Fast Fiction

লাইনটা শেষমেশ আমার জন্য ভাঙল

“ওকে পেছনে রাখেন,” রিমি ভাবি হাত তুলে বেঞ্চের দিক দেখাল, যেন ভেন্যুর লোকজনও তার বাপের চাকর। “আগে কনের মামারা, তারপর আমাদের দিক। মেহরীন দাঁড়াক।”

ঢাকার পুরোনো কমিউনিটি সেন্টারের রেজিস্ট্রেশন লবিতে তিনটা লাল প্লাস্টিকের বেঞ্চ। সামনের বেঞ্চে বাতাস লাগে, পেছনেরটায় গরম জমে থাকে। মেহরীনকে ঠেলে সেই পেছনের বেঞ্চের ধারে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো, যেখানে এক কাপ চা অনেকক্ষণ আগে রেখে দেওয়া হয়েছে, ঢাকনার চারপাশে বাদামি গোল দাগ শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। সকাল থেকে দৌড়াদৌড়িতে তার শাড়ির কুঁচি ভেঙে গেছে, কাঁধে ব্যাগের ফিতা চেপে রেখা কেটে দিয়েছে। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নীল কালি লেগে আছে—দুপুরে অফিসে কৃষি-ঋণের ফর্মে সই করাতে করাতে কলম ফেটেছিল।

খালা মুখ টিপে বললেন, “মেয়েমানুষ বেশি সামনে থাকলে লোকজন কথা বলে। তুই একটু বুঝে থাক।”

মেহরীন বসেনি। পেছনের বেঞ্চের লোহার পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। আজকের এই অনুষ্ঠান শুধু বিয়ের সংবর্ধনা না—দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে নাবিলের পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে কাকে কতটা জায়গা দেয়, সেটাও দেখা হবে। ছয় মাস ধরে সব আয়োজনের তালিকা, অগ্রিম টাকা, খাবারের বাছাই, লাইভ বিক্রির জন্য নাবিলের অনলাইন পাতায় সাজসজ্জার প্রচার—সবই মেহরীন সামলেছে। তবু দরজার সামনে তাকে এমনভাবে সরানো হচ্ছে, যেন সে বাড়তি কেউ।

রেজিস্টার-ডেস্কের ছেলেটা নামের তালিকা হাতে নিয়ে ডাকছিল। “কনের পক্ষ—শাহেদ সাহেবের পরিবার?”

রিমি ভাবি সঙ্গে সঙ্গে উঠে সামনের বেঞ্চ থেকে ওড়না গুছিয়ে কাউন্টারের গায়ে প্রায় হেলে পড়লেন। “এইদিকে, এইদিকে। আর শোনেন, বরপক্ষের ভেতরের লোক আগে যাবে। কাগজও আমাদের কাছে।”

মেহরীন ঠান্ডা গলায় বলল, “কাগজ আমার ব্যাগে।”

এক মুহূর্তে কয়েকটা মাথা ঘুরল। ছেলেটা তালিকা থেকে চোখ তুলে তাকাল। “আপনি মেহরীন আপা?”

“জি।”

সে তড়িঘড়ি সোজা হয়ে দাঁড়াল। “আপনার নম্বরই তো আগে ছিল। নাবিল ভাই বলছিলেন, যিনি পেমেন্টের রশিদ আর লাইভ-স্ট্রিমের ভেন্ডর কনফার্ম করেছেন, তাকে ডাকতে।”

এটাই প্রথম টান। সামনের বেঞ্চে বসা দুই খালাতো ভাইয়ের হাঁটু সরল। রিমি ভাবির মুখে হাসি রইল, কিন্তু ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। তিনি দ্রুত বললেন, “ও তো বাইরে-বাইরে কাজ করেছে। ভেতরের বড়দের নাম আগে লিখেন। মেয়েটা পরে আসুক।”

মেহরীন ব্যাগ খুলে ফাইল বের করল। রশিদের কপি, হলের বাকি টাকার চেক, খাবারের আপডেট—সব একসঙ্গে। “নাম লেখা শেষ হবে কাগজ দেখে। কাগজ এখানে।”

রেজিস্টার-ডেস্কের ছেলেটা ফাইল নিতে সামনে এগোতেই রিমি ভাবি মাঝখানে হাত রাখলেন। “আমাকে দেন। আমি বুঝি।”

মেহরীন ফাইল ছাড়ল না। তার আঙুলের নীল কালি রিমি ভাবির নখে একটুখানি লেগে গেল। চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা এবার পুরোটা দেখল। ছেলেটা কাশল, তারপর রশিদের ওপর চোখ বুলিয়ে বলল, “আপা, আপনি সামনে আসেন। একটা সই লাগবে।”

