Fast Fiction

আসল শিফটটা আবার আমার হলো

“ওই ব্যাগটা আগে দেন—না, ওইটা না, ইউরিয়া লেখা নীলটা,” মিতু হাত বাড়িয়ে ক্রেতার কাঁধের উপর দিয়ে বস্তাটা টেনে নামাল, তারপর একই নিঃশ্বাসে বলল, “বিকাশে গেলে শেষ চার ডিজিট বলেন, ভুল গেলে পরে আমার ঘাড়ে পড়বে।” তার আঙুলের ডগা তখনও রেজিস্টারের পাশে খুচরো নোট গুনছে, আর রাকিবা ভাবি কাউন্টারের উঁচু স্টুলে বসে ঠোঁট কুঁচকে বলল, “তুমি একটু সাইডে দাঁড়াও তো। নতুন মানুষ দেখলে গ্রাহক কনফিউজ হয়।”

ঢাকার এই গলির মুখের দোকানটা অর্ধেক কৃষি-ইনপুট, অর্ধেক বিকাশ-নগদ লেনদেন, আর পুরোটা আত্মীয়স্বজনের জানাশোনায় বাঁধা। কাসেম চাচার দোকান, কিন্তু সন্ধ্যার ভিড়ে কে আসলেই দোকান চালায় সেটা কাগজে লেখা থাকে না। মিতুর কনুইয়ে দিনের পুরনো ভাঁজ, শাড়ির হাতায় ধুলো, কাউন্টারের কিনারায় এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে গায়ে পাতলা চামড়া ধরেছে—দুপুর থেকে দাঁড়িয়ে আছে সে। তারপরও রাকিবা ভাবি এমন স্বরে বলল যেন মিতু আজকেই পথ থেকে ডেকে আনা সাহায্যকারী মেয়ে।

একজন কৃষক টুপি খুলে বিরক্ত গলায় বলল, “আপা, আমার টাকাটা গেল নাকি?” রাকিবা ভাবি মোবাইলের স্ক্রিন উল্টেপাল্টে তাকিয়ে রইল; লেনদেনের নম্বর মিলছে না। মিতু এক ঝলক তাকিয়েই বলল, “শেষ দুইটা উল্টা লিখছেন। সাত-তিন না, তিন-সাত।” সে হাত বাড়ালে রাকিবা ভাবি এক সেকেন্ড থামল, যেন রেজিস্টারের বোতাম ছুঁতে দিলেই মান নষ্ট হবে। তারপর অগত্যা হিসাবের ছোট খাতাটা ঠেলে দিল। মিতু তিনটে চাপ দিয়ে রসিদ বের করতেই লোকটা হাঁফ ছাড়ল। খাতাটা ফেরত নিতে নিতে রাকিবা ভাবি তবু বলে উঠল, “আমি দেখছিলামই। ও একটু আগে থেকে আছে, তাই নম্বরগুলো চেনে।”

এইটুকুই প্রথম ফেরত—খাতাটা তার হাতে ফিরেছিল, যদিও কথাটা ফেরেনি।

মাগরিবের আজান ভেসে আসতেই ভিড় পাল্টে গেল। রাস্তার ধুলোয় স্যান্ডেল ঘষে কলেজপড়ুয়া ছেলেরা, পাশের বাসার খালা, ফার্মেসির ডেলিভারি বয়—সবাই একসাথে। ঠিক তখনই সাব্বির এল। কাসেম চাচার ভাগ্নে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, ইদের আগে পরে দোকানে দাঁড়ায়। মিতুর বুকের ভিতরটা কেন জানি শক্ত হয়ে গেল; এ দোকানে সাব্বিরের সঙ্গে চোখাচোখি মানেই আলাদা বিপদ, কারণ এই গলিতে একবার কারও নাম কারও পাশে জুড়ে গেলে আর আলাদা করা যায় না।

