Fast Fiction

এক প্রশ্নেই ঘরটা ওদের বিরুদ্ধে গেল

গাড়ির দরজা খুলতেই দুজন বেয়ারা একসঙ্গে মেহরিনের দিকে ঘুরে বলল, “আপা, পরের ভিআইপি কারটা—” “ওকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই,” রাশেদা খালা কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়েই কথাটা কেটে দিলেন। “মেহরিন, তুমি সাইডে দাঁড়াও। আজ থেকে রিসিভিং দেখবে নাদিয়া। তোমার গলায় কার্ড ঝুললেই কেউ কর্ত্রী হয় না।”

ঢাকার বনানীর সেই অনুষ্ঠানস্থলের নামফলকের নিচে গাড়ির হেডলাইট এসে থামছিল একটার পর একটা। হর্ন, আতরের গন্ধ, ভেজা ফুলের মালা, কুর্তা-পাঞ্জাবির কড়া ইস্ত্রি, আর মেহরিনের গলায় ঝোলা পাতলা ভাঁজপড়া পরিচয়ফিতা—সবকিছু একসঙ্গে চোখে পড়ছিল। এই প্রবেশপথের গাড়ির সারি, কোন আত্মীয় আগে নামবে, কার শ্বশুরবাড়ির লোককে দরজায় কে নেবে, কোন জেলায় থেকে আসা খালাতো ভাইদের গাড়ি কোথায় থামাতে হবে—গত তিন সপ্তাহ ধরে এসব সে-ই ধরে রেখেছে। নিজের টাকায় দুবার রাতের খাবার বাদ দিয়ে চালক আর শ্রমিকদের চা খাইয়েছে। এখন, বিয়ের রাতেই, তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে।

মেহরিন সাইডে সরে গেল বটে, কিন্তু হাত থেকে নামের তালিকা ছাড়ল না। আরেকটা মাইক্রোবাস ঢুকতেই দারোয়ান অভ্যাসবশে তার দিকে তাকাল। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “ওটা কিশোরগঞ্জের মামাবাড়ির গাড়ি। পিছনের লেনে নিন। সামনে জায়গা রাখুন কনের নানার জন্য।” রাশেদা খালার মুখ শক্ত হয়ে উঠল। “আমি বলছি না? নাদিয়া, কাগজটা নাও।”

নাদিয়া আপা সাজগোজে ঝলমল করছিলেন; রিসেপশনের ফিতে ধরার ছবি তোলার জন্যই বেশি মানায় তাকে। তালিকা হাতে নিয়ে তিনি প্রথমেই থমকালেন। “এই যে… হুম… ‘মোঃ শহীদুল্লাহ, কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক’—এরা কারা?” চালক কাশেম দাঁত চেপে হাসি চেপে রাখল। মেহরিন একটুও এগোল না। সামনে থেকে কালো প্রাডো ঢুকল, পেছনে সাদা নোয়া। দুজন ভদ্রলোক দরজা খুলে নামতে গিয়ে একসঙ্গে চারদিকে তাকাচ্ছিলেন—কে নেবে, কোন পথে যাবে।

রাশেদা খালা এবার সরাসরি মেহরিনের হাত থেকে তালিকা কেড়ে নিতে গেলেন। “তোমাকে যা বলা হয়েছে, তা-ই করো। চাবিটাও দাও।” ওটা ছিল সামনের কাচের দরজার পাশের সঞ্চয়কক্ষের চাবি—যেখানে রিজার্ভ ফুল, পানির কেস, অতিরিক্ত নামফলক, আর গাড়ির ক্রম লেখা সাদা বোর্ড রাখা। মেহরিন চাবিটা মুঠোয় চেপে রাখল। “চাবি?” “যার দরকার, সে যেন জেনে নেয় ভেতরে কী আছে,” মেহরিন বলল। গলার স্বর উঁচু নয়, কিন্তু কাছের তিনজন আত্মীয়া শুনে ফেলল।

