শেষ ধাপের আগেই সে থামাল
“দরজার ভেতরে আসবে না, এখানেই দাঁড়াও,” সাবিহা খালা থালার ঢাকনা তুলে আবার চাপা দিলেন, যেন ঘরের গন্ধও মেহরীনের ভাগে পড়া অন্যায়। “খাতাটা দাও। হাত মুছে ধরো আগে। নানুর সামনে তেল-হলুদের দাগ নিয়ে দাঁড়াবে না।”
মেহরীন দরজার কাঠে কনুই ঠেকিয়ে অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদগুলোর গুচ্ছ আর কৃষি-সরবরাহের লেজার বুক বুকে চেপে ধরল। রান্নাঘর থেকে গরম ঘি, পেঁয়াজভাজা, কাঁচামরিচের গন্ধ আসছে; ডাইনিং টেবিলে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মানুষ বসে, আজানের পরের রাতের খাবার শুরু হবে। কিন্তু গত তিন মাসের বকেয়া হিসাব, মধুপুরের বীজের চালান, মানিকগঞ্জের সার পাঠানোর তারিখ—সবই তার মাথায়। তবু তার জন্য মাদুরও নেই, শুধু দরজার চৌকাঠ।
“খালা, আজকেই সই লাগবে,” সে নিচু গলায় বলল। “কাল ভোরে ট্রাক যাবে।”
“সই লাগবে তো রায়হান করবে। তুমি দরজায় দাও, ভেতরে এসে বসার দরকার নেই।”
ভেতর থেকে নানুর কাশি উঠল। কারও গলা—“মেয়েটা না থাকলে তো এদের অফিসই বন্ধ।” সঙ্গে সঙ্গে সাবিহা খালার ঠান্ডা জবাব, “কাজ জানা আর ঘরের মান জানা এক কথা না।”
মেহরীন খাতাটা বাড়াতেই ভেতর দিক থেকে রায়হান এগিয়ে এল। সাদা পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, কপালে ওজুর ভেজা রেখা। সে দরজার ফাঁকে এসে থামল। এতটা কাছে যে মেহরীনের তালুর নিচে ধরা ধাতব চাবির রিংয়ে তার আঙুলের ছায়া পড়ে। “আমাকে দিন,” সে খুব আস্তে বলল।
মেহরীন চাবি আর খাতা একসঙ্গে বাড়াল। রায়হানের হাত উঠেই থেমে গেল, তাদের মাঝের এক আঙুল ফাঁক যেন হঠাৎ শোনার মতো জিনিস হয়ে দাঁড়াল। ভেতর থেকে সাবিহা খালার গলা কেটে এল, “রায়হান, খাওয়া ঠান্ডা হচ্ছে।” তখনই সে চাবিটা মেহরীনের তালু ছুঁয়ে না নিয়ে রিংয়ের ধাতু ধরে টেনে নিল। থেমে যাওয়াটাই ছোঁয়ার চেয়ে বেশি টের পেল মেহরীন।
রাতের খাওয়া শেষে হিসাবের ফোন এলে সবসময় মেহরীনকেই ধরা হয়। ছাদের ধারের ছোট ঘরে, যেখানে সে ভাড়া থাকে বললেও সবাই জানে—এ বাড়ির কাজের সুবিধের জন্যই রাখা, মর্যাদার জন্য নয়—সেখানেই বসে সে মোবাইলের আলো তালুর মধ্যে ঢেকে কথা বলে। সেই আলোই সেদিন রায়হানের দরজার নিচে গিয়ে থামল। নিচে কেউ যেন জোরে ডাকাডাকি না শুনে ফেলে, সে জন্য কড়া নাড়ল না; কেবল ফিসফিস, “গুদামের চাবি।”
দরজা আধখোলা হল। রায়হান একা। ঘরে হালকা আতরের গন্ধ, টেবিলে খোলা হিসাব, নামাজের টুপি উল্টো করে রাখা। “এত রাতে?”
