Fast Fiction

চেয়ারটা আবার আমার হলো

চতুর্থ র্যাকের মুখে ঠেলা গাড়ি দুটো আড়াআড়ি আটকে যেতেই রাশেদ সুপারভাইজার চাবির গোছা ঝনঝন করে তুলে বলল, “মেহজাবিন, তুমি লাইনে দাঁড়াও। ডিসপ্যাচ টেবিলে হাত দেবে না।” লাল ট্যাগওয়ালা আলুর বস্তা, সবুজ লেবেলওয়ালা পেঁয়াজের খাঁচা, আর খোলা রুটশিট একসাথে গুলিয়ে গিয়ে পুরো লেন থমকে ছিল। মেহজাবিন প্লাস্টিক চেয়ারের কোণ ছুঁয়ে দাঁড়িয়েই দেখল, তার নিজের আসনের সামনে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে ওপরটায় চামড়া পড়ে গেছে, টেবিলে গোল দাগ রেখে। সেই চেয়ারটায় রাশেদ বসে আছে, যেন শুরু থেকেই ওর ছিল।

আজকের বিলম্ব মানে শুধু মাল আটকে যাওয়া না। নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, সাভারের তিনটা ট্রাক বেরোতে না পারলে গুদামের মালিক দুপুরের আগেই নেমে আসবে, আর মাসের শেষে মেহজাবিনের বাড়িতে যে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা হয়ে ছেলে-পক্ষ বসার কথা, তাদের কাছে আবার বলার মতো কথা থাকবে—মেয়েটার চাকরি নাকি টেকে না, পদ নেই, স্থিরতা নেই। গত তিন বছর এই ডিসপ্যাচ লেন ও চালিয়েছে; কিন্তু রাশেদ তার মামাতো ভায়রার সুপারিশে এসে প্রথম সপ্তাহেই মেইন চেয়ার দখল করেছে, আর মেহজাবিনকে নামিয়ে দিয়েছে “সাপোর্ট” বলে।

“লাল ট্যাগ আগে যাবে না,” মেহজাবিন ঠান্ডা গলায় বলল, রুটশিটের দিকে তাকিয়ে। “চট্টগ্রামের গাড়িটা আগে ছাড়লে ঢাকার ভিতরেরটা আটকে যাবে। তৃতীয় র্যাক খালি করতে হবে।”

রাশেদ মাথা না তুলেই বলল, “আমি জানি। তুমি লেবেল গুনো।” তারপর ভুল খাতাটা টেনে নিয়ে নাঈমকে চেঁচাল, “পাঁচ নম্বর ট্রলি ঘুরাও, পাঁচ নম্বর!”

মেহজাবিন আরেক পা এগিয়ে রুটশিটের ভাঁজে আঙুল ছোঁয়াল। নীল কালির পুরোনো কলমের দাগ এখনও পাতার কোণে, ওর হাতের অভ্যাসের মতো। রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে খাতা সরিয়ে নিল। চারপাশের প্যাকাররা চোখ তুলল, আবার নামাল। প্রথম পুরস্কারটা ছোট ছিল, কিন্তু পড়ে থাকা অবস্থাতেই সে নিয়ে নিল—খাতার ডান পাশে থাকা মুক্তির সিলটা রাশেদের নাগাল থেকে টেনে নিজের তালুর নিচে রেখে দিল। “এটা আমার ছাড়া কেউ মারবে না,” সে বলল। “কালও দুইটা ভুল গাড়ি গেছে।” রাশেদ মুখ কষে উঠল, কিন্তু সিল ফেরত নিতে এগোল না; কারণ সবাই দেখেছে, ভুল গাড়ির কাগজে তারই সই ছিল।

দশ মিনিটের মধ্যে চাপ দ্বিগুণ হয়ে গেল। বাইরের শাটারের ফাঁক দিয়ে আরেকটা ট্রাকের হর্ন ঢুকল। শীলা আপা হিসাবের টেবিল থেকে আধভাঁজ করা রসিদ নিয়ে ছুটে এসে বলল, “সিরাজগঞ্জের লোকেরা ফোন দিছে। খালি গাড়ি দাঁড়ায়া আছে।” ঠিক তখনই গেটের দিকে সালাম চাচা দেখা দিলেন—মেহজাবিনের খালাতো ফুপার বন্ধু, যিনি আজ দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে ছেলেপক্ষকে বসানোর সময় নিয়ে কথা বলবেন। হাতে মসজিদের দোয়াতের দাগওয়ালা সাদা টুপি, মুখে অস্বস্তি। তিনি মাল তুলতে আসেননি; কাছে কারো বিয়ের বাজারের চাল-ডাল পাঠানোর গাড়ি খোঁজ নিতে এসে এই জট দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন।

