দরজা বন্ধের পর সে ফিরল
কাশেম দারোয়ান দরজায় টোকা না দিয়ে সোজা গ্রিল নেড়ে উঠল, “মেহরিন আপা, নিচে একজন এসেছে—নাঈম ভাই বলে। হাতে একটা বক্স, আর খাম। বলছে আজই দিতে হবে।”
ডাইনিং টেবিলে ইলিশের কাঁটা আলাদা করতে করতে খালা সেলিনা মুখ তুললেন। তাঁর ভুরু এমনভাবে উঠল, যেন সাত বছর পরও পুরোনো কারও আসার অধিকার তিনি নিজের হাতে মাপবেন। “নাঈম? এখন? সাহস তো কম না। মেহরিন, বসে থেকো না, গিয়ে দেখে আসো। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মানুষ একসময় ছিল—দারোয়ানের মুখে বিদায় দিতে ভালো দেখায়?”
মেহরিনের আঙুলে ভাত লেগে ছিল। সে ধুতে গেল না। শুধু টিস্যু দিয়ে হাত মুছল। এই ফ্ল্যাটের চারতলার বারান্দা, ছোট ডাইনিং, রান্নাঘরের কড়াইয়ের গন্ধ—সবকিছু এত বছর ধরে কষ্টে গুছিয়ে নেওয়া। ঢাকায় টিকে থাকার মতো গুছিয়ে। কৃষি দপ্তরের অস্থায়ী চাকরি থেকে স্থায়ী হওয়া, ছোট ভাই রাফির টিউশন, মায়ের ওষুধ—এগুলো কোনো স্মৃতির জায়গা রাখেনি। তবু একটা নাম নিচতলায় দাঁড়ালে লিফটের পুরোনো ধাতব দরজায় জমে থাকা আঙুলের দাগ পর্যন্ত অন্যরকম লাগে।
রাফি গ্লাস নামিয়ে বলল, “যাবা না হলে আমি বলে দিই চলে যেতে।”
“তুই কিছু বলবি না,” খালা সেলিনা কড়া গলায় থামালেন। “মানুষ যদি খাম-বক্স নিয়ে আসে, তাহলে শুধু আসেনি—কিছু ফেরত দিতে এসেছে, কিছু চাইতেও পারে। নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে শোনো। দরজা তো আর ঘরে বসে বন্ধ করা যায় না।”
মেহরিন বুঝল, এ ঘরে না গেলেও তাকে নামতেই হবে। কারণ অনুপস্থিত থাকলেও বিচার হবে; নামলে অন্তত শোনার পর চলে আসতে পারবে। সে ওড়না টেনে নিল, চাবির গোছা হাতে নিল অভ্যাসে। তার মধ্যে একটা আলাদা পিতলের চাবি আছে—ছোট, পুরোনো, অকারণে সে এখনও ফেলে দেয়নি। নিচে নামার সময় লিফট আসতে দেরি করছিল। সে সিঁড়ি দিয়ে নামল। মাঝখানের ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়াতেই কাশেম নিচ থেকে তাকিয়ে বলল, “বাইরের বেঞ্চে বসে আছে। অনেকক্ষণ।”
নাঈম সত্যিই বেঞ্চে বসে ছিল, কিন্তু বসার ভঙ্গিতে আগের সেই নিশ্চিন্ত অধিকার ছিল না। একসময়ে ক্যাম্পাসে যে ছেলে সবাইকে অপেক্ষা করাত, সে এখন নিজের কাঁধ একটু নামিয়ে বসে আছে। দাড়ি ঠিকমতো কাটা না, শার্ট ধোয়া কিন্তু পুরোনো, পাশে ছোট কার্ডবোর্ডের বাক্স। হাতে একটা সাদা খাম, কোণ নরম হয়ে গেছে বারবার ধরা হাতে। তাকে দেখে নাঈম দাঁড়াল, আবার পুরোটা দাঁড়াতে পারল না, যেন কী দূরত্বে থামবে বুঝে উঠতে পারছে না।
উপরে বারান্দা থেকে খালা সেলিনার গলার হাওয়া নেমে এল, “নিচে দাঁড়িয়েই বলো। ভেতরে আনার দরকার নাই।”
নাঈম একবার ওপরে তাকাল, তারপর মেহরিনের দিকে। “আমি ভেতরে আসতে আসিনি।”
“তবু এসেছ,” মেহরিন বলল। কণ্ঠ তার শুকনো। “এত বছর পরে হাতে জিনিস নিয়ে আসলে মানুষ সেটাকেই ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা বলে।”
নাঈম খামটা একটু এগিয়ে ধরল, আবার নামিয়ে নিল। শুকনো কাগজ ঘষার শব্দ হল। “তোমার নামে। অনেক আগে দেওয়া উচিত ছিল।”
মেহরিন নড়ল না। বেঞ্চের ধারে, ভবনের গেটের পাশে, কাশেম দাঁড়িয়ে আছে এমন ভঙ্গিতে যেন দরকার হলে লোক সরাবে, কিন্তু কথা শুনছে না—এই অভিনয়ও সে বহুদিনের। ওপরে রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে খালার শাড়ির আঁচল। এইটুকু সাক্ষীই যথেষ্ট অপমানের জন্য।
“তুমি তো আগে দেওয়ার মধ্যে বিশ্বাসী ছিলে না,” মেহরিন বলল। “আগে খবর দেওয়া, আগে বলা, আগে দাঁড়ানো—কিছুই করোনি। এখন খাম?”
