Fast Fiction

শেষে একই ভার তুলেছি

রিদা দুই হাতে স্যালাইনের স্ট্যান্ড ঠেলে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে তুলতেই পেছন থেকে তানভীর খালার কড়া গলা এসে লাগল, “এইটা তুমি ধরবা না, নার্স আসতেছে— অত বাড়াবাড়ি কইরো না।” অথচ নার্স তখনও কোথাও নেই, আর স্ট্যান্ডের চাকাটা থমকে গিয়ে কাত হয়ে পড়ছিল বৃদ্ধ মানুষটার বিছানার গায়ে। রিদা ঝট করে হাঁটু দিয়ে স্ট্যান্ড সামলে, কাঁধ দিয়ে দরজা ঠেলে খুলে, মাথা নিচু করে বলল, “চাচার হাত টান খাইতেছে।” বৃদ্ধের কুঁচকে যাওয়া আঙুলে ক্যানুলা নড়ে রক্তের লাল বিন্দু উঠেছিল। সে নিজের ওড়নার কোণা দিয়ে না মুছে পাশে রাখা তুলা নিয়ে চেপে ধরল। তবু তানভীর খালা এসে প্রথমে রোগীর দিকে নয়, রিদার হাতের দিকে তাকালেন, যেন এ হাতের সাহসটাই অপরাধ।

করিডরের টিউবলাইটে সাদা আলো কাঁপছিল। প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণে নীলা আধবসা, আধাউঠা অবস্থায় দাঁত কামড়ে কাঁদা আটকাচ্ছিল। কাউন্টারের ওপর এক কাপ চা অনেকক্ষণে ঠান্ডা হয়ে ওপরটা চামড়া ধরেছে, নিচে গোল দাগ পড়ে আছে। বিকেলের ভিড়ের মধ্যে ঢাকার এই ছোট প্রাইভেট ক্লিনিকটা এমনিতেই হাঁসফাঁস; তার ওপর গ্রামের বাড়ি থেকে খবর শুনে যারা এসেছে, সবাই আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা ধরে ভেতরে ঢুকতে চাইছে, কে কতটা ঘনিষ্ঠ সেই হিসাবও চলছে। রিদা এই পরিবারের কেউ নয়— তবু সবচেয়ে আগে সে-ই রিকশা ধরে মানুষটাকে এনেছে। আর এখন যেন সে দরজার চৌকাঠে ভুল করে দাঁড়িয়ে থাকা এক কর্মচারী।

“টাকা জমা দাও, দ্রুত,” রিসেপশনের ছেলেটা কাগজ বাড়িয়ে দিলে তানভীর খালা সেটা না নিয়ে রিদার দিকে ফিরলেন। “তোমার কাছে তো বিকাশে আছে, আগে দাও। পরে দেখা যাইব।” কথাটা এমন ভঙ্গিতে, যেন রিদার পকেট মানেই সবার খোলা ড্রয়ার। রিদা এক সেকেন্ড থামল। মাসের শেষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভাড়া, টিউশনের পাওনা, সব মাথায় এসে ঠুকল। তবু কাগজের মোড়কের শুকনো শব্দ তুলে ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা নোট, ফোন, আর এটিএম কার্ড বের করল। টাকা জমা দিয়ে ফিরে এলে খালা কাগজটা নিজের হাতে নিলেন, কিন্তু রোগীর কেবিনের চাবি আর ওষুধের স্লিপ নীলাকে দিলেন। “ওই বেঞ্চে বসো তুমি। ভেতরে বেশি যাইয়ো না। মানুষ কী ভাববে?”

মানুষ কী ভাববে— এই কথাটা রিদা বহুবার শুনেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েমের সঙ্গে লাইব্রেরি থেকে বেরোলে, ডিপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ালে, এমনকি নীলার বাসায় ঈদের সেমাই খেতেও। সম্পর্কটা কোনোদিন নাম পায়নি, কারণ নাম দিলে হিসাব খুলে যাবে— কার বাবা কী করেন, কার গ্রামে কত জমি, কার পরিবার কৃষি করে সংসার টানে, কারা ঢাকায় নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকে। সায়েমের মা নেই, তানভীর খালা ছোটবেলা থেকে অভিভাবকের মতো; সেই অধিকারের ধারেই তিনি সবকিছুর দরজা নিয়ন্ত্রণ করেন। ব্যবহার করতে অসুবিধা নেই, মানতে অসুবিধা আছে।

