Fast Fiction

দূরত্বটাই দৃশ্য হয়ে রইল

খামটা মাহিরার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছিল, পাতলা কাগজের শুকনো মচমচ শব্দে দোতলার সিঁড়ির নিচের করিডরটা আরও টানটান হয়ে উঠল, ঠিক তখনই তানভীর দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল। তার ফোনের আলো হাতের তালুর ভেতর নিচু হয়ে জ্বলছিল; আলোটা মুখে নয়, সোজা গিয়ে থামল মাহিরার ডান হাতের বুড়ো আঙুলে, যেখানে হলুদের দাগ বসে আছে আর বারবার খাম ভাঁজ খোলার চাপে নখের কাছে কাগজ কেটে লাল রেখা উঠেছে।

“ওটা আম্মাকে দাও,” ওপর থেকে রুবিনা খালার গলা নামল, “তানভীরের ঘরে ঢুকতে হবে না। দরজায় দিয়েই নামো।”

কথাটা এমনভাবে বলা, যেন মাহিরা কোনো মানুষ না, ভুল জায়গায় চলে আসা কাজের জিনিস। অথচ আজকের টাকা-পয়সার হিসাব এই খামেই, কৃষি-ঋণের কিস্তির নগদ মিলছে না; ভুল হলে দোষ তারই হবে। মাহিরা খামটা বুকে চেপে দরজার ধারে দাঁড়াল। ভেতর থেকে এসির ঠান্ডা বাতাস, বাইরে রান্নাঘর থেকে ভাজার গন্ধ; মাঝখানে তানভীর এক পা সরল না।

“দেন,” সে নিচু গলায় বলল।

মাহিরা হাত বাড়াল। সে-ও। চৌকাঠের মাঝখানে খাম বদলানোর কথা ছিল, কিন্তু তানভীর খাম না নিয়ে এক নিশ্বাস দেরি করল—চোখ বুড়ো আঙুলের কাটা দাগে। তারপর খাম নিল, এত কাছ থেকে যে মাহিরার ওড়নার কিনারা তার কবজিতে ছুঁইছুঁই করে থেমে গেল। এক মুহূর্ত। তারপর সে সরে দাঁড়াল। “নিচে যান,” বলল, গলা আবার স্বাভাবিক, “আমি আসছি।”

নিচতলায় পুরনো বাড়ির সামনের ঘরটাকেই অফিস বানানো হয়েছে—সাইনবোর্ডে কৃষি-ঋণ পরামর্শ কেন্দ্র, কিন্তু ভেতরে সবকিছুতেই বাড়ির বাতাস লেগে আছে। লোহার আলমারি, রেজিস্টার টেবিল, দেয়ালে কাবার ছবি, আর কোণে তিনটে প্লাস্টিকের চেয়ার; দুটোতে বসেন লোক, একটার কোণ বরাবর সব সময় যেন মাহিরার জন্যই খালি থাকে, তবু তাকে খুব কমই বসতে দেওয়া হয়। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা এমন ঘন জিনিস যে এখানে কে কর্মচারী, কে আপন, কে বাইরে—সব আলাদা রেখেও জড়িয়ে থাকে।

রাতে হিসাব মেলাতে বসে রুবিনা খালা প্রথমে নাঈমা ভাবিকে টেনে এনে চেয়ারে বসালেন। “ভাবি তো ঘরের মেয়ে,” তিনি বললেন, “টাকাপয়সার জিনিস সামনে থাকুক। মাহিরা, তুমি দাঁড়াও। কিস্তির খাতাটা পড়ে শোনাও।”

মাহিরা দাঁড়িয়ে রইল। সারাদিন মাঠের লোকেদের ফোন, কাগজ, হিসাব, সংগ্রহ—সব সে করেছে। তবু বসার জায়গা পেল নাঈমা, যে দুপুরে একবারও অফিসঘরে ঢোকেনি। মাহিরা রেজিস্টার খুলে নম্বর পড়ছিল, আর দেখছিল রুবিনা খালা কীভাবে বারবার তার কথার ওপর কথা চাপিয়ে দেন—“ওটা না, পরের পাতাটা”, “এত ধীরে কেন”, “তোমাদের বাসার মেয়েদের হাতে শৃঙ্খলা কম।” শেষ কথাটা বলে খালা এমনভাবে নাঈমার দিকে তাকালেন যেন রায় পড়ে গেছে।