নাঈম চুপ করল। তার সেই চুপ করে থাকা মেহরিন চেনে। আগে এই চুপের পর ব্যাখ্যা আসত, পরিকল্পনা আসত, কী করতে হবে বলা আসত। আজ কোনো কর্তৃত্ব এল না। শুধু সে বলল, “আমি চাকরি হারিয়েছি। এই কথাটা বলার জন্য আসিনি। তারপরও তুমি যেন অন্যের মুখে না শোনো।”
মেহরিন তিক্ত হেসে ফেলল। “অন্যের মুখেই তো সব শুনেছি আমি। সাত বছর আগে, ‘ওদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করো’—ওটা তোমার মুখে শুনিনি। শুনেছি তোমার ফুফুর মুখে। ‘মেয়েটার ঘরের অবস্থা ভালো না, বাবার ঋণ আছে’—ওটাও। তুমি শুধু ফোন বন্ধ করেছিলে।”
বারান্দা থেকে খালা সেলিনা এবার জোরে বললেন, “আমি তখনও বলেছিলাম, মর্যাদা দেখে যারা মানুষ বেছে, তারা দুঃসময়ে সবার আগে পালায়।”
নাঈম মাথা তুলল না। “আপা, আপনি যা ইচ্ছা বলুন। আজ থামাতে আসিনি।”
“থামাতে কে বলছে?” সেলিনা খালা যেন আরও চড়ালেন। “শুধু এখন মনে পড়েছে? যখন মেহরিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, কৃষি অফিসে চাকরি করছে, বাসা ভাড়া টানছে, ভাইকে মানুষ করছে—তখন?”
মেহরিনের বুকের ভেতর পুরোনো রাগের জায়গা পরিচিতভাবে কেঁপে উঠল। এ দৃশ্য তার পক্ষে সহজ হওয়ার কথা ছিল। নিচু হয়ে আসা নাঈম, ওপরে আত্মীয়ের কড়া বিচার, হাতে দেরিতে আনা খাম—এখানে তার জেতার কথা। তবু নাঈমের ডান হাতের আঙুলে একটা কুঁচকে যাওয়া কাগজ আটকে আছে দেখে সে চোখ সরাতে পারল না। খামের নিচে অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদ, এতবার খোলা-বন্ধ করা যে প্রান্ত ফেটে গেছে।
“ওটা কী?” সে জিজ্ঞেস করল।
নাঈম যেন লুকাতে চাইল, তারপর পারল না। “কিছু না।”
উপরে থেকে সেলিনা খালা তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “কিছু না হলে মুঠোয় চেপে ধরেছ কেন? এবার নাটক কম করো।”
কথাটা হয়তো বেশি জোরে হয়ে গেল। নাঈমের হাতের কাগজ নিচে পড়ে গেল। কাশেম এগিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু মেহরিন আগে ঝুঁকল। রসিদের মাথায় হাসপাতালের নাম। তারিখটা ঠিক সেই সপ্তাহের, যেদিন বাবা স্ট্রোক করে পড়েছিলেন আর বাসায় চারদিকে ধারদেনার মানুষ। নিচে লেখা জমা টাকার অঙ্ক দেখে তার চোখ থমকে গেল। অঙ্কটার পাশে নাম—নাঈম হোসেন। আর পেছনে নীল কালি দিয়ে লেখা, “বাকি ঋণ—মতিঝিল সমবায়, মেহরিনের বাবার হিসাবে সমন্বয়।”
তার গলা আটকে গেল না; বরং অতিরিক্ত পরিষ্কার হয়ে গেল। “এটা তোমার কেন?”