রাশেদ সালাম চাচাকে দেখে কণ্ঠ বদলে নরম করল, “চাচা, একটু বিশৃঙ্খলা। নতুন মেয়ে, শিখতেছে।” কথাটা ইচ্ছে করেই জোরে বলল, যাতে লেনজুড়ে শোনা যায়।

মেহজাবিন মাথা তুলল না। “নতুন মেয়ে” শুনে তার কানের পাশ গরম হলো, কিন্তু মুখে কিছু উঠল না। সে শুধু দেখল, রাশেদ চতুর্থ র্যাকের জন্য পঞ্চম র্যাকের চালান খুলেছে। এতে সামনে থাকা দুই ট্রলি আটকে থাকবে, পেছনের তিনটা আর নামবেই না। নাঈম দ্বিধায় দাঁড়িয়ে আছে; যার নির্দেশ শুনবে, তার ওপরেই সন্ধ্যার ওভারটাইমের ভাগ।

“ভাই, কোনটা আগে?” নাঈমের গলায় সোজাসুজি ভয়।

রাশেদ এবার আরেক ভুল দিল। “সবুজ লেবেল ডান দিকে, লাল বাম। সিরাজগঞ্জ পরে।”

শীলা আপা হিসাবের কাগজ উঁচু করেই থেমে গেল। “পরে মানে? ওইটার পেমেন্ট ক্লিয়ার।” সালাম চাচা চোখ কুঁচকে তাকালেন। বাইরে হর্ন লম্বা হল। লেনের ভেতর বস্তা ঘষার শব্দ, কাঠের প্যালেট টেনে ধরার গন্ধ, ঘামের সাথে আলুর মাটির গন্ধ মিশে একধরনের আটকে থাকা দুপুর বানিয়ে ফেলল।

রাশেদ তবু চেয়ারে জেঁকে বসল। “আমি বলছি পরে। যারে যা বলছি, তাই করবে।”

সেই মুহূর্তেই পেছনের ট্রলি থেকে একটা বস্তা কাত হয়ে পড়ে ফেটে গেল। পেঁয়াজ গোল গোল গড়িয়ে পুরো লেন ভরে দিল। এক ছেলেপ্যাকার লাফিয়ে সরে গেল, আরেকজনের স্যান্ডেলের নিচে পেঁয়াজ চটকে কড়মড় শব্দ হলো। দৃশ্যটা এতটাই পরিষ্কার ব্যর্থতা ছিল যে কারও আর নিচু চোখে দাঁড়িয়ে থাকা গেল না।

মেহজাবিন সোজা রাশেদের টেবিলের দিকে হাঁটল। কারও অনুমতি নিল না। চাবির গোছা তার মুঠোয় যাওয়ার আগেই রাশেদ উঠতে গিয়ে বলল, “এই! তুমি সীমা—”

বাকিটা শেষ করতে পারল না। মেহজাবিন এক টানে চাবি নিয়ে নিল, আর অন্য হাতে ডিসপ্যাচ রেজিস্টার ঘুরিয়ে নিজের দিকে টেনে আনল। চেয়ারের পেছনে তার নামের ছোট সাদা সিট-মার্কার এখনও আটকানো ছিল, ধুলায় আধাআধি ঢাকা—“মেহজাবিন আ.” সে হাতের তালু দিয়ে ধুলো মুছে দিল, তারপর সবার শোনার মতো স্বরে বলল, “নাঈম, চতুর্থ র্যাকের মুখ খালি করো। শওকত, ফাটা বস্তা উঠাও, পেঁয়াজ ডান পাশের খাঁচায়। শীলা আপা, সিরাজগঞ্জের পেমেন্ট স্লিপ দেন। সবুজ লেবেল থামাও, লাল ট্যাগ তিন নম্বর গাড়িতে যাবে না—সাভারের ছোট ট্রাকে যাবে। এখন।”

