আমাকে সরাতেই শর্টকাট মরল
“মৌ, ওই কৃষির প্রেসক্রিপশনটা আগে দাও—না, এটা না, সবুজ ফাইলটা—আহা, তোমারে কতবার কইতে হবে?”
এক হাত দিয়ে প্রেসক্রিপশন টেনে, আরেক হাত দিয়ে টাকা গুনে, কাঁধ দিয়ে কাচের স্লাইডিং জানালা ঠেকিয়ে রেখেছিল মৌ। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তিতে তার সালোয়ারের হাঁটুর কাছে ভাঁজ শক্ত হয়ে আছে, কবজিতে নীল দাগ ফেলে রাবার ব্যান্ড চেপে আছে। কাউন্টারের সরু ধার জুড়ে ঠান্ডা হয়ে চা-র ওপর সর জমে গেছে, পাশে ভাঙতি টাকা, স্ট্যাম্প, আর অর্ধেক খোলা রেজিস্টার। রোগীর লাইন দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে, তবু রাশেদা ভাবি তাকে এমন গলায় ধমকাচ্ছিলেন যেন মৌ শুধু বাড়তি হাত, কাউন্টারের মানুষ না।
মৌ চোখ না তুলেই বলল, “সবুজ ফাইল আপনার ডান পাশে। কৃষির ওষুধ ছাড়তে হলে আগের কিস্তির কপি লাগবে।”
রাশেদা ভাবি তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন। “এই জন্যই তো বলি, পড়ালেখা কইরা মেয়েদের মাথা গরম হয়। রোগী দাঁড়ায়া আছে, তুমি নিয়ম ধরছ?” তাঁর গলায় সেই টান—আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে লোক দেখানো মমতা, আর ভেতরে খোঁচা। আজ তিনি ইচ্ছে করেই এসেছেন; ক্লিনিকের মালিক ডা. খালার বড় ভাবি, পাড়ায় মুখ আছে। সন্ধ্যার ভিড়ের এই সময়ে এসে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই কার হাতে কাজ, কার হাতে শুধু ঘাম—তা সবাইকে দেখানো।
তবু প্রথম ফাঁকাটা মৌ-ই খুলে দিল। লাইনে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ কাগজ বাড়িয়ে কাঁপা গলায় বললেন, “মাইয়া, তুমি দেখো, আগেও তোমার হাতেই নিছিলাম।” রাশেদা ভাবি মুখ বাঁকানোর আগেই মৌ রেজিস্টারের ভাঁজ খুলে নাম খুঁজে বের করল, পুরোনো কিস্তির পাতায় আঙুল রেখে বলল, “এই যে, বাকি ছিল দুইশো। আজ দিলে ছাড়বে।” বৃদ্ধ টাকা দিলেন সরাসরি তার হাতেই। রাশেদা ভাবির সামনে, টাকা গিয়ে পড়ল মৌয়ের টিনের ট্রেতে। ক্ষুদ্র, কিন্তু পরিষ্কার—কাউন্টার এখনো তার হাত চেনে।
এর মধ্যেই সজিব এসে ঢুকল। ইস্ত্রি-করা পাঞ্জাবি, গলায় সুগন্ধি, হাতে ফোনের নীচু আলো। ক্লিনিকের হিসাব নাকি শিখছে—ডা. খালার ভাতিজা। বাস্তবে রাতের ব্যস্ত সময়ে এসে স্টুলে বসে কাগজ নাড়ে, আর লোকজন তাকে “ছেলে মানুষ” বলে সরে দাঁড়ায়। রাশেদা ভাবি সঙ্গে সঙ্গে নরম হলেন। “এসো সজিব, তুমি বসো। এত ভিড়ে এ মেয়েরে দিয়া আর কুলানো যায় না।”
মৌ তখন এক মহিলার পরীক্ষা-স্লিপে সিল মারছে। সিলটা নামিয়ে রাখার আগেই রাশেদা ভাবি তার বুকপকেট থেকে ঝুলে থাকা পরিচয়-চিহ্নের ক্লিপ খুলে নিলেন। এত দ্রুত, যেন খুব স্বাভাবিক কাজ। তারপর স্টুল টেনে সজিবকে বসিয়ে সক্রিয় ফাইলটা—আজকের ছাড়পত্রের লাল ফোল্ডার—তার সামনে সরিয়ে দিলেন। “তুমি বসো। ও ভেতরে যাক, প্যাকেট গুছাক।”
মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু সিঁড়িমুখে দাঁড়ানো লোকজন, পাশের বেঞ্চে বসা খালা, ইনজেকশনের রুম থেকে বের হওয়া আয়া—সবাই দেখল। কাউন্টারের মানুষকে এক ধাক্কায় পেছনে সরিয়ে দেওয়া যায়, যদি পাশে বংশের জোর থাকে। মৌয়ের আঙুল তখনো সিলের কালি মুছছে। সে শুধু হাতটা বাড়িয়ে খালি জায়গায় তাকাল, যেখানে ক্লিপটা ছিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু লাল ফোল্ডারে অসম্পূর্ণ ছাড়পত্র আছে। নাম না মিললে ওষুধ বের হবে না।”
“তোমারে শেখায় কে?” রাশেদা ভাবি ঠাস করে বললেন। “যা, ভেতরে যা।”
মৌ ভেতরে গেল না। কাউন্টারের এক পাশ থেকে সরে গিয়ে দেয়ালের কাছে দাঁড়াল, হাত গুটিয়ে না, মুখ ফুলিয়ে না—শুধু এমন দূরত্বে, যেখানে সব দেখা যায় কিন্তু সে আর কিছু ছুঁবে না। এইটুকু করাই রাশেদা ভাবি ভাবেননি। সজিব প্রথমে হেসে বসেছিল; দুই মিনিটের মধ্যে সেই হাসি শুকিয়ে গেল।
এক মা তার জ্বরের শিশুকে কোলে নিয়ে প্রেসক্রিপশন বাড়াতেই সজিব ভুল করে পুরোনো ডোজের ওষুধ ধরিয়ে দিল। মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন, “গতবারে এইডা খাইয়া বমি করছিল!” পিছন থেকে কেউ বলল, “নাম ঠিকমতো দেখেন!” আরেকজন জমার রসিদ চাইলো। সজিব রেজিস্টার উল্টে দেখে, একই নামে দুজন রোগী। লাল ফোল্ডারের মধ্যে একটি নীল স্লিপ আটকে আছে; কোনটা ছাড়বে বুঝতে পারছে না। কাউন্টারের কাচের ওপারে লোকজনের ধৈর্য যেমন পাতলা, তেমনি রাতও নেমে আসছে। বাইরে আজানের পর রাস্তার দোকানগুলোতে ঝাঁপ নামার শব্দ উঠছে।
রাশেদা ভাবি তাড়াতাড়ি কাগজ টেনে নিয়ে বললেন, “দাও, আমি দেখি।” দেখেই তার গলাটা আটকে গেল। শেষ রোগীর ছাড়পত্রে ডা. খালার সই বাকি, আর সেই সই যাওয়ার আগে বিলের পাশে ডিউটি-নাম লিখতে হবে কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা লোকের। আজকের নাম আধাআধি লেখা ছিল—মৌর হাতের অক্ষর, তারপর খালি। নাম মেলানো ছাড়া কৃষির ভর্তুকির ওষুধ ছাড়া যাবে না; ভুল দিলে ফেরত নেওয়ার উপায় নেই। তার ওপর রাতের হিসাব বন্ধ হবে না, টাকা মিলবে না।
সজিব ফিসফিসিয়ে বলল, “ও কই? ওকে ডাকেন।”
মৌ শুনেও এগোল না। সে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কাঁধের ওপর সারাদিনের শক্ত ভাব, পায়ের কাছে আলো-ছায়া। পাশের স্ট্যান্ডে রাখা তার ফোনে নীচু আলো জ্বলল; কেউ মেসেজ দিয়েছে, সে দেখলও না। খালা বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “মৌ, একবার দ্যাখ তো মা।” গলায় অনুরোধ ছিল, কর্তৃত্বও ছিল, কিন্তু কাউন্টারের সামনে এত মানুষের মধ্যে অনুরোধ আর আদেশের পার্থক্য সবাই টের পায়।
মৌ এবার তাকাল। “দেখব। কিন্তু আমার হাতের কাজ যদি আমার না হয়, ভুলের দায়ও আমার না।”
রাশেদা ভাবি রেগে উঠে বললেন, “এইখানে দাঁড়ায়া নাটক করো না। রোগী আছে।”
“তাই তো,” মৌ শান্ত গলায় বলল। “রোগী আছে বলেই কিছু ছুঁই না। আমার ক্লিপ, আমার স্টুল, লাল ফোল্ডার—যেখানে ছিল, সেখানে আসুক। তারপর আমি বসব।”
