Fast Fiction

অনুতাপ এল, ভেতরে ঢুকল না

রাশেদা খালা ট্রেটা মেহরীনের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, “ওদিকে বসিস না, ওই সোফা বড়দের জন্য। প্লাস্টিকের চেয়ারটা টেনে নে, চা দে আগে।” দরজার ভেতরেই থেমে গেল মেহরীন। সারা দিন কৃষি ব্যাংকের ফাইল টেনে বসে থাকার ক্লান্তি তার কাঁধে জমে আছে, ওড়নার কিনারা কুঁচকে গেছে, হাতে আধভাঁজ করা রসিদ—নাফিসার ওষুধের, তিনবার খুলে আবার ভাঁজ করা। ড্রয়িংরুমে আলো, কাবাবের গন্ধ, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ, আর মাঝখানে আরিবের মা এমনভাবে তাকালেন যেন মেহরীন এখনও সেই পুরোনো মেয়ে—যাকে ডাকা যায়, বসানো যায় না।

আরিব তখনও আসেনি। তবু তার অনুপস্থিতিতেও সে ঘরটায় ছিল—চকচকে কুশনে, চুপচাপ বসে থাকা এক কাজিনের ফিসফিসে গলায়, “ওই যে, আরিব ভাইয়ার ইউনিভার্সিটির ফ্রেন্ড।” ফ্রেন্ড। চার বছর আগে, যখন আরিব চাকরি পেল বলে সম্পর্কটা “এখন সম্ভব না” বলে সরিয়ে দিয়েছিল, তখনও শব্দটা এমনই ছিল—সুবিধামতো ছোট, অপমানের জন্য যথেষ্ট। মেহরীন ট্রের কাপে চা সাজাতে সাজাতে দেখল, নরম গ্লাসের বাটিতে রাখা মিষ্টির চেয়ে তার হাতের কাজের দাম এখানে বেশি।

দরজার বাইরে তখনই শুকনো কাগজের খসখস শব্দ। তানভীর এক হাতে পাতলা কাগজে মোড়া কেকের বাক্স, আরেক হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠল। তাকে দেখেই রাশেদা খালার গলা বদলে গেল, “আসছিস? দেরি হলো কেন?” তানভীর জুতা খুলে, হাঁপ সামলে, প্রথমে মেহরীনের হাত থেকে ট্রেটা নামিয়ে বলল, “এটা আমি দিচ্ছি। মেহরীন, নাফিসা তোমাকে খুঁজছে। উপরে আম্মার ঘরে যাও তো।”

ঘরটা এক নিঃশ্বাসের জন্য কেমন কাত হয়ে গেল। রাশেদা খালা বললেন, “এই এখন? আগে লোকজনকে—”

“চা আমি দিচ্ছি,” তানভীর শান্ত গলায় বলল। “ও নাফিসার ওষুধও এনেছে। দোতলায় যাও, আপা অপেক্ষা করছে।”

মেহরীন তাকিয়ে রইল। এই বাসায় সে অতিথি হয়ে আসে না; গত আট মাস ধরে নাফিসাকে কোচিংয়ে পৌঁছে দেওয়া, খালার ডাক্তারের সিরিয়াল নেওয়া, বাজারের তালিকা মিলিয়ে দেওয়া—সব করেছে, কিন্তু সেসব কাজ ছিল পর্দার আড়ালে। আজ প্রথমবার কারও সামনে তার জন্য একটা জায়গা আলাদা করে উচ্চারণ করা হলো। “উপরে যাও”—আদেশ নয়, অধিকার।

দোতলায় ছোট ঘরটা খোলা। নাফিসা বিছানার ওপর অর্ধেক উঠে বসে, ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “আপু, তুমি নিচে কেন? আমার চুলটা বেঁধে দাও, সবাই আসার আগে।” বিছানার পাশে তানভীরের মা শুয়ে, হাঁপের কাশির ফাঁকে বললেন, “ওকে নিচে পাঠাই না আর। এতক্ষণ দাঁড়ায়ে ছিল?” মেহরীন কোনো উত্তর দিল না, শুধু রসিদটা বালিশের পাশে রেখে নাফিসার চুল ভাগ করল। এই ঘরে তার হাতের স্পর্শ লোকদেখানো নয়; এখানে কেউ তাকে মনে রাখে কাজ ফুরালে ফেলে রাখার জিনিস বলে না।