রুমটা তর্ক করেনি; রুমটা নড়ে উঠল। কারণ নির্দেশগুলো সোজা, জায়গামতো, আর দেরি-খেকো গিঁট কেটে দিচ্ছিল। নাঈম একটুও দেরি করল না। পেঁয়াজ কুড়োনো শুরু হতেই ট্রলির মুখ খুলে গেল। শীলা আপা রসিদ ছুড়ে দিলেন। সালাম চাচা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলেন; তার চোখে এবার অস্বস্তি না, হিসাব।

রাশেদ চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “চাবি রাখো। আমি সুপারভাইজার।”

মেহজাবিন খাতা না তুলেই বলল, “তাইলে রিলিজ অর্ডার পড়েন।” সে একখানা নীল স্লিপ সামনে ধরল। “এই চালান কোন গাড়িতে যাবে?”

রাশেদ স্লিপটার দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে তিন জায়গায় সংশোধন, দুইটা গন্তব্য, আর ভোরের ফোনে বদলানো ওজন লেখা। এই লাইনের লোক না হলে চোখে পড়ে না কোনটায় শেষ চিহ্ন, কোনটা বাতিল। সে কাগজ উল্টে আবার সোজা করল। বলল, “এটা পরে—”

“পরে না,” মেহজাবিন বলল। “বাইরে গাড়ি দাঁড়ানো।”

শীলা আপা এবার কড়া স্বরে বললেন, “ভুল গেলে কাটতি আপনার নামে যাবে?” নাঈমের ঠেলা গাড়ি তখন গড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। একটা, তারপর আরেকটা। আটকে থাকা লেনের বাতাস বদলে গেল; চলন্ত চাকার শব্দ উঠল।

রাশেদ মরিয়া হয়ে একবার নিজেই নির্দেশ দিতে গেল। “সবুজটা আগে, সবুজটা—”

কেউ শুনল না। শওকত বস্তা তুলে মেহজাবিনের দেখানো লাইনে রাখল। গেটের লোকজন কাগজের জন্য তার টেবিলের দিকে এল। সালাম চাচা আর ভেতরে ঢুকলেন না, কিন্তু সরে গিয়েও দাঁড়ালেন না; তিনি এমনভাবে দেখছিলেন, যেন বাড়িতে গিয়ে কার কী বলা যাবে, এখনই মেপে রাখছেন।

মেহজাবিন কলম তুলে রেজিস্টারের পাতায় দ্রুত তিনটা নাম লিখল, সিল মারল, তারপর চাবির গোছা থেকে ছোট লোহার চাবিটা খুলে নাঈমকে দিল। “তিন নম্বর লক খুলো। বামে ঘুরবে, আটকে থাকলে চাপ দিও না।” তার গলায় তাড়া ছিল, অস্থিরতা ছিল না। রাশেদের মুখে সেই প্রথম ফাঁকা ভাব দেখা গেল; যাকে এতক্ষণ “সাপোর্ট” বলে পাশে রেখেছিল, এখন পুরো লেন তার একেকটা বাক্যে চলছে।

দুই ট্রাক বেরোতেই মালিকের ছেলে কামরুল নেমে এল। সাধারণত সে হিসাব দেখে, লেনের ঝামেলায় ঢোকে না। আজ গেটেই আটকে থাকা গাড়ি দেখে ভেতরে ঢুকেছে। চোখের সামনে সে যা দেখল, তাতে প্রশ্ন করার ভঙ্গিটাই বদলে গেল। “রিলিজ কই?”

মেহজাবিন রেজিস্টার খুলে দিল। “এখানে। আগের তিনটা ভুল মেলাইয়া নিয়েছি। চতুর্থ র্যাক খুলেছি। আরও দুইটা গাড়ি পনেরো মিনিটে যাবে।”

কামরুল রাশেদের দিকে ফিরল। “আপনি ক্লিয়ার করেন নাই কেন?”