রিদা বেঞ্চে বসল না। ওষুধের স্লিপে ইনজেকশনের নাম দেখে নিচতলার ফার্মেসির দিকে দৌড় দিল, কারণ ভেতর থেকে ওয়ার্ডবয়ের চিৎকার এল— একটা ইনজেকশন এখনই লাগবে। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে সে শুনল খালার গলা, “সায়েম, তুমি যাও না। মেয়েমানুষ একা গেলে লোকজন ঠেলে দেবে।” কিন্তু সায়েম গেল না, খালার পাশে দাঁড়িয়েই রইল। সেই থেমে থাকার শব্দটাই রিদার কানে কাঁটার মতো বিঁধল। যেন সব দৌড়, সব রাতজাগা, সব গোপন পাশে থাকা— সবই একপাশে, আর নিরাপদ নীরবতাই আসল ভদ্রতা।

নিচে ফার্মেসির সামনে লাইন। কাঁচের ওপাশের ছেলেটা প্রেসক্রিপশন নিয়ে বলল, “একটা বাইরে থেকে আনতে হবে।” রিদা টাকা গুনে, ফোনে বাকিটা পাঠিয়ে, আবার পাশের গলির দোকানে দৌড় দিল। ফেরার সময় হাতে ওষুধ, কাঁধে ব্যাগ, আর বগলের নিচে রোগীর পুরনো রিপোর্ট। ওপরে উঠতেই ওয়ার্ড-দারোয়ান কাকা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, দেরি হইলে সমস্যা হইত।” তিনি দরজাটা চুপচাপ একটু বেশি খুলে ধরলেন। খুব ছোট্ট ছাড়, কিন্তু দিনের মধ্যে এটুকুই প্রথম— কেউ তাকে সরায়নি, বরং পথ করে দিয়েছে।

সে ভেতরে ঢুকে ইনজেকশনটা নার্সের হাতে দিতেই তানভীর খালা বললেন, “দিয়া যাও, বাইরে যাও।” তখনই সায়েম হঠাৎ সামনে এসে রিদার হাত থেকে রিপোর্টের ফাইলটা নিয়ে বলল, “এইটা আমি রাখি।” তারপর সে সরে দাঁড়াল না; রিদার কাঁধের পাশেই দাঁড়িয়ে নার্সকে জিজ্ঞেস করল, “আর কী লাগবে?” নার্স রোগীর হাত সোজা করতে বললে সায়েম বিছানার পাশের বালিশটা তুলে দিল, রিদা হাতের নিচে গুঁজে দিল। তাদের হাত একবার ছুঁয়ে গেল, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা— তারা একই পাশে দাঁড়িয়ে কাজটা শেষ করল, তানভীর খালার সামনে। খালার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল।

এইটুকুতেই মাটি বদলে গেল না, বরং বেশি বিপজ্জনক হল। করিডরে বেরোতেই খালা নিচু গলায়, কিন্তু এমনভাবে বললেন যাতে নীলা, দারোয়ান কাকা, এমনকি পাশের বেডের লোকও শুনতে পায়, “রাত বাড়লে ছেলেপেলেরা যার তার সঙ্গে থাকলে ভালো দেখায় না। সায়েম, তুমি মামার ঘরে থাকবা। আর এই মেয়েটা কাজ শেষ করে চলে যাক। ভবিষ্যতে কী হবে, সে হিসাবও আছে।” ভবিষ্যৎ— কথাটার ভেতর বিয়ের বাজার, বংশ, মানসম্মান, সব ঠাসা। সায়েম চুপ। চুপ মানেই অস্বীকার নয়; তবু রিদার গায়ে সেটা বৃষ্টির ঠান্ডা নয়, বরফের মতো পড়ল।

সে আর তর্ক করল না। চুপচাপ দারোয়ান কাকার কাছ থেকে স্টোররুমের চাবি নিয়ে বাড়তি কম্বল বের করল, রোগীর পায়ে দিল, প্রেসক্রিপশনের নতুন কাগজ ভাঁজ করল। কাজের মধ্যে লজ্জা কম লাগে। কিন্তু রাত সাড়ে নয়টার দিকে ডাক্তার এসে বললেন, রোগীকে ওপরের ছোট অপারেশন কক্ষে নিয়ে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখতে হবে, আর এখনই দুটো ওষুধ বাইরে থেকে আনতে হবে। লিফট নষ্ট। স্ট্রেচার সিঁড়ি দিয়ে তুলতে হবে, আর সঙ্গে অক্সিজেনের ছোট সিলিন্ডার, আলো কম বলে একটা চার্জলাইটও নিতে হবে। মুহূর্তেই করিডর কাঁপা কাঁপা হয়ে উঠল।

