শেষে কাজটা আমার হাতেই এলো
চতুর্থ ট্রাকটা বে-দরজার সামনে কাত হয়ে দাঁড়াতেই মাহিন হাত তুলে চিৎকার করল, “ওইটা তিন নম্বর লাইনে, এখনই!” কিন্তু মার্কারটা ছিল রাশেদ সুপারভাইজারের হাতে; সে কাগজে গোল দাগ টেনে উল্টো এক নম্বর বে খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আলুর প্যালেট ঠেলে আনা ট্রলিটা মাঝরাস্তায় আটকে গেল, পেছনে কাঁচা টমেটোভর্তি দুইটা ভ্যান ধাক্কা খেয়ে থেমে দাঁড়াল, আর ভোরের আর্দ্র বাতাসে পচা পেঁয়াজ, ডিজেল আর কাঁচা ধনেপাতার গন্ধ একসাথে ঘনীভূত হয়ে উঠল।
মাহিন তখনও আসল কাজটাই করছিল—ড্রাইভারের নাম মিলিয়ে, জেলার হিসাব মাথায় রেখে, কোন মাল আগে নামলে কম নষ্ট হবে সেটা ধরে ধরে লেন খুলে দিচ্ছিল। অথচ তার গলায় ঝুলে থাকা কুঁচকে যাওয়া পরিচয়-ফিতেটা শুধু গুদাম-সহকারী। ডিসপ্যাচ টেবিলের চেয়ারটা রাশেদের নিচে। টেবিলের কিনারায় ঠাসা খাতা, ভেজা স্ট্যাম্পপ্যাড, মোবাইল চার্জার, এক কাপ চা পড়ে আছে; অনেকক্ষণে তার ওপরে সর জমে বৃত্ত রেখে দিয়েছে। মাহিন হাত বাড়াতেই রাশেদ তার কবজি ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল।
“তোর এত তাড়া কিসের?” রাশেদ মুখ না তুলেই বলল, “চেয়ার আছে, নিয়ম আছে। তুই লাইনে দাঁড়াস।”
নিয়ম কথাটা শুনে পাশের গেট-চেকার মিলন মুখ নিচু করল। কারণ সবাই জানে, গত তিন মাস এই ভোরবেলার বে চালিয়েছে মাহিনই; রাশেদ তখন অফিসঘরে বসে ফোন কানে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকজনকে বলে বেড়িয়েছে, “আমি না থাকলে এখানে নড়াচড়া হয় না।” আজ জেসমিন আপা নিজে এসে দাঁড়িয়েছেন—রাশেদের খালা-শাশুড়ি দিকের আত্মীয়া, যিনি মালিকপক্ষের সঙ্গে নাম ধরে কথা বলেন। তাঁর সামনে মাহিনকে নিচে নামিয়ে রাখা আরও সুবিধার।
মাহিন এক মুহূর্ত রাশেদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার অপ্রত্যাশিত কাজটা করল—ডিসপ্যাচ টেবিলের ডানদিকে ছোট স্টুলটা টেনে নিজের দিকে নিল, বসে না, কেবল খাতার ফাঁকা পাতায় দ্রুত তিনটা লাইনের নতুন ক্রম লিখে মিলনের হাতে ধরিয়ে দিল। “যে ট্রাক আগে নষ্ট হবে, ওটা আগে ঢুকবে। আমি না বললে তিন নম্বর দরজা খোলবি না।” কথাটা রাশেদকে না, মিলনকে শোনাল।
এটাই ছিল প্রথম ফাঁক। চেয়ার না পেলেও কাজের ক্রম মাহিনের হাত দিয়ে বেরোল। মিলনের আঙুল কাগজটা ধরে শক্ত হয়ে গেল; সে রাশেদের দিকে তাকাল, আবার কাগজের দিকে। রাশেদ সেটা দেখে ঠোঁট বাঁকাল, যেন স্টুল টেনে বসা মানেই দুঃসাহস।
পাঁচ মিনিটও গেল না, বিপদ চোখে দেখা গেল। রাশেদ সাব্বিরের কুমিল্লার ট্রাকটা আগে ছাড়ল, কারণ লোকটা তাকে “ভাই” বলে সিগারেট ধরিয়ে দিয়েছিল। ফলে পেছনে থাকা শেরপুরের বেগুনের চালান রোদ উঠার আগেই নামানো গেল না। সাব্বির ট্রাক ঘোরাতে গিয়ে প্যালেটের কোণা গেটের পিলারে ঠুকে দিল। বাঁশের খাঁচা ছিঁড়ে টমেটো গড়িয়ে পড়ে লাল থকথকে হয়ে গেল সিমেন্টে। ড্রাইভাররা একসাথে গালাগাল শুরু করল।
“এই ছাড়াটা কে দিল?” সাব্বির গলা ফাটিয়ে উঠল।
রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে মাহিনের দিকে দেখাল। “ও তো সারাক্ষণ মুখ চালায়। ড্রাইভারদের কনফিউজ করছে।”
মিথ্যেটা এত সহজে ছুড়ে দিল যে জেসমিন আপাও এক পা এগিয়ে এলেন। ওড়নার কিনারা নাকের কাছে ধরে বললেন, “মাহিন, কাজ শিখে করো। রাশেদ তো উপরে কথা বলে, তোমরা নিচের লোকজন ঝামেলা বানাও কেন?”