কাউন্টারের ওপারে শিশুটার মা চুপ করে গেলেন। নাইট-গার্ড সোহেল দরজার ফ্রেমে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; তার মুখে সেই কৌতূহলী টান, যখন পাড়ার কোনো গোপন হিসাব হঠাৎ প্রকাশ্য কাজে ধরা পড়ে। সজিব এবার পুরোপুরি অস্বস্তিতে। “ভাবি, দেন না। ক্লোজ করতে হবে তো।”
রাশেদা ভাবির মুখ লাল, কিন্তু হাত আটকে গেছে। কাউন্টার এখন বন্ধও করা যাচ্ছে না। ভিতরের ফার্মেসি-ছেলেটা ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোন রোগীর ওষুধ বের করবে বুঝছে না। খালা ধীরে ধীরে সামনে এলেন। তিনি কারও দিকে তাকালেন না, শুধু সজিবের সামনে রাখা লাল ফোল্ডার তুলে কাউন্টারের আগের জায়গায় রাখলেন। তারপর রাশেদা ভাবির হাতে ধরা পরিচয়-চিহ্নের ক্লিপটার দিকে চোখ বাড়ালেন। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। রাশেদা ভাবি মুখ ঘুরিয়ে ক্লিপটা নামিয়ে রাখলেন।
“মৌ,” খালা বললেন, গলা খুব নিচু, “তোমার জায়গায় বসো।”
এইটুকুই। না ক্ষমা, না ঘোষণা। কিন্তু শব্দটা শুনে যেন কাচের জানালার সামনে জমে থাকা চাপা হাওয়া সরল। মৌ এগিয়ে এল। সে সাথে সাথে বসেনি। আগে ক্লিপটা তুলে নিজের ওড়নার ধারে আটকাতে দুবার চেষ্টা করল; হাতের ঘামে ফসকে যাচ্ছিল। তারপর স্টুলে বসল, লাল ফোল্ডার টেনে নিল, রেজিস্টার খুলে মাঝখানের ভাঁজটা সমান করল। কাউন্টারের ওপারে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাগজ গুছিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। লাইন আবার একজনের হাতে ফিরে এলো।
“শিশুরটা আগে,” মৌ বলল। প্রেসক্রিপশন টেনে নিয়ে আগের ভুল ওষুধটা সরিয়ে সঠিক ডোজ লিখে ভেতরে দিল। “পরেরজন, কৃষির কিস্তির কপি?” বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। “জমা দুইশো হয়েছে। ওষুধ ছাড়ুন।” ফার্মেসি-ছেলেটা এবার প্রশ্ন না করে তাকেই শুনল। সজিব এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে টাকা গোনার ট্রে ধরল, যেন অন্তত কিছু কাজে লাগে; মৌ তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “পঞ্চাশের আলাদা বান্ডিল করুন, ভুল করবেন না।”
কাজ এবার দৌড়াতে লাগল, কিন্তু সেই দৌড়ের লাগাম তার হাতেই। নাম মিলল, রসিদ কাটা হলো, ডাক্তারের কক্ষে শেষ ছাড়পত্র সইয়ের জন্য সে নিজেই ভিতরে পাঠাল। রাশেদা ভাবি একবার বলেছিলেন, “আমি দিই?” মৌ মাথা না তুলেই বলেছিল, “থাক।” গলাটা শক্ত নয়, ঠান্ডাও নয়—শুধু কাজের ভাষা। এই ভাষাতেই সবচেয়ে বেশি অপমান ফেরত যায়।
শেষ ভিড়টা নামতে নামতে রাত ন’টা পেরিয়ে গেল। শাটার অর্ধেক নামানো, বাইরে ফার্মেসির নীয়ন আলো কাঁপছে। নাইট-গার্ড সোহেল দুজন দেরি-করা রোগীকে জানিয়ে দিল, “আজ শেষ। কাল সকালে আসেন।” কিন্তু ভেতরে তখনো শেষ কাগজ বাকি। হিসাবের পাতায় জমা-খরচ মেলাতে গিয়ে সজিব আবার থমকালো। তার গলায় আর আগের নিশ্চিন্ত ভঙ্গি নেই। “এখানে ঘাটতি দেখাচ্ছে।”
মৌ তার হাত থেকে কাগজ নিল না। “ঘাটতি না। দুপুরের ফেরত টাকা আপনি ভুল খাতায় ধরেছেন।” সে রেজিস্টারের ডান পাশের পাতায় আঙুল রাখল। “এখানে তুলুন। আর বন্ধের কাগজে দায়িত্বের নাম ফাঁকা কেন?”