নিচে নামতেই আরিব এসে গেছে। ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, চুলে জেল, হাতে মোবাইল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে প্রথমে মেহরীনকে দেখে থমকাল, তারপর এমন হাসি দিল যেন কিছুই অস্বস্তিকর নয়। “তুই? হঠাৎ?” তার গলায় অবাকের চেয়ে হিসাব ছিল বেশি—এত লোকের মধ্যে কোন ভঙ্গিতে কথা বললে নিজের পুরোনো নিষ্ঠুরতা ঢাকা যায়।

মেহরীন শুধু বলল, “ডাকা ছিল।” সে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে আরিব আধা-ফিসফিসে বলল, “একটু পরে কথা বলবি।”

রাশেদা খালা সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দিলেন, “কথা আবার কিসের? মেয়েটা ভালো, কিন্তু সবার তো ভাগ্য একরকম হয় না। আরিব এখন অন্য লেভেলে গেছে।” কথাটা তিনি কার জন্য বললেন, বোঝার কষ্ট হলো না। কাছের এক খালা সমর্থনে মাথা নাড়লেন। “মেয়েরাও এখন চাকরি-বাকরি করে, ভালোই। তবে ঘর সামলানোর জিনিস আলাদা।”

মেহরীন থামল না। কিন্তু সে অনুভব করল, আরিব চুপ করে গেল। একদিন এই একই সুরে, এই একই ধরনের তুলনার কাছে সে মাথা নত করেছিল। তার নিজের পড়াশোনার ফরম ফি জমা দিতে দেরি হওয়ায়, বাবার স্ট্রোকের হাসপাতালের বিল হাতে নিয়ে, সে আরিবের সামনে বসেছিল টং দোকানের বেঞ্চে। আরিব তখন বলেছিল, “আম্মাকে বুঝাতে পারছি না। তুই একটু সময় দে।” সেই ‘সময়’ই ছিল অন্য এক মেয়ের সঙ্গে তার বাগদানের সময়।

ডাইনিংয়ের কাছে তানভীর তালিকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। “মেহরীন, ভাত ওপরে যাবে দুটো প্লেট। নাফিসা আর আম্মা নিচে নামবে না। আর চাবিটা কোথায় রেখেছ?” প্রশ্নটা এমন স্বাভাবিকভাবে এল, যেন এই ঘরের কাজে কোন জিনিস কার হাতে নিরাপদ, তা সবার জানা। মেহরীন তার ব্যাগ থেকে ছোট পিতলের চাবিটা বের করল—ওষুধের আলমারি আর বারান্দার গ্রিলের একসঙ্গে লাগানো চাবি। তানভীর হাত বাড়িয়ে আবার থামল। “না, তুমি রাখো। তোমাকেই তো পরে বের করতে হবে।”

কথাটা শুনে আরিবের মুখে সেই মসৃণ ভদ্রতা প্রথমবার ফাটল ধরল। চাবি নেওয়া-দেওয়া এখানে শুধু কাজ নয়; ঘরের ভেতরে কার চলাফেরার অনুমতি আছে, তারও হিসাব। রাশেদা খালা যেন হঠাৎ বুঝতে পারলেন, নিচের প্লাস্টিকের চেয়ারে ঠেলে দেওয়া মেয়েটাকে এ বাসায় অন্য কোথাও বসিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি ঠোঁট টিপে বললেন, “তানভীর, সবকিছু সবাইকে এত হাতে তুলে দিতে নেই।”

তানভীর মিষ্টির বাটি সরাতে সরাতে সোজা উত্তর দিল, “যার হাতে দিলে খুঁজতে হয় না, তার হাতেই দিই।”

