শেষ ধাপের আগেই থামল
“ওপরে এখন দাঁড়িয়ে থাকো,” নাঈমা আপা হাতের খামটা মেহজাবিনের বুকের দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, তারপর একই দরজার ভেতর দিয়ে হালকা শাড়ি-পরা এক মেয়েকে ডেকে নিলেন, “তুমি আসো মা, ভিতরে বসো।” সিঁড়ির মাথার ছোট ল্যান্ডিংয়ে মেহজাবিন থেমে রইল, হাতে আধাভাঁজ করা রসিদ, কাঁধে সার-ও-বীজের হিসাবের ব্যাগ, আর নিচে অফিসঘর থেকে উঠে আসা ধুলো-মেশানো কৃষির গন্ধ। প্লাস্টিকের চেয়ারটা দরজার পাশে খালি ছিল, তবু তাকে বসতে বলা হল না। ঢাকার এই পুরনো বাড়িতে সে তিন বছর ধরে হিসাব গুছিয়েছে, ফোন ধরেছে, মালামালের বাকি তুলেছে; তবু উপরের ফ্ল্যাটে তার জায়গা আজও দোরগোড়ার বাইরে। ভেতর থেকে থালার শব্দ, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার চাপা হাসি, আর নাঈমা আপার গলা—“ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে হলে ঘরদোরও তো বুঝতে হয়”—শুনে মেহজাবিন রসিদের কোণা আরও শক্ত করে ভাঁজ করল।
ঠিক তখনই নিচ থেকে রিদওয়ান উঠে এল। সাদা পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখে ক্লান্তি, এক হাতে ফোনের আলো তালুর ভেতর চাপা। সে প্রথমে ভেতরের খোলা দরজাটা দেখল, তারপর মেহজাবিনকে। খুব সামান্য, কিন্তু স্পষ্ট—এক পা বাড়িয়ে দরজার দিকে গিয়েও থেমে গেল। “হিসাবটা?” তার গলা নিচু। মেহজাবিন খামটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে সরে দাঁড়াল; তাদের আঙুলের মাঝখানে এক আঙুল পরিমাণ ফাঁক রইল। ভেতর থেকে নাঈমা আপা তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “রিদওয়ান, অতিথির সামনে অফিসের কথা এখন না।” সে খাম নিল না। শুধু একবার মেহজাবিনের হাতে ধরা রসিদের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন ভেতরের লোকজনের চেয়ে ওটাই তার জরুরি। তারপর সরে গেল। ফাঁকটা না ছুঁয়েও জ্বলে উঠল।
নিচের অফিসঘর আর ওপরের ফ্ল্যাটের মাঝের সিঁড়িটা যেন সারা দিন তাদের শাস্তির জায়গা হয়ে রইল। দুপুরে নাঈমা আপা নিচে লোক পাঠালেন—উপরের ডাইনিংয়ে পেঁয়াজ কম পড়েছে, বাজারের বিলও নিতে হবে। মেহজাবিন ব্যাগ থেকে খুচরা টাকা, কাগজে মোড়া পেঁয়াজের রসিদ, আর পাতলা পলিথিনের শুকনো খসখস শব্দ নিয়ে ওপরে উঠল। দরজায় পৌঁছাতেই ভিতর থেকে খালাম্মার গলা, “ওকে দাও, ভেতরে আনো না। মেয়েপক্ষ বসে আছে।” মেহজাবিন থালাবাটি-ভরা ট্রের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে একপাশে সরে দাঁড়াল।
রিদওয়ান তখনই ভেতর থেকে বেরোচ্ছিল। দুজনের মধ্যে সিঁড়ির বাঁকে এত কম জায়গা যে কারও না কারও গা ছুঁয়ে নামতেই হতো। মেহজাবিন পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে নিচে নামার পথ ছেড়ে দিল। রিদওয়ানও নামল না। তার ডান হাত রেলিংয়ে, বাম হাতে ট্রের এক কোণা সামলে রাখা চাচাতো বোনকে আগে যেতে দিল। সেই ফাঁকে তার কাঁধ মেহজাবিনের ওড়নার কাছ ঘেঁষে থেমে রইল, স্পর্শ হলো না। চাচাতো বোনটা নেমে গেলে সে নিঃশব্দে বলল, “তুমি দুপুরে খেয়েছ?” প্রশ্নটা এমন, যেন নিচে অফিসঘরের ত্রৈমাসিক হিসাবের চেয়েও গোপন। মেহজাবিন ঠান্ডা মুখে বলল, “আমার খাওয়া নিয়ে আপনারা ভাববেন না।” কিন্তু সে নামতে গিয়ে বুঝল, রিদওয়ান সরে দাঁড়াতে দেরি করেছে এক শ্বাসের সময়। এই দেরিটাই বাড়িতে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস।