সেইটুকুই প্রথম ফাটল হল। রাশেদা খালা জোরে বললেন, “শুনছেন সবাই? কাজের মেয়ে হয়ে এখন শর্ত দিচ্ছে!” কথাটা এমনভাবে ছুড়ে দিলেন যেন মেহরিনকে যত নিচে নামানো যায় ততই নিরাপদ। সামনের গাড়ি থেকে নামা এক ভদ্রমহিলা কপাল কুঁচকে তাকালেন; তিনি স্পষ্ট বুঝলেন, যাকে তিরস্কার করা হচ্ছে, একটু আগেই সবাই তাকেই জিজ্ঞেস করছিল। মেহরিন সেই দৃষ্টি ধরল, কিন্তু কারও কাছে কিছু বোঝাতে গেল না। নাদিয়া আপা ইতিমধ্যে ভুল করে কনের বড়ফুফুকে পিছনের সিঁড়ির দিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফুফুর ছেলে উচ্চস্বরে বলছে, “এদিকে কেন? মূল দরজা কোনটা?”

রাশেদা খালা ঘুরে চেঁচালেন, “সায়েম! তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? তোমার বউ হতে চলা মেয়েটাকে বলো, সীমা মানতে।” সায়েম সিঁড়ির ধারে থেমে গেল। তার শেরওয়ানির কলারে হাত, মুখে সেই চেনা দুর্বলতা—যে দুর্বলতা সবসময় সবচেয়ে শক্ত লোকটার দিকেই ঝুঁকে থাকে। বিয়েটা তার বড়চাচাতো বোনের, কিন্তু মেহরিনকে সে-ই এনেছিল এই আয়োজনের কাজে; বলেছিল, “তুমি না থাকলে কেউ পারবে না।” এখন সে শুধু বলল, “খালা, একটু আস্তে…”

“আস্তে বললে কাজ চলবে?” রাশেদা খালা সোজা তার কথাও ডুবিয়ে দিলেন। “বিয়েবাড়িতে শৃঙ্খলা লাগে। আত্মীয় আর বাইরের লোকের জায়গা আলাদা।”

ওই ‘বাইরের লোক’ কথাটা আশপাশের বাতাসে এমনভাবে ছড়াল, যেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিনই সবচেয়ে অচেনা। অথচ চালকদের ফোনে ফোনে রুট পাঠিয়েছে সে, কনের বাবার ডায়াবেটিক খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে সে, ফুলওয়ালার টাকা আটকে গেলে নিজের বিকাশ থেকে অগ্রিম দিয়েছে সে। তার কাঁধে সারাদিনের দৌড়ঝাঁপের কড়া টান, হাতার কাছে ভাঁজ, পায়ের পাতায় জ্বালা—সবই আজকের রাতের জন্য। আর সেই রাতেই তার জায়গা কেড়ে নিয়ে সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে এমন একজনকে, যে তালিকায় লেখা জেলা আর সম্পর্ক পড়তেই গুলিয়ে ফেলছে।

এর মধ্যে তিনটা গাড়ি একসঙ্গে এসে পড়ল। একটায় কনের নানার বাড়ির লোক, একটায় ব্যবসায়ী অতিথি, আরেকটায় গ্রামের দিক থেকে আসা আত্মীয়। সামনের লেন বন্ধ। দুজন চালক একে অন্যকে হাত দেখাচ্ছে। দারোয়ান আবার তাকাল মেহরিনের দিকে। নাদিয়া আপা জড়িয়ে গেলেন, “আগে… উম… যাদের নাম বড়, তারা নামুক।” মেহরিন এবার প্রথমবারের মতো সামনে এক কদম এল। “নাদিয়া আপা,” সে বলল, “কোন গাড়িতে কনের নানা আছেন?” নাদিয়া চুপ। সে আরেকটু স্পষ্ট করল, সবার সামনে, রাশেদা খালার দিকেই চোখ রেখে—“আর কৃষি ব্যাংকের শহীদুল্লাহ সাহেব কোন পক্ষের, সেটা জানেন?”