পেছনের বেঞ্চ থেকে সামনের দিকে যাওয়ার সেই ছোট্ট ফাঁকটা হঠাৎ খোলা হলো। রিমি ভাবি পথ ছাড়েননি; কিন্তু ছেলেটা পাশের দড়ি খুলে দিল, যেটা দিয়ে লাইন ঘুরিয়ে রাখা ছিল। “এইদিকে, আপা।”

মেহরীন সরাসরি গিয়ে কাউন্টারের কাছে দাঁড়াল। দড়ির নতুন ফাঁকে রিমি ভাবি আর প্রথম থাকলেন না। তাকে পিছিয়ে দাঁড়াতে হলো, আর সামনের বেঞ্চে বসা মামারা নিজেদের লুঙ্গি-স্যান্ডেল সামলে জায়গা ঠিক করতে করতে বুঝল, ক্রমটা বদলেছে।

“এইসব কী!” খালা এবার একটু জোরে বললেন। “ছোট মেয়েকে এত সামনে তোলার কী দরকার? আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, ভাবমূর্তি বলে কিছু আছে।”

রিমি ভাবি সুযোগটা কুড়িয়ে নিলেন। “তাই তো বলছি। আজকে যদি ওকে ভেতরে আগে নেওয়া হয়, কাল থেকে সবাই বলবে, ছেলের বাড়ির সিদ্ধান্ত নাকি বাইরে থেকে কেউ চালায়। নাবিল কোথায়? ও থাকলে বুঝত।”

সিঁড়ির মাথার লিফটের ধাতব দরজায় ময়লা আঙুলের দাগ জমে আছে। সেখানে এক ঝলকে নিজের মুখ পড়ল মেহরীনের—ঘাম, ক্লান্তি, টানটান চোয়াল। তারপরই কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল নাবিলের বড় চাচা, সঙ্গে ভেন্যুর ব্যবস্থাপক। পেছনে নাবিল। গাঢ় পাঞ্জাবির কলার খোলা, যেন সে দৌড়ে এসেছে। চোখ প্রথমে কাউন্টারে, তারপর মেহরীনের হাতে ধরা ফাইলে, তারপর রিমি ভাবির মুখে।

রিমি ভাবি এক লহমায় গলা নরম করলেন। “দেখো না, আমরা তো শুধু শৃঙ্খলা রাখছিলাম। মেহরীন একটু আবেগী—”

“আবেগী না,” মেহরীন কেটে দিল। “আমাকে পেছনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। কাগজ নিতে দেননি। এখন বলছেন শৃঙ্খলা।”

নাবিল কিছু বলার আগেই বড় চাচা ভ্রু কুঁচকে বললেন, “মেয়ের নাম এত সামনে উঠলে কথা হবে। রেজিস্ট্রেশন আগে, সংবর্ধনা পরে। কনের ঘরের লোক কী ভাববে?”

ব্যবস্থাপকও দ্বিধায় পড়ল। তার হাতে হলঘরের প্রবেশ-তালিকা, অতিথি চলাচলের চিহ্ন, মাথার টেবিলের বসার কার্ড। সে বুঝছে কার কথা শুনবে, কিন্তু ভুল করলে কার কাছে জবাব দেবে সেটাও বুঝছে। রিমি ভাবি সেই দোটানায় আরও চাপ দিলেন। “মাথার টেবিলে আমার কার্ড গেছে। বরপক্ষের বড় বউ আমি। বাইরে লোকজন দেখবে। এখন যদি ক্রম উলটে দেন, সবার সামনে কেলেঙ্কারি হবে।”

মেহরীন প্রথমবার নাবিলের চোখে সরাসরি তাকাল। “তুমি চুপ থাকলে আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব। কিন্তু আমার নামে অগ্রিম গেছে, আমার নামে সরবরাহকারী ঢুকেছে, তোমার অনুষ্ঠান আজকে কার হাতে টিকে আছে, সেটা সবাই জানবে। এখনই জানবে।”

লবির বাতাস গরম ছিল, কিন্তু ওই কথার পর হঠাৎ সবকিছু তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। কাউন্টারের পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা তালিকার পাতায় আঙুল থামিয়ে রাখল। বড় চাচা গলা খাঁকারি দিলেন, যেন কথা শুরু করবেন। রিমি ভাবি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওড়না টেনে বুক ঢাকলেন