বিকেলে আরেকবার। নাঈমা আপা নিচে নেমে হিসাবখাতায় ভুল ধরলেন সবার সামনে। “মেহজাবিন, তুমি খুব ভালো কাজ করো, কিন্তু সীমা বুঝতে হয়। অফিসের কাগজ উপরে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল?” ভুলটা তার নয়; সকালে নিজেই খাম ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তবু তিনি এমনভাবে বললেন, যেন মেহজাবিন সিঁড়ির চেয়ে বেশি কোথাও উঠতে চাইছে। পাশের দোকানের ছেলেটা মাথা নিচু করে হাসি চাপল। মেহজাবিন উত্তর দিল না। খাতাটা টেনে নিজের দিকে নিল, ভুলটা লাল কালিতে ঘুরিয়ে দেখাল—তার লেখা নয়, রিদওয়ানের। নাঈমা আপা এক সেকেন্ড থমকালেন, তারপর গলা নরম না করেই বললেন, “ঠিক আছে, এবার এটা তুমি নিজে পৌঁছে দাও। ও উপরে আছে।” শাস্তি দেওয়ার ভঙ্গিতেই যেন আবার তাকে সেই দরজায় পাঠালেন।
ওপরের বসার ঘরে তখন মেয়েপক্ষ উঠে যাচ্ছে। জুতো, শাড়ির ঘর্ষণ, আতর, দুধচায়ের গন্ধে ভরা। মেহজাবিন খাতাটা বুকে চেপে দোরগোড়ায় থামতেই খালাম্মা বললেন, “থাক, বাইরে দাও।” কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ভিতর থেকে নাঈমা আপার নাতনি ছুটে এসে গরম চায়ের কাপ উলটে দিল কার্পেটের ধারে। খালাম্মা চমকে সরে গেলেন, কাজের মেয়েটা তখন রান্নাঘরে। মেহজাবিন স্বভাবমতো এগিয়ে গেল—এই বাড়ির সব বিপদে শেষ পর্যন্ত তাকেই ডাক পড়ে। “না, না—” খালাম্মা বলতে না বলতেই নাঈমা আপা ঘুরে দাঁড়ালেন।
যেটা কখনও হয় না, সেটাই হলো। নাঈমা আপা এক টানে মেহজাবিনের কব্জি চেপে তাকে দোরগোড়া পার করালেন, “ওখানে জল ঢালো—এখনই।” টানটা তাড়াহুড়োর, কিন্তু চোখের ভেতর হিসাব ছিল। যেন এই এক মুহূর্তে তিনি নিজেই নিয়ম ভাঙছেন, শুধু কারণ নিয়মের চেয়ে ক্ষতি বড়। মেহজাবিন হাঁটু গেড়ে দাগ মুছতে লাগল। কার্পেটের কিনারায় চায়ের রঙ ছড়িয়ে যাচ্ছে, আর সে অনুভব করল, ঘরের সবাই তাকে দেখছে—কাজের মেয়ে বলে নয়, বাইরে রাখা কেউ হঠাৎ ভিতরে ঢুকে গেছে বলে। রিদওয়ান পাশ থেকে এক বাটি পানি বাড়িয়ে দিল; তাদের হাতের ফাঁক অর্ধেক শ্বাসের মতো। নাঈমা আপা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “হয়ে গেছে, এবার বের হও।” কব্জিতে তাঁর আঙুলের চাপ তখনও গরম।
এই ব্যতিক্রমটাই বিপদ ডেকে আনল। সন্ধ্যার পর নিচের অফিসঘরে খালাম্মা নাঈমা আপাকে নিচু গলায় বলছিলেন, “মেয়েপক্ষ দেখেছে তো? আপনার অফিসের মেয়েকে আপনি নিজে ধরে ভেতরে নিলেন।” জবাবে নাঈমা আপার স্বর আরও নিচু, আরও ধারালো, “একটা দাগ বাঁচাতে যা করতে হয় করেছি। তার মানে এই না যে কে কোথায় বসবে ঠিক নেই।” মেহজাবিন ফাইল সাজাতে সাজাতে শুনল, আর বুঝল—আজ থেকে তাকে শুধু তুচ্ছ করা হবে না, নজরও রাখা হবে। উপরের দরজায় ঢোকার অনুমতি যে একবার বদলেছে, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা চোখ সেটা ধরে ফেলেছে।