প্রশ্নটা ছুরি হয়ে গেল। ব্যাখ্যা নয়, অভিযোগ নয়—শুধু ফেরত দেওয়া প্রশ্ন। রাশেদা খালার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু উত্তর বেরোল না। তিনি তালিকার ওপর চোখ বুলিয়ে নাম খুঁজতে গিয়ে দেখলেন, কাগজ তিনি ঠিকমতো ধরতেই জানেন না; কোন লাইন গাড়ির, কোন লাইন টেবিল নম্বর, আলাদা করতে পারছেন না। কাশেম চালক মাথা কাত করে অপেক্ষা করছে। দারোয়ানের হাত থেমে আছে মাঝআকাশে। যাদের নামানো হবে তারা গাড়ির ভেতরেই বসে আছে, এয়ারকন্ডিশনের কুয়াশা জমা কাচের আড়াল থেকে বাইরে দেখছে।

মেহরিন থামল না। “সামনের কালো গাড়িটা কনের নানার। উনি হাঁটেন ধীরে। তাকে সোজা বামদিকের র‍্যাম্পে নিতে হবে। পেছনের সাদা নোয়ায় কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শহীদুল্লাহ সাহেব, আব্বুর অফিসের সম্মানিত অতিথি, ওদের ডানদিকের কার্পেট এন্ট্রি। আর যে মাইক্রোবাসটা আটকে আছে, ওরা ময়মনসিংহের মামাতো ভাইরা; ওদের আগে ঢুকতে দিলে ছবির লাইনে ভেঙে পড়বে।”

এইবার লোকজন তার দিকে যেভাবে তাকাল, তাতে করুণা ছিল না, খালি চেনা সত্যিটা ছিল। কে কোথায় দাঁড়াবে, কোন গাড়ির দরজা আগে খুলবে—মুহূর্তেই সেটার কেন্দ্র বদলে গেল। কাশেম কোনো আদেশের অপেক্ষা না করে মেহরিনের দেখানো মতো স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিল। দারোয়ান ডানদিকে দরজা খুলে ধরে বলল, “এই পথ, নানাজি।” রাশেদা খালা চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি বলছি থামো—” কেউ থামল না।

এবার দৃশ্যটা দ্রুত বদলাতে লাগল। আরেকটা গাড়ি ঢুকল, চালক জানালা নামিয়ে সরাসরি মেহরিনকে জিজ্ঞেস করল, “আপা, কনের ফুফুর গাড়ি।” “সামনের ছাউনির নিচে পাঁচ মিনিট। তারপর সরিয়ে নিন।” একজন বেয়ারা ফুলের ঝুড়ি নিয়ে তার দিকে দৌড়ে এসে বলল, “এই মালাটা কার হাতে দেব?” “প্রথমে নানার। তারপর বড়ফুফু।” নাদিয়া আপা তালিকা হাতে দাঁড়িয়েই থাকলেন; কেউ আর তার কাছে কিছু চাইছে না। রাশেদা খালার প্রতিটি নির্দেশ হাওয়ায় ঝুলে যাচ্ছে, যেন মাইকের তার খুলে গেছে। আত্মীয়ারা চোখাচোখি করছে; একটু আগের ‘কাজের মেয়ে’ কথাটা এখন তার নিজের গায়েই ফিরে লেগে আছে, কারণ কাজ কার হাতে আছে সেটা সবাই সামনে দেখছে।

কাঁচের দরজার ভেতর করিডোরে টিউবলাইটের মৃদু গুঞ্জন, বাইরে হেডলাইটের ঝলক, আর দরজার সামনে জমে ওঠা লেনচাপা উত্তেজনার মাঝখানে কনের দাদা, হাফপ্যান্টের ওপর পাঞ্জাবি চাপিয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে এলেন। “এই লাইন কে দেখছে? অতিথিরা বাইরে আটকে কেন?” রাশেদা খালা তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গেলেন। “আমি সামলাচ্ছি, শুধু এই মেয়েটা—” “সামলাচ্ছেন?” দাদার গলায় বয়সের কাঁপন, কিন্তু কথায় কড়া লোহা। “নানাভাই গাড়িতে বসে আছেন, আর আপনি সামলাচ্ছেন?”

তিনি চোখ ফেরালেন মেহরিনের দিকে। এই বাড়ির বড়রা তাকে নাম ধরে চেনে, কিন্তু কখনও নিজেদের লোকের জায়গায় দাঁড় করায়নি। আজ তার দিকে তাকানোর ভঙ্গি অন্যরকম—ব্যস্ত, প্রয়োজনী, প্রকাশ্য। “তুমি বলো, কী লাগবে?”

