এই ভাঙনও আমাদের আলাদা করতে পারল না
স্ট্রেচারে ধাক্কা লাগতেই অক্সিজেন সিলিন্ডারের মুখটা কাত হয়ে গেল, রিদা দৌড়ে গিয়ে দুহাতে সেটাকে ধরে সোজা করল আর গেটের পাশে দাঁড়ানো ওয়ার্ডবয়কে বলল, “ভাই, আগে চাকা উঠান, না হলে আবার আটকে যাবে।” মানুষে ঠাসা ঢাকার ওই বেসরকারি ক্লিনিকের সামনে তখন হর্ন, আজানের ভাঙা সুর, আর আত্মীয়স্বজনের দৌড়ঝাঁপ একসাথে কাঁপছে। সাব্বিরের বাবা অচেতন, গাড়ি থেকে নামানোর সময় পকেটের কাগজপত্র মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। রিদা এক হাতে প্রেসক্রিপশনের খাম, অন্য হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে নিয়ে ডিউটি-ডেস্কে এগিয়ে দিল। তার আগেই নওশীন খালা ঝড়ের মতো এসে বললেন, “তুমি এত ভেতরে যাচ্ছ কেন? কাগজ দাও, আমরা আছি।”
কথাটা বলার ভঙ্গি এমন, যেন রিদা গাড়ির ড্রাইভারও না, তারও নিচে কিছু। অথচ মিনিটখানেক আগেও গাড়ির পিছনের সিটে আধশোয়া মানুষটাকে কাত করে শ্বাস নেওয়ার জায়গা করে দিয়েছিল রিদাই, কারণ অন্য সবাই একসাথে চিৎকার করছিল। ডেস্কের নার্স নাম জিজ্ঞেস করতেই নওশীন খালা কাগজ টেনে নিয়ে বললেন, “আমার দুলাভাই। ভর্তি করেন তাড়াতাড়ি।” তারপর না তাকিয়েই যোগ করলেন, “রিদা, বাইরে থেকে একটা পানির বোতল এনে দাও।”
রিদা বোতল আনতে ফিরছিল, তখনই সাব্বির পেছন থেকে বলল, “একটু দাঁড়াও।” সে নিজের মানিব্যাগ থেকে ভাঁজ করা টাকা বের করে রিদার হাতে গুঁজে দিল। চোখ তুলে তাকায়নি, শুধু নিচু গলায় বলল, “নিজেরটা খরচ কোরো না এখন।” এটাই ছিল প্রথম ফাটল—যেন সবাই তাকে বাইরে ঠেলে দিলেও একজন অন্তত দেখেছে, সে একা পড়ে নেই।
ভর্তি কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। কাঁচের ওপাশে নাম ডাকা হচ্ছে, ফাইলের শুকনো কাগজ মোড়ানোর শব্দ উঠছে থেমে থেমে। নওশীন খালা আর দুজন ফুপু কাউন্টারের সামনে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ালেন। রিদাকে দেখিয়ে খালা বললেন, “ওখানে বসো। দরকার হলে ডাকব।” বসার জায়গা বলতে করিডরের বাঁক ঘেঁষে একটা সস্তা প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণা, যেখান থেকে কাউন্টারের কাঁচ দেখা যায়, কিন্তু কথাবার্তা শোনা যায় না। রিদা বসেনি। সে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু হিসাব করল—অ্যাডভান্স লাগবে, ওষুধ লাগবে, রক্ত লাগলে দৌড়াতে হবে।
দশ মিনিটের মধ্যে সেটা সত্যিই হল। নার্স এসে বলল, “এখনই এই ইনজেকশন আর এই দুটো ওষুধ আনতে হবে।” কাগজটা প্রথমে নওশীন খালার হাতে গেল, তারপর খালা চারদিকে তাকিয়ে বললেন, “সাব্বির, তুমি বাবার সাথে থাকো। রিদা, যাও তো। ফার্মেসি তো নিচেই।” যেন এটাই রিদার স্বাভাবিক কাজ, ক্লিনিকের মেঝে মোছার পরের কাজের মতো। প্রেসক্রিপশনটা দেওয়ার সময়ও তিনি কাগজের এক কোণা ধরে রাখলেন, পুরোটা ছাড়লেন না; শেষে ছাড়লেন যখন নিশ্চিত হলেন, রিদা টাকার কথা তুলবে না।