সাব্বির শাটারের ভেতর ঢুকেই অবস্থা বুঝল। “চেঞ্জ শেষ?” সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল। মিতু ড্রয়ারের নিচ থেকে পাঁচশোর বান্ডিল দেখিয়ে আবার ঢুকিয়ে দিল। বলার আগেই রাকিবা ভাবি হাসল, “তুমি আসছো ভালো হয়েছে। এই চেয়ারে বসো তো। তোমার হাতটা পরিষ্কার, তোমাকে দেখলে লোকজনও ভরসা পায়। মিতু, তুমি ভেতর থেকে সার আর বীজের হিসাবটা দেখে দাও, আর চা নিয়ে এসো।”

চেয়ার বদলানোটা এত প্রকাশ্যে হল যে পাশের খালা পর্যন্ত দেখে নিলেন। স্টুলে সাব্বির, সামনে মোবাইল আর রেজিস্টার; মিতু পিছনের সরু তাকের ফাঁকে। দৃশ্যটা এমন, যেন দৃশ্যমান কাজের জায়গা ভদ্র ঘরের ছেলেকে দেওয়া হল, আর ভরাট কাজ, বোঝা, ভুলের দায়—সব আগের মতোই মেয়েটার ঘাড়ে। সাব্বির একবার মিতুর দিকে তাকিয়েছিল; তাতে দুঃখ ছিল, বাধা ছিল না।

মিতু ভেতরে গেল না। চা-গ্লাসের ট্রেটা এনে কাউন্টারের নিচে নামিয়ে রেখে সে বীজের তিনটা প্যাকেট তুলে সামনে রাখল, যাতে অন্তত মাল নিতেও তার হাত লাগতেই থাকে। রাকিবা ভাবি বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি তো বললাম ভেতরে যাও।” মিতু ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, “ভেতরের হিসাব পরে হবে। এখন সামনের লাইনে ভুল হলে পরে ফেরত দেওয়ার টাকা থাকবে না।” কথা শেষ করে সে এক বৃদ্ধের হাতে ফেরত টাকার খুচরো গুঁজে দিল। বৃদ্ধ লোকটা তাকাল সাব্বিরের দিকে নয়, মিতুর দিকে—এটুকু ছোট সরে আসা, কিন্তু চোখে পড়ার মতো।

এরপর ভিড় এক ধাক্কায় চেপে বসল। একসাথে তিনটা নগদ তোলা, দুটো বিকাশ পাঠানো, সার মাপা, আর পাশের মসজিদের মোয়াজ্জিন এসে আগের বকেয়া মেলাতে চাইলেন। সাব্বির শুরুতে সামলাচ্ছিল, কিন্তু রাকিবা ভাবি তাকে একটার পর একটা নির্দেশ দিতে লাগল—“আগে উনাকে দাও”, “না, এই খাতা ধরো”, “ওই টাকাটা ড্রয়ারে রাখো”—এমনভাবে যে তার হাত আর মাথা এক লয়ে চলল না। তারপরেই কেলেঙ্কারিটা হল। এক মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি দশ হাজার তুললাম, রসিদে কেন এক হাজার?” আর একই সঙ্গে ড্রয়ারের ভেতর নোটের বান্ডিলের ফাঁক উল্টে গিয়ে একশোর জায়গায় পাঁচশো ঢুকে আছে দেখা গেল।

সাব্বির জমে গেল। রাকিবা ভাবি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল, মুখে শুধু, “একটু দাঁড়ান, একটু দাঁড়ান।” কিন্তু লাইনে কেউ দাঁড়ায় না; তারা ধাক্কা দেয়, ঝুঁকে দেখে, গলির মুখ পর্যন্ত আওয়াজ যায়। মিতু তখন পিছন থেকে বেরিয়ে এসে প্রথমে রসিদটা হাতে নিল, তারপর ড্রয়ারের সামনে থামল। তার হাত বাড়ানো মাত্র রাকিবা ভাবি ঝট করে বলল, “একটু ঠিক করে দাও তো। এত কথা বাড়ানোর কী আছে?”