তানভীর সামনের টেবিলের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে কারও পক্ষ নিল না। শুধু মাহিরা যখন পাতায় আঙুল বোলাতে বোলাতে আটকে যাচ্ছিল, তখন সে একবার বলল, “তেরো নম্বর সারিটা।” কোনো ব্যাখ্যা নয়। কোনো সান্ত্বনা নয়। অথচ সে দেখেছে—পৃষ্ঠার ভাঁজ, অঙ্কের দাগ, মাহিরার থমকে যাওয়া।

“তুমি চা দাও আগে,” রুবিনা খালা হঠাৎ বললেন, যেন রেজিস্টার পড়া আর চা দেওয়া একই শ্রেণির কাজ। “তারপর দাঁড়ায়ে থাকো।”

মাহিরা খাতা বন্ধ করল। তার হাতের শিরা ফুলে উঠেছে। সে রান্নাঘরের দিকে ফিরতেই তানভীর বলল, “রেজিস্টারটা টেবিলেই থাক।”

খালা কটমট করে তাকালেন। “এত কাগজ সামনে রেখে মেয়েটা গেলে—”

“আমি আছি,” তানভীর বলল। শুধু এইটুকু। তারপর আর কিছু না। মাহিরা বুঝল, এও কোনো রক্ষা নয়; বরং তাকে চোখের ভেতর রেখে দেওয়া। সে চা বানাতে গেল।

রান্নাঘরের সরু দরজায় ফেরার সময় ঘটনাটা হল। চায়ের ট্রে হাতে, বাম কাঁধে ওড়না সরে গেছে, রুবিনা খালা পিছন থেকে তাগাদা দিলেন, “দ্রুত, দ্রুত—” আর নাঈমা হেসে উঠে সরে না দাঁড়ানোয় ট্রেটা কাত হল। গরম চা সোজা রেজিস্টারের ওপর পড়ত, মাহিরার হাত ফসকাত, আর সেই ভুলের দাম মাসজুড়ে শুনতে হতো। ট্রে কাত হওয়ার আগের মুহূর্তে তানভীর এগিয়ে এসে তার কবজি থামাল।

একটা স্পষ্ট, একটানা গতি। আঙুলের চাপ খুব জোরে নয়, কিন্তু এড়ানো যায় না। ট্রে থেমে গেল। কাপের ভেতরের চা কাঁপল, এক ফোঁটাও পড়ল না। মাহিরার শ্বাস বুকের মাঝখানে আটকে রইল। তানভীরের হাত তার কবজিতে এক নিশ্বাসের বেশি থাকল না; থামিয়েই ছেড়ে দিল। সরে গেলও আগে সে-ই।

“চেয়ার সরিয়ে রাখো,” সে নাঈমাকে বলল, চোখ অন্যদিকে।

ঘরে কারও হাসি রইল না। শুধু কাপের চামচে টুং শব্দ হল। মাহিরা ট্রে নামাল। কবজির জায়গাটায় আগুনের মতন একটা সরু রেখা রয়ে গেল, যেন ছোঁয়া নয়, থামিয়ে দেওয়া।

এরপর রাতগুলো বদলে গেল, কিন্তু বদলটা এমন ছোট ছোট জায়গায় যে মুখে বললে কেউ বিশ্বাস করত না। তানভীর পরদিন থেকে নগদ আদায়ের ছোট লোহার বাক্সের চাবি নিজে না রেখে মাহিরার টেবিলের ডান ড্রয়ারে রাখতে শুরু করল। বলল, “দিনশেষে মিলিয়ে তারপর দেবেন।” রুবিনা খালা শুনে বললেন, “ওর হাতে?” সে জবাব দিল, “দিনে যার হাতে সংগ্রহ থাকে, রাতে হিসাবও তার হাতেই থাকুক।” কথাটা এমন সরল, যেন এর ভেতরে কিছু নেই। কিন্তু তারপর থেকে প্রতিবার লোক এলে সে মাহিরাকেই ডাকত—“রশিদটা দেখান”, “ফসলের জামানত ফর্মটা বের করুন”—এমনভাবে, যেন ঘরে অন্য কেউ নেই।

