Fast Fiction

আমার জায়গা ওরা মুছতে পারেনি

গরম ট্রের ধাক্কায় স্টিলের জগটা কাত হয়ে পড়তেই মেহরিন দুই হাতে ধরে ফেলল, আর একই সময়ে বলল, “ভাতটা ওই টেবিলে নামান, দই এখানে রাখেন—ওপাশে জায়গা নাই।” তার কণ্ঠে তাড়াহুড়ো ছিল, কিন্তু হাত একটুও কাঁপেনি। তবু সাবিহার খালা সবার সামনে মাথা উঁচু করে বললেন, “তুমি এত নির্দেশ দিচ্ছ কেন? এখানে তোমার ভূমিকা কী? আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা বলে যে যার খুশি ভেতরে ঢুকে পড়বে নাকি?”

করিডরের সাদা আলো মৃদু ভনভন করছিল। মেহরিনের ওড়নার কাঁধভাগে সারাদিনের ভাঁজ শক্ত হয়ে আছে, কবজিতে বাসকার্ডের ঘষায় মসৃণ হয়ে যাওয়া প্রান্ত ঠেকছে। সে রাতভর ইনস্টিটিউটের কৃষি প্রদর্শনীর নিবন্ধন সামলেছে, সকালে আবার হলঘরের খাবারের তালিকা ধরে দাঁড়িয়ে আছে—কারণ রায়ানের বাবা ডায়াবেটিক, রায়ানের মা হাঁটুতে ব্যথা নিয়ে বসে আছেন, আর আমন্ত্রিত অতিথিরা নাম ধরে বসার জায়গা চাইবেন। এসব কাজ যেদিন গুলিয়ে যায়, অপমানটা কাজের মানুষের গায়েই আগে লাগে। মেহরিন শুধু জগটা সোজা করে বলল, “পানি পড়লে মেঝে পিচ্ছিল হতো।”

সামনের টেবিলে প্লাস্টিক মোড়া আসনসূচি। বড় কাগজে মোটা কালিতে লেখা—শিক্ষক, অভিভাবক, বিশেষ অতিথি, পরিবার। ‘পরিবার’ সারির একেবারে শেষে ছোট ফন্টে ছিল: “রায়ান + ১”। সেই ‘+ ১’-এর ওপর ইতিমধ্যে সাবিহার খালা কলম ঠেকিয়ে রেখেছেন। তিনি পাশের মেয়েটাকে ডেকে বললেন, “শায়লাকে এখানে বসাও। ওর খালাতো বোন, মানায়ও। অচেনা কাউকে সামনে রাখা ঠিক না।”

মেহরিনের বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল। গত ছয় মাসে সে এই ইনস্টিটিউটের অস্থায়ী গ্রন্থাগারকক্ষ থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঠ সফরের হিসাব পর্যন্ত সামলেছে, অথচ নামের জায়গায় সে কখনো পুরো নামে ওঠেনি। কারও ফোনে “মেহরিন আপা”, কারও মুখে “ও মেয়েটা”, আর আত্মীয়মহলে “চেনা আছে”। আজকের এই ‘+ ১’টাই ছিল প্রথম দৃশ্যমান ফাঁক—যেন অনুমতির দরজা অল্প খোলা। সাবিহার খালার কলমের নিবের চাপ কাগজে বসতেই সে হাত বাড়িয়ে কাগজটা ভাঁজ করে নিজের দিকে টেনে নিল। “কালি ছড়াবে,” সে বলল, শান্ত গলায়। “নতুন কপি আছে।”

এই প্রথম ছোট্ট ফাঁকটা বদলাল। রায়ান, যে এতক্ষণ অতিথিদের সঙ্গে দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম আর আসন দেখিয়ে দিচ্ছিল, ভেতরে এসে দ্বিতীয় কপিটা মেহরিনের হাত থেকে নিল না—উল্টো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিল, যেন কাজটা তারই জায়গা। তারপর সবার শুনতে পাওয়ার মতো জোরে নয়, কিন্তু খুব পরিষ্কারভাবে বলল, “পরিবার সারিটা আগের মতোই থাকবে।” সে ‘রায়ান + ১’ লাইনের পাশে টিক দিল, শায়লার দিকে তাকালও না। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো সাহসী ঘোষণা নেই; শুধু খালার বাড়ানো কলমটা সে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল।

সাবিহার খালার ঠোঁট চিকন হয়ে গেল। “তোর মাথা খারাপ হয়েছে? বিকেলের মিলনমেলায় মেয়েপক্ষ আসবে। ওই সারি দেখে মানুষ কী বুঝবে? একটা ঠিকঠাক নাম দরকার। এইসব ঢিলেঢালা ব্যাপার পরিবারে মানায় না।”

