আমার জন্য খোঁড়া গর্তে সে পড়ল
শরীফা খালা নাজমার হাতে ঝুনঝুনে চাবিটা ছুঁড়ে মেরে বলল, “এটা এত দেরিতে ফেরত দেওয়ার পরে আবার ভেতরের লাইনে দাঁড়াবি? ওখানে না, লোডিং বেয়ের একদম কিনারায়। ঝাড়ু ধরে থাক।”
চাবিটা নাজমার তালুতে লাগল, ধাতব ঠান্ডা ছুঁয়ে গেল পুরোনো পোড়া জায়গা। কার্ডের ক্ষয়ে যাওয়া ধারও সঙ্গে ছিল; অফিসঘরের কাচের কাউন্টারে কতবার ঘষা খেতে খেতে নরম হয়ে গেছে। আজও সে ঠিক ভোরে এসেছে, ঢাকার কাঁপতে থাকা ট্রাফিক ঠেলে, দুই বাস বদলে, কৃষি-সরবরাহের গুদামের পেছনের গলিতে নামার আগে অর্ধেক চা ঠান্ডা হয়ে কাপের কিনারায় দাগ ফেলে গেছে। কিন্তু শরীফা খালার গলায় এমন ভঙ্গি, যেন নাজমা রাতভর চাবি লুকিয়ে রেখেছিল।
লোডিং বেয়ের সামনে হলুদ গ্যাফার টেপে সরু পথ কেটে দেওয়া, একপাশে পেঁয়াজের ক্রেট, অন্যপাশে সার-বীজের বস্তা। এই পথটা সে চেনে। আগের জীবনে—এই একই সকাল, এই একই গন্ধ, ডিজেলের ধোঁয়া, ভেজা পাটের তন্তু, ধাতব দরজায় হাতুড়ির মতো আঘাত—এই সরু পথেই তাকে আটকে দেওয়া হয়েছিল। তারপর রুটশিটে সই না থাকায় ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে, দোষ চাপানো হয় নাজমার নামে, আর শরীফা খালা আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে বলে বেড়ায়, “মেয়েটা কাজের না, ঘর সামলানোই ওর জন্য ভালো।”
আজ দ্বিতীয়বারের মতো সেই সকাল। নাজমা শুধু ঝাড়ুটা নিল না। ঝাড়ুর বাঁশের হাতলটাকে পায়ের কাছে ঠেলে সরিয়ে রাখল, যেন ভুল জায়গার জিনিস।
মতিন সাহেব, মালিকের খালাতো ভাই আর শরীফা খালার বিশেষ ভরসা, অর্ধেক খোলা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরে তার কাপে চা ঠান্ডা হয়ে পাতলা আস্তর ধরেছে। তিনি কপাল কুঁচকে দেখলেন, “কী হলো? কাজ থামিয়ে নাটক?”
শরীফা খালা সুযোগটা আরও চওড়া করল। “নাটক না, নিয়ম। আজ থেকে ও receiving lane-এ থাকবে না। রুট ছাড়ার কাগজও ছুঁবে না। যাদের ঘরে মেয়ে নেওয়ার কথা ওঠে, তাদেরও তো দেখতে হয়—কাজে গড়িমসি, জবাবদিহি নেই। রাকিব, তুই দাঁড়া, দেখ। এমন লোককে সামনে রাখা যায়?”