এই বদল মাহিরার জন্য সহজ হলো না। তানভীর তাকে কাছে টানেনি; বরং তার চারপাশের কাজের রেখাগুলো এমনভাবে কেটে দিল যে সে সব সময় তার দৃষ্টিসীমায় থাকে। দুপুরে অন্যদের খাওয়া শেষ হলে অফিসঘরের কোণের প্লাস্টিকের চেয়ারটা একদিন খালি দেখে সে বলল, “বসে খান।” মাহিরা দাঁড়িয়েই খেল। পরদিন সেই চেয়ারটায় আর কেউ বসেনি, তবু সে দাঁড়িয়েই থাকল। তানভীর কিছু বলল না, শুধু হিসাব চাওয়ার অজুহাতে তাকে বারবার দরজার ভেতর-বাইরের সেই সীমায় দাঁড় করিয়ে রাখল।

মাহিরা জানত এই খেলায় হারলে তারই সর্বনাশ। এই বাড়িতে সে দূরসম্পর্কের পরিচয়ে এসেছে—আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলেই কাজ পেয়েছে, আবার সেই জানাশোনাই তার চারদিকে ফাঁসের মতো। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে দেরি হলে মা প্রশ্ন করেন না, মুখ চেয়ে থাকেন। রুবিনা খালা সুযোগ পেলেই বলে ওঠেন, “মেয়েদের সীমানা মেয়েদেরই বুঝতে হয়।” তানভীরও এসব জানে। তাই তার প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্ত মাহিরার বুকের ভেতর আরও ধারালো হয়ে বসে।

শবে বরাতের আগের সন্ধ্যায় বাড়িতে ফাতেহা আর দোয়ার আয়োজন। আত্মীয়রা আসছে, সামনের উঠোনে আলো, ডাইনিং টেবিলে ফিরনি, হালুয়া, রুটি। অফিসঘর সেদিনও বন্ধ নয়; গ্রামের তিনজন লোক নগদ জমা দিয়ে গেছে, রেজিস্টার মেলাতে হবে। রুবিনা খালা অতিথিদের সামনে বললেন, “মাহিরা, উপরে যেয়ো না। থালা ধুয়ে নিচে হিসাব লিখে রেখো। এইসব সময়ে কে কোথায় যাচ্ছে, লোকে দেখে।”

লোকেরা শুনল। কেউ কিছু বলল না। নাঈমা ভাবি মুখে মিষ্টি হাসি রেখে এক চাচির কানে কানে কী যেন বলল। মাহিরা বুঝল—আদেশটা তার কাজের জন্য নয়, তার অবস্থান মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। সে থালা ধুয়ে, হাত মুছে, ভেজা আঙুলে কাগজ না লাগার জন্য ওড়নায় চেপে শুকিয়ে অফিসঘরে এল।

তানভীর সেদিন সাদা পাঞ্জাবি পরে ছিল। এত লোকের মাঝেও সে সরাসরি তাকায়নি। তবু যখন রুবিনা খালা উপরের ট্রে নামাতে মাহিরাকে না পাঠিয়ে বাড়ির আরেক কিশোর ছেলেকে ডাকলেন, তখন তানভীরের চোয়াল একবার শক্ত হতে মাহিরা দেখল। তারপর সে সবাইকে সামনে রেখে কেবল বলল, “কিস্তির আজকের নগদ গুনে তালা দেবে মাহিরা। কেউ খাতা ছুঁবেন না।”

এটা ঘোষণা ছিল না, তবু ঘরের ভেতর ছোট্ট সরে যাওয়া তৈরি করল। এক চাচা বললেন, “ও-ই নাকি এখন হিসাব দেখে?” তানভীর হেসে কিছু বলল না। মাহিরা অনুভব করল, তাকে দেখা হচ্ছে—সম্মানে নয়, সংশয়ে। আর সেই সংশয়ের নিচেই তানভীরের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত, ঠান্ডা, অদ্ভুত।