‘ঠিকঠাক নাম’ কথাটা হলঘরের গরমে আরও কড়া শোনাল। কাছের টেবিলে বসা দুই আন্টি কাঁটাচামচ থামিয়ে তাকালেন। রায়ান এবারও সোজা জবাব দিল না। সে শুধু আসনসূচির নিচে রাখা মোটা রেজিস্টারটা টেনে মেহরিনের সামনে রাখল। “শেষ ব্যাচের অভিভাবকদের টিক দিন,” বলে সে অন্যদিকে ফিরল। এই সরানোটা ছোট ছিল, কিন্তু স্পষ্ট—কাজের টেবিলের কেন্দ্র বদলে গেল।

দুপুর পার হয়ে গেলে আঘাতটা আরও নির্দিষ্ট হলো। হলঘরের বাইরে বারান্দায় আরেকটা বোর্ড টাঙানো হলো—সন্ধ্যার খাবার পরিবেশনের পালা, কারা কারা ভেতরে থাকবে, কারা ভিআইপি সারি দেখবে। সেখানে আগে থেকেই মেহরিনের নাম ছিল “অতিথি সমন্বয়”—ছোট, কোণে, তবু ছিল। সাবিহার খালা নিজে লাল কলমে সেটা কেটে লিখলেন, “সহায়ক, রান্নাঘর।” আর তার জায়গায় শায়লার নাম উঠে গেল ভেতরের সারিতে, যেখানে খাওয়া শেষের পর পরিবারের সঙ্গে ছবি তুলবে সবাই।

মেহরিন বোর্ডটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। কাগজের কোণে স্ট্যাপলারের ধাতব দাঁত চকচক করছে। তার গলায় কেউ দড়ি টানেনি, অথচ শ্বাসটা ছোট ছোট হচ্ছে। রান্নাঘরে নামিয়ে দেওয়া মানে শুধু কাজের ভার না—সন্ধ্যার পরের সব দৃশ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া, ভবিষ্যতের সব পরিচয় থেকে নাম মুছে ফেলা। সাবিহার খালা এসে তার কাঁধে আঙুল রাখলেন, বাইরে থেকে দেখলে খুব স্নেহের ভঙ্গি। “কষ্ট কোরো না মা। কাজের মেয়ে মানে ছোট না। কিন্তু নিজের সীমা বুঝতে হয়।”

মেহরিন সেই আঙুল সরিয়ে দিল না, আবার নরমও হলো না। সে বোর্ড থেকে নিজের নামের নিচে ঝোলানো প্লাস্টিকের প্রবেশকার্ডটা খুলে ফেলল। কার্ডের ফিতেটা ঘামে ভিজে নরম হয়ে গেছে। তারপর সোজা রায়ানের কক্ষের দিকে হাঁটল। ছোট অফিসঘর, টেবিলে কৃষি প্রশিক্ষণের মডিউল, কোণে মাটিভরা ট্রে আর চারা। রায়ান ফোন কেটে তার দিকে তাকাতেই সে কার্ড আর স্টোররুমের চাবি টেবিলে রাখল। “রান্নাঘরে থাকব, ঠিক আছে। কিন্তু আমার নামে যা যা দরজা খোলে, তা আমি দিয়া কারও বদলি খেলায় নামব না। চাবি লাগলে আপনি নিজে দেন।”

রায়ানের মুখে ক্লান্তির রেখা ছিল; সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকার টান পায়ের ভঙ্গিতে ধরা পড়ছে। তবু সে তাড়াহুড়ো করল না। বাইরে থেকে সাবিহার খালার ডাক এল, “রায়ান, শায়লাকে স্টোররুম দেখিয়ে দে।” সে চাবির গোছায় হাত বাড়িয়েও তুলল না। দরজার কাছে গিয়ে শুধু বলল, “স্টোররুম আজ বন্ধ থাকবে।” খালা তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “খাবারের অতিরিক্ত প্লেট কোথায়?” রায়ান উত্তর দিল, “যার নাম কেটে রান্নাঘরে পাঠানো হয়েছে, তার চাবি ছাড়া খুলবে না।”

এই না-সহযোগিতা কক্ষে জমে থাকা গরম হাওয়াটাকে আরও ভারী করল। মেহরিন মাথা তুলল। এতদিন সে দেখেছে, রায়ান তর্ক এড়ায়, আত্মীয়দের সামনে নরম থাকে, সব সামলে দেওয়ার চেষ্টা করে। আজ সে সামলালো না। শুধু সুবিধাটা দিল না। এটাই প্রথমবার মেহরিন বুঝল, তার অপমানটা সে একাই বয়ে বেড়াচ্ছে না।