ফার্মেসির লাইনে দাঁড়িয়ে রিদা নিজের বিকাশের টাকা থেকে ঘাটতি মেটাল। ফেরত পাওয়া পাতলা খামে খুচরো নোট ঢুকিয়ে ছুটে উঠল। ফিরে এসে দেখে কেবিনের দরজায় তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। “শুধু নিকট আত্মীয়,” গার্ড বলল। নওশীন খালা ভেতর থেকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, “ওষুধটা দিন, আপনি বাইরে থাকেন।” তিনি “তুমি” থেকে “আপনি”-তে গেলেন, কিন্তু তাতে দূরত্বই বাড়ল; সভ্য গলায় কাউকে সীমানার বাইরে রাখা যায় আরও নিখুঁতভাবে।
রিদা ওষুধ এগিয়ে দিয়ে সরে দাঁড়াল। পাশে চায়ের কাপ পড়ে আছে, চা ঠান্ডা হয়ে উপরে পাতলা চামড়া ধরেছে; কাপের তলায় গোল দাগ পড়ে আছে ধূসর বেঞ্চে। অপেক্ষার গন্ধটা তেতো। কাঁচের ভেতর সাব্বিরকে দেখা গেল একবার—হাসপাতালের নীল কভার পরা, গলায় মাস্ক নামানো, বাবার বালিশ ঠিক করছে। তারপর নওশীন খালা তার হাতে কিছু দিলেন, আর সে ফিরে তাকাতেই রিদা বুঝল, ছেলেরও হাত খালি নেই। খালার কাছে এখন রেজিস্টারের কাগজ, টাকা, কেবিনের পাস—সব।
একটু পর নার্স দৌড়ে এসে করিডরে জিজ্ঞেস করল, “কেবিনের বাড়তি চাবি কার কাছে? রোগীর জামাকাপড় লাগবে, লকার খুলতে হবে।” ভেতর থেকে কেউ ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারল না। নওশীন খালা বললেন, “সাব্বির তো তাড়াহুড়োতে সব নিয়েছে।” সাব্বির বলল, “না খালা, আমি শুধু ফোন আর মানিব্যাগ নিয়েছি।” দুজন ফুপু একসাথে বলতে লাগলেন, হয়তো গাড়িতে, হয়তো বাড়িতে, হয়তো ড্রাইভারের কাছে। কথা ঘুরতে লাগল, কিন্তু লকারের ওষুধ আর রিপোর্ট ছাড়া পরের ধাপ আটকে আছে।
রিদা তখনই ব্যাগের ছোট চেইন খুলে একটা চাবির রিং বের করল। সাদামাটা লাল ফিতেয় বাঁধা। “আপনারা গাড়ি থেকে নামানোর সময় আন্টির শাড়ির আঁচলে আটকে ছিল,” সে বলল। “খুলে পড়ে যাচ্ছিল, আমি রেখে দিয়েছিলাম।” কেউ তার কথা শেষ পর্যন্ত শোনেনি তখন; সে নিজেও জানানোর সময় পায়নি। নওশীন খালা প্রথমে হাত বাড়ালেন, কিন্তু রিদা চাবিটা সোজা সাব্বিরের দিকে ধরল। “লকারটা খুলে নাও। ভিতরে একটা ব্রাউন খামে আগের রিপোর্ট আছে, আর ডান দিকে সাদা ব্যাগে কাপড়।”
সাব্বির চাবিটা নিয়ে স্থির হয়ে গেল এক মুহূর্ত। “তুমি তখনই রেখেছিলে?”
“পড়ে গেলে খুঁজে পেতে দেরি হতো,” রিদা বলল। গলায় কোনো অভিমান রাখল না, শুধু তাড়াহুড়োর হিসাব।
সে কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই সাব্বিরকে লকার খুলতে দেখল। ব্রাউন খাম ঠিক জায়গায়, কাপড়ও ঠিক। খামের ভিতরকার পুরোনো রিপোর্ট দেখে ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ বদলালেন; ভুল ইনজেকশনটা আটকে গেল শেষ মুহূর্তে। ভেতর থেকে নার্স বেরিয়ে এসে শুকনো গলায় বলল, “ভালো হয়েছে এটা পাওয়া গেছে।” তারপর আরেকটা কাগজ বাড়িয়ে দিল, “এই নতুনটা নিচ থেকে আনতে হবে।”
এইবার সাব্বির কাগজটা নওশীন খালার দিকে না দিয়ে সরাসরি রিদার হাতে দিল। খুব ছোট্ট কাজ, কিন্তু করিডরের বাতাসে সেটা আলাদা করে শোনা গেল—কাগজের ঘর্ষণের মতো। নওশীন খালার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। তিনি বললেন, “সবাই একটু সামলে চলবে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, কে কী দেখছে বুঝে কথা বলো। মেয়েটা ভালো, কাজ করছে—তা বলে সব হাতে তুলে দিলে চলে?”
