Fast Fiction

সামনের সারি সে-ই নিল

রাশেদ চাচা সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে রেজিস্টারের উপর তালু চাপা দিলেন, তারপর মেহরিনের গলায় ঝুলে থাকা পুরোনো, ঘষে-চকচকে কার্ডের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “এই পাস নিচতলার কাজের জন্য। অতিথি-ফ্লোরে উঠবা না। সরে দাঁড়াও।”

উপরে যাওয়ার সিঁড়িটা এমনিতেই চিকন; দুই দিক থেকে শাড়ির আঁচল, আতরের গন্ধ, বিরিয়ানির ধোঁয়া, আর মোবাইল হাতে ফুফাতো-খালাতো আত্মীয়দের ভিড় গিয়ে গলায় আটকে আছে। ল্যান্ডিংয়ের কাঁচঘেরা দরজার ফ্রেমে এক মুহূর্ত থেমে মেহরিন দাঁড়াল, সরে গেল না। তার ব্যাগের ভেতর অর্ধেক ভাঁজ করা একখানা রসিদ শুকনো কাগজের মতো শব্দ করল। নিচতলায় মিষ্টির ট্রে নিয়ে ছুটতে থাকা ছেলেগুলোও তাকিয়ে রইল। এটা যে শুধু ওপরে ওঠা না—কাকে সবার সামনে নিচে নামিয়ে দেওয়া যায়, সেই রায়—ঘর বুঝে গেল।

রাশেদ চাচা এমন গলায় কথা বলছিলেন, যেন তিনি কমিউনিটি সেন্টারের মালিক না হলেও অন্তত আজকের বিয়ের মুখ। “আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, মেয়েমানুষের ইজ্জত আছে। যে যেখানে মানায় সেখানে থাকলেই ভালো। উপরতলায় বরের পক্ষের বড়রা বসছে।”

মেহরিন শান্ত গলায় বলল, “আমি সরে গেলে আপনাদের সুবিধা হবে, জানি। কিন্তু আড়ালে যাব না।”

এই এক লাইনে কয়েকটা মাথা ঘুরল। পাশের খালা নিচু স্বরে “হায় আল্লাহ” বলেও চুপ করলেন। রাশেদ চাচা সুযোগটা আরও মোটা করতে চাইলেন। “দেখলা? ভাষা কেমন? নিচের তদারকি করতে দিছি, এখন সামনের সারিতে বসতে চায়। তোমার নাম কোথায়? রেজিস্টারে দেখাও।”

তিনি রেজিস্টারের পাতাটা এমনভাবে উল্টাতে লাগলেন যেন নাম না পাওয়াটাই আগেই ঠিক করা। মেহরিন তার দিকে না তাকিয়ে সিঁড়ির নিচে দাঁড়ানো হল কমিটির সেক্রেটারিকে বলল, “শাহীন ভাই, উপরের পশ্চিম পাশে তিনটা খালি চেয়ার সরান। নাঈম ভাইয়ের দাদির হুইলচেয়ার উঠবে। পথ বন্ধ রাখবেন না।”

একটুও দেরি না করে শাহীন মাথা নুইয়ে বলল, “আচ্ছা আপা,” তারপর দুই কর্মচারীকে ডেকে চেয়ার সরাতে ছুটল।

ফাটলটা এত তাড়াতাড়ি হবে রাশেদ চাচা ধরতে পারেননি। তার চেপে রাখা হাত রেজিস্টারের উপরই রইল, কিন্তু সেক্রেটারি তার কথায় নয়, মেহরিনের কথায় নড়ে গেল। ভিড়ের মধ্যে কানে কানে ফিসফিস উঠল—কে এই মেয়ে, যাকে কাজের লোকের মতো তাড়ানো হচ্ছে, আবার হলের লোক তার নির্দেশ মানছে?

রাশেদ চাচার চেহারায় কাঁচা বিরক্তি উঠল। “শাহীন!” তিনি তীক্ষ্ণ গলায় ডাকলেন, “আগে আমি যা বলি, তা করো। এ মেয়ের কথা শুনছ কেন?”

