চালাবেন,” সে বলল, স্বর উঁচু নয়, কিন্তু লেনের মাথা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাল। “মাস্টার চাবিও আপনার কাছেই থাকবে শিফট শেষ পর্যন্ত। পরে অফিসে জমা দেবেন।”

রাশেদ যেন কিছু বলতে গিয়ে গিলল। তার চোখ একবার সিঁড়ির দিকে, একবার আশেপাশের মানুষদের দিকে গেল। কেউ তার হয়ে তাকিয়ে রইল না। সাব্বির রিলিজ পড়ছে, লেবাররা মেহরীনের ইশারায় ট্রলি ঘোরাচ্ছে, ড্রাইভার নিজে এসে সই চাইছে। রাশেদ পাশে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তাকে ছাড়া কাজ চলছে—এই দৃশ্যটাই তার জন্য সবচেয়ে কড়া।

মেহরীন খাতার পাতায় দ্রুত সাইন টেনে বলল, “পরেরটা।” এক ড্রাইভার ভাঁজ-করা চালান এগিয়ে দিল; কাগজের শুকনো শব্দ এবার আর স্নায়ু কাঁপাল না। সে কোড মিলিয়ে খাতা নামাল, আঙুলের এক ইশারায় ট্রলি ছাড়ল। একটার পর একটা গাড়ি লেন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। গুদামের মুখে জমে থাকা লাইন ছোট হতে হতে হঠাৎ সহনীয় হয়ে গেল।

রাশেদ শেষ চেষ্টা করল যখন চট্টগ্রামের চালানটা সামনে এল। “ওটা আগে গেলে খালিশপুর—”

“খালিশপুর বিকেল,” মেহরীন না তাকিয়েই বলল।

“কিন্তু—”

“রসিদে সময় লেখা আছে। দেখেন।” এবার সে খাতা উল্টে তার সামনে ধরল। আশেপাশে যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদের একজন হেসে ফেলল না, কিন্তু ঠোঁট চেপে রাখার ভঙ্গিটাই যথেষ্ট ছিল। রাশেদ খাতার ওপর ঝুঁকল, যেন পড়ছে; বাস্তবে সে সময় কিনছিল। কিনতে পারল না।

শেষ ট্রলিটা বেরিয়ে গেলে লেনের মাঝখানে যে জটটা এতক্ষণ গলায় কাঁটার মতো ছিল, সেটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে দাঁড়াল। ধুলো বসে এল। স্ক্যানার নীরব। আরিব এগিয়ে এসে একেবারে কাজের পয়েন্টে, র্যাকের পাশে, মেহরীনের খোলা হাতে রিলিজ সিল আর মাস্টার চাবির রিং দুটো গুঁজে দিল। “এখন থেকে তিন নম্বর লেনের চাবি আপনি রাখবেন,” সে বলল। “অফিসে নাম তোলা হবে পরে। আপাতত কাজ চলবে আপনার কথায়।”

রাশেদের কাঁধে তখনও সুপারভাইজারের ব্যাজ ঝুলছে, কিন্তু কেউ তার দিকে নির্দেশের জন্য ফিরল না। সে এক পা সরল, যেন পথেই বাধা হয়ে আছে বুঝতে পেরেছে। ওই সরে দাঁড়ানোটা ছিল সবচেয়ে জোরে শোনা পতন।

শিফটের শেষে লেন পরিষ্কার। খালি র্যাকের ফাঁকে বাতাস ঢুকছে, কোথাও আর ঠেলাঠেলি নেই। মেহরীন অফিসঘরের দেয়ালে বসানো ছোট চাবির আলমারির সামনে দাঁড়াল, মাস্টার চাবির রিং হুকে তুলে দিল। ধাতব রিংটা একবার দুলে উঠল, তারপর থেমে গেল।