রাকিব তখন ফর্কলিফটের পাশে। নাজমার দিকে একবার তাকাল, তারপর দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। ছেলেটার মা শরীফা খালার আপন চাচাতো বোন; বিয়ের কথা একসময় উঠেছিল, পরে শরীফা খালা নিজে ছড়িয়েছিল, নাজমার মতো মেয়েকে ঘরে আনলে মান থাকবে না। আজ সে ইচ্ছে করেই রাকিবকে ডেকে দাঁড় করিয়েছে—কাজের অপমানটাকে ঘরের দরজায় বেঁধে দিতে।
নাজমা নিচু গলায় নয়, স্পষ্ট স্বরে বলল, “আমার কাজের জায়গা বদলাতে হলে রুটখাতায় লিখে দিন। মুখে না।”
এক মুহূর্তে দুই শ্রমিকের হাত থেমে গেল। একজনে বস্তা কাঁধে তুলে মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যজন প্যালেট জ্যাকের হাতল ধরে। শরীফা খালা ঠোঁট সরু করল। সে এমন জবাব চায়নি। “খাতা আমি লিখব, তুই দেখাবি? এই জন্যই তো—”
“লিখে দিন,” নাজমা আবার বলল, “কারণ পরে যদি ট্রাক দাঁড়ায়, সই যেখানে থাকবে, দোষ সেখানেই যাবে।”
এই ছিল প্রথম ফাঁটল। ছোট, কিন্তু দেখা যায়। মতিন সাহেব দরজার পাশে থেকে বললেন, “লিখেই দাও না। সময় নষ্ট কেন?” তার গলায় বিরক্তি, কিন্তু সেই বিরক্তি এবার শরীফার দিকে একটু ঘুরলও। কারণ গুদামের প্রথম ট্রাকটা খুলনা রুটে যাবে; দেরি মানে ক্ষতি।
শরীফা খালা পকেট থেকে রুটখাতা টেনে আনল। মোটা খাতা, কভার কোণ ভাঙা। সে পাতাটা উল্টে নাজমার বুকের দিকে ঠেলে ধরে লিখল—“নাজমা: বহির্পথে সহায়তা, রিলিজ নয়।” তারপর নিচে নিজের নাম টেনে দিল। কাগজ ছিঁড়ে একটা স্লিপও বানাল। “এই নে, তোর সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ।”
নাজমা স্লিপটা হাতে নিল। কালি এখনও ভেজা। এটাই দরকার ছিল। আগেরবার সে মুখের অপমান গিলে চুপ ছিল; আজ লিখিত অপমান ওদের হাতেই বেরিয়ে এল।
ট্রাকটা পেছিয়ে এসে বেয়ের মুখে ঠেকতেই জায়গা হঠাৎ টানটান হয়ে গেল। লোহার দরজা ওপরে উঠে আছে, ভেতর থেকে বস্তা-প্যালেট গড়িয়ে আসছে। হলুদ টেপের সরু পথ ধরেই শুধু রুটস্লিপ নিয়ে বেরিয়ে গাড়িচালকের হাতে দেওয়া যায়, তারপর রিলিজ সিল পড়ে, গেট খুলে। শরীফা খালা ইচ্ছে করেই নাজমাকে সেই পথের মুখে দাঁড় করাল, বাইরে-পথে সহায়তা নামে; যেন কেউ ধাক্কা দিলে দোষও তার।
“এখানেই থাক,” শরীফা খালা বলল, “সরে যাবি না। চালানের কাগজ আমি দেব।”
নাজমা মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে।”
বস্তা উঠছে, ক্রেট ঠুকছে, কাঁচা পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখ জ্বলে। রাকিব ফর্কলিফট ঘুরিয়ে আনল, কিন্তু হলুদ টেপের সরু রেখায় চাকা ফেলতে গিয়ে থামল; সামনে নাজমা, হাতে সেই সই-করা স্লিপ। ভেতর থেকে ড্রাইভার চিৎকার দিল, “কাগজ দেন! দেরি হইতেছে!” মতিন সাহেব কাঁধ ঝাঁকালেন, “শরীফা, দ্রুত করো।”
শরীফা খালা তখন বুঝল, নিজের হাতে নাজমাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যেখান দিয়ে না গেলে কাগজ গাড়িতে পৌঁছাবে না। তবু সে পথ ছাড়তে বললে নিজের লেখা মিথ্যা হয়ে যাবে—“বহির্পথে সহায়তা” লিখে ওই পথটাই তো নাজমার হাতে তুলে দিয়েছে। সে সামনে এসে হাত বাড়াল, “স্লিপটা দে, আমি পাঠাই।”
নাজমা স্লিপটা বুকের কাছে ভাঁজ না করে সোজা ধরে রাখল। “আপনি লিখেছেন আমি রিলিজ নই। তাহলে আপনার কাগজ আমার হাত ছাড়া যাবে কীভাবে? পথ তো একটাই।”
দুই পাশে মানুষ জমতে লাগল না; তারা কেবল কাজের জায়গা ছাড়তে পারছিল না। এটাই খারাপ। প্যালেট একদিকে আটকে, ট্রাকের ডালা খোলা, দরজা ওপরে, সবাই দেখছে কিন্তু কেউ সরে যেতে পারছে না। চাপা গুঞ্জনের বদলে শোনা গেল জিনিসের শব্দ—চাকার দাঁত কংক্রিটে খোঁচা দিচ্ছে, এক বস্তা সরে গিয়ে থপ করে পড়ল, কারও গ্লাভসের ঘষা। দৃশ্যটা একদম পরিষ্কার: পথের মুখে নাজমা, হাতে স্বাক্ষর-করা স্লিপ; শরীফা খালা তার সামনে, অথচ এগোতে পারছে না, কারণ সে-ই পথ বেঁধেছে।
মতিন সাহেব গলা কষালেন, “রিলিজ কোথায়?”