নাঈম কিছু বলার আগেই সেলিনা খালা নিচে নামতে নামতে বলে উঠলেন, “কারণ বোকা ছেলে ওইদিন টাকা দিয়েছিল। আর আমাদের সামনে এসে বলেনি। আমাদেরও বলেনি ঠিক করে। শুধু তোমার বাবার ঋণখাতার লোকজনকে থামিয়ে দিয়েছে। তারপর তার ফুফুরা সুযোগ পেয়ে বলেছে, ‘ঋণী ঘরের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে ছেলেরও ডোবা।’ আমি ভেবেছিলাম, ও মাথা উঁচু রাখতে তোমাকে ছেড়ে গেছে। পরে জানলাম, তোমার বাবার নামে নিজের নামে ঋণ তুলে ঢেকেছে, তারপর শহর ছেড়েছে কাজের জন্য। অথচ তোকে কিছুই বলে যায়নি—মহা বুদ্ধিমান!”
শেষ কথাটা রাগে, কিন্তু রাগের মধ্যে লজ্জাও ছিল। সেলিনা খালা সিঁড়ির শেষ ধাপে থামলেন। “আমি তখন জানলে তোমাকে বলতে পারতাম। কিন্তু এই ছেলেই বলেছিল, ‘আপা, ও যেন না জানে। ওর ঘরে তখন যথেষ্ট চাপ।’”
মেহরিনের হাতে রসিদ কাঁপল না, এটাই তার ভয়ের জায়গা। এত বছর সে বিশ্বাস করে এসেছে, নাঈম শুধু সামাজিক মর্যাদা বেছে নিয়েছিল। সে একা ছিল, হ্যাঁ। অপমান ছিল, হ্যাঁ। কিন্তু এই কাগজ বলে—একটা অংশ সে একা ছিল না; কেউ ছিল, কিন্তু মুখ বন্ধ করে ছিল এমনভাবে যে থাকাটাও অনুপস্থিতির মতো হয়েছে। এতে ক্ষত কমল না। উল্টো অন্য জায়গায় গিয়ে বিঁধল। যদি সে জানত? যদি অন্তত একবার নাঈম বলত, “আমি পালাচ্ছি না, আমি ডুবছি”? তাহলে কি এই সাত বছর অন্যরকম হত? এখন সেই প্রশ্নের কোনো ব্যবহার নেই।
নাঈম ধীরে বলল, “আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে দূরে রাখলে তুমি মুক্ত থাকবে। আমার বাড়ির লোকজন তখন যা বলছিল—”
“তোমার ভাবনা সবসময় তোমার একার ছিল,” মেহরিন কেটে দিল। “আমাকে জিজ্ঞেস করার দরকার পড়েনি।”
নাঈম মাথা নুইয়ে নিল। আজ প্রথমবার সে সত্যিই ছোট দেখাল, অবস্থানে নয়, সিদ্ধান্তে। “হ্যাঁ। তাই এসেছি। এই খামে সমবায়ের বাকি কাগজ, আমি শেষ কিস্তিও মিটিয়েছি। তোমার বাবার নামে আর কিছু নেই। আর বক্সে—” সে বাক্সটার দিকে তাকাল, যেন নিজেও জানে জিনিসের ওজন ভুল সময়ে হালকা হয়ে যায়—“তোমার পুরোনো জিনিস। হলের ঘরের অতিরিক্ত চাবি, তোমার নোটবুকের ক্লিপ, যেগুলো আমার কাছে ছিল। রেখে দিয়েছিলাম। রাখা উচিত ছিল না।”
মেহরিনের বুকের ভেতর একবার খুব নিচু স্বরে ভাঙার শব্দ হল। হলের ঘরের সেই চাবি—নীল প্লাস্টিকের মাথা, পরীক্ষার আগের রাতে সে নাঈমকে দিয়েছিল যেন ফটোকপি করা নোট রেখে যায়। পরে সে আর চায়নি। কিংবা চাইতে পারেনি। এইটুকু ব্যক্তিগত জিনিস এত বছর ধরে কারও কাছে পড়ে থাকা একধরনের অন্তরঙ্গ লজ্জা।
খালা সেলিনা দাঁত চেপে বললেন, “এখন দিয়ে কী হবে?”