নিচের লোকজন। কথাটা আশেপাশের সবার কানে গেল। মাহিন কিছু বলল না। সে শুধু সিমেন্টের ওপর চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া টমেটোর দিকে তাকাল, তারপর সাব্বিরকে বলল, “পেছনের দুটো চাকা সোজা করো। আরেক হাত ডানদিকে নাও। এখন ছাড়লে আরও লাগবে।”
রাশেদ ফোঁস করে উঠল, “তুই চুপ! আমার চ্যানেলে কথা বলবি না।” সে বেল্টে ঝোলানো ওয়াকিটা নিজের বুকে টেনে নিল। ওইটাতেই বে-ছাড়া, লেন খোলা, রিসিভিং-চেক—সব একসাথে যায়। মাহিনের কাজ করতে হলে ওই শব্দের ভিতরে ঢুকতে হয়; রাশেদ তাকে শব্দের বাইরে ঠেলে রেখেছে।
কিন্তু লাইন ততক্ষণে লম্বা হয়ে গিয়েছে। বে-র পেছনের সরু রাস্তায় ট্রাকের মাথা গুঁজে আছে, কেউ ডিজেল বন্ধ করতে পারছে না, কেউ নামতেও পারছে না। কাঁচা শাকের গায়ে ধুলো বসছে। দূরে আজানের শেষ ধ্বনি মিলিয়ে যেতেই এক বৃদ্ধ পাইকার, সাদা টুপি পরা, উঁচু গলায় বললেন, “ঢাকায় এসে মাল পচাবি নাকি? ফজরের আগে ঢুকলে দাম পাই, পরে পাই না।”
জেসমিন আপার মুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি রাশেদের দিকে ঝুঁকে চাপা গলায় বললেন, “আজ কিন্তু মালিকের ভায়রাও আসবে। মুখ রাখো।”
মুখ রাখার জন্যই রাশেদ আরও খারাপ ভুল করল। সে চতুর্থ বে খুলে দিল, অথচ ভেতরে আগের খালি প্যালেট সরানো হয়নি। একসাথে দুই ট্রলি ঠেলে ঢুকতেই লোহার চাকা আটকে গেল রেলের ফাঁকে। সামনের ট্রলি বেঁকে দরজার মুখে আড়াআড়ি হয়ে রইল, পেছনেরটা তার গায়ে চেপে বসল। মুহূর্তে পুরো লেন বন্ধ। কেউ ঢুকতে পারছে না, কেউ বেরোতেও না। ভেতর থেকে চিৎকার, বাইরে হর্ন, মাঝখানে ধাতব ঘর্ষণের কানে কাটা শব্দ।
“ধরো! ঠেলো!” রাশেদ চেঁচাল, কিন্তু কী ধরে কী ঠেলতে হবে তার হদিস তার নিজেরই নেই। সে ওয়াকিতে এলোমেলো নির্দেশ দিতে লাগল—“দুই নম্বর থামাও—না না, তিনে নাও—আরেকটা ব্যাক করাও”—ফলে পেছনের ট্রাকটাও উল্টো অর্ধেক ঘুরে ক্রসলেনে মাথা ঢুকিয়ে দিল।
এবার কেউ রাশেদের দিকে না, মাহিনের দিকে তাকাল। মিলন প্রথম। তারপর সাব্বির। তারপর সেই সাদা টুপি বৃদ্ধ। তাদের দৃষ্টি ছিল একরকম—যে পারে, সে করুক।