শরীফা খালা ঘুরে বলল, “আমার কাছেই—”
“কিন্তু যাচ্ছে না কেন?” এবার তিনি চৌকাঠ ছেড়ে একপা নামলেন। “ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে।”
শরীফা খালা নাজমার কাঁধের পাশ দিয়ে ঢুকতে চাইল। হলুদ টেপের ওপর পা ফেলতেই প্যালেট জ্যাকের মুখ ধাতব শব্দ করে থেমে গেল; ভেতর থেকে শ্রমিক বলল, “পথে মানুষ, স্যার।” রাকিব স্টিয়ারিং চেপে বসে আছে, তার কপালে ঘাম চকচক করছে। সে এবার চোখ তুলে বলল, খুব নিচু গলায়, কিন্তু সবার সামনে, “খালা, কাগজ ওর হাতে দেন। না হলে গাড়ি বের হবে না।”
শরীফা খালা যেন গিলে ফেলল কথাটা। “তুই চুপ।”
নাজমা তখনই দ্বিতীয় চালটা দিল। “ডিসপ্যাচ খাতা,” সে বলল। “যেহেতু আপনি আমাকে রুটের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, হস্তান্তরটা খাতায় লিখে দিন। কার কাছ থেকে কার হাতে গেল।”
মতিন সাহেব এবার স্পষ্ট বিরক্ত। “লিখো। এখনই।” তার এই বিরক্তি আর কাজে দেরির হিসেব, দুটো মিলেই শরীফার গলা শুকিয়ে দিল। কারণ লিখলে বোঝা যাবে, সে নাজমাকে রিলিজ থেকে সরিয়েও রুটের গলায় আটকে রেখেছে। না লিখলে ট্রাক যাবে না, আর দোষ সোজা তার।
শরীফা খালা খাতা টেনে আনল। হাত সামান্য কাঁপছে। পাতার ওপর চা-কাপের পুরনো গোল দাগ, তাড়াহুড়োয় নোংরা আঙুলের ছাপ। সে লিখল—“স্লিপ ও রুটশিট নাজমার মাধ্যমে চালকপক্ষ হস্তান্তর।” তারপর থামল। নাজমা সরে গেল না। “সিল?” সে জিজ্ঞেস করল।
“অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করিস না,” শরীফা খালা দাঁত চেপে বলল।
“সিল ছাড়া গেট ছাড়ে না,” নাজমা বলল। “আপনি তো জানেন।”
দরজার পাশের বাতাস যেন ধাতব। মতিন সাহেব আরেক পা এগিয়ে এলেন। “শরীফা, তোমার সিল দাও।”
এখানেই তার পুরোনো কৌশলটা উল্টে গিয়ে গলায় ফাঁস হল। সিল আর রিলিজ-টোকেন সবসময় শরীফা নিজের আঁচলের গিঁটে রাখত; সেই নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে সবাইকে ছোট করত। আজ সেই নিয়ন্ত্রণটাই দরকার, আর সেই নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকায় আটকে আছে পুরো লাইন। সে একবার রাকিবের দিকে তাকাল—কোনও সাহায্য পেল না। একবার নাজমার দিকে তাকাল—সেখানে অনুনয়ের জায়গা নেই, কেবল অপেক্ষা।