রাশেদা খালা বাধা দিলেন, “ওকে এত সামনে আনার দরকার নেই। আত্মীয়রা আছে—” দাদা হাত তুলে তাকে থামালেন। “যে জানে, সে-ই সামনে থাকবে। এখনই লাইন ঠিক করো।”

মেহরিন এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। “তাহলে সবার সামনে শোনেন,” সে পরিষ্কার গলায় বলল, যেন দরজা, কার্পেট, গাড়ি, আত্মীয়—সবাই শুনতে পায়। “এই মুহূর্ত থেকে সব গাড়ির আগমন, নাম ডাকা, আর কোন অতিথি কোন দরজা দিয়ে ঢুকবে—ওই সিদ্ধান্ত আমি নেব। তালিকা আমার হাতে থাকবে। ভেতরের সঞ্চয়কক্ষের চাবিও আমার কাছেই থাকবে। যিনি আমাকে সরিয়ে দিয়ে কাজ চালাতে চান, তিনি আগে গাড়ি, সম্পর্ক আর ক্রম চিনে দেখান; না পারলে আমার কথায় চলতে হবে। বিয়ের লাইন আমি ঠিক করব, নইলে এই দরজা এগোবে না।”

কথাগুলো বলেই সে তালিকাটা বুকের সামনে তুলে ধরল। শোনা গেল, পেছনের গাড়িতে বসা কেউ বিরক্তিতে কাচ নামাল; সময় নষ্ট মানে মুখে দাগ। ঠিক সেইখানেই দাদা বললেন, একদম জোরে, “যা বলেছে, তাই হবে। মেহরিন, তুমি দাঁড়াও সামনে। যার আপত্তি আছে, সে আমার সঙ্গে কথা বলবে—এখন না।”

রাশেদা খালার মুখ থেকে রঙ সরে গেল। তিনি আরেকবার শেষ চেষ্টা করলেন। “একটা বাইরের মেয়েকে—” দাদা তাকালেনও না। “চুপ। নানাভাইকে আগে নামাও।” এটাই ছিল পতন। সামনে দাঁড়ানো দুই বেয়ারা একসঙ্গে মেহরিনের দিকে ঘুরল। কাশেম গাড়ির দরজা খুলে মাথা নত করল। ভেতরের সম্মানিত অতিথিকে ডাকার আগে সে মেহরিনের ইশারা দেখল। নাদিয়া আপা চুপচাপ তালিকাটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে বুঝলেন, কেউ তা নিতে বলছে না; মেহরিন নিজেই হাত বাড়িয়ে কাগজ টেনে নিল। রাশেদা খালার গলায় আদেশের বদলে শুকনো হাওয়া।

লাইন তখন মেহরিনের তালে চলতে শুরু করেছে। “নানাজিকে ধীরে নামান… মালাটা দিন… শহীদুল্লাহ সাহেব, এই পথে… মামাতো ভাইরা, দুই মিনিট অপেক্ষা…” প্রতিটি নামের সঙ্গে প্রতিটি পথ ঠিক জায়গায় বসে যাচ্ছে। আত্মীয়রা দরজার কাছে এসে যার দিকে মাথা নাড়ছে, সে মেহরিন। কেউ আর জিজ্ঞেস করছে না, সে কার কী। আজ রাতে সে-ই প্রবেশের মুখ।

সবচেয়ে শেষে, যখন ভিড় একটু কেটে গেছে কিন্তু দরজা এখনো খোলা, রাশেদা খালা পাশ থেকে নরম গলায় বললেন, “চাবিটা দাও, আমি রাখি। তোমাকে ভেতরে গিয়ে বসতেও হবে।” নরম গলাটাই অপমানের শেষ রূপ—যখন প্রকাশ্যে হার মেনে নরম হতে হয়। মেহরিন তার দিকে তাকাল না। সঞ্চয়কক্ষের সেই দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবিটা সে খালার হাতে না দিয়ে পাশের হিসাবরক্ষকের টেবিলে রাখল, তারপর তুলে নিল দরজার পাশের নোটিশ-ওয়ালে ঠেস দেওয়া সাদা নামফলক। আগের নামটা খুলে সে কালো মার্কারে লিখল— আগমন ও প্রবেশ তদারকি: মেহরিন তারপর চাবিটা নামফলকের নিচের হুকে ঝুলিয়ে দিয়ে বলল, “চাবি এখন কাজের জায়গায় থাকবে, কারও মুখের ইজ্জতের ভেতর না,” এবং খোলা দরজার পাশে নোটিশ-ওয়ালে তার নামের কালো অক্ষরগুলো স্থির হয়ে রইল।