অনুশোচনা এল, অধিকার পেল না
ট্রে নামাতেই সেলিনা খালা ফিসফিস না করে সবার শুনিয়ে বললেন, “মেহরিন, তুই সামনের বসার ঘরে যাস না। ওদিকটা ভিআইপি আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকজন বসবে। এই চাবিটা নে, ওপরের স্টোররুম খুলে ফুলদানি নামা।” খালার আঙুলের ফাঁকে ধরা স্টোররুমের চাবিটা পুরনো নীল ফিতেয় বাঁধা; মেহরিন চেনার আগেই পেছন থেকে নাবিলা ছুটে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে আরেকটা খাম তার হাতে গুঁজে দিল। “আপা, গেটের বাইরে একজন দিয়ে গেছে। বলল, ‘মেহরিন আপার জন্য।’”
খামের কোণায় আরিবের হাতের লেখা। সাত বছরেও সে ‘ম’ অক্ষরটা এমন কাত করে লিখত, যেন নামটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে সরে যাচ্ছে। মেহরিন খামটা খুলল না। নীল ফিতেয় বাঁধা চাবি আর সাদা খাম একসঙ্গে মুঠোয় নিয়ে সে ভেতরের রান্নাঘরের গরম ধোঁয়া পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে উঠল। নিচে হলঘরে গানের শব্দ, বাসনের টুংটাং, বরের মামাদের গলা—সব কিছুর মধ্যে এই একটুখানি সাদা কাগজ এমন করে ঢুকে পড়ল, যেন কেউ বহুদিন পরও তার হাত খালি থাকতে দিল না।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের ভাড়া করা কমিউনিটি হলের সঙ্গে লাগোয়া এই বাসাটায় আজ বিয়ের ঘর। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা এত ঘন যে কার সঙ্গে কার কী কথা, কে কাকে একসময় পছন্দ করত—সবই বাতাসে থাকে, শুধু মুখে বলা হয় না। মেহরিন এই বাড়িতে কাজের মেয়ে না, অতিথিও না; সেলিনা খালার ছোটবেলা থেকে আদরের ভাইঝি, আর দরকার পড়লে সব সামলে দেওয়া মানুষ। যে মেয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের ফি দিত, খালার স্বামীর কৃষি অফিসের কাগজপত্র টাইপ করে দিত, সেই মেয়েকেই একদিন আরিবের মা খুব নরম গলায় বলে দিয়েছিলেন—“ছেলের সামনে ভবিষ্যৎ আছে, ওকে আটকে রাখিস না।”
স্টোররুম খুলতেই ধুলোর গন্ধে চোখ জ্বলে উঠল। ভেতরে ফুলদানি, অতিরিক্ত প্লেট, লাইটের তারের সঙ্গে একটা বাদামি ব্যাগ ঠেস দিয়ে রাখা। ব্যাগটা দেখে তার হাত থেমে গেল। এটাই সে আরিবকে দিয়েছিল শেষ বর্ষে—নকল চামড়া, সস্তা, কিন্তু পাশের ছোট পকেটটা নিজে সেলাই করে শক্ত করেছিল যাতে কাগজপত্র পড়ে না যায়। সে ব্যাগটা এখানে কেন?