মাহিন তখনই নড়ল। সে রাশেদের হাত থেকে ওয়াকি কাড়ল না; আগে দৌড়ে গিয়ে ট্রলির জ্যাম ধরা সামনের চাকা হাঁটু দিয়ে চেপে ধরল, বাঁ হাত দিয়ে লোহার পিন টেনে খুলল, ডান কাঁধ দিয়ে আড়াআড়ি হয়ে থাকা ট্রলিটাকে এক ধাক্কায় সরাল। লোহার ঠক্ শব্দে রেল ফাঁকা হতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, “পেছনেরটা থামাও! সাব্বির, এখন—এখন ব্যাক না, সোজা!” তারপর রাশেদের বুকের সামনে ঝুলে থাকা ওয়াকিটা ধরে মুখের কাছে টেনে শুধু বলল, “চার নম্বর বন্ধ। তিন নম্বর খুলো। শেরপুর আগে। সবাই শুনে নাও।”
ওয়াকির ভেতর শুকনো ঝাঁঝালো শব্দ উঠল, তারপর ভিতর থেকে কে যেন উত্তর দিল, “শুনছি।”
এক মিনিটের কম সময়ে ট্রলির মুখ সোজা হয়ে গেল। জ্যাম ভাঙতেই বে-র জমে থাকা শ্বাস যেন বেরিয়ে এলো। শেরপুরের বেগুন ঢুকল, ভাঙা টমেটো সরিয়ে পানি ঢালা হলো, পেছনের দুই ট্রাক ক্রম পেল। রাশেদ দাঁড়িয়ে রইল ঠিক ডিসপ্যাচ টেবিলের সামনে, কিন্তু কেউ তার দিকে নির্দেশের জন্য ফিরল না। মাহিনের কাঁধে ঘাম, কনুইতে টমেটোর লাল দাগ, তবু তার গলা সমান।
এই সাময়িক হাতবদলটা রাশেদের জন্য অপমান ছিল। অপমান ঢাকতে সে সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে ফিরে গিয়ে ডিসপ্যাচ খাতা নিজের দিকে টেনে নিল, যেন কিছুই হয়নি। “ঠিক আছে, এখন আমি বসছি,” সে গলা ঝেড়ে বলল, “ও তো শুধু ঠেলাঠেলি জানে। ক্রম আমি দেব।”
মিলন ইতস্তত করল। সাব্বির নিচু গলায় বলল, “ভাই, এই ক্রম পাল্টাইলে আবার লাগবে।”
রাশেদ শুনেও শুনল না। জেসমিন আপা তখন খুব কাছে এসে দাঁড়ানো। রাশেদ তাঁকে শোনানোর মতো করেই বলল, “নিচের ছেলেরা দুইটা কাজ করলেই ভাব নেয়। ডিসপ্যাচ টেবিল খেলনা না।”
সে খাতায় নতুন দাগ টেনে ফরিদপুরের চালানকে সামনে আনল, যদিও ওটার মাল শক্ত—আরও আধঘণ্টা দাঁড়ালেও ক্ষতি কম। তার মানে আবার শাক-সবজির গাড়ি অপেক্ষা। মাহিন দেখল, শেরপুরের পরেই রাখা কাঁচামরিচের ভ্যানটা রোদ ধরলে অর্ধেক বসে যাবে। সে বলল, “ওটা এখনই লাগবে।”
“তুই আদেশ দিবি?” রাশেদ এবার পুরো বে শুনতে পায় এমন গলায় বলল, “তোর নামে কি চেয়ার বরাদ্দ আছে?”