নাঈম উত্তর দিল না। সে শুধু খাম আর বাক্স দুটো মেহরিনের নাগালের ভেতর বেঞ্চে রাখল। “যদি নাও, নাও। না নিলে আমি জোর করব না। আমি শুধু দরজার সামনে রেখে পালিয়ে যেতে চাইনি আর।”
মেহরিন অনেকক্ষণ কিছু বলল না। উপরের তলার কারও প্রেসার কুকার বাঁশি দিল, রাস্তা থেকে আজানের ভাঙা শব্দ এল, গেটের বাইরে রিকশা থামল। শহর এমনসব সময়ে থামে না, যখন কারও পুরোনো জীবন হাতের নাগালে এসে দাঁড়ায়। সে নিচু হয়ে নিজের চাবির গোছা থেকে ছোট পিতলের চাবিটা আলাদা করল। এতদিন ধরে ব্যাগ পাল্টালেও এটা তার সঙ্গে ছিল—ফেলে দিইনি, ফেরতও দিইনি। অকারণ অবশিষ্ট।
“এটা তোমার,” সে বলল।
নাঈম তাকিয়ে রইল। “ভেবেছিলাম ফেলে দিয়েছ।”
“না,” মেহরিন বলল। “ফেলারও সময় লাগে। আমি রাখিনি তোমাকে ফেরত দেওয়ার আশায়। শুধু একটা জিনিস শেষ না করলে যেমন পড়ে থাকে, তেমন।”
সে চাবিটা নাঈমের খোলা হাতের ওপর রাখল। স্পর্শ বলতে যা, তা হল মাত্র এক সেকেন্ডের ধাতব ঠান্ডা। নাঈম যেন হাত বন্ধ করতে ভুলে গেল। মেহরিন তখন খামের দিকে তাকাল, বাক্সের দিকে তাকাল, কিন্তু তুলল না। “ঋণ শোধ হয়ে থাকলে কাগজ অফিসে জমা দিও। খালাকে কপি দিও। আমার দরকার নেই।”
নাঈমের গলা কর্কশ হয়ে গেল। “মেহরিন, একবার অন্তত—”
“না।” শব্দটা খুব উঁচু না, তবু সোজা। “তুমি যা করেছিলে, আজ বুঝলাম সেটা শুধু অবহেলা ছিল না। তাতে তোমার কষ্টও ছিল। এই বুঝতে পারাটা আমার জন্য সহজ না। কিন্তু দেরিতে জানা মানে পথ খুলে যাওয়া না। তুমি তখন সিদ্ধান্ত একাই নিয়েছিলে। আজ আমি একাই নিচ্ছি।”
সে এক পা পেছাল। নাঈম যেন কেবল তখন বুঝল দরজা আর মানুষ এক জিনিস না; সামনে ফ্ল্যাটের গেট খোলা থাকলেও প্রবেশের অধিকার নেই। তবু সে হাত তুলেছিল, হয়তো খামটা আবার ধরিয়ে দেবে, হয়তো শুধু থামতে বলবে। মেহরিন সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইল না। সে খালা সেলিনার দিকে ফিরল। “খালা, চলেন।”
খালা সেলিনা কিছু বললেন না, শুধু সরে দাঁড়ালেন সিঁড়ির দিকে। মেহরিন প্রথম ধাপে পা রাখার আগে শেষবার নিচে না তাকিয়েই বলল, “নিচে কিছু ফেলে যেও না ভাবলে ভুল করবে। কিছু জিনিস যেখানে দেরি হয়, সেখানেই পড়ে থাকে।”
সে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল। লিফটের আয়নায় পুরোনো মুছেমুছে না ওঠা দাগের পাশে তার মুখ একবার ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল। দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে সে থামল না, চতুর্থ তলায় গিয়ে গ্রিল টেনে ভেতরে ঢুকল, তারপর নিজের দরজার কাঠে হাত রেখে ধীরে বন্ধ করল।
নিচের বেঞ্চের শেষ মাথার ছায়ায় ছোট বাক্সটা পড়ে রইল। কার্ডবোর্ডের গা নরম হয়নি, ভেঙেও পড়েনি; যেমন আনা হয়েছিল, তেমনই নিজের আকার ধরে বসে থাকল। পাশে রাখা খামটাও কেউ নিল না।