রাশেদ বলল, “ও হঠাৎ—”

ঠিক তখনই গেট থেকে লোক ছুটে এসে বলল, “ভাই, শেষের অর্ডারটা আবার আটকা। ওজন মিলতেছে না।” সেটাই ছিল সেই ব্লকড রিলিজ, যেটা ভুল হাতে পড়লে পুরো দুপুর ডুবে যাবে। রাশেদ এক ঝটকায় স্লিপটা নিল, কিন্তু সংখ্যার কাটাকুটি আর র্যাক কোড দেখে থেমে গেল। “এইটা... এইটা পরে ঠিক করতে হবে।”

মেহজাবিন হাত বাড়াল। “দেন।”

রাশেদ স্লিপ দিল না। “আমি দেখতেছি।”

বাইরে তৃতীয় হর্ন বাজল, এবার খিটখিটে। কামরুলের চোখ ছোট হয়ে গেল। “এখনই ছাড়তে হবে।”

মেহজাবিন আর পাশ থেকে উদ্ধার করতে গেল না। সে সোজা বলল, “চেয়ার ছাড়েন।” এতক্ষণ পর প্রথমবার তার গলায় বরফের ধার শোনা গেল। “খাতা আমার দিকে। চাবি আমার হাতে আছে। আপনি অর্ডার পড়তে পারেন না, লেন থামাইয়া রাখছেন।”

রাশেদ মেইন চেয়ারের হাতলে হাত চেপে ধরল। সেই হাতলটা চকচকে, কারণ দিনভর মানুষ ধরতে ধরতে রং উঠে গেছে। “আমি সুপারভাইজার,” সে আবার বলল, কিন্তু এবার কথাটা ঘোষণা না, আঁকড়ে ধরা।

কামরুল টেবিলের ওপর ছড়ানো স্লিপগুলোর দিকে তাকাল, তারপর ফাটা বস্তা, গড়িয়ে যাওয়া পেঁয়াজ, ভুল খোলা র্যাক, আর চলতে শুরু করা গাড়িগুলোর দিকে। হিসাব করতে তার বেশি সময় লাগল না। “রাশেদ ভাই, উঠেন,” সে বলল। “এখনই। খাতা ওর দিকে দেন।”

চারপাশে কেউ হাঁ করে তাকাল না; সবাই কাজ করছিল। কিন্তু কাজ করতেও করতেও প্রত্যেকে শুনল। রাশেদের মুখের রং বদলাল। সে প্রথমে চাবির দিকে তাকাল—যা আর তার হাতে নেই। তারপর রেজিস্টারের দিকে—যা মেহজাবিনের কনুইয়ের নিচে। শেষে চেয়ার থেকে হাত সরাল। সরাতেই তার আঙুলের চাপা রাগ টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাপটাকে ধাক্কা দিল; ঠান্ডা চা একটু ছলকে গোল দাগের বাইরে আরেকটা অসমান রেখা ফেলল।

মেহজাবিন স্লিপটা তার হাত থেকে টেনে নিল। একবার চোখ বুলিয়ে বলল, “ওজনের বদল ভোরের কলের। পুরনোটা কাটছে না, নিচে নতুন চিহ্ন। এই চালান খুলনা যাবে না, গাবতলীর গাড়িতে যাবে। শীলা আপা, নতুন নোট লিখেন। নাঈম, শেষ ট্রলি বাঁয়ে নাও।” তারপর সে মেইন চেয়ারে বসল না সঙ্গে সঙ্গে; আগে খাতা, সিল, আর চাবির গোছা এক সরল রেখায় নিজের সামনে রাখল, যেন কেউ আর মাঝখানে হাত ঢোকাতে না পারে। রাশেদ পাশে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু তার কথার জায়গা আর থাকল না।

শেষ গাড়িটা নড়ে উঠতেই কামরুল টেবিলের পাশে থাকা নামফলকটা তুলে দিল। ছোট সাদা প্লাস্টিক, কোণায় পুরোনো কলমের খোঁচা। এতদিন ড্রয়ারে ছিল। মেহজাবিন সেটা নিয়ে মেইন চেয়ারের পিঠে আবার আটকাল। তারপর রেজিস্টারটা নিজের বাঁ পাশে, সিলটা ডান পাশে রাখল, চাবির গোছা টেবিলের কিনারায় থামিয়ে মেইন চেয়ারটা একটু পেছনে ঠেলে দিল। চাকা ঘষে হালকা শব্দ করে গড়িয়ে গেল, আর চাবিগুলো আর একবারও ঝনঝন করল না।