শাহীন এবার থামল, কিন্তু মেহরিনের দিকে তাকিয়েই। এই থামাটাই খারাপ ছিল; কোন দিকে চোখ যায়, সেখানেই লাইন টানে। রাশেদ চাচা ভিড়কে জড়ো করতে গলা আরও উঁচু করলেন, “বিয়েবাড়ি নাকি অফিস? যে-তার-সে উঠে পড়বে? নিচের তদারকি করতে দিলেই কি মাথায় চড়ে বসতে হবে?”

মেহরিন এবার সোজা তার দিকে তাকাল। চোখে কান্না নেই, তাড়া নেই। “রেজিস্টার দেখতে চান?” সে বলল, “ভালো কথা। কোন স্বাক্ষর দেখে অতিথি-ফ্লোর বন্ধ করছেন—আপনার, না যার নামে আজকের বুকিং?”

প্রশ্নটা এমন ছুরি ছিল, যার ধার আগে কেউ টের পায়নি। ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়ানো তিনজন পুরুষ আত্মীয় অজান্তেই সরে দাঁড়াল, যেন উত্তর বেরোনোর জায়গা লাগে। রাশেদ চাচা প্রথমে গলাটা কাশির মতো পরিষ্কার করলেন, তারপর বললেন, “আমি তো বড়দের পক্ষ থেকে—”

“কোন বড়?” মেহরিন থামাল না, ঠেলে দিল। “বুকিংয়ের অগ্রিম কে দিয়েছে, রান্নাঘরের বাকি বিল কে মিটিয়েছে, কৃষি ব্যাংক থেকে টাকা ছাড় না হওয়া পর্যন্ত নিজের গয়না বন্ধক দিয়ে কে অনুষ্ঠান ঠেকায়নি—নাম বলুন। তারপর বলেন, আমার ওঠা আটকাবেন।”

শুকনো কাগজের শব্দে সে ব্যাগ থেকে অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদটা বার করল, খুলল না, শুধু আঙুলে ধরে রাখল। কথাটা বড় ছিল না; কিন্তু কৃষি ব্যাংকের নাম, অগ্রিম, বাকি বিল—এগুলো বিয়ের সেজেগুজে কথার চেয়ে বেশি শক্ত। দু’জন খালা যারা একটু আগেও মুখ চেপে দাঁড়িয়েছিলেন, এবার চোখ নামিয়ে রাশেদ চাচার দিকে তাকালেন না।

উপরতলার সিঁড়ি দিয়ে নাঈম নেমে আসছিল। তাকে দেখেই কয়েকজন ভেবেছিল, এবার হয়তো ঝগড়া থামবে, মেয়েটাকে আলাদা ডেকে বোঝানো হবে। কিন্তু নাঈম ল্যান্ডিংয়ে এসে কারও মাঝখানে ঢোকেনি। শুধু শাহীনকে বলল, “দাদির পথ খোলা রাখেন।” তারপর মেহরিনের হাতে থাকা রসিদের দিকে একবার তাকিয়ে চুপ করল।

রাশেদ চাচা নাঈমকে ধরে আবার মঞ্চ বানাতে চাইলেন। “তুমি বলো। আজকে কারা ওপরে উঠবে, কারা না। সামনের মান-সম্মানের প্রশ্ন।”

নাঈম উত্তর দিল না। মেহরিনই বলল, “মান-সম্মান বাঁচাতে চাইলে সহজ কথা বলেন—আপনি কি জানতেন না, উপরের অতিথি-ফ্লোরের আসনবিন্যাস আর গ্রহণ-তালিকা আজ আমি দেখছি?”