জেসমিন আপার চোখে ঠান্ডা কৌতুক। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা জায়গায় এ ধরনের প্রশ্ন মানুষকে কাজের চেয়ে ছোট করে দেয়। মাহিনের গলায় ঝুলে থাকা পুরোনো ফিতা, টেবিলের পাশে তার দাঁড়িয়ে থাকা, আর রাশেদের নিচে চেয়ার—চিত্রটা খুব স্পষ্ট।
তারপর দ্বিতীয় ভাঙনটা এল, আগের চেয়ে খারাপ। রাশেদ ফরিদপুরের ট্রাকটাকে এক নম্বর বে-তে ঢোকাতে বলে ভেতরের র্যাম্প না দেখে সিগন্যাল দিল। র্যাম্পের কাঠের ঠেকনা তখনও বসানো হয়নি। সামনের চাকা উঠেই কাত হয়ে গেল; পেছনের প্যালেট দুলে দুটো কলাভর্তি ক্রেট নিচে আছড়ে পড়ল। হলুদ কলা মেঝেতে ছিটকে গেল, এক ট্রলি হেলে দরজার মুখে আটকে রইল, আর একসাথে তিন লাইনের গতি মরে গেল। এবার আর কেউ গালাগালিও দিল না; সবাই থেমে গেল সেই ভয়ংকর অর্ধেক-সেকেন্ডের জন্য, যখন বোঝা যায় এখন যদি ঠিক লোক না ধরে, পুরো সকাল নষ্ট।
রাশেদের মুখের রং বদলে গেল। সে ওয়াকিতে বলল, “এক নম্বর—এক নম্বর—” কিন্তু পরের শব্দ বেরোল না। কারণ এক নম্বর, দুই নম্বর, তিন নম্বর—সবাই একই জ্যামে জড়িয়ে গেছে।
মাহিন ধীরে ধীরে ডিসপ্যাচ টেবিলের দিকে হাঁটল। তার জুতোর নিচে থেঁতলানো কলা লেপটে যাচ্ছে। সে টেবিলের কাছে গিয়ে হাত বাড়াল। “মার্কারটা দিন।”
রাশেদ এক পা পেছালেও মার্কার ছাড়ল না। “আমি সামলাই।”
মাহিন এবার আর পাশ থেকে সমাধান দিল না। তার গলা নিচু, কেটে কেটে বেরোল। “পাশ থেকে কাজ বলে দেব না। দিলে আমার কথাই চলবে।”
কেউ কথা বলল না। শুধু ভেতর থেকে র্যাম্পে আটকে থাকা ধাতব খাঁচার ঠং ঠং শব্দ। জেসমিন আপা এবার রাশেদের দিকে তাকালেন; সেই দৃষ্টিতে প্রথমবার রাগের চেয়ে ভয় বেশি। মুখরক্ষা আর হচ্ছে না।
রাশেদ শেষ চেষ্টা করল। ওয়াকি তুলে চেঁচিয়ে উঠল, “সবাই দাঁড়াও, কেউ নড়বা না—”
সঙ্গে সঙ্গে পেছনের লাইনে আরেকটা ট্রাক হর্ন বাজিয়ে উঠে এল; থামার জায়গা না পেয়ে তার পেছনের বাম্পার কাঁচামরিচের ভ্যানের সিঁড়িতে ঠুকে দিল। সবুজ ঝুড়ি কেঁপে উঠল। দৃশ্যটা এতটাই প্রকাশ্য ক্ষতি যে রাশেদের গলা নিজে থেকেই ভেঙে গেল।
মিলন তখন এগিয়ে এসে বলল না “ভাই”, বলল, “মার্কারটা দেন।” সে হাত বাড়িয়ে রাশেদের কাছ থেকে না নিয়ে, টেবিলের ওপর রাখা লাল মোটা কলমটা তুলে মাহিনের দিকে ধরল। সাব্বির ডিসপ্যাচ খাতাটা ঠেলে দিল মাহিনের সামনে। চেয়ারটা ফাঁকা হয়নি; মাহিন নিজেই হাত দিয়ে সেটাকে এক ইঞ্চি সরিয়ে টেবিলের মাথায় বসল। এটাই ছিল আসল বদল—চেয়ার, খাতা, মার্কার, চ্যানেল, সব একসাথে তার দিকে।
সে খাতা খুলে দ্রুত তিনটা নাম কাটল, নতুন করে লিখল—শেরপুর শেষ, এখন নারায়ণগঞ্জ মরিচ, তারপর মানিকগঞ্জ কলা উদ্ধার, ফরিদপুর অপেক্ষা। নিচে মোটা দাগ টেনে মিলন, সাব্বির, হেলাল—তিনজনের নাম পাশে বসাল। কাজ ভাগ হয়ে গেল চোখের সামনেই।
“শুনো,” মাহিন ওয়াকিতে বলল, গলা একটুও না চড়িয়ে, “এক নম্বর র্যাম্পে ঠেকনা বসাও। কলা হাতে নামবে, ট্রলি না। তিন নম্বর মরিচ ঢুকবে। ফরিদপুর বাইরে অপেক্ষা। কেউ ক্রসলেনে মাথা ঢোকাবে না। আমি বলব, তখন ছাড়বা।”