তানভীর খালা হাত তুলে ব্যবস্থা করতে লাগলেন, “সায়েম, তুমি সামনে থাকো। নীলা, তুমি দূরে। রিদা, তুমি আর যাইও না। নিচে নামার দরকার নাই।” দরকার নাই— যেন এতক্ষণকার সব দরকার এখন শেষ। অথচ ফার্মেসির ছেলেটা নিচ থেকে চিৎকার করে জানাল, এক ওষুধ এখনই আনতে হলে রাস্তার কোণের দোকান থেকে আনতে হবে, আর আগাম টাকা লাগবে। স্ট্রেচার একসঙ্গে তুলতে চারজন চাই। এক মুহূর্তের ফাঁকে রিদা দেখল, হিসাব ভেঙে যাচ্ছে। যারা মুখে কর্তৃত্ব করে, তাদের হাত খালি। যারা থাকতে পারে, তাদের দূরে সরানো হচ্ছে।

রিদা প্রথমে নিজেই অক্সিজেনের সিলিন্ডারের পাশে ঝুঁকে ধরল। “আমি নিচে যাই, ওষুধ আনি। তারপর সিঁড়িতে ধরব।” খালা এমন চোখে তাকালেন, যেন সে ইচ্ছে করে অপমান কুড়োতে এসেছে। “তোমারে বলছি না। এতক্ষণ যা করছো, সেটাই বেশি। মানুষ দেখতেছে।” রিদা সোজা হয়ে দাঁড়াল। বুকের ভেতর ধকধক করছিল, কিন্তু গলাটা আশ্চর্য ঠান্ডা বেরোল, “মানুষ দেখলে দেখুক। টাকা আমি দিছি, ওষুধ আমি চিনি, চাচার কাগজ আমার কাছে। আমি নামতেছি।”

সে ঘুরতেই তানভীর খালা ঝট করে তার কবজি ধরলেন। শক্ত, শুষ্ক আঙুল। “এক পা যাইবা না।” সেই মুহূর্তে সায়েম এতক্ষণকার সব নীরবতা ভেঙে একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। খালার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে খুব জোরে নয়, কিন্তু থামানো যায় না এমন স্বরে বলল, “ছাড়েন।” তারপর রিদার কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে নিজের কাঁধে তুলল, ভেতর থেকে প্রেসক্রিপশন বের করে তার হাতে দিল, আর অক্সিজেনের সিলিন্ডারের ফিতেটা অন্য হাতে নিল। “চলো।”

এত ছোট শব্দ, অথচ করিডরের বাতাস বদলে গেল। নীলা বেঞ্চের কোণা থেকে উঠে সরে দাঁড়াল। দারোয়ান কাকা তাড়াতাড়ি সিঁড়ির দরজা খুলে দিলেন। তানভীর খালার মুখে এতক্ষণকার আস্থার ভঙ্গি খসে পড়ে কেবল বিরক্ত লজ্জা রইল, কারণ এবার বাধা দিলে রোগীর কাজ থামবে। সায়েম আর রিদা একসঙ্গে নামল— সে সামনের দিকে চার্জলাইট জ্বেলে, রিদা ওষুধের টাকা হাতে চেপে। নিচে গিয়ে দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে সিলিন্ডারটা একা তোলা মুশকিল বুঝে রিদা বলল, “ফিতাটা দাও।” সায়েম ফিতা বাড়িয়ে দিলে সে নিজের হাত ঢুকিয়ে নিল। একই ফিতায় দুজনের কবজি কাছাকাছি, মাঝখানে ধাতব ভার। তারা দুজনে কাঁধ মিলিয়ে সিঁড়ি উঠতে লাগল।

উপরে তখন রোগীকে স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছে। স্ট্রেচারের এক কোণ বেয়ে চাদর সরে যাচ্ছিল; রিদা দৌড়ে গিয়ে সেটা গুঁজে দিল, সায়েম সিলিন্ডারটা দরজার ফ্রেম ঠেকিয়ে সামলে রাখল। ডাক্তার রাগী গলায় বললেন, “তাড়াতাড়ি।” আর তখনই শেষ জট বাঁধল— চার্জলাইট আর ওষুধের ব্যাগ একসঙ্গে বহন না করলে ওপরের অন্ধকার মোড়ে ইনজেকশন প্রস্তুত করা যাবে না। নীলা কাঁদছে, দারোয়ান কাকা স্ট্রেচারের পেছনে, খালা দরজায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু কাজটা করার মতো ফাঁকা হাত আর নেই।