এইবার কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল না; নড়াচড়া হল। পশ্চিম পাশের চেয়ার সরানো শেষ করে শাহীন ফিরে এসে রেজিস্টারের নিচ থেকে নীল ফোল্ডার টেনে বের করল। সেটা এতক্ষণ রাশেদ চাচার কনুইয়ের নিচে চাপা ছিল। শাহীন ফোল্ডারটা সরাসরি মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিল। “আপা, তালিকাটা।”

রাশেদ চাচার হাত মাঝআকাশে থেমে গেল। লোক দেখানো কর্তৃত্বের চেয়ে খারাপ জিনিস হচ্ছে—চোখের সামনে জিনিস সরে অন্যের দিকে যাওয়া। দু’জন কাজের ছেলে, যারা একটু আগে তার ডাকে সিঁড়ি ফাঁকা করছিল, এবার ফোল্ডার যাওয়ার পথ খুলে দিল।

মেহরিন ফোল্ডার নিল না সঙ্গে সঙ্গে। সে বলল, “খুলে দিন। সবাই দেখুক।” শাহীন খুলে ধরতেই ওপরের পাতায় পরিষ্কার অক্ষরে লেখা: অতিথি-ফ্লোর আসন ও গ্রহণ তদারকি—মেহরিন আখতার, প্রতিনিধিত্বে: নাজমা বেগম। নিচে নাজমা বেগমের স্বাক্ষর, পাশেই হলের সিল। নাজমা বেগম—নাঈমের মা—এই বিয়ের পুরো আয়োজনের মুখ, যার অসুস্থতার জন্য তিনি দেরিতে আসছেন, এই কথাই দুপুর থেকে সবাই শুনছে।

কেউ লম্বা বক্তৃতা দিল না। শুধু দুই খালা দ্রুত সিঁড়ির এক পাশ ছেড়ে দিলেন। এক বয়স্ক মামা, যিনি এতক্ষণ রাশেদ চাচার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিজের পাঞ্জাবির আস্তিন টেনে নিয়ে নিচে নেমে গেলেন। ল্যান্ডিংয়ের বাতাস বদলায়নি; কিন্তু কার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে, সেটা বদলে গেল।

রাশেদ চাচা মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টাটা করলেন। “প্রতিনিধিত্বে মানে এই না যে সে বরের পাশে বসবে, সবার সামনে নির্দেশ দিবে। কাগজ থাকলেই সব হয় না। কার্ড দেখায়া যে-তার-সে—”

মেহরিন এবার ফোল্ডার থেকে নিজেই কার্ডটা টেনে তুলল। কার্ডের প্লাস্টিকের কোণা ঘষে সাদা হয়ে গেছে, ল্যানইয়ার্ডে পুরনো ভাঁজ। তবু লেখা স্পষ্ট: গ্রহণ ও অতিথি-ফ্লোর তদারকি। সে কার্ডটা কাঁধের সমান উঁচু করল, ঠিক সেই খোলা ল্যান্ডিংয়ের মাঝখানে, যেখানে নিচে নামা আর ওপরে ওঠা—দুই স্রোত একে অপরকে ঠেলে যায়।

“যে-তার-সে না,” মেহরিন বলল, গলা না তুলে, “নাজমা বেগমের পক্ষ।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই শাহীন ঘুরে দাঁড়াল। “পথ খালি করেন,” সে কর্মচারীদের বলল, “নাজমা আপার পক্ষের তদারকি যাবে ওপরে।” যে দুইজন মিনিটখানেক আগে রাশেদ চাচার ইশারায় হাত তুলে রাস্তা আটকে রেখেছিল, তারা প্রথমে দ্বিধায় ছিল। তারপর উপরের দিক থেকে হুইলচেয়ার নামানোর র‌্যাম্প টানতে আসা ছেলেরা এসে তাদের গা ছুঁয়ে পাশ কাটাল। ভিড়ের মধ্যে আটকে থাকা চলাচল একবার থেমে আবার নতুন নিয়মে বয়ে গেল।

রাশেদ চাচা কার্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “নামাও এটা। সবাই সবকিছু জানার দরকার নাই।”