তার দাম সঙ্গে সঙ্গে উঠল। নাসরিন আপা, যিনি ইনস্টিটিউটের আবাসিক ব্লকের তদারকি করেন, এসে নিচু গলায় বললেন, “মেহরিন, আপাতত তুমি পাশের সিঁড়ির দরজা দিয়ে চলাচল করো। সামনের ফটকটা সন্ধ্যায় আত্মীয়দের জন্য খোলা থাকবে।” মানে, মূল দরজা তার জন্য সরু করা হলো। একটু পরেই সাবিহার খালা আবার এসে বললেন, “চাবি দাও। এই নাটক করে মান-সম্মান নষ্ট কোরো না।” মেহরিন টেবিলে রাখা চাবির গোছার দিকে তাকাল, তারপর সেটাই তুলে নাসরিন আপার হাতে দিল। “যেখানে আমার নামে কাজ, সেখানে আমার হাতেই খুলব। না হলে বন্ধ থাকুক।”

নাসরিন আপা থমকে গেলেন। তিনি কারও পক্ষ নিলেন না, কিন্তু চাবি আর ফেরত দিলেন না। ততক্ষণে সিঁড়িঘরের ভনভন আলো, নিচে থালা ধোয়ার শব্দ, আর ভেতর থেকে মাইকে দোয়া পড়ার টানা গলা মিলিয়ে এক ধরনের ঝিম ধরা চাপ তৈরি করেছে। রায়ান বারান্দায় এসে থামল। দুজনের মাঝখানে শুধু অর্ধেক খোলা লোহার দরজা। সে বলল, “তুমি গেলে সব সহজ হয়ে যেত।”

মেহরিন হেসে ফেলল, খুব সামান্য, খুব শুকনো। “আপনাদের জন্য।”

রায়ানের চোখে এক সেকেন্ডের জন্য ধাক্কা দেখা গেল; যেন এত সোজা কথাটা সে শুনতে অভ্যস্ত না। তারপর সে বলল, “হ্যাঁ। আমাদের জন্য। তাই আমি সহজটা নিচ্ছি না।” এতটুকুই। কিন্তু তার হাত দরজার কপাটে ছিল না; বরং সে সরে দাঁড়াল, যেন পথ চাওয়া না, জায়গা রাখা।

সন্ধ্যা নামতেই আসল ধাক্কা এল। খাওয়া শেষে লম্বা সারিতে ট্রে নেওয়া হচ্ছে, পরিবারের প্রবীণরা সামনের টেবিলে, তরুণরা একটু পেছনে। এখানে বসার বদল চোখে কম পড়ে না। মেহরিনকে শুরুতে রান্নাঘরের কোণে থালা গোনা কাজে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর সাবিহার খালা শেষ চালটা চাললেন—রায়ানের পাশে যে ট্রে আর চেয়ার রাখা ছিল, সেটা সরিয়ে শায়লাকে ডেকে বসালেন। অন্য ট্রেটা এক কিশোরকে দিয়ে বললেন, “ওখানে বসো। মেয়েদের আলাদা সারি আছে।”

এবার মেহরিন আর এগিয়ে গেল না। রান্নাঘরের চৌকাঠেই দাঁড়াল। কেউ ভাবলে ভাবুক সে অভিমান করেছে; সে আর বদলি ভূমিকায় ঢুকবে না। সাবিহার খালা তাকে দেখিয়ে বললেন, “এই মেয়েটা থালা বাড়াক, তবু কাজ বাঁচে।” তার স্বরটা মিষ্টি, কিন্তু ভেতরে আদেশের ধার।

মেহরিন থালা তুলল না। “আমার কাজের তালিকা কাটছেন, বসার সারি কাটছেন, এখন মুখরক্ষা করার কাজও আমি করব না,” সে বলল। খুব উঁচু গলায় না, তবু আশপাশের দু-তিনজন শুনে ফেলল। কথাটা বলেই সে চৌকাঠ থেকে সরে দেয়ালের পাশে দাঁড়াল, হাত খালি, চোখ স্থির।

