দরজা বন্ধ হওয়ার পর সে ফিরল
ডেলিভারি ছেলেটা কাগজে মোড়া ছোট প্যাকেটটা মেহরীনের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, “আপার নাম লেখা আছে, নিচে সই দেন,” আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতরের ডাইনিং টেবিল থেকে খালার গলা এল, “কে রে? আবার কার জিনিস?” শুকনো কাগজের ঘষাঘষি শব্দটা বারান্দায় এত জোরে শোনা গেল যে মনে হল সবার চোখ ওই পাতলা মোড়কের ভেতর ঢুকে গেছে।
ঢাকার মগবাজারের পুরনো ভাড়া বাসা, নিচতলার বারান্দা, সামনের গলিতে রিকশার ঘণ্টা আর ভাপ ওঠা ভাতের গন্ধ। আজ নওশীনের বাগদানের তারিখ ঠিক করতে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা দুই-চারজন এসে বসেছে। মেহরীন রান্নাঘর আর টেবিলের মাঝখানে থালা বাড়িয়ে দিচ্ছিল; সে এই বাড়িতে থাকে, চাকরি করে, এমবিএর সন্ধ্যার ক্লাস ছেড়ে দিয়েছে এক বছর আগে, কারণ মামা মারা যাওয়ার পর খালার সংসার টানতে আর নওশীনের কোচিং-ফি দিতে কেউ ছিল না। হাতে প্যাকেট দেখে তার বুক শক্ত হয়ে গেল। মোড়কের ওপর নিজের নামের নিচে লেখা— “ফেরত”।
খালা বারান্দা পর্যন্ত এসে প্যাকেটটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন। “ফেরত মানে? কার কাছ থেকে?” কাগজটা উল্টে ঠিকানার দিকে চোখ সরু করতেই ঠোঁট কেঁপে উঠল, “ধানমন্ডি... রাশেদদের বাসা?” তারপর খুব নিচু, কিন্তু সবাই শোনার মতো স্বরে বললেন, “এতদিন পর আবার কীসের আদিখ্যেতা? যেটা হওয়ার ছিল, হয় নাই। বড় ঘরের ছেলে কি আর সবখানে মানায়?”
মেহরীন হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা ফেরত নিল। নওশীন দরজার আড়াল থেকে মুখ বের করেছে, চোখে কৌতূহল আর লজ্জার মিশ্র আলো। ভেতর থেকে নওশীনের হবু শাশুড়ির ফোনে ভিডিও কলে কারও হাসির শব্দ আসছিল। খালা গলার ওড়না ঠিক করে, যেন খুব বাস্তব কথাই বলছেন, বললেন, “মেয়ে মানুষকে বুঝে চলতে হয়। সে তো ডাক্তার ছেলের সাথে বিয়ে করল না, তুই-ই বরং কপাল করে ভুলে গেছিস। কৃষির চাকরির বাবার মেয়ে, আবার ভাড়া বাসা— সব জায়গায় তো আর দরজা খোলে না।”
কথাটা নতুন ছিল না। কিন্তু আজ সেটা লোকের সামনে বলা হল, খাবার সাজানো টেবিলের পাশেই, যেন মেহরীন ছিল একবার বিবেচনা করা, তারপর বাদ দেওয়া কোনো প্লেট। সে প্যাকেটের ভাঁজের ওপর বুড়ো আঙুল চেপে দেখল ভিতরে শক্ত কিছু। চাবির দাঁতের মতো ঠেকল। তার গলাটা শুকিয়ে গেল।
“খুলে দেখ না,” নওশীন ফিসফিস করল। “এভাবে দাঁড়িয়ে থাকিস কেন?”