রিদা একটানে ওষুধের ব্যাগের লম্বা ফিতা খুলে চার্জলাইটের হাতল তাতে গেঁথে নিল। তাৎক্ষণিক, কাঁচা ব্যবস্থা। তারপর নিজের কাঁধে ফিতার একপাশ তুলে বলল, “এই পাশ ধরো।” সে কারও অনুমতি চাইল না, শুধু সায়েমের দিকে তাকাল। সায়েম এক মুহূর্তও নিল না। ব্যাগ-লাইট-ফিতার অন্য পাশ নিজের কাঁধে তুলে নিল, এমনভাবে যে মাঝখানে ওষুধের ব্যাগ আর ঝোলানো আলো দুজনের মধ্যে পড়ে রইল। তাদের চলতে হলে একই গতিতে চলতে হবে, একই দিকে। আর পেছনেই দারোয়ান কাকা, নীলা, খালা— কাছের সাক্ষী।

তানভীর খালা “সায়েম!” বলে উঠেছিলেন, কিন্তু শব্দটা আর কর্তৃত্ব পেল না। কারণ এই মুহূর্তে আলাদা আলাদা চলার উপায় নেই। রিদা আগে পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। সায়েম তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠল। আলোটা দুলতে দুলতে কখনও সিঁড়ির ভাঙা ধাপ, কখনও তাদের জোড়া হাতের নিচের ফিতা, কখনও ব্যাগের কাগজের মোড়ক ছুঁয়ে যাচ্ছিল। শুকনো কাগজের শব্দ, ধাতব সিলিন্ডারের ঠক্, স্ট্রেচারের চাকায় ঘষা— সব মিলিয়ে ওঠার পথটা একটানা চাপ হয়ে দাঁড়াল। মাঝপথে রিদার পা পিছলে যেতেই সায়েম কাঁধ শক্ত করে ভার টেনে নিল; আবার পরের মোড়ে সায়েমের হাত ফসকাতে রিদা ফিতাটা কবজিতে মুড়ে ধরল। তারা কারও দিকে তাকাল না। শুধু কাজটা ভাঙতে দিল না।

ওপরে পৌঁছে ডাক্তার ব্যাগ নিয়ে নিলেন, নার্স আলো টেনে ধরল, স্ট্রেচার ভেতরে ঢুকে গেল। তবু রিদা সঙ্গে সঙ্গে সরে দাঁড়াল না। ফিতার এক পাশ তখনও তার কাঁধে। অন্য পাশ সায়েমের। মাঝখানে এখন খালি চার্জলাইট, তবু ঝুলছে। তানভীর খালা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন; তিনি কিছু বলতে গিয়ে দেখলেন, বলার মতো বাকিটা বোধহয় নিচেই পড়ে গেছে। নীলা মুখ মুছতে মুছতে চুপচাপ রিদার হাতে রোগীর কেবিনের চাবিটা দিয়ে দিল— দেরিতে ফেরত দেওয়া সেই ছোট চাবি, যেটা এতক্ষণ অন্য হাতে ছিল।

রিদা তখনই নড়ল। “নিচে আরও ওষুধ লাগতে পারে,” সে আস্তে বলল। কাউকে না, যেন পথকেই। তারপর সিঁড়ির আধো অন্ধকারে এক ধাপ নেমে থামল, নিজের কাঁধ থেকে ফিতাটা পুরো নামাল না। সায়েমও নামল না, সরে গেল না; শুধু একই ফিতার ভর সামলে তার পাশে এসে দাঁড়াল। ওপরে অপারেশন কক্ষের দরজা আধখোলা, নিচে করিডরের টিউবলাইটের আলো উঠছে কমে কমে। ঝুলন্ত লণ্ঠন-ধরানো চার্জলাইটটা দুজনের মাঝখানে দুলে উঠল, ওষুধের ব্যাগের সঙ্গে এক ফিতায় বাঁধা। আলো একবার রিদার আঙুলে, একবার সায়েমের গিঁট ধরা হাতে পড়ে আবার সরে গেল। তারপর শুধু সেই দোলার ছায়া সিঁড়ির দেয়ালে লেগে রইল।