“ওষুধ এখনই লাগবে,” সাব্বির শুধু এতটুকু বলল।
রিদা নেমে গেল, কিনে আনল, বিল মেটাল, ফেরত টাকাও গুনে দিল। কিন্তু জরুরি ধাক্কাটা কমে আসতেই অন্য হিসাব মাথা তুলল। করিডরে নতুন করে আত্মীয়রা জমল; কে এসেছে, কে যায়নি, কার মেয়ে মেডিকেলে পড়ে, কার ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে—এইসব চাপা তুলনা। নওশীন খালা তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাব্বিরকে আলাদা টেনে নিয়ে বললেন, অথচ এমন জোরে যে রিদা শুনে ফেলল, “রাতের দিকে নীলা আসবে। ওর বাবাও ডাক্তার মানুষ, হাসপাতালে থাকা-টাকা-পয়সার হদিস বোঝে। তুমি ওর সাথে থাকো। এই মেয়েকে এতক্ষণ ছিল, ঠিক আছে, এখন কাগজপত্র দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দাও। বাইরে কাজ থাকলে ডাকবে।”
রিদা তখন রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে ওষুধের সাদা ব্যাগ, অন্য হাতে ভর্তি রেজিস্টারের কাগজ। তার বুকের ভেতর কেমন ফাঁপা শব্দ হলো, যেন ফার্মেসির পাতলা কাগজ আবার মোচড়ানো হচ্ছে। এতক্ষণ যে কাজগুলো তাকে দিয়ে করানো হয়েছে, এখন সেগুলোর ওজনটুকু আলাদা করে রেখে তাকে বাদ দেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক ব্যবস্থার মতো সাজিয়ে বলা হচ্ছে।
নওশীন খালা নিজেই এগিয়ে এসে হাত বাড়ালেন। “দাও, এগুলো আমি রাখি। তুমি অনেক কষ্ট করেছ। এখন বাসায় যাও। মেয়েমানুষ রাত করে থাকলে কথা ওঠে। নীলা এলে সামলাবে।”
রিদা প্রথমে কিছু বলল না। তারপর কাগজগুলো শক্ত করে ধরল। “আমি কেবিনের বাইরে থাকব,” সে শান্ত গলায় বলল। “যতক্ষণ ওষুধের পরের ডোজ না হয়।”
খালার মুখে পাতলা হাসি উঠল। “তোমার থাকলে কী বাড়তি হবে? আত্মীয় তো নও।”
সাব্বির তখন দরজার ধারে, তাদের মাঝখানে না এসে পাশে দাঁড়িয়ে। এই পাশে-না-ওপাশে দাঁড়ানোই এতক্ষণ তার ভরসাহীনতা ছিল। নওশীন খালা এবার সোজা তাকে বললেন, “কাগজগুলো নাও। নিচে নীলাকে রিসিভ করতে যাও। রিদাকে দিয়ে ব্যাগ পাঠিয়ে দাও, তারপর তুমি ওর সাথে থাকো।”
এটাই ছিল হাতে-হাতে বোঝা বদলের মুহূর্ত। নওশীন খালা ভেবেছিলেন, নিয়মমাফিক ছেলেকে আলাদা পথে পাঠালেই সব আগের জায়গায় ফিরে যাবে। করিডরের দুপাশে দাঁড়ানো ফুপুদের চোখ একসাথে সেদিকে উঠল। গার্ডও দরজার পাশ থেকে তাকাল। রিদা কিছু বলল না। সে শুধু কাগজগুলো নিজের বুকে ঠেকিয়ে ধরে সোজা নিচের ফার্মেসির দিকের অপেক্ষার লাইনের দিকে হাঁটা দিল। যেন সিদ্ধান্তটা কারও অনুমতির বিষয় নয়—ওষুধের সময় আছে, সে লাইনে দাঁড়াবে।
