Fast Fiction

ভাঙনও আমাদের আলাদা করেনি

মেহরীন দৌড়ে গিয়ে চুলার ওপর ওঠা দুধের পাতিলটা নামাতেই রিফাতের খালা হাতের আঁচল ঝাপটে উঠলেন, “এই মেয়ে, কে বলছে তোমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে?” পাতিলের গা বেয়ে দুধ নেমে আগুনে সিঁসিঁ শব্দ করছে, আর মেহরীনের কবজিতে গরম ছিটা পড়ে লাল দাগ উঠেছে। তবু সে পাতিলটা মেঝেতে না রেখে সিঙ্কে নামাল, গ্যাস বন্ধ করল, তারপর পাশের টেবিলে ঠান্ডা হয়ে চামড়া ধরা চায়ের কাপ সরিয়ে জায়গা করল। প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণে বসে থাকা দুই কাজিন মুখ টিপে হাসল, যেন সে সুযোগ বুঝে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আজ বিকেলে রিফাতের মায়ের ছোট বোন দেখতে এসেছেন; আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা এই বাড়িতে কে কোথায় দাঁড়াবে, তাও হিসাব করা থাকে। মেহরীনকে ডাকা হয়েছিল শুধু নোটস দেওয়ার জন্য। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেই চলত। কিন্তু দুধ উপচে আগুন ধরার আগে সে নড়েছে—এইটাই এখন তার দোষ।

রিফাত তখন বারান্দা থেকে ভেতরে ঢুকছিল, হাতে পাতলা কাগজে মোড়া মিষ্টির প্যাকেট। শুকনো কাগজের খসখস শব্দটা থেমে গেল। সে একবার মেহরীনের হাতে, একবার সিঙ্কের ওপর ছড়ানো দুধে তাকাল। তার খালা আগেই বলে উঠলেন, “বাইরের মেয়েরা একবার ঢুকলে আর সীমানা মানে না। নোটস দিতে এসেছ, নোটস দাও। ঘর সামলানোর ভান করতে হবে না।” কথাটা রিফাতের দিকে ছুড়ে দেওয়া, কিন্তু আঘাতটা এসে লাগল মেহরীনের গায়েই। মেহরীন ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা খাতাটা বের করে টেবিলে রাখল। বলল না, এই বাড়ির তিনতলার পানির মোটর নষ্ট হলে সবার আগে তাকেই ফোন করা হয়েছিল, কারণ রিফাত তখন ক্যাম্পাসে। বলল না, রিফাতের মায়ের ডায়াবেটিক বিস্কুট এনে দিয়েছিল সে-ই। যাদের কাজ সুবিধাজনক, তাদের নাম ঘরের লোকের মতো উচ্চারিত হয় না।

খালা খাতা হাতে নিলেন না। বললেন, “ওটা রাখো বাইরে। টেবিল ভরা।” তারপর মেঝের দুধের দিকে তাকিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন, যেন সব নষ্ট হয়ে গেছে। মেহরীন ঝুঁকে কাপড় খুঁজছিল, তখনই প্রথম পুরস্কারটা এল—বড় কিছু না, কিন্তু স্পষ্ট। রিফাত মিষ্টির প্যাকেটটা কাজিনের হাতে গুঁজে দিয়ে সরাসরি সিঙ্কের নিচ থেকে মুছনি টেনে বের করল। “খালা, আগুন ধরলে কে সামলাত?” বলে সে দুধ মুছতে হাঁটু গেড়ে বসল। ঘরের ভেতর হাসিটা হঠাৎ আটকাল। কেউ তাকে থামতে বলল না; তাও তার এই হাঁটু গেড়ে বসা মানে ছিল সে অন্তত ওই মুহূর্তে দূরে দাঁড়িয়ে নিরাপদ মুখ রাখল না।