রাতের খাওয়া শেষ হতে হতে বাড়ির ভেতর চাপা জট পাকিয়ে গেল। রিদওয়ানের সম্ভাব্য সম্বন্ধের লোকেরা চলে গেছে, কিন্তু খাওয়ার টেবিলে তার জন্য যে জায়গা রাখা হয়েছিল, পরে সেটা ফাঁকা পড়ে ছিল। নাঈমা আপা নিচে নেমে মেহজাবিনকে বললেন, “আজকের নগদের ব্যাগটা তুমি নিয়ে উপরে দেবে। আর দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবে। দাঁড়াবে না।” কথাটা হুকুমের চেয়ে বেশি পরীক্ষা। যেন দেখতে চান, মেয়ে সীমা বুঝে কি না; অথবা আরও খারাপ, কে কাকে দেখে থামে।
ব্যাগটা হাতে নিয়ে মেহজাবিন সিঁড়ি উঠল। পাতলা কাগজে মোড়া টাকার গোছা নড়ে শুকনো শব্দ করছিল। ল্যান্ডিংয়ের বাল্বটা আধমরা, দেয়ালে দিনের গরম আটকে আছে। ওপরতলা থেকে আজ আর হাসির শব্দ নেই; শুধু বাসন ধোয়ার ধাতব ঠোকাঠুকি আর দূরে আজানের শেষ টান। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল না। নাঈমা আপা নিজেই বলেছিলেন, দিয়ে নেমে আসতে। কিন্তু দরজা আধখোলা, ভেতরে বসার ঘর অন্ধকার, করিডরের শেষে রিদওয়ানের ঘরের আলো।
“এদিকে,” রিদওয়ান বলল ভেতর থেকে। গলায় ক্লান্তির সঙ্গে আরেকটা কিছুর ঘষা। মেহজাবিন দরজার ভেতর না গিয়ে ল্যান্ডিংয়েই দাঁড়াল। “ব্যাগটা নিন।” সে হাত বাড়াল, কিন্তু পুরোটা নয়; ব্যাগ ঝুলে রইল মাঝখানে। রিদওয়ান এগিয়ে এল। আজ তার পাঞ্জাবির বদলে সাদামাটা শার্ট, গলার বোতাম খোলা, চোখের নিচে ছায়া। নিচে বাড়ির সবাই আছে, তবু এই আধখোলা দরজার আড়ালটুকু সবচেয়ে ঝুঁকির।
সে ব্যাগ নিতে গিয়ে থামল। “আজ তোমাকে ভেতরে টানা হলো, দেখলাম,” বলল। মেহজাবিনের মুখে হাসি এল না। “দাগ বাঁচানোর জন্য। মানুষ বাঁচানোর জন্য না।” রিদওয়ানের চোয়াল শক্ত হলো। “তবু টানা হয়েছে।” তার এই একগুঁয়ে কথার ভেতর এমন মনোযোগ ছিল, যেন সারা দিনকার অপমান, সম্বন্ধ, খাওয়া-দাওয়া সব মুছে গিয়ে ওই এক মুহূর্তে এসে আটকে আছে। “তুমি সারাদিন দাঁড়িয়ে ছিলে,” সে বলল, “কেউ তোমাকে বসতে বলেনি।”
“এই বাড়িতে আমাকে বসতে বললে আপনার মায়েরই মুখ পুড়বে,” মেহজাবিন নিচু স্বরে জবাব দিল। “আপনার না।”
নিচে থালার শব্দ থামল। কারও পায়ের আওয়াজ উঠছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, তবু দুজনেই শুনতে লাগল। রিদওয়ান হাত বাড়িয়ে ব্যাগ ধরল, কিন্তু ছাড়ল না। ব্যাগের মুখ দুজনের হাতের মাঝে টানটান। “তুমি চাইলে চলে যেতে পারো,” সে বলল, “অন্য অফিসে কাজ—”
মেহজাবিন তার কথা কেটে দিল, “আমি ভিক্ষা নিতে আসিনি।” এক টানে ব্যাগ ছেড়ে দিল। রিদওয়ান সামান্য সামনে দুলে উঠল। তাদের মধ্যে দূরত্ব কমে গেল এক অর্ধপা। এই বাড়ির সিঁড়িতে এর চেয়ে বেশি কাছে আসা মানেই অন্য মানে।
নিচ থেকে নাঈমা আপার ডাক ভেসে এল, “রিদওয়ান? নগদটা পেলি?” গলায় এমন সোজা ভর, যেন তিনি শুধু টাকা নয়, ফাঁকও গুনছেন। রিদওয়ান জবাব দিল না। সে একধাপ নেমে ল্যান্ডিংয়ে এল, দরজার ভেতর আর সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়াল। মেহজাবিন বুঝল—এখন সরে গেলে সে আবার সেই আগের জায়গায় নামবে, যেখানে তাকে শুধু দরজার বাইরে রাখা হয়। আর যদি দাঁড়ায়, বাড়িটা এই দাঁড়িয়ে থাকাকেও পড়ে ফেলবে। দুই দিকেই খরচা আছে।
রিদওয়ান খুব আস্তে বলল, “আজ যদি আমি বলি, ভেতরে এসে বসো?”