মেহরীন কিছু বলার আগেই খালা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। “খোলার দরকার কী? ফেরত দেবে, ব্যস। দেরিতে মনে পড়ছে, এখন আবার মানসম্মান খাবে?” কিন্তু তিনি নিজেই কৌতূহল সামলাতে না পেরে বললেন, “দে দেখি।”
কাগজ ছিঁড়তেই টুং করে ছোট ধাতব শব্দ হল। একটা পুরনো পিতলের চাবি, কালচে রিংয়ে ঝুলছে। সঙ্গে ভাঁজ-করা অর্ধেক ছেঁড়া রসিদ— বহুবার খোলা-বন্ধ করা হয়েছে, কাগজের মাঝখান সাদা হয়ে এসেছে। রসিদের সঙ্গে একটা ছোট্ট নোট, মাত্র দুই লাইন: “এটা ওর কাছে পৌঁছে দিও। আমার হাতে দিলে নেবে না। — সায়রা আপা।”
সায়রা আপা রাশেদদের পুরনো বাসার গৃহকর্মী ছিলেন। তিনিই একদিন মেহরীনকে চুপিচুপি বলেছিলেন, “মা, তুমি আসলে নিচে দাঁড়াইও না, ওপর থেকে ভালো লাগে না।” সে-ই শেষবার ছিল।
খালা নাক সিটকালেন। “এইসব নাটক।”
মেহরীন রসিদটা খুলল। উপরেই লেখা এক চাবিওয়ালার দোকানের নাম, নিউমার্কেট। তারিখ— তিন বছর আগের, সেই সপ্তাহ, যেদিন রাশেদের বাগদান ঠিক হয়েছিল অন্য কারও সঙ্গে। নিচে হাতে লেখা: “এক কপি ফ্ল্যাট কী। জরুরি।” আর পেছনদিকে নীল কালিতে ছোট ছোট অক্ষরে, যেন কাউকে বোঝানোর জন্য নয়, নিজেকে মনে করিয়ে রাখার জন্য লেখা— “মেহরীনের জন্য। যদি বের হতে হয়, কারও সামনে দাঁড়াবে না।”
কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না। ভিডিও কলে হাসির শব্দটাও যেন দূরে সরে গেল। নওশীন এক পা এগিয়ে এসে রসিদটা খালার হাত থেকে নিয়ে আবার পড়ল। তার মুখের রং বদলে গেল। “তাহলে... সে আগে থেকেই—”
মেহরীন বাকিটা শুনল না। তার মাথায় হঠাৎ সেই বিকেলটা ফিরে এল না, বরং ফিরে এল না-ফেরা সবকিছু: ধানমন্ডির বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা, ফোন না ধরা, পরে বন্ধ নম্বর; রাশেদের পাঠানো একটাও কথা নয়; খালার ঠান্ডা সিদ্ধান্ত— “চুপ থাক, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি মানায় নাই।” সে এতদিন ভেবেছে তাকে ব্যবহার করে, লজ্জা পেয়ে, সুবিধামতো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন দেখা গেল, তাকে সরিয়ে দেওয়ার আগে লোকটা এক কপি চাবি করিয়েছিল— যাতে দরজা বন্ধ হলে সে অন্তত ভেতর থেকে বেরোতে পারে। যত্ন ছিল। তবু সে কিছু বলেনি। যত্ন লুকিয়েছিল, মানুষটাকেও লুকিয়েছিল।
বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাতেই সে নিচের সিঁড়ির মুখে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। রাশেদ। সাদা শার্ট, হাতা গোটানো, চুলের পাশে ক্লান্ত রেখা। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার লোক সে ছিল না কোনোদিন; তার সবকিছুই আগে সাজানো, ঠিকঠাক, উপরে ওঠার মতো। আজ সে নিচে, আর ওপরে উঠতে পারছে না।
খালা প্রথমেই নিজেকে সামলে নিলেন। “নওশীন, ভেতরে যা। আর তুমি,” রাশেদকে লক্ষ্য করে গলা উঁচু করলেন, “এখন আসার সময় পাইছ? যখন আমার ভাইঝিরে ঝুলাইয়া রাখছ, তখন তো মুখ ছিল না। এখন আবার কী দরকার?”
রাশেদ ওপরের দিকে তাকাল, কিন্তু চোখ থামল শুধু মেহরীনের মুখে। “খালা, দুই মিনিট দরকার। শুধু ওর সঙ্গে।”
“এত বছর পরে মেয়েদের দরজায় দুই মিনিট চায়!” খালা হেসে উঠলেন, হাসিটা কড়াইতে তেল পড়ার মতো কটকটে। “তখন তো তোমাদের মা বলছিল, আমাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করলে তাদের মান থাকবে না। এখন মান শেষ?”