নিচে থেকে ডাক এল, “মেহরিন! দেরি করিস না।” সে দ্রুত ফুলদানি নামিয়ে আনল। নামতেই দেখল সামনের বসার ঘরে কুশন-তোলা সোফায় আরিব বসে আছে। ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, কবজিতে দামি ঘড়ি, পাশে তার মা আর দুইজন খালাতো বোন। তাকে দেখা মাত্র আরিব উঠে দাঁড়ায়নি; শুধু চোখ তুলেছিল, যেন সে এই ভিড়েও জানত মেহরিন এসে যাবে, কারণ মেহরিনকেই সব সময় ডেকে আনা যায়।
সেলিনা খালা ট্রে তার হাতে ঠেলে দিলেন। “চা নিয়ে যা। সাবধানে। কাপ কম আছে।” তারপর নিচু গলায় যোগ করলেন, “তুই থাকলে কাজ গুছায়।” এই এক বাক্যে যত প্রশংসা, তার চেয়ে বড় তাচ্ছিল্যও ছিল—ঘরের ভিতরের আলোচনায় নয়, কাজের জায়গায় তার দরকার। মেহরিন ট্রে তুলে বসার ঘরে ঢুকতেই আরিবের মা মুখ সরিয়ে খালাকে বললেন, “নাবিলাকে বললে তো হতো।” খালা অস্বস্তি ঢাকতে হেসে বললেন, “ওর হাতে ঠিক থাকে।”
আরিব কাপ নিল, কিন্তু তাকাল না। তার খালাতো বোন নুসরাত হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “আপা, আপনি কি এখানেই থাকেন এখন? খালা বলছিলেন স্কুলে পড়ান?” মেহরিন বলল, “কোচিং-এ।” নুসরাতের চোখে সঙ্গে সঙ্গে হিসাব নেমে এল—অস্থায়ী, ছোট, সাময়িক। ঠিক সেই সময় আরিবের ফোন বেজে উঠল; সে স্ক্রিনে তাকিয়ে ছোট গলায় ইংরেজি দু-একটা কাজের শব্দ বলল, “বোর্ড… ফার্ম… মিটিং।” ঘরের বড়রা এমনভাবে শুনল, যেন ছেলেটা এখন একধাপ ওপরে বসে আছে। কাপ এগিয়ে দিতে দিতে মেহরিন বুঝল, পুরনো ভুলটা এখনও একই রকম সক্রিয়: সে নির্ভরযোগ্য, সে উপকারী, সে ঘরের ভেতর ঢুকতে পারে শুধু কাজ হাতে।
চা নামিয়ে বেরোতে গিয়েও সে থামল, কারণ সেলিনা খালা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আরেকটা আঘাত বাঁচিয়ে না রেখে দিলেন। “মেহরিন, তুই ওপরের ছোট ঘরে বসে একটু হিসাব লিখে রাখ। গায়ে-হলুদের খরচ, ক্যাটারিং, ফুল—সব। তোর লেখা পরিষ্কার।” বসার ঘরের সোফায় খাতা-কলম নিয়ে বসার জায়গা ছিল, কিন্তু তাকে পাঠানো হলো পাশের অন্ধকার ছোট ঘরে, যেখানে ডেলিভারির কার্টন আর অতিরিক্ত চেয়ার রাখা। আরিবের মা শুনে বললেন, “ভালোই তো। ও এসব পারে।”
মেহরিন কিছু বলল না। ছোট ঘরের প্লাস্টিক টেবিলে খাতা খুলে বসে খরচের রসিদ গুনতে লাগল। আধভাঁজ করা একটা রসিদ আঙুলে বারবার খুলে গেল—ফুলওয়ালাকে অগ্রিম, দুধ, বরফ, বাস ভাড়া। হঠাৎ নাবিলা ঢুকে ফিসফিস করে বলল, “আপা, ওই মানুষটা আবার জিজ্ঞেস করছে, আপনি খামটা দেখেছেন কি না।” মেহরিন চোখ তুলল না। “বল, কাজ আছে।” নাবিলা চলে গেল। দরজার ফাঁকে হলঘরের আলো এসে তার হাতে ধরা সাদা খামের কিনারে পড়ছিল; সে তবু খুলল না।
বিকেলের দিকে বিদ্যুৎ একটু ওঠানামা করতেই হলঘরে হালকা গোলমাল বেধে গেল। সাউন্ডওয়ালা টাকা চাইছে, ফুলওয়ালা বাকি চাইছে, আর সেলিনা খালার স্বামী—যিনি উপজেলা কৃষি অফিসে কাজ করেন বলে আত্মীয়দের সামনে সব সময় একটা কর্তৃত্ব ধরে রাখেন—নিজের মানিব্যাগ খুঁজে পাচ্ছেন না। খালু বিরক্ত হয়ে বললেন, “মেহরিন, তুই তো হিসাব করছিস, নগদের খাম কোথায় রেখেছিস?” প্রশ্নটা এমন, যেন হারালে দোষও তার।