রাত গাঢ় হতে হতে অতিথিরা ওপরে। নিচতলায় অফিসঘর, সিঁড়ির বাঁক, আর পাশের ছোট ওয়াশরুমের দরজায় লাগানো আয়না অন্ধকারে আধা আলো ধরে আছে। মাহিরা রেজিস্টার টেনে বসে নগদ গুনছিল। নোটের কাগজে পুরনো ঘামের গন্ধ, খামের মচমচ শব্দ আবার উঠছে। চাবির গোছা তার পাশে। রুবিনা খালা এসে দরজায় দাঁড়ালেন।

“চাবি দিয়ে যাও,” তিনি বললেন। “আজকে আমি রাখব।”

মাহিরা মাথা তুলল না। “স্যার বলেছেন, মিলিয়ে তালা দিয়ে আমি দেব।”

“স্যার?” খালার ঠোঁট চিকন হয়ে গেল। “তুমি এখন ভাষাও বদলাইছ? চাবি দাও।”

মাহিরা চাবি ধরল, দিল না। “হিসাব বাকি।”

এই প্রথম সে সরাসরি অমান্য করল। রুবিনা খালার চোখে গরম অপমান জ্বলে উঠল। “তোমার মতো মেয়েদের দুই দিন মাথায় তুললেই—”

পাশের সিঁড়ি থেকে পায়ের শব্দ নামল। তানভীর এসে থামল। খালা সোজা তার দিকে ঘুরে বললেন, “দেখো তোমার কর্মচারী কীভাবে কথা শিখছে। আমি চাবি চাই, দিচ্ছে না।”

তানভীর একবার মাহিরার দিকে তাকাল, একবার টেবিলের খোলা রেজিস্টারের দিকে। “হিসাব শেষ?” সে জিজ্ঞেস করল।

“হবে,” মাহিরা বলল, গলা শুকনো। “তারপর দিয়ে চলে যাব।”

খালা যেন এই কথাটা নিজের ওপর আঘাত হিসেবে নিলেন। “চলে যাব মানে? অনুমতি কে দিল? তোমাকে আমি বলছি—”

মাহিরা চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। প্লাস্টিকের পায়া মেঝেতে ঘষে একটা খসখসে শব্দ করল। সে রেজিস্টার বগলে নিল, চাবি মুঠোয়, আর সরু করিডরের দিকে হাঁটল—যে পথ দিয়ে বেরোতে হলে আয়নার সামনে দিয়ে, তারপর বাইরের লোহার গেটের দিকে যেতে হয়। খালা পিছন থেকে তীব্র গলায় ডাকলেন, “থামো!”

সে থামল না।

করিডরটা আধো আলো। ওপরে দোয়ার শব্দ ভেসে আসছে। আয়নার সামনে এসে মাহিরা দেখল নিজের ছায়া—ক্লান্ত মুখ, খাতার ধার, মুঠোয় চাবির ধাতব ঝিলিক। ঠিক দরজার চৌকাঠ আর আয়নার সরু সীমার মধ্যে তানভীর এসে সামনে দাঁড়াল। পিছনে নয়, একেবারে রেখার উপর। এবার তার হাতে কোনো ফোন নেই, আলো নেই; শুধু সিঁড়ির নিচের হলুদ বাতি।

“রেজিস্টারটা দিন,” সে বলল।

মাহিরা খাতা আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। “না।”

এক মুহূর্তেই বাতাস বদলে গেল। এ না শুধু খাতার জন্য, চাবির জন্য, বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নয়—সে তার অধিকারও অস্বীকার করছে। তানভীরের কাঁধ শক্ত হল। “এভাবে বেরোতে পারবেন না।”

“পারব।” মাহিরার গলা কাঁপল, কিন্তু কথা ভাঙল না। “দিনভর কাজ করাইছেন, সামনে দাঁড় করাইছেন, এখন খালা অপমান করবে আর আপনি আবার এখানেও থামাবেন? দরজা ছাড়েন।”

সে বাঁ পাশ দিয়ে কাটিয়ে যেতে চাইল। তানভীর হাত তুলল—এই সেই বিপজ্জনক সীমানা—কাঁধ ছোঁয়া, বাহু ধরা, কিংবা চৌকাঠ বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু সে মাহিরার গায়ে হাত দিল না। তার হাত এসে থামল মাহিরার পথের এক চুল আগে, তারপর নেমে গেল রেজিস্টারের দিকে।