রাশেদ এ কথা অস্বীকার করল না। এটাই তার অন্যায়ের সবচেয়ে কুৎসিত অংশ— সে জানত, তবু তখন চুপ ছিল। নিচতলার সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে সে থামল, যেন অনুমতি ছাড়া এক ধাপও নিতে পারছে না। মেহরীন বুঝল, আজ ক্ষমতা খুব সামান্যভাবে সরে এসেছে; এত সামান্য যে তাতে কোনো সুখ নেই।
সে নিজেই বলল, “খালা, থাক। আমি নিচে যাচ্ছি।”
লিফটটা নষ্ট ছিল, আয়নাওয়ালা দরজায় পুরনো আঙুলের দাগ জমে আছে। তারা সিঁড়ি দিয়ে নামল। নিচতলার বারান্দার বাঁ পাশে লোহার বেঞ্চ, সামনে চায়ের দোকান থেকে উঠতি কাঁচা লাল চায়ের গন্ধ। রাত নেমেছে, তবু পাশের ফ্ল্যাটের লোকেরা জানালার ফাঁক দিয়ে তাকাতে জানে— এ রকম কথাবার্তা ঢাকায় কখনও পুরো ব্যক্তিগত হয় না, শুধু প্রকাশ্যও হয় না।
রাশেদ হাতে একটা পাতলা খাম আর মোবাইল চেপে ছিল। কাছাকাছি এসে সে থামল। “আমি আজ না এলে সায়রা আপা নিজে চলে আসত। মা গত মাসে মারা গেছেন।” কথাটা বলেই সে যেন একটুখানি হালকা হতে চাইল, কিন্তু হল না। “আমি... এখন আর কারও কাছে জবাবদিহি করে না—”
মেহরীন ওকে থামিয়ে দিল। “এই কথাটা বলার জন্যই এত দেরি করেছ?”
রাশেদের চোখ নেমে গেল। “না। দেরি করেছি বলে আজ বলাটা নোংরা শোনাবে, জানি। কিন্তু আমি তোমাকে পুরো ফেলে দিইনি।”
মেহরীন হাতের রসিদটা তার দিকে তুলল। “এইটুকুই তোমার সবচেয়ে খারাপ কাজ, রাশেদ। যদি তুমি সত্যি কিছুই না রাখতে, কিছুই না ভাবতে, তাহলে আমি সহজে ঘৃণা করতে পারতাম। জীবনটা সোজা হত। আমি ভাবতাম, আমি ভুল মানুষকে চিনেছিলাম। কিন্তু তুমি যত্ন করেছ, তারপরও চুপ থেকেছ। তুমি আমাকে এই বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে দাওনি যে আমি মূল্যহীন ছিলাম না।”
রাশেদের ঠোঁট শুকিয়ে উঠল। “আমি মা’কে ঠেকাতে পারিনি। বাগদানের আগের রাতে ঝগড়া করে বের হয়ে গিয়ে ওই চাবি করাই। ভেবেছিলাম তোমাকে—”
“ভেবেছিলে?” মেহরীনের গলা খুব শান্ত। “তুমি ভেবেছিলে, আর আমি কী করেছি জানো? আমি তিন বছর ধরে ভেবেছি আমি নিজেই সব বানিয়ে নিয়েছিলাম। তুমি আমার মাথার ভিতর থেকে আমার নিজের দাম চুরি করে নিয়েছিলে। তোমার নীরবতার জন্য আমি প্রতিটা প্রস্তাব, প্রতিটা ভালো কথাও সন্দেহ করেছি। আমি মনে করেছি, আমি বাড়াবাড়ি করি, আমি বুঝতে ভুল করি, আমি কারও প্রথম পছন্দ হওয়ার মতো না। এই তিন বছর তুমি আমাকে কী দিয়ে ফেরত দেবে?”