সেইটুকুই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু শান্তি টিকল না। ঠিক তখন ওপরে ট্যাংকির লাইন খুলে দিয়ে কেউ ভুলে গিয়েছিল; রান্নাঘরের পেছনের সরু করিডর দিয়ে পানি ঢুকে উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল। বাড়িওয়ালি খালাম্মা নিচতলা থেকে হাঁক ছাড়লেন, “আবার কারা মোটর ছেড়ে রেখে গল্প করছে?” এক মিনিটের মধ্যে ঘরের ভেতরের অতিথি-আয়োজন ছেড়ে সবাই পানি, স্যান্ডেল, ছড়ানো আলুর বস্তা আর ভিজে বাজারের থলি বাঁচাতে হুড়োহুড়ি শুরু করল। যাদের মুখে একটু আগে শুচিবায়ুর কথা ছিল, তারা পা ভেজা এড়িয়ে প্লাস্টিকের চেয়ার সরিয়ে উঁচু জায়গায় তুলছে। মেহরীন কথাই না বাড়িয়ে বারান্দা থেকে বালতি টেনে আনল, ড্রেনের মুখে আটকে থাকা পলিথিন হাত ঢুকিয়ে বের করল। কালো, কাদা মেশানো পানি কবজি পর্যন্ত উঠে গেল। কাজিনরা “ইস” বলে পেছাল।

রিফাতের খালা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আদেশ করতে লাগলেন। “ওই বইগুলো আগে তোলো। সাব্বির, দাঁড়িয়ে আছ কেন? রিফাত, অতিথিদের ঘরে নিয়ে যা। আর তুমি”—মেহরীনের দিকে চিবুক ঠেলে—“এক কাজ শুরু করলে শেষ করো। যেহেতু হাত দিয়েছ।” শেষ কথাটা ছিল এমন, যেন বিপদটাও সে-ই ডেকে এনেছে। সাব্বির, পাশের ফ্ল্যাটের ছেলে, একবার এগিয়ে এসে আবার থেমে গেল; তার নতুন পাঞ্জাবির পাড় পানিতে ছুঁইছুঁই। রিফাত দুটো বইয়ের বান্ডিল তুলে ঘরের ভেতর রাখল বটে, কিন্তু তার চোখ বারবার নেমে আসছিল মেহরীনের দিকে—নুয়ে থাকা পিঠ, ভেজা ওড়না, আর ড্রেনের মুখ খুলে দিলে হঠাৎ ঘূর্ণি তুলে নামা নোংরা পানির দিকে।

ভেজা উঠোনে দাঁড়িয়ে কাজের হিসাব দ্রুত বদলে গেল। অতিথিদের জন্য রাখা থালার পাশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কোচিং-এর ফর্ম ভিজে কুঁচকে যাচ্ছে; খালা সেটা তুলতে গিয়ে আবার বলে উঠলেন, “এই জন্যই বলি, যার যা জায়গা সে তাই মানলে সমস্যা হয় না।” মেহরীন একটুও মুখ তুলল না। একটা বালতি ভরে সে পেছনের নালা পর্যন্ত বয়ে নিয়ে গেল, ফিরল, আবার ভরল। রিফাতের মা ডায়াবেটিক পায়ে ভেজা মেঝেতে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন; মেহরীন তাঁকে ধরে প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণে বসাল, চায়ের ঠান্ডা কাপ সরিয়ে শুকনো গামছা দিল। তবু ধন্যবাদ এল না। উল্টো খালা বললেন, “ছোঁয়াছুঁয়ি কম করো। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার বাইরে মানুষেরও তো সীমা আছে।”

এবার রিফাত থামল না। খালার ওই শেষ কথাটার পর সে হাতের বইগুলো টেবিলে ফেলে সোজা মেহরীনের কাছ থেকে বালতি নিল। “খালা, সীমা পরে দেখবেন। আগে পানি নামাই।” বলেই সে আরেকটা বালতি চাইল, না পেয়ে চালের ড্রাম খালি করে সেটাকেই কাজে লাগাল। মেহরীন মাথা তুলল; বিস্ময় দেখানোর সময় নেই, তবু চোখে এক মুহূর্তের থেমে থাকা ছিল। রিফাত সেদিকেই না তাকিয়ে ড্রেনের মুখে বসে হাত ঢুকিয়ে দ্বিতীয়বার পলিথিন টানল। নোংরা ছিটে তার হাতা, গাল, পাঞ্জাবির সামনের অংশে লেগে গেল। খালা এবার সত্যি ক্ষেপে উঠলেন, “অতিথিরা বসে আছে, তুমি এসব করছ? ওকে করতে দাও। ও তো অভ্যস্ত।” শব্দটা উঠোনে থাপ্পড়ের মতো পড়ল—অভ্যস্ত। যেন মেহরীনের পরিশ্রম কোনো মানুষের সীমা নয়, তার স্বাভাবিক তল।