“না,” মাহিরা আরও তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, পিছু না হটে। “এই খাতা আমি মিলিয়ে দেব। চাবিও আমি দেব। আপনার নামে না, কাজের হিসেবে। কারও দয়ায় না।”

কথাগুলো করিডরের সরু দেয়ালে লেগে খসখসে হয়ে ফিরল। তানভীর তাকিয়ে রইল। খুব কাছে। মাহিরা তার নিঃশ্বাস শুনতে পেল, নিজেরটাও। আয়নায় তাদের দুজনকে দেখা যাচ্ছে না পুরোপুরি; শুধু কাঁধের রেখা, খাতার কালো মলাট, আর মাঝখানের ফাঁক।

তারপর তানভীর এমন কিছু করল, যা সে না করলে সহজ হতো। সে এক ধাপ পিছিয়ে গেল। আগে সে-ই। চৌকাঠ খালি করল, কিন্তু সরে গিয়ে পথ ছেড়ে দেওয়ার মতো নয়; বরং সেই ফাঁকটাকে স্পষ্ট করে তুলল। হাত বাড়িয়ে বলল, “চাবি।”

মাহিরা সন্দেহে জমে গেল। সে চাবি দিল না।

তানভীর নিজের পকেট থেকে ছোট লোহার আলমারির অতিরিক্ত চাবিটা বের করল। তারপর ধীরে, একেবারে ধীরে মাহিরার মুঠোর দিকে না গিয়ে, তার বগলের খাতার ওপর আঙুল ছোঁয়াল না ছোঁয়াল অবস্থায় থেমে বলল, “এইটা আপনার কাছে থাক। নগদ মিলবে, সিল দেবেন, আলমারি বন্ধ করবেন। কাল সকালেও আপনি খুলবেন।”

মাহিরা নড়ল না। রুবিনা খালার পায়ের শব্দ দূরে, কিন্তু আসছে না; হয়তো সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে। তানভীর এবার রেজিস্টারের নিচে তার হাত ঢুকালও না, কেবল নিজের হাতের চাবিটা খাতার ওপর রাখল। ধাতুর ঠান্ডা শব্দ হল। তারপর তার অন্য হাত উঠল—মাহিরার গালের কাছে নয়, ওড়নার কিনারার কাছে নয়, বাতাসে—যেন কিছু ঠিক করবে। এক নিঃশ্বাস। সেই হাত থেমে গেল মাঝপথে। সে হাত নামিয়ে নিল।

“কাজের জিনিস,” সে বলল, গলা নিচু, কঠিন। “কাজের মানুষকেই থাকবে।”

এতটুকুই। না ক্ষমা, না স্বীকারোক্তি, না মালিকের ভঙ্গি। কিন্তু কথাটা মাহিরার গায়ে হাতের চেয়েও গভীরভাবে লাগল, কারণ এই বাড়িতে তাকে এতদিন কাজের সময় দরকার, মুখের সময় অদৃশ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। আর সে তা দেখেছে—ঠিক কতখানি।

মাহিরা ধীরে ধীরে নিজের মুঠো খুলল। তার চাবির গোছা আর তানভীরের বাড়তি চাবি একই খাতার ওপর ঠেকল। সে খাতা সরিয়ে নিজের বুকে টেনে নিল, যেন জিনিস নয়, সিদ্ধান্ত। “আমি তালা দিয়ে যাব,” বলল।

“হ্যাঁ,” তানভীর বলল।

আর কিছু নয়। সে আবার এক পা পিছোল। এবার পুরো রাস্তা ফাঁকা। মাহিরা তার পাশ কেটে গেল। গায়ে গা লাগল না। লাগতে পারত। হয়নি।

তানভীর প্রথমে ঘুরে দাঁড়াল, করিডরের আলো তার কাঁধ কেটে দুই ভাগ করল। তারপর সে সিঁড়ির ছায়ার দিকে সরে গেল।

আয়নার রেখায় মাহিরার শ্বাস লেগে ম্লান কুয়াশা উঠল; নিচু কোথাও চাপা পড়ে থাকা ফোনের পুরনো আলো না থাকলেও কাচে হালকা ছায়া জমে সেই ধোঁয়াটে দাগ এক মুহূর্ত স্থির রইল, আর মাঝের কাটা বাতাস আলাদা হয়েই থাকল।