এটাই ছিল সবচেয়ে খারাপ প্রস্তাব। কারণ এটা তার হাতে নয়, তার নামে আসবে; আর কাল সকালে সেই নামই তার বিরুদ্ধে যাবে। মেহজাবিন চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। এতদিন সে রিদওয়ানের দৃষ্টি টের পেয়েছে—হিসাবের পাতায় ঝুঁকে থাকা, দুপুরে না খাওয়ার প্রশ্ন, সরে দাঁড়াতে দেরি—কিন্তু আজ সেটা আরও সরু হয়ে শুধু তার ওপর এসে ঠেকেছে। যেন এই ল্যান্ডিংয়ের অর্ধেক আলোয় সে ছাড়া আর কিছু নেই। এই মনোযোগই পুরস্কার, আবার ফাঁদও।
নিচে আবার ডাক পড়ল, এবার একটু জোরে। বাড়ির বাতাস টান খেল। মেহজাবিন এক পা বাড়াল। রিদওয়ানের বুক যেন উঠল। দরজার ভেতর যেতে তার আর এক ধাপ লাগবে, এর বেশি না। সে হাতও তুলল—রিদওয়ানকে ছুঁতে নয়, তার পাশ কেটে ঢোকার সেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেভাবে মানুষ সংকীর্ণ জায়গা পার হয়। ঠিক তখনই সে থেমে গেল।
“না,” মেহজাবিন বলল না; শব্দ করলে ব্যাপারটা ছোট হয়ে যাবে। সে নিজের অগ্রসর শরীরটাকে মাঝপথে আটকাল। এক হাত সিঁড়ির রেলিং শক্ত করে ধরল, আঙুলে লোহা ঠান্ডা। অন্য হাত উঠেই থেমে রইল রিদওয়ানের বাহুর কাছাকাছি, স্পর্শের এক চুল আগে। তার শরীর সামনের দিকে, কিন্তু পা আর বাড়ল না। দরজার ভেতরও নয়, পুরো নিচেও নয়—অর্ধপায়ে থামা এক নিষ্ঠুর জায়গা।
এই থামাটাই ওর ছিল। কারও অনুমতি নয়, কারও ডাকা নয়, কারও দয়া নয়। যদি ঢোকে, সে তাদের বানানো গল্পে ঢুকবে। যদি পালায়, তারা বলবে সীমা বুঝেছে। সে কোনোটাই নিল না। রিদওয়ানের সামনে, তার মা শোনা যায় এমন দূরত্বে, সে শুধু সেই দূরত্বটাই নিজের হাতে ধরে রাখল—যেটা সবার জন্য নিয়ম, কিন্তু তার জন্য অন্য রকম আগুন।
নিচ থেকে তৃতীয়বার ডাক ওঠার আগেই মেহজাবিন শরীর ঘুরিয়ে নিল। পুরোপুরি না; শুধু এতটুকু, যেন রিদওয়ানের পাশ দিয়ে যাওয়ার পথ খুলে থাকে, অথচ সে পথে সে যায় না। রেলিং ধরা হাতের গাঁট সাদা হয়ে উঠল। অন্য হাত, যা এক মুহূর্ত আগে উঠেছিল, বাতাসে থেমে থেকে ধীরে ধীরে নেমে এল—স্পর্শের আগে কাটা পড়া গতির মতো।
সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে লোহার রেলিংয়ে তার মুঠো শক্ত, আর অন্য হাতটি রিদওয়ানের দিকে থেমে আছে—অর্ধপা দূরে, ছোঁয়ার ঠিক আগে।