এক মুহূর্তে ঘরের পড়া বদলে গেল। কেউ চিৎকার করল না, কেউ নাটক করল না; শুধু রাশেদা খালা আরিবকে দ্বিতীয়বার চা চাইতে বললেন না, আর নাফিসা সিঁড়ির মাথা থেকে চেঁচিয়ে উঠল, “মেহরীন আপু, তুমি যাবে না কিন্তু! কেক কাটার পর আমার নোট বুঝায়া দিবা।” এই ‘যাবে না’টাই ছিল আসল। অতিথিরা ওঠে; আপনজনকে থেকে যেতে বলা হয়।

আরিব আরেকবার কাছে এল, এবার রান্নাঘরের ধারে। “তুই এখানে এত… মানে, রেগুলার আসিস?” শব্দ বাছাই করতে গিয়ে সে কেমন কাঁচা হয়ে গেল। মেহরীন হাঁড়ির ঢাকনা চাপা দিতে দিতে বলল, “যখন দরকার হয়।”

“আমার তো জানাই ছিল না।”

“তুই জানতে চাসনি।”

কথাটা ছুরির মতো তীক্ষ্ণ ছিল না; বরং ক্লান্ত। এই ক্লান্তিটাই আরিবকে বেশি অস্বস্তিতে ফেলল। সে নিচু গলায় বলল, “আমি তোর সঙ্গে অন্যায় করেছি, জানি। তখন অনেক চাপ ছিল।”

মেহরীন ঢাকনার গরম ধাতুতে আঙুল ছুঁইয়ে সরিয়ে নিল। “চাপ ছিল বলে মানুষকে অপেক্ষায় রাখিস। ফেলে রাখিস না।”

তার আগে আরিব জবাব দিত, নিচের গেট খোলার শব্দ হলো। কেউ সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে বলল, “আরিব ভাই, তোমার বাসা থেকে একজন লোক আইছে। এটা দিয়ে গেছে।” সবার চোখের সামনে একটা ছোট সাদা খাম আর তার ওপর রাখা আরেকটা চাবি। আরিব চমকে খামটা নিল। খামের মুখ ছিঁড়তেই ভেতর থেকে ভাড়াবাসার চাবির রিং, আর দুই লাইনের নোট। সে পড়ে ফ্যাকাসে হলো।

রাশেদা খালা এগিয়ে এলেন, “কি?”

আরিব নোটটা মুঠোয় চেপে বলল না, কিন্তু মেহরীন বুঝল। যে মেয়েটার সঙ্গে বাগদান ঠিক ছিল, সে জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে। হয়তো আরেকটা ভালো সমীকরণ পেয়ে গেছে, হয়তো দীর্ঘদিনের সাজানো ভদ্রতা শেষে আরিবকেই রেখে দিয়েছে দরজার বাইরে। এটাই কি বিচার? পুরো না। তবে দেরিতে শেখা পাঠের চেহারা এমনই হয়—সামান্য, লজ্জাজনক, সবার সামনে পড়ে থাকা।

আরিবের চোখ এবার সরাসরি মেহরীনের দিকে উঠল। প্রথমবার সেখানে কৌশল কম, আতঙ্ক বেশি। “মেহরীন, একটু নিচে আসবি?” তার গলায় অনুনয় ছিল, আর সেই অনুনয়টাই দেরিতে আসা।

সিঁড়ির মোড়ে নিচতলার বেঞ্চটার পাশে কম আলো। পুরোনো বিল্ডিং, সিমেন্টের দেয়ালে স্যাঁতস্যাঁতে দাগ, গেটের বাইরে ঢাকার রিকশার ঘণ্টা। আরিব আগে নেমে দাঁড়িয়েছিল। চায়ের দোকান থেকে পাঠানো কাগজের কাপ দুটো টেবিলের ওপর। একটার ভাপ এখনও পাতলা। সে মেহরীনকে দেখেই তাড়াহুড়ো করে বলল, “আমি ভুল করেছি। তখন আমি কাপুরুষ ছিলাম, এখন সেটা বুঝি। ওই বাসার চাবি…” সে নিজের মুঠো খুলে ধরল, “তোর কাছে থাক। আমরা আবার শুরু করতে পারি। এবার আমি কাউকে—”