রাশেদ এবার এক পা এগোল, আবার থামল। তার গলায় কাঁটার মতো স্বর। “আমি বিয়েটা টিকাইনি। অনেক আগেই ভেঙে গেছে। মায়ের অসুখ, বাসার ঝামেলা... আমি জানতাম, এগুলো অজুহাত শোনাবে। কিন্তু এখন আর কেউ থামাবে না। আমি নতুন ফ্ল্যাট নিয়েছি। মোহাম্মদপুরে। ছোট, কিন্তু নিজের। আজ আমি যা হাতে নিয়ে এসেছি, সেটা তখন দিতে পারিনি।”
সে খাম খুলে টেবিলের সমান চওড়া বারান্দার সিমেন্টের তক্তার ওপর দুটো চাবি রাখল— একদিকে সেই পুরনো ফিরিয়ে-আনা চাবি, অন্যদিকে চকচকে নতুন ডুপ্লিকেট। ধাতুর ঠান্ডা ঝিলিক হলুদ আলোয় কেঁপে উঠল। “এবার তোমাকে লুকিয়ে নয়,” সে বলল। “এবার চাইলে তুমি ঢুকবে। আমি এবার তোমাকে বেছে নিতে পারি।”
বারান্দার ওপরে কোথাও থালার শব্দ থেমে গেছে। খালা শুনছেন, নওশীনও। এটাই সেই নিষ্ঠুরতা— যত ব্যক্তিগতই হোক, দরজার ভাষা সবসময় সামাজিক। আগে তাকে বলা হয়েছিল, ওদিকে মানায় না। আজ একই জায়গায় লোকটা বলছে, এখন পারে।
মেহরীন চাবিদুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। নতুন চাবির দাঁত ধারালো, অনাবহৃত। পুরনো চাবির রিংয়ে তার নিজের একসময়ের নীল সুতো নেই, তবু সে চিনতে পারল; রাশেদের পুরনো বাসার ছাদের দরজা, যেখানে পরীক্ষা শেষের রাতে তারা দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখেছিল, আর রাশেদ বলেছিল, “আমার সাথে থাকলে তোকে কারও সামনে ছোট হতে দেব না।” মানুষ মাঝে মাঝে ভবিষ্যৎ বলার জন্য মিথ্যে বলে না, কেবল পরের দিন সাহস হারায়।
সে হাত বাড়িয়ে নতুন চাবিটা নিল না। বরং পুরনো চাবিটা আঙুলের ডগায় তুলে দেখল, তারপর আবার খুব আস্তে তক্তার ওপর নামিয়ে রাখল। “এখন তুমি পারো,” সে বলল। “কিন্তু যে সময় আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন তুমি পারোনি। ভালোবাসা যদি তখন আমাকে ঢোকাতে না পারে, এখনকার সুবিধা আমাকে কেন ডাকবে?”
রাশেদ ফিসফিস করে বলল, “কারণ আমি এখনও—”
“থামো।” এবার তার চোখ একেবারে স্থির। “দেরিতে ভালোবাসা এসে ঠিক সময়ের পরিত্যাগ মুছে দেয় না। তুমি আজ সত্যি নিয়ে এসেছ, মিথ্যে না। এই জন্যই তোমাকে ক্ষমা করা আরও সহজ না, আরও কঠিন। কারণ এখন জানি, আমাকে তুমি ভুলে যাওনি; আমাকে তুমি ছেড়ে দিয়েছিলে।”
হাওয়ায় চায়ের গন্ধ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। পাশের দোকান থেকে ছেলেটা একটা কাচের কাপ এনে বেঞ্চের ডানদিকে রেখে গিয়েছিল, কেউ খেয়ালই করেনি। মেহরীন নিজের ব্যাগ থেকে ওই পুরনো রসিদটা ভাঁজ করে ভেতরে রাখল। নতুন চাবির দিকে আর তাকাল না। তারপর একটুখানি ঝুঁকে চকচকে ডুপ্লিকেটটা আঙুলের হালকা ধাক্কায় পুরনোটার পাশে ঠেলে দিল— যেন দুটোই একই অপ্রয়োজনীয় জিনিস।
“এগুলো তোমার কাছেই থাক,” সে বলল না। “আমি নিচ্ছি না,” এটুকুও বলল না। শুধু চাবি দুটো তক্তার ওপর সমান করে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার এই না-নেওয়াটাই কথার চেয়ে পরিষ্কার ছিল।
সে ঘুরে সিঁড়ির দিকে হাঁটল। একবারও পেছনে তাকাল না। বাঁ পাশের বেঞ্চটা খালি রইল। তার পাশে রাখা চায়ের কাপে আর কেউ হাত দিল না। ধোঁয়া একটু একটু করে পাতলা হয়ে এসে মরে গেল।