“শাওন ভুল চাবি নিয়ে গেছে। ভোরের মাল উঠবে কী দিয়ে?” মেহরীন চাবির রিং বাড়িয়ে দিল। “আপনারটাই লাগবে।”
সে এবার আরও কাছে এল। দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে তার কাঁধ প্রায় কাঠে ঠেকানো, মেহরীনের পেছনে অন্ধকার করিডর। “সাবিহা খালা দেখলে—”
“তাহলে আপনি নেবেন না?” মেহরীনের গলায় কোনো নরমতা ছিল না। ক্লান্তি ছিল, অপমান ছিল।
রায়হান হাত বাড়িয়ে চাবি নিল, কিন্তু তার কবজির ঠিক আগে থেমে আবার রিং ধরল। চোখ তুলে বলল, “কাল থেকে রাতের হিসাব আমাকে ফোনে নয়, সরাসরি দেবেন।” তারপর ফিসফিসিয়ে যোগ করল, “দাঁড়িয়ে থেকে নয়।”
নিচের তলা থেকে হঠাৎ কারও স্যান্ডেলের শব্দ উঠতেই সে এক পা পিছিয়ে গেল। দরজা একটু বেশি খুলে আবার সঙ্গে সঙ্গে টেনে দিল। ফাঁক রইল শুধু এতটুকু, যতটুকু দিয়ে শ্বাস বাইরে আসে, মানুষ নয়।
দুই দিন পর দুপুরে, ডাইনিং টেবিলটাই হিসাবের টেবিল হয়ে গেল। ঢাকার বাসার এই এক রোগ—খাওয়ার জায়গা, মান রাখার জায়গা, বিচার করার জায়গা, সব এক। মানিকগঞ্জের ডিলার ভিডিও কলে চেঁচাচ্ছে, আগের চালানে ঘাটতি আছে। সাবিহা খালা সামনে বসে বললেন, “মেহরীনই লিখেছে। আমি প্রথম দিনই বলেছিলাম, বাইরের মেয়েকে মাথায় তুললে এই হয়।”
মেহরীন চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। তার হাতে সেই অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদ—কতবার খুলে আবার গুঁজে রেখেছে, কাগজ নরম হয়ে গেছে। সে বলল, “ঘাটতি চালানে না। ওরা দুই বস্তা নামিয়ে আলাদা রেখেছে। ড্রাইভার ভিডিও পাঠিয়েছিল।”
“তুমি আবার এখন ভিডিও দেখাবে?” সাবিহা খালা চোখ কুঁচকে উঠলেন। “তোমার কথায় লোকসান মাপবে সবাই?”
রায়হান তখন পর্যন্ত একটাও কথা বলেনি। হঠাৎ সে চেয়ার ঠেলে উঠে মেহরীনের হাত থেকে রসিদটা নিল, সঙ্গে তার ফোনটাও। স্ক্রিনের আলো তালুতে ঢেকে থাকা প্রমাণ এবার সে সবার সামনে খুলল না; শুধু নিজে দেখে বলল, “মেহরীন ঠিক বলেছে।” তারপর লেজার বুকটা সাবিহা খালার পাশ থেকে সরিয়ে ডাইনিং টেবিলের এপাশে, মেহরীনের সামনে রেখে দিল। “আজ থেকে ইনওয়ার্ড-আউটওয়ার্ডের শেষ নোট ও করবে। সই আমি দেব।”
ঘরে খচ্ করে একটা চামচ পড়ে গেল। নানু ভাত মাখা হাত তুলে তাকিয়ে রইলেন। সাবিহা খালার মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তুমি আমার সামনে—”
“আপনার সামনে বলেই,” রায়হানের গলা নিচু, কিন্তু সোজা। “যে কাজ করে, হিসাব তার সামনে থাকবে।”
মেহরীন লেজারের কালো মলাটে হাত রাখল। মনে হল টেবিলটা একটু সরেছে, আসলে সরেছে মানুষদের পড়া। কিন্তু সেই সরে যাওয়াতেই বিপদ বাড়ে। সন্ধ্যার পর থেকেই সাবিহা খালার চোখে নতুন হিসাব।
বাড়িতে শবে বরাতের প্রস্তুতি পড়ল। সেমাই ভাজা, রুটি বেলা, ফাতেহার তালিকা—সবকিছুতেই লোকজন ওঠানামা করছে। সেই ভিড়ের ভেতরই সাবিহা খালা নিঃশব্দে আঘাত করলেন। গুদামের আলমারির ছোট চাবিটা, ছাদের ঘরের পাশের শেলফের চাবিটা, এমনকি হিসাবরুমের ডুপ্লিকেট চাবিও তিনি মেহরীনের হাত থেকে নিয়ে নিলেন।
“আজ থেকে এগুলো শাওনের কাছে থাকবে,” তিনি বললেন। “তোমার অনেক কর্তৃত্ব হয়ে গেছে। লোকের সামনে মুখ খুলতেও শিখেছ। ভালো। এখন বাইরে থেকে এসে বাইরে থাকো।”
মেহরীন শুধু একবার জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমার কাজ?”