মিতু হাত সরিয়ে নিল।

কাউন্টারের ওপর ঝুলে থাকা ছোট লোহার চাবিটা ড্রয়ারের মুখে লাগানো। দিনের শেষে মিল না করলে শাটার নামবে না, আর রসিদ-টাকার অমিল বের না করলে এখনই কেউ নড়বে না। মিতু চাবিটা দেখল, খাতাটা দেখল, তারপর খুব আস্তে নিজের ওড়নার কোণা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, “ঠিক করে দিচ্ছি কেন? আমি যদি শুধু চা আনার মানুষ হই, তাহলে ভুলও আপনারাই ধরেন।”

পাশের খালা কেশে উঠলেন। মোয়াজ্জিন সাবধানে টুপিটা গুঁজে ধরলেন। রাকিবা ভাবির মুখ শক্ত হয়ে গেল, “এখন নাটক কোরো না, এত মানুষ দাঁড়িয়ে।” “মানুষ তো আগেও দাঁড়িয়েছিল,” মিতু বলল। “তখন আমাকে পেছনে দেননি?”

সাব্বির এবার নড়ল। তার গলাটা নিচু, কিন্তু ভিড়ের চাপে স্পষ্ট শোনা গেল। “চাবিটা ওর হাতে দিন, ভাবি। আর খাতাটাও। বন্ধের হিসাব মিতু ছাড়া হবে না।” কথার মধ্যে ক্ষমা ছিল না, সাফ করে দেওয়া ছিল। রাকিবা ভাবি তাকাল তার দিকে, যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না সে এমন জায়গায় সরে দাঁড়াবে। কিন্তু লাইনের মহিলাটা তখনও রসিদ চেপে ধরে আছে, আর একজন বলছে, “আপা, আগে যার হাতে চলত তার হাতে দেন, আমরা রাত করব না।”

রাকিবা ভাবি শেষ চেষ্টা করল মান বাঁচাতে। “ঠিক আছে, ও দেখে দিক। তুমি বসে থাকো, সাব্বির।” মিতু স্থির দাঁড়িয়ে রইল। “দেখে দিলে হবে না। সামনে বসব, ড্রয়ার আমার দিকে থাকবে, হিসাবও আমি মিলাব। না হলে আপনারা অন্য কাউকে ডাকেন।”

এইবার থামাটাই সবচেয়ে ধারালো হল। বাইরে রিকশার বেল, ভেতরে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে আরেকটা বৃত্ত, দোকানের বাতিতে পোকা ঝাঁপাচ্ছে—এইসব ছোট শব্দের মধ্যে কাউন্টারের জায়গাটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। রাকিবা ভাবির চোখে রাগ, লজ্জা, হিসাব—সব একসাথে খেলে গেল। সে জানে, এখন মিতুকে ছাড়া পারা যাবে না; আবার সামনে বসালে এই গলির সবাইও বুঝে যাবে এতদিন কাকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল।

সাব্বির কথা বাড়াল না। সে নিজেই স্টুল থেকে নেমে পাশে সরে দাঁড়াল, নিজের হাতের মোবাইল আর ক্যালকুলেটর কাউন্টারের খালি অংশে সরিয়ে রাখল। তারপর রেজিস্টারের ছোট খাতাটা তুলে মিতুর সামনে রাখল। এতটুকু নড়াচড়া—কেউ তালি দিল না, কেউ কিছু বলল না, কিন্তু দৃশ্যটা বদলে গেল। ধার করা আসন ফাঁকা হল।

মিতু সামনে এল। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তার হাঁটুতে কাঠ ধরেছে, তবু সে বসার আগে কাউন্টারের কিনারা একবার হাতের তালু দিয়ে ঝেড়ে নিল; ধুলোর সঙ্গে ছড়ানো দুইটা খুচরো, একটা কলম, আর চায়ের দাগ সরল। তারপর সে স্টুলে বসল না—অর্ধেক দাঁড়িয়ে, অর্ধেক ভর দিয়ে রইল, যেভাবে সে সবসময় কাজ করে। “ওনারটা আগে,” বলে সে দশ হাজার তোলার মহিলার ফোন নম্বর মিলাল, উল্টে যাওয়া দুই অঙ্ক ঠিক করল, আগের লেনদেনের ছাপা কাগজ টেনে তুলল। “এখানে এক হাজার গেছে, এটা বাতিল না—এটার পরেরটা ঠিকমতো তুলেছেন। মাঝখানে নোট গোনার সময় গুলিয়ে গেছে।”