মেহরিন উঠে দাঁড়াল। “আমি যেটা হাতে পেয়েছি, খাতায় লিখে টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছি।” খালু ধমক দিলেন, “তাহলে নেই কেন?” ঠিক তখন স্টোররুমের দিক থেকে রিফাত ছুটে এল, হাতে সেই বাদামি ব্যাগ। “এই ব্যাগটা কার? ভেতরে খাম আছে।” ঘরে যে কয়জন ছিল, সবাই তাকাল। ব্যাগটা মেহরিনের চোখে চিনে নেওয়া পুরনো জিনিস, আরিবের মুখে মুহূর্তের জন্য রক্ত সরে গেল।
রিফাত ব্যাগ খুলে টেবিলে তিনটে জিনিস রাখল—সাউন্ডওয়ালার অগ্রিমের খাম, ক্যাটারারের বাকি, আর একটি ছোট ওষুধের প্যাকেট। খামের ওপর তারিখ—দুদিন আগের। সঙ্গে একটা ফার্মেসির রসিদ, ভাঁজে ভাঁজে নরম হয়ে গেছে। সেলিনা খালা অবাক হয়ে বললেন, “এগুলো এখানে কেন?” আরিব এবার উঠে দাঁড়াল। “আমি… আমি আগেই এসে রেখেছিলাম। খালা ব্যস্ত ছিলেন।” তার মা তৎক্ষণাৎ ঢাকতে গেলেন, “আরিব তো সাহায্যই করতে চেয়েছে।”
মেহরিন রসিদটা তুলে একবার দেখল। ওষুধগুলো সেলিনা খালুর ডায়াবেটিসের জন্য, আর এগুলোই দুপুরে না পেয়ে খালা অস্থির হয়ে সবাইকে দোষারোপ করছিলেন। রসিদের নিচে ফার্মেসির ছাপ, টাকা দেওয়া নগদ। আরিব চুপ। সে সাহায্য করতে এসে কিছু হারায়নি; সে রেখেছিল, জানায়নি, তারপর মেহরিনের ঘাড়ে হিসাবের বোঝা পড়তে দিয়েছে। রিফাতের চোখ একবার আরিব, একবার মেহরিনের দিকে ঘুরল। কাউকে কিছু বলতে হলো না। ঘরের বাতাসে প্রথমবারের মতো হিসাবটা একটু উল্টো হলো।
সেলিনা খালার স্বর বদলে গেল। “মেহরিন, খাতাটা তোর কাছেই থাক।” তিনি টেবিলের ড্রয়ার নিজে বন্ধ করে চাবিটা মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। এই ছোট্ট হস্তান্তরটাই যথেষ্ট ছিল; আরিবের হাতে থাকা সুবিধেটা নরমে খুলে গেল। কিন্তু তাতে কোনো জয়ধ্বনি ছিল না। মেহরিন শুধু চাবিটা নিল, খাতার ওপর রাখল, আবার লিখতে বসল। তার কাঁধ সোজা, মুখে কোনো রং নেই। যে অপমানটা বহু বছর আগে চাপা পড়েছিল, আজ তার ওজন এক মুহূর্তের জন্য অন্য কারও হাতে গিয়ে লাগল—তবু পুরনো ক্ষত ভরল না।
সন্ধ্যার পর কনের গায়ে হলুদ শেষ, ছবি তোলা শেষ, অতিথিদের প্রথম ঢল নেমে গেলে হলের পাশের বারান্দায় একটু ফাঁক পড়ল। মেহরিন ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। ফোনের স্ক্রিন নিচু করে তালুতে ধরা; আরিবের দুটো মিসড কল, একটা ছোট বার্তা—“পাঁচ মিনিট দরকার।” সে উত্তর দিল না। বারান্দার গ্রিলে হলুদ আলো, নিচে গলির ধোঁয়া, দূরে আজানের ভাঙা সুর। এ সময়েই আরিব সামনে এসে দাঁড়াল, কিন্তু খুব কাছে নয়; দরজার ফ্রেমের বাইরে, যেন ভেতরে ঢোকার অনুমতি সে নিজেও পাচ্ছে না।
তার হাতে সেই সাদা খাম। এবার খামটা খোলা, ভেতরে একটা চাবি আর একটা পাতলা নথি। আরিব নিচু গলায় বলল, “মেহরিন, আমি তখন ভুল করেছি। শুধু ভুল না—আমি চুপ ছিলাম। আম্মু যখন বলেছিল, তোমার সঙ্গে গেলে আমার পথ আটকে যাবে, আমি ওটাই হতে দিয়েছি। তুমি টিউশনি করে, খালুর কাগজ লিখে, আমার ফর্ম ফি পর্যন্ত দিয়েছিলে। আমি কাউকে বলিনি।” তার গলার স্বর ভেঙে পড়ল না; বরং যত সংযত, তত দেরি করে আসা। “এটা ধানমন্ডিতে ছোট একটা ফ্ল্যাটের বুকিং চাবি। আমার নামে ছিল, আমি তোমার নামে করে দেব। আর এই নথি… চাকরির জন্য না, নিরাপত্তার জন্য। তুমি চাইলে—”
মেহরিন কাপটা রেলিংয়ে নামিয়ে রাখল। ঠান্ডা চায়ের উপরিতে পাতলা আস্তরণ জমেছে। “চাইলে কী?” সে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু স্বরে তৃষ্ণা ছিল না, কৌতূহলও না। আরিব এবার প্রথমবার সরাসরি তাকাল। “একটু ভেতরে যাই? দুই মিনিট বসে কথা বলি। সব ঠিক করতে পারব না, জানি। কিন্তু অন্তত—”
“অন্তত নামটা বলবে?” মেহরিনের কণ্ঠ খুব নিচু। “যেটা করেছিলে, তার নাম?” আরিব যেন অনেকদিন ধরে গিলে রাখা একটা লজ্জা গলায় টেনে তুলল। “আমি তোমাকে কম ভেবেছিলাম। তোমার পরিশ্রম নিয়েছি, কিন্তু পাশে দাঁড়াইনি। স্ট্যাটাস বেছে নিয়েছি। তোমাকে একা রেখে সুবিধা নিয়েছি।”
শব্দগুলো বারান্দার বাতাসে পড়ে রইল। ভেতরে হলঘর থেকে একদল আত্মীয় হাসতে হাসতে বেরোতে গিয়ে আবার থেমে গেল; তারা পুরোটা শুনল না, কিন্তু দৃশ্যটা বুঝল—দরজার ধারে একজন পুরুষ, হাতে খাম; ভেতরে দাঁড়ানো মেয়ে, চাবি আর হিসাবের অধিকার তার কাছে। আরিব খামটা বাড়িয়ে দিল। “নাও। এটা নাও, মেহরিন। আমাকে শাস্তি দিও, কিন্তু এটা ফিরিও না।”
মেহরিন এক মুহূর্ত হাত বাড়াল। আরিবের চোখে দ্রুত, অযথা একটা আশা উঠল। সে খামটা নিল না; তার বদলে নিজের পকেট থেকে ছোট নীল ফিতেয় বাঁধা ড্রয়ারের চাবিটা বের করল—যেটা সেলিনা খালা সন্ধ্যায় তাকে দিয়েছিলেন। তারপর আরিবের খোলা হাতের ওপর নিজের চাবিটা না রেখে, পাশের কনসোল টেবিলে রাখল। এই বাড়ির ভেতরের হিসাব তার হাতে থাকবে, কিন্তু সেই অনুমতি কারও কাছে বন্ধক নয়—এ কথাটাই যেন প্রথমে জায়গা নিল। তারপর সে আরিবের বাড়ানো খামটার নিচে আঙুল ছুঁইয়ে সেটাকে ধীরে ধীরে তারই বুকে ঠেলে দিল।
“ভেতরে আসার দরকার নেই,” সে বলল। “এখানে যা বলার ছিল, হয়ে গেছে।”
আরিব নড়ল না। “একবার বসি, প্লিজ। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব, তবু—”
মেহরিন এক পা পেছাল। দরজার কাঠ তার কাঁধের কাছে এল, ছোট্ট সেই ফ্রেমের ফাঁক আরও সরু হয়ে গেল। সে হাত বাড়িয়ে হলঘরের দরজাটা অর্ধেক টেনে আনল, যেন পথ বন্ধ করতে খুব বেশি শব্দও লাগল না। “দেরি করে আনা জিনিস রেখে দাও নিজের কাছেই,” সে বলল। “আমার দরকার ছিল তখন।”
খামটা আরিবের হাতে রয়ে গেল। মেহরিন নিচু হয়ে কনসোল টেবিল থেকে নিজের কাপ তুলে নিল, এক সেকেন্ড থামল, তারপর কাপটা দরজার ভেতরের ছোট তাকের ওপর রেখে দিল—চা একেবারে ঠান্ডা। তার ফোনটা এখনও তালুতে, স্ক্রিনে আরিবের নামের ওপরে নরম আলো জ্বলছে। সে ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিল, সম্পূর্ণ জোরে নয়, কিন্তু এমনভাবে যে বাইরে থেকে আর হাত বাড়িয়ে ধরা যায় না।
হলঘর একটুখানি ফাঁকা। দূরের আলোগুলো পর্দায় পড়ে ছায়া বানাচ্ছে। তাকের ওপর কাপটা পড়ে আছে; চায়ের রং গাঢ় হয়ে গেছে। মেহরিন ফোনটা উল্টে রাখল, স্ক্রিনের আলো তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে একবার নীল হয়ে উঠল, তারপর নিভে কালো হয়ে গেল।