“যতটুকু বলা হবে। দরজায় দাঁড়িয়ে। আর ঘরের লোকের মতো এদিক-সেদিক ওঠানামা বন্ধ।”
কথাটা যেভাবে বলা হল, সেটা চাকরি কাটা নয়, অবস্থান কাটা। মেহরীন নিজের ঘরে উঠে খুব শান্তভাবে থলে গুছাল। দুই জোড়া কাপড়, টিউশনের খাতা, পুরনো চার্জার, আর লেজারের নোট কপি। রাত বাড়লে সে সেই চাবিগুলো—যেগুলো তার হাতে থেকে আবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে—একসঙ্গে একটা ছোট খামে ভরে নিচে নামল। খামের উপর লিখল: “ফেরত।”
রায়হান তখন নানুর ওষুধ দিয়ে উপরের তলায় উঠছিল। সিঁড়ির মোড়ের আলো আধো, দেয়ালে লম্বা ছায়া। মেহরীন খামটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। “এগুলো আর আমার কাছে থাকবে না।”
রায়হান খাম নিল না। “কে বলেছে?”
“যিনি বলতে পারেন।” মেহরীন চোখ তুলল না। “আপনি আর মাঝখানে পড়বেন না। আমার থাকার মতো জায়গা এ বাড়িতে কোনোদিন ছিল না; শুধু কাজের মতো জায়গা ছিল। সেটা আজ তুলে নেওয়া হয়েছে।”
“মেহরীন—”
“না। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারি। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে অপমান নিতে পারি। কিন্তু ভিক্ষা করে চাবি রাখব না।” সে খামটা সিঁড়ির রেলিংয়ের উপর রেখে দিল। “ভোরের আগে চলে যাব। শাওনকে বলে দিয়েছি কোন ফাইলে কী আছে।”
সে ঘুরে নিচের দিকে নামতে শুরু করল। প্রথম ধাপ, তারপর বাঁক। বাড়ির ভেতরে কারও কাশির শব্দ, রান্নাঘরে ঢাকনার ঠোকাঠুকি, দূরে মসজিদের মাইকে কোরআন তেলাওয়াত—সব মিলিয়ে এমন এক সাধারণ রাত, যেটা মানুষের জীবন কেটে দেয় বিনা শব্দে। মেহরীন দ্বিতীয় ধাপে পা রাখতেই ওপর থেকে রায়হানের গলা এল, খুব নিচু, কিন্তু থামানোর মতো ধারালো—“একটু দাঁড়ান।”
সে থামল না। আরও আধ ধাপ নামল। তখনই রায়হান দ্রুত নেমে এসে তার এক ধাপ ওপরে থামল। এত কাছে নয় যে শরীর ছুঁয়ে যায়, এত দূরে নয় যে কথাটা আর কারও হতে পারে। তার হাতে এখন খাম নেই; খামের ভেতরের চাবির রিং খোলা, সঙ্গে কালো ট্যাগ বাঁধা হিসাবরুমের মূল চাবি।
মেহরীন প্রথমবার তাকাল। “ওটা তো আমার কাছে ছিল না।”
“আজ থেকে থাকবে।” রায়হানের শ্বাস নিয়ন্ত্রিত, মুখ কঠিন। “শাওনের না। কারও ধারেও না।”
“খালাকে না জানিয়ে?”