তার হাত চলতে লাগল দ্রুত, কিন্তু প্রদর্শনীর মতো নয়। এক হাতে রসিদ, আরেক হাতে ড্রয়ার, চোখ একবার স্ক্রিনে, একবার লাইনে। কে আগে এসেছে, কার বকেয়া পরে ধরা হবে, কোন নোট আলাদা রাখতে হবে—সব জায়গা আবার নিজের লয়ে বসে গেল। মোয়াজ্জিনের বকেয়া মেলাতে গিয়ে সে আগের পাতার ভাঁজ খুলে দিল; পাশের খালার পাঠানো টাকার এসএমএস মিলিয়ে দিল; কৃষকের সার-বীজের টাকা নগদ আর বিকাশে ভাগ করে নিল। রাকিবা ভাবি একসময় কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ কথার ফাঁকে ফাঁকে যে শ্বাসরোধ হত তা আর হচ্ছে না।

অমিলের জায়গাটা বের হল ড্রয়ারের ডানদিকের খোপে। পাঁচশোর সঙ্গে একশো মিশে গিয়েছিল, আর ভুল রসিদের পরে ফেরত দেওয়া নোট লেখা হয়নি। মিতু আলাদা করে নোট রাখল, খাতায় দাগ টানল, লাইনের শেষ দুজনকে সেরে বলল, “শাটার অর্ধেক নামান।” কে নামাল সেটা সে দেখল না। তার দরকার ছিল ড্রয়ার আর খাতা।

কাসেম চাচা তখনই নামাজ থেকে ফিরে দরজায় দাঁড়ালেন। মুখে ক্লান্তি, চোখে উদ্বেগ, কিন্তু তিনি ভেতরে ঢুকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দেখলেন হিসাবের টান কোথায় গিয়ে বাঁধা পড়েছে। তিনি শুধু নিজের পকেট থেকে সিল-মারা দিনের শিটটা বের করে কাউন্টারে রাখলেন—সেটা রাকিবা ভাবির দিকে নয়, মিতুর হাতের পাশে। এতটুকু সরে থাকা স্বীকৃতি, তবু দোকানের ভেতর যার দাম নগদের মতোই।

মিতু শিটটা টেনে নিল। “আগের তিনটা এন্ট্রি আমি নতুন করে বসাচ্ছি,” সে বলল, যেন বহুদিনের নিজের ভাষায় ফিরে এসেছে। কেউ তাকে থামাল না। সাব্বির চুপচাপ পাশের ক্রেট থেকে খুচরো নোটের বান্ডিল এনে তার নাগালের মধ্যে রাখল; আঙুল ছুঁয়ে গেল না, কিন্তু দূরত্বটাও আগের মতো রইল না। মিতু একবারও তার দিকে তাকাল না। এখন তাকানোর সময় নয়; এখন সংখ্যা, কালি, আর হাতের দখল।

বন্ধের হিসাব মিলতে মিলতে দোকান পাতলা হয়ে এল। বাইরে রাস্তায় শেষ বাসের হর্ন, দূরে ভাজা মরিচের গন্ধ, অর্ধেক নামানো শাটারের ফাঁক দিয়ে হেডলাইট কাটাকুটি করছে। মিতু শেষ বান্ডিলটা গুনে ড্রয়ারে রাখল, খাতার লাইনের নিচে সোজা দাগ টানল, তারপর রেজিস্টারের ভেতর থেকে ব্যবহৃত কাগজের রোলটা এক টানে ছিঁড়ে নিল। কাগজে টাটকা সংখ্যাগুলো স্পষ্ট, ড্রয়ার খোলা রইল হিসাব মিটিয়ে, আর কাউন্টারের ওই পাশটা নিঃসন্দেহে আবার তার নিয়ন্ত্রণে।