ভিতর থেকে একের পর এক ছোট উত্তর এলো—“আচ্ছা।” “পাইছি।” “ঠেকনা দিছি।”
রাশেদ তখনও পাশে দাঁড়িয়ে, কিন্তু যেন জায়গাটার মালিকানা তার শরীর থেকে খুলে গেছে। সে বলল, “ফরিদপুর আগে দিলে—”
মাহিন খাতা থেকে চোখ না তুলে বলল, “আপনি গেটের চাবিটা মিলনকে দেন। দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবি দিয়ে আজ আর বে খুলবেন না।” কথাটা ধারালো, কিন্তু চিৎকার নয়। তবু আশেপাশের তিনজনের কাঁধ সোজা হয়ে গেল। রাশেদের পকেটে থাকা চাবির রিং একবার টুং করে উঠল; সে সেটা বের করে মিলনের হাতে দিল। এই ছোট শব্দটাই তার হারার সবচেয়ে জোর প্রমাণ।
তারপর কাজ চলল তীব্র, দৃশ্যমান গতিতে। মাহিন চেয়ার ছেড়ে বসে থাকল না; একবার টেবিলে দাগ, একবার র্যাম্পে ইশারা, একবার প্যালেটের ফাঁক মাপা, একবার ওয়াকিতে কাটা আদেশ। মানিকগঞ্জের কলা হাতে নামিয়ে পাশের শুকনো জায়গায় তোলা হলো; মরিচের ভ্যান তিন নম্বর দিয়ে ঢুকে পাঁচ মিনিটে খালাস; শেরপুরের বেগুন ঠান্ডা ছায়ায় সরিয়ে রাখা গেল। ফরিদপুরের ড্রাইভার মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়ালেও সামনে আসতে পারল না, কারণ খাতায় এখন তার নাম নিচে। কাজের ক্রম বদলেছে, আর সেই বদল সবার চোখের সামনে লিখিত।
জেসমিন আপা একবার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তাঁর ওড়নার ভাঁজে আঙুল কুঁচকে ছিল। যে ছেলেটাকে একটু আগে “নিচের লোক” বলা হয়েছিল, এখন তার অনুমতি ছাড়া মালিকপক্ষের আত্মীয়ার পরিচয়ও কোনো লেন খুলতে পারছে না। সামাজিক দূরত্বটা মুছে যায়নি; বরং উল্টো করে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
শেষ আটকে থাকা ট্রাকসেটটা ছিল সবচেয়ে কঠিন—দুই জেলার মিশ্র চালান, একটার পেছনে আরেকটা গোঁজা, মাঝখানে খালি প্যালেটের ভুল সারি। রাশেদ ফিসফিস করে বলল, “এটা ছাড়বে না।” গলায় আর কর্তৃত্ব নেই, শুধু ভয়।
মাহিন খাতা বন্ধ করল, লাল মার্কারটা মুঠোয় নিল, ক্রসলেনের মুখে গিয়ে নিজে দাঁড়াল। “মিলন, বাঁ দিক খালি। সাব্বির, অর্ধেক চাকা নামাও। হেলাল, পেছনের প্যালেট টেনে ফাঁক করো। এখন—প্রথমটা ছাড়ো।”
প্রথম ট্রাক নড়ল। পেছনেরটা থমকালো, তারপর মাহিনের হাতের এক কাটা ইশারায় সেটাও সোজা হয়ে এলো। দরজার মুখ মুক্ত। বহুক্ষণ জমে থাকা হর্ন থেমে গেল; তার জায়গায় শুধু চাকা ঘোরা, প্যালেট ঘষা, লোকজনের ছোট ছোট সাড়া। শেষ ব্লকটাও বেরিয়ে যেতেই মাহিন ফিরে এসে ডিসপ্যাচ টেবিলের খাতা নিজের ডান পাশে রাখল, খোলা পাতায় নামগুলো যেমন লিখেছিল তেমনই রইল—মিলন, সাব্বির, হেলাল; রাশেদ কোথাও নয়।
লোডিং বে-র পাশের পেছনের ক্রসলেনে বাতাস একটু ঠান্ডা। সিমেন্টের দেয়ালে ভোরের কুয়াশা ভেজা, টেবিলের কোণে আগের ঠান্ডা চায়ের বৃত্ত শুকিয়ে গাঢ় হয়ে আছে। মাহিন ওয়াকিটা মুখের কাছে তুলে ছোট করে বলল, “শেষ সেট ছাড়ো।” তারপর সেটাকে টেবিলের ওপর নিজের পাশে নামিয়ে রাখতেই ক্ষীণ এক ক্লিক শোনা গেল, আর ক্রসলেনের ওপর দিয়ে টেনে যাওয়া শুকনো স্ট্যাটিক ধীরে ধীরে কেটে পরিষ্কার হয়ে গেল।