এই এক পা সরে দাঁড়ানোতেই ভেতরের গতি কেঁপে উঠল। যে কিশোরটাকে বসানো হচ্ছিল, সে অস্বস্তিতে ট্রে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। শায়লা নিজের ওড়না টেনে নিল, কিন্তু বসল না। রায়ান তখন ঠিক মাঝসারিতে, হাতের প্লেটে ডাল আর ভাত। সে একবারও মেহরিনের দিকে ডাকল না, কাউকে বোঝাল না। বরং নিজের পাশে রাখা সরানো ট্রেটা টেনে আবার আগের জায়গায় রাখল। তারপর ওই কিশোরকে বলল, “তুমি ওদিকের সারিতে বসো।” শায়লার দিকে না তাকিয়েই আরেকটা খালি চেয়ার সামনে ঠেলে দিল—দূরে, পরিবার সারির বাইরে।

সাবিহার খালা থমকে গেলেন। “রায়ান, এখন নাটক কোরো না। লোকজন বসে গেছে।”

রায়ান ট্রের পাশে রাখা কাগজের আসনচিহ্ন তুলে সোজা করল। সেখানে ছোট কালিতে এখনও লেখা ছিল—“+ ১”। বিকেলে সেটা ভাঁজ হয়ে গিয়েছিল, এখন সে আঙুল বুলিয়ে মেলে দিল। তারপর রেজিস্টার টেনে নিয়ে, খাওয়া-শেষের গুছিয়ে রাখার তালিকায় মেহরিনের নাম যেটা কেটে “সহায়ক, রান্নাঘর” করা হয়েছিল, তার পাশে আবার লিখল, “অতিথি সমন্বয়—অভ্যন্তর সারি।” কেউ তাকে থামাতে এগোনোর আগেই সে কলম বন্ধ করে রাখল।

মেহরিনের কানে নিজের রক্তের শব্দ উঠল। এত লোকের মধ্যে কোনো ঘোষণা নেই, কিন্তু প্রত্যেক দৃশ্যমান জিনিস নিজের জায়গায় ফিরছে—ট্রে, কাগজ, সারি। তবু শেষ সিলটা তার না হলে সবই আবার নরম হয়ে যাবে। সে ধীরে ধীরে চৌকাঠ পেরিয়ে এল। সাবিহার খালা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “এখন এসে বসলে তোমারই তো অসুবিধা। মেয়েদের পাশে বসো, মান থাকে।”

মেহরিন তার দিকে তাকাল না। রায়ানের পাশের খালি চেয়ারটার দিকে গিয়ে দাঁড়াল, কিন্তু বসল না। প্রথমে সে নিজের ওড়নার আঁচল ঠিক করল, তারপর টেবিলের পাশে ঝোলানো পরিবেশন তালিকা থেকে রান্নাঘরের নীল প্লাস্টিক ক্লিপ খুলে ফেলল। যে ক্লিপ দিয়ে তাকে কর্মীর সারিতে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, সেটা সে ভাঁজ করা কাগজের পাশে রেখে দিল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, “আমি থালা বাড়াব না। আমি আমার জায়গায় বসব, না হলে বের হয়ে যাব। মাঝের কিছু করব না।”

এইবার কেউ তাকে টেনে রান্নাঘরে পাঠাতে পারল না। কারণ খালি চেয়ারটা আগেই রাখা হয়েছে; কারণ কাগজে লাইন খোলা আছে; কারণ রায়ান নিজের খাবার নিয়ে উঠে যায়নি, আবার অন্য কাউকে বসিয়েও দেয়নি। দৃশ্যটা এত সাধারণ যে অস্বীকার করা কঠিন। মেহরিন চেয়ারটা একবার স্পর্শ করে বসে পড়ল। তার আঙুলে সারাদিনের শুকনো চালের গুঁড়ো লেগে ছিল; কাঠের কিনারা ঠান্ডা। রায়ান শুধু জগটা তার দিকে এগিয়ে দিল। এইটুকু।

খাওয়া শেষ হতে দেরি হলো না। ট্রে ফেরত দেওয়ার সরু লাইনে সবাই নিজ নিজ প্লেট নামাচ্ছে। করিডরের একই ভনভন আলো, স্টিলের ঘষা শব্দ, ধোয়া ভাতের গন্ধ। রায়ান আগে নিজের ট্রে রেখে দিল। তার পাশের ফাঁকা জায়গাটায় কেউ আর অন্য ট্রে রাখেনি। মেহরিন লাইনের এক ধাপ পেছন থেকে এসে নিজের ট্রেটা তুলে ঠিক সেই খালি স্থানে নামাল; তারপর ফেরত তাকের ধার ঘেঁষে ট্রেগুলো সোজা করতে করতে তার ট্রের পাশের ফাঁকটা আবার একই জায়গায় রেখে দিল।