“জানানো হবে।” সে নিচু হয়ে নয়, সোজা দাঁড়িয়েই চাবিটা বাড়াল। “কিন্তু আপনাকে না দিয়ে আর কিছু হবে না।”
মেহরীনের হাত উঠল না। “এটা দিয়ে কী হবে? দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার নিয়ম বদলাবে?”
রায়হানের আঙুল চাবির রিংয়ে শক্ত হল। তারপর সে এক অদ্ভুত কাজ করল—যা তার মতো মানুষ, এই বাড়ির ছেলে, এই বাড়ির শৃঙ্খলার রক্ষক, সবার সামনে নয়, ঠিক এই আধো সিঁড়িতে, কারও চোখের বাইরে থেকেও করবে বলে মনে হয় না। সে হিসাবরুমের চাবির সঙ্গে ছাদের পাশের ছোট ঘরের অতিরিক্ত চাবিটাও জুড়ে দিল; নিজের পকেট থেকে খুলে। ধাতুর ঠোকাঠুকিতে ছোট শব্দ হল। “ওই ঘরটা আপনার,” সে বলল। “কাজের সুবিধার জন্য না। তালা বদলাবেন কাল।”
মেহরীনের বুকের ভেতর কিছু শক্ত হয়ে উঠল, গলে নয়। “আপনি জানেন, এর মানে কী দাঁড়ায়?”
“জানি।” এবার তার হাত এক মুহূর্ত সামনে এগিয়ে এসে থেমে গেল—মেহরীনের কবজির আগে, বাতাসে। “তাই ছুঁই না।”
নিচের তলা থেকে সাবিহা খালার ডাক ভেসে এল, “রায়হান? উপরে কে?” সিঁড়ির বাতাস সঙ্গে সঙ্গে কড়া হয়ে গেল। এই এক মুহূর্তে যদি মেহরীন চাবি না নেয়, তবে চলে যাওয়াটা সত্যি হয়ে যাবে; আর যদি নেয়, তবু কিছুই সহজ হবে না। সহজের জন্য তো তাকে কখনও ডাকা হয়নি।
সে ধীরে হাত বাড়াল, কিন্তু রায়হানের হাত থেকে কেড়ে নয়—রিংয়ের নিচের ফাঁকা অংশে আঙুল ঢুকিয়ে নিল, যেন মালিকানা ধাতুর এক পাশে, স্বীকৃতি অন্য পাশে। “আমি কারও দয়ার জায়গায় থাকব না,” সে বলল।
“থাকবেন না,” রায়হান বলল। “চাবি রেখে দেন। বাকিটা আমি থামাব।”
“সব থামাতে পারবেন?”
“যেটুকু আমার দরজায় আসে, পারব।”
এই প্রথম মেহরীন চাবিটা মুঠোয় বন্ধ করল। তারপরই সে নিজের শরীর অল্প সরিয়ে নিল, যেন নেওয়ার পরও দাঁড়িয়ে থাকা মানে আত্মসমর্পণ নয়। এক ধাপ নিচে নামল, কিন্তু পুরোটা নয়—সিঁড়ির সেই অর্ধেক উঁচু-নিচু মোড়ে থেমে গেল। ওপর থেকে রায়হানও আর নামল না। তাদের মাঝখানে শুধু নিয়মের পরিমাপ করা ফাঁক, আর ধাতব চাবির ঠান্ডা ওজন।
মেহরীনের জুতার আগা থেমে রইল তার চেয়ে এক ধাপ নিচে; সিঁড়ির আধা-ধাপে দুই ছায়া পাশাপাশি দীর্ঘ হয়ে নেমে এল, কিন্তু একটাও আরেকটার গায়ে গিয়ে মিশল না।