তিন পা গিয়েই সে শুনল পেছনে নওশীন খালার কণ্ঠ, “সাব্বির! বললাম না, কাগজ নাও।”
কাগজের বদলে শুকনো একটা শব্দ হলো—সাদা ব্যাগের হাতল হাত বদলানোর নয়, ভাগ হওয়ার। সাব্বির নওশীন খালার বাড়ানো হাত এড়িয়ে এসে রিদার পাশে দাঁড়াল। তার ডান হাতে রেজিস্টারের কাগজের অর্ধেক, বাম হাতে ওষুধের ব্যাগের অন্য হাতল। “খালা, নীলা এলে আপনি থাকবেন,” সে বলল, গলা নিচু, তবু পরিষ্কার। “আমি এটার সাথে যাচ্ছি।”
“এটার সাথে?” নওশীন খালার গলায় অপমানের খসখস শব্দ।
সাব্বির একবারই তাকাল খালার দিকে। “রিদার সাথে।”
এত ছোট সংশোধনেও খালার মুখ বদলে গেল। কিন্তু সে আর দাঁড়ায়নি। রিদা হাঁটা থামায়নি। দুজন একসাথে সিঁড়ি নামল—ভিড় এড়িয়ে, কাঁধে কাঁধ না ছুঁয়ে, তবু একই গতিতে। নিচের করিডরে ফার্মেসির সামনে আবার লাইন। এক লোক সরে দাঁড়াল, ব্যাগটা বড় দেখে জায়গা করে দিল। রিদা লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়াল। সাব্বির তার পাশেই। নওশীন খালা ওপরে রেলিং থেকে একবার ডেকেছিলেন কি না, শব্দ এসে ভেঙে গেল মানুষের কথায়।
রিদা ব্যাগটা নিজের দিকে টেনে নিল না, পুরোটা সাব্বিরের হাতেও ছাড়ল না। “রাতের ডোজের কাগজ আগে দাও,” সে বলল। “ভুল হলে আবার দেরি হবে।” এই প্রথম সে তাদের দুজনের ভেতরের কাজের সীমা নিজেই ঠিক করল।
সাব্বির কাগজ বাড়িয়ে দিল। আঙুল ছুঁয়ে গেল এক মুহূর্ত, তারপর সরে গেল। “তুমি খেয়েছ কিছু?”
“না।”
সে পকেট থেকে বিস্কুটের ছোট প্যাকেট বের করে ব্যাগের ওপর রাখল, যেন কথাটা আলাদা করে বড় না হয়। “এটা রাখো।”
রিদা প্যাকেট খুলল না। লাইনের ধীর অগ্রগতি, কাঁচের ওপাশে বিলের হিসাব, আর সামনে ঘষা পড়া পুরোনো বেঞ্চ—সব মিলিয়ে অপেক্ষা আবার জমতে লাগল। বেঞ্চটার এক কোণে আগের ঠান্ডা চায়ের গোল দাগ শুকিয়ে গাঢ় হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে যে ফাঁকা জায়গাটা রেখে তাকে দূরে বসতে বলা হয়েছিল, এখন সেটার ফাঁকাই চোখে পড়ে—ওখানে আর কেউ এসে কাগজ নিতে দাঁড়ায়নি।
লাইন এগোলে রিদা আগে গিয়ে বেঞ্চের ধারটায় বসে কাগজগুলো হাঁটুর ওপর রাখল। সাব্বির তার পাশে বসল না, ঠিক পাশে দাঁড়াল; তারপর লাইন আরও এগোতেই নীরবে বসে পড়ল। তাদের মাঝখানে আলাদা করে রাখার মতো কোনো হাতবদল নেই—একটা ব্যাগ দুজনের হাঁটুর ফাঁকে, রেজিস্টারের কাগজ রিদার হাতে, সাব্বিরের হাঁটু তার হাঁটুর সমান্তরালে এসে থামল। দুজনেই সামনের কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে রইল, একই ঘষা পড়া বেঞ্চের ধার ঘেঁষে, হাঁটু দুটো নীরবে এক সরল রেখায়।