অবশেষে শরীফা খালা আঁচল খুলে ছোট লাল সিল-প্যাড, রাবারের সিল আর ধাতব রিলিজ-টোকেন বের করল। কারও হাতে দিতে তার কত কষ্ট হচ্ছে, তা দেখা যাচ্ছিল। যেন নিজের গলার স্বর খুলে দিচ্ছে। “নাও,” সে বলল, কিন্তু সোজা নাজমার হাতে দিতে পারল না; মাঝপথে থামল।
নাজমা হাত বাড়িয়ে নিল। “খাতায় সময় লিখুন,” সে বলল।
মতিন সাহেব নিজেই ঘড়ি দেখে বললেন, “সাতটা আট।”
শরীফা খালা লিখল। নাজমা তার সামনে, সবার চোখের মাঝে, রুটশিটের নিচে সিল বসাল। কালি চেপে ধরতেই কাগজ কেঁপে উঠল; তারপর ধাতব টোকেনটা ড্রাইভারের হাতে দিল। “খুলনা রুট, বের করেন।”
ড্রাইভার টোকেন নিয়ে একঝটকায় উঠে গেল। গেটের ভেতরকার ছেলেটা চেইন টেনে খুলল। রাকিব ফর্কলিফট সোজা করল, জ্যাক সরল, বস্তার সারি নড়ল। এতক্ষণ যে আটকে ছিল, সেই পুরো লাইন একসঙ্গে খুলে গেল—কিন্তু শরীফা খালার হাত ফাঁকা। তার সিল, তার টোকেন, তার লিখিত নির্দেশ—সব নাজমার ব্যবহারে রুট ছাড়ল। আর সেটা হল তার নিজের খাতার ওপর, নিজের লেখার নিচে।
শরীফা খালা বলল, “এটা—এটা নিয়মের বাইরে—”
নাজমা তাকে দেখলও না। সিলটা খাতার ওপর রেখে মতিন সাহেবের দিকে বলল, “আজকের প্রথম চালান বের হলো। পরের রুটের জন্য যিনি পথ আটকাবেন, তার নামও লিখে রাখা হবে।”
এ কথার পরে আর বড় কিছু লাগল না। বড় কিছু আগেই হয়ে গেছে। মতিন সাহেব খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিলেন, শরীফার হাতের কাছ থেকে। “আজ থেকে প্রথম বেয়ের ছাড়পত্র নাজমা দেখবে,” তিনি বললেন। “তুমি বাইরের আত্মীয়-টাতীয় নিয়ে কম ভাবো, রুট আগে ছাড়ো।”
শরীফা খালা যেন কিছু বলতে গিয়ে গলায় কাঁটা খেল। সে দাঁড়িয়ে রইল, ঠিক সেই সরু হলুদ পথের পাশে, যেটা দিয়ে নাজমাকে চেপে ধরতে চেয়েছিল। রাকিব তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ট্রাকের পেছনের লক দিচ্ছে; তার এই না-তাকানোই যথেষ্ট।
দ্বিতীয় ট্রাক ঢোকার হর্নে গুদামের ধাতব বাতাস আবার কেঁপে উঠল। নাজমা সিল-প্যাড, রিলিজ-টোকেন, খাতা—সব গুছিয়ে নিজের বগলের নিচে নিল। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে, বেয়ের বাইরে বাঁক নেওয়া রুটের কোণে এসে সে শুধু একবার পা ফেলল ধীরে। প্রথম ট্রাকটা তখন মোড় ঘুরে বেরিয়ে গেছে। মেঝেতে জোর করে কাটা পথের হলুদ গ্যাফার টেপের একধার ঘষা লেগে উঠে এসে আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছিল। নাজমা না পেছনে তাকিয়ে, না থেমে, সোজা হেঁটে গেল।