খালা তখন চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছেন। রাশেদা ভাবি আর কিছু বললেন না। সজিব পেন ধরল, কিন্তু থামল। যে জায়গায় কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা লোকের নাম লেখা হয়, সেটা ফাঁকা। ক্লিনিক আইনমতো ওই নাম ছাড়া রাত্রির নগদ জমা সিল হবে না। খালা এবার পেনটা তার হাত থেকে নিয়ে কাগজটা মৌয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“তুমি লেখো।”
এই মুহূর্তে চাইলে মৌ সঙ্গে সঙ্গে পেন নিয়ে ফেলতে পারত। তবু সে নিল না। শুধু হাত বাড়িয়ে কাউন্টারের খালি জায়গাটার দিকে দেখাল, যেখানে শিফট-শিট পড়ে থাকার কথা। “আজকের শিফট-শিট?”
সজিব তাড়াতাড়ি নিজের কনুইয়ের নীচে চেপে রাখা সাদা পাতাটা বের করল। ভাঁজ পড়ে গেছে। সে সেটাও এগিয়ে দিল। এবার মৌ নিল। প্রথমে শিফট-শিট নিজের দিকে টেনে রাখল, তারপর বন্ধের কাগজ। পরিচয়-চিহ্নের ক্লিপ তার ওড়নার ধারে ঠেকা, ঠান্ডা ধাতু। সে নাম লিখল—মৌ। অক্ষরগুলো ছোট, স্থির। এরপর হিসাবের ঘাটতির লাইনটা ঠিক করে দিল, বিল নম্বর মেলাল, নগদের অংক পাশে টেনে দিল। খালা সেই অনুযায়ী সই করলেন। ভেতর থেকে ফার্মেসি-ছেলেটা শেষ ট্রে গুছিয়ে নিল।
সজিব খুব নিচু গলায় বলল, “আমি বুঝি নাই।” সে ক্ষমা চাইল না; এর চেয়েও কম কিছু বলল। কিন্তু সে কাউন্টারের ওপর রাখা ট্রেটা সরিয়ে মৌয়ের জন্য জায়গা করে দিল। সেই সরানোটা চোখে পড়ার মতো ছোট, তবু সত্যি।
মৌ শুধু বলল, “আগে নাম দেখবেন, পরে ভরসা করবেন।”
শাটার পুরো নামার আগে রাশেদা ভাবি একবার দরজার কাছে থমকালেন। তার চুড়ির শব্দ হলো, তারপর থেমে গেল। মৌ তাকাল না। সে রেজিস্টারের শেষ পাতায় সিল বসাচ্ছিল। কারও মুখ দেখে রাত শেষ করার কোনো দরকার নেই; কাগজে যা ঠিকঠাক বসে, সেটাই পরদিন সকাল বাঁচায়।
সবাই বেরিয়ে গেলে কাউন্টারটা হঠাৎ ছোট শোনাল। দিনের ভিড়ে যে সরু ধারটুকুতে হাত রাখার জায়গা ছিল না, এখন সেখানে শুধু লাল ফোল্ডার, বন্ধের কাগজ, আর ঠান্ডা চায়ের গোল দাগ। বাইরে ঢাকা শহরের রাতের আওয়াজ নরম হয়ে দূরে গিয়ে পড়েছে। মৌ শিফট-শিটটা ভাঁজ করে ফোল্ডারের নীচে গুঁজে রাখল, যাতে সকালে খুললেই দেখা যায়। তারপর পরিচয়-চিহ্নের ক্লিপ খুলে একবার মুঠোয় নিল; ধাতুর ঠান্ডা ভার ছোট, কিন্তু পরিচিত। বন্ধের কাগজে খালার সই শুকিয়ে এসেছে। সে কাগজটা কাউন্টারের মাঝখানে সোজা করে রাখল। ফোল্ডার যেখানে সে রেখে গেছে, সেখানেই রইল; সই-করা কাগজ তার পাশে পড়ে অপেক্ষা করতে লাগল, আর ক্লিপটা এসে নরম শব্দে তার তালুতে ঠুকল।