মেহরিন কার্ড নামাল না। “আজ দরকার আছে,” সে বলল। “আমাকে নিচে নামানোর আগে আপনি সবার সামনে জিজ্ঞেস করেছেন আমি কে। এখন সবার সামনেই উত্তর পড়া হবে।”

শাহীন ফোল্ডার থেকে পাতাটা তুলে উচ্চস্বরে পড়তে শুরু করল—“অতিথি-ফ্লোর আসন ও গ্রহণ তদারকি—মেহরিন আখতার—প্রতিনিধিত্বে: নাজমা বেগম”—আর শব্দের সঙ্গে সঙ্গে রাশেদ চাচার মুখের রং এমন নামল, যেন কেউ আলো কমিয়ে দিয়েছে। তিনি নাঈমের দিকে তাকিয়ে সমর্থন চাইতে গেলেন, কিন্তু নাঈম ইতিমধ্যে সিঁড়ির মাঝপথে সরে দাঁড়িয়ে জায়গা ছেড়েছে; পাশে দাঁড়ানো মানে কখনও কখনও কথার চেয়েও স্পষ্ট।

“তুমি দাঁড়াইছ কেন?” রাশেদ চাচা এবার নাঈমকেই বললেন, স্বর ভেঙে। “কিছু বলো।”

নাঈম তখনই প্রথম কথা বলল, আর তাও মেহরিনকে নয়, শাহীনকে—“মায়ের গ্রহণ-টেবিলের চাবিটা মেহরিনকে দিন।”

চাবির ছোট গোছাটা রেজিস্টারের পাশে পড়ে ছিল। রাশেদ চাচা সেটা আগে কেড়ে নিয়ে নিজের পকেটে ঢোকাতে গিয়েছিলেন; এখন তার হাত পকেটের মুখে গিয়ে থেমে গেল। শাহীন নিঃশব্দে এগিয়ে এসে বলল, “চাবি, চাচা।” এই ‘চাচা’ সম্বোধনের ভদ্রতায় কোনো রক্ষা ছিল না; কারণ সে হাত পাতল কাজ বুঝে, অনুমতি চেয়ে নয়। রাশেদ চাচা দু’সেকেন্ড দেরি করলেন। এতটুকু দেরিতেই ল্যান্ডিংয়ের মানুষ বুঝে ফেলল, কার হাত থেকে জিনিস বের হচ্ছে, কার হাতে যাচ্ছে।

মেহরিন এক পা ওপরে উঠল। রাশেদ চাচা আবার সামনের পথ ঢাকতে গিয়ে বললেন, “দেখো, মেয়েদের নিয়ে এভাবে—”

“সরে দাঁড়ান,” মেহরিন বলল। তার হাতে উঁচু কার্ড, অন্য হাতে ফোল্ডার। “গ্রহণ-টেবিল, অতিথি-ফ্লোর, আর বরের মায়ের আসন—তিনটার দায় আমার। আপনি যদি আপত্তি করেন, নাজমা বেগম এসে আপনাকেই জিজ্ঞেস করবেন, তার নামে কাকে আটকালেন।”

এবার দৃশ্যটা হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল। নিচের ফ্লোর থেকে ঢাকের শব্দ এসে থেমে গেল না, কিন্তু ল্যান্ডিংয়ে আটকে থাকা পাঁচ-ছয়জন একসঙ্গে পাশ কাটাল। যে হাতগুলো একটু আগে বুকের কাছে তুলে পথ আটকে রেখেছিল—কেউ আত্মীয়, কেউ কাজের লোক, কেউ শুধু দৃশ্য দেখতে দাঁড়ানো—সেগুলো একে একে নেমে গেল। পথের মাঝখানে মেহরিনের উঁচু করা কার্ড এক মুহূর্ত দৃশ্যমান রইল, ভোটের মেঝের মতো খোলা ল্যান্ডিংয়ে, তারপর সে না থেমে ওপরে উঠতে শুরু করল; চারপাশের আটকানো হাতগুলো নিচে নেমে গেল, পথ খুলে দিল।