রিফাত প্রথমবার সোজা তাকাল। “ও অভ্যস্ত বলে সব ও-ই করবে?” তার গলায় চিৎকার ছিল না, তবু এতটাই কাটল যে প্লাস্টিকের চেয়ার ঠেলে সরানোর শব্দটাও থেমে গেল। তারপর সে আর কোনো ব্যাখ্যা দিল না। হাঁটু গেড়ে বসে বালতি ভরতে লাগল। মেহরীনও থামল না। তাদের দুজনের হাত এখন একই নোংরা পানিতে, একই গতিতে ওঠানামা করছে। এইটুকু দৃশ্য ঘরের ভেতর যত কথাই থাকুক, আলাদা করে ব্যাখ্যা চাইছিল না।

হুড়োহুড়ির ফাঁকে বাড়িওয়ালি খালাম্মা এসে হাজির হলেন, হাতে দেরিতে ফেরত পাওয়া নিচতলার গেটের চাবি। চাবিটা নেড়ে বললেন, “কে মোটর দেখে? বারবার বলি, ছেলেপেলে ভাড়া থাকলে নিয়ম লাগে।” তাঁর চোখ দ্রুত মেহরীনের ওপর গিয়ে আটকাল; সে এই বাড়ির মেয়ে না, অতিথি না, কাজের লোকও না—সবচেয়ে সুবিধাজনক দোষী। খালা সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ নিলেন। “এই মেয়েটাই একটু আগে রান্নাঘরে। তারপর থেকেই সব গণ্ডগোল।” মিথ্যেটা এমন স্বরে বলা হলো যেন আগেই স্থির ছিল। কয়েকজন আত্মীয় দরজার ধারে এসে দাঁড়াল; কারও হাতে ফোন, কারও কাপে আধখাওয়া চা, উপরে পাতলা চামড়া পড়ে গেছে।

মেহরীন সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখে পানি, কপালে চুল লেগে আছে। সে বলল, “আমি এখনই বের হয়ে যাচ্ছি। ড্রেনের মুখ খুলে দিয়েছি, বাকি আপনারা—” কথাটা শেষ করতে পারল না; কারণ বেরিয়ে যাওয়াই এখানে সহজ রাস্তা। দোষ নিয়ে চলে গেলে ঘরও বাঁচে, মুখও বাঁচে। খালা সেই পথই খুলে দিলেন, “হ্যাঁ, যাও। দরজার বাইরে থাকাই ভালো ছিল।” রিফাত যদি এখন চুপ থাকত, সবাই স্বস্তি পেত।

সে চুপ থাকল না, আবার বক্তৃতাও করল না। বাড়িওয়ালি খালাম্মার হাত থেকে চাবিটা নিয়ে সবার সামনে রান্নাঘরের তাকের ওপর না রেখে মেহরীনের ভেজা ব্যাগের পাশে রাখল। তারপর বলল, “মেহরীন যাবে না। নিচের স্টোরঘরে বস্তাগুলো উঠাতে হবে, আমি একা পারব না।” এইটুকু। কোনো সম্পর্কের নাম নেই, কোনো দাবি নেই। কিন্তু কাজের ভাগ সে প্রকাশ্যেই বদলে দিল; দোষীকে বের করে দেওয়ার বদলে তাকে পাশে দাঁড় করাল। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার চোখের সামনে এই পরিবর্তনটাই বেশি বাজল। খালা বললেন, “তোমার এত দরদ কবে থেকে?” রিফাত ইতিমধ্যে স্টোরঘরের দরজা খুলে দিয়েছে।

নিচতলার স্টোরঘরটা আধা-অন্ধকার, সিমেন্টের মেঝে ঠান্ডা আর পিচ্ছিল। বন্যার পানি পুরো ঢোকেনি, কিন্তু দরজার গোড়ায় ভিজে কৃষির সার, পেঁয়াজের জালি, আলুর বস্তা টেনে না সরালে সব নষ্ট হবে। সবচেয়ে ভারী বস্তাটা মেহরীন একা টানতে গিয়ে বুঝল, কাপড় জলে ভিজে গায়ে লেপ্টে আছে, হাতে জোর কমে গেছে। পেছন থেকে রিফাত বলল, “থামো।” সে না থেমে বস্তার মুখের দড়িটা শক্ত করে ধরল। “আমি ধরেছি।” কথাটা ছোট, শুষ্ক, কিন্তু তাতে পুরনো অভিমান ছিল—এতক্ষণ তো ধরে আছিই। বাইরে খালার স্যান্ডেলের শব্দ, কারও চাপা গুঞ্জন, ভিজে কাগজ কচমচ আওয়াজ করছে। এই সবকিছুর মাঝেই রিফাত সামনে এসে কোনো কথা না বাড়িয়ে বস্তার অন্য মাথাটা দুই হাতে তুলল।