মেহরীন চাবিটার দিকে তাকাল। ধাতু, রিং, একফালি নীল প্লাস্টিক। একসময় এইরকম একটা চাবি তার কাছে থাকলে সে রাত জেগে ভবিষ্যৎ কল্পনা করত। কোন বই শেলফে রাখবে, ফ্রিজে কতটুকু মাছ, মাসের শেষে কতটুকু টান। তারপর একদিন আরিব বলেছিল, “আমার পক্ষে আর হচ্ছে না,” আর সেই কল্পনার ঘর আগুন না লাগলেও পুড়ে গিয়েছিল। আজ চাবি এসেছে—ঘর ভাঙার পরে।

উপরে থেকে নাফিসার হাসির শব্দ নেমে আসছিল। কারও ডাকা—“মেহরীন আপু!” তারপর তানভীরের গলা, “ও নিচে আছে, আসছে।” সহজ, ঘরোয়া, অযত্নে উচ্চারিত; তবু তার মধ্যে জায়গা ছিল। আরিবের হাতে ধরা চাবিতে ছিল দেরি।

সে বলল, “দেরি হয়ে গেছে।”

আরিব এক পা এগোল। “দেরি মানে? তুই যদি একবার—”

“আমি একবার অনেকবার করেছি।” মেহরীনের গলা নিচু, স্থির। “তুই যখন আমাকে দরজার বাইরে রেখে নিজের সুবিধা বেছেছিস, তখন আমার অপেক্ষার দিনগুলো কি তোর কাছে ফিরে আসবে? আমার বাবার হাসপাতালের সেই রাতগুলো? আমার মাস্টার্স ফরম ফেলে রাখা? আমার নিজের কাছে ছোট হয়ে যাওয়া?” সে হাত বাড়াল না। “চাবি দিয়ে এসব খোলা যায় না।”

আরিব এবার চাবিটা প্রায় তার দিকে ঠেলে দিল। “আমি এবার সত্যি বলছি। আমি বুঝছি।”

“বুঝেছিস,” মেহরীন বলল, “কারণ তোর দরজাও একবার বন্ধ হয়েছে।”

কথাটা শোনার পর সে আর তর্ক করতে পারল না। শুধু ফিসফিসিয়ে বলল, “তবু নে। প্লিজ।”

মেহরীন ধীরে ধীরে তার হাতের ওপর আঙুল রাখল, কিন্তু নেওয়ার জন্য নয়। চাবিটা তার মুঠো থেকে সরিয়ে পাশের ছোট টেবিলের কিনারায় নামিয়ে রাখল। ধাতুতে ঠক করে শব্দ হলো। তার পাশে কাগজের কাপ। সে নিজের জন্য ধরা কাপটাও না নিয়ে সোজা করে রেখে দিল, যেন কোনো জিনিস ভুল হাতে না যায়। তারপর বলল, “যে সময়ে আসিসনি, সেই সময়টাই দরকার ছিল।”

সে ঘুরে সিঁড়ির দিকে উঠল। মাঝপথে থেমে আর একবার নিচে তাকাল না। ওপরে আলো, মানুষের শব্দ, নাফিসার ডাক, রান্নাঘরের ঢাকনা খোলার টুংটাং—সবকিছু তাকে ফেরত চাইল না; ধরে নিল সে থাকবেই। নিচে বেঞ্চের পাশের টেবিলের কিনারায় ফিরিয়ে দেওয়া চাবিটা পড়ে রইল, তার পাশে ছুঁয়ে না-দেখা এক কাপ চা ঠান্ডা হতে থাকল। বেঞ্চ ফাঁকা। কাপে উঠতে থাকা শেষ পাতলা ভাপটুকু নিভে গেল।