এই মুহূর্তটাই সিদ্ধান্ত হল। মেহরীন আগে নিজের দিকটা কাঁধের কাছে টেনে তুলল; ওটাই তার সীমা-টানা—যদি নিতে হয়, একা দোষ বইতে নয়, কাজের মালিকানা নিয়ে। রিফাত তারপর নিজের হাত গলিয়ে একই বস্তার নিচে কাঁধ দিল। ভারে দুজনের শরীর একসাথে হেলে গেল, আবার সামলে উঠল। দরজার মুখে দাঁড়ানো সাব্বির তাড়াতাড়ি সরে গেল; খালা কিছু বলতে গিয়ে দেখলেন, তারা ইতিমধ্যে হাঁটা শুরু করেছে। আলুর কাদা আর সারের গুঁড়ো মিশে মেঝেতে দাগ পড়ছে। বস্তাটা স্টোরের উঁচু তাকের সামনে তুলতে গিয়ে রিফাতের পা পিছলে গেল; মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে নিজের দিকটা নামিয়ে ভার সামলে নিল। এবার সে বলল, “একসাথে। এখন।” দুজন একই সময়ে চাপ দিল। বস্তা উঠে গেল, তাকের ওপর থেমে ভারী শব্দে বসে রইল। বাইরে যারা তাকিয়ে ছিল, তাদের কারও আর মুখ রইল না সহজ তিরস্কারের ভঙ্গিতে।

কাজ তখনও বাকি। পেঁয়াজের জালি, ভাঙা মাটির টব, ভেজা চট—সব সরাতে হবে। মেহরীন একটা বালতি পানিভরা টেনে নিল, যেন যা ভেসে এসেছে তা ধুয়ে না দিলে গন্ধ বসে যাবে। রিফাত তার হাত থেকে বালতি কেড়ে নিল না; বালতির লোহার হাতলে নিজের হাত জুড়ে দিল। একই বালতি, দুই দিক থেকে ধরা। খালা ওপর থেকে ডাকলেন, “রিফাত, ওঠো, কাপড় পাল্টাও।” সে তাকালও না। মেহরীনও না। তারা বারান্দা, করিডর, উঠোনের ভেজা রেখা ধরে হাঁটল, যেখানে একটু আগে মেহরীনের পা একা দাগ কাটছিল। এখন বালতির ভার মাঝখানে টান মেরে তাদের গতি এক করে দিচ্ছে। বাড়িওয়ালি খালাম্মা সরে দাঁড়ালেন, যেন কাজের পথেই এখন জায়গা ছাড়তে হচ্ছে।

শেষ ধোওয়া পানি ফেলে ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যার আযান ভেসে এল, ঘিঞ্জি ঢাকার বাড়িগুলোর মাঝখানে আটকে নরম হয়ে। অতিথিরা ভেতরে সরে গেছে; কেউ আর উঠোনে নির্দেশ দিচ্ছে না। করিডরের একপাশে ঠান্ডা চায়ের কাপের তলায় গোল দাগ শুকিয়ে আছে। দরজার পাশে দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবিটা এখনও মেহরীনের ব্যাগের কাছে। সে বালতিটা নিয়ে উঠোনের কোণের দিকে গেল, যেখানে পাকা মেঝে একটু উঁচু, পানি জমে না। সেখানে থেমে দুই হাতেই হাতল নামিয়ে রাখল, কিন্তু ছাড়ল না।

রিফাত এসে অন্য পাশের হাতলে হাত রাখল। দুজনেই ভেজা, নিঃশ্বাস ভারী। উঠোনের কোণে ঢাকা-সন্ধ্যার ম্লান আলোয় বালতিটা তাদের মাঝখানে রইল। কেউ কিছু বলল না। তারপর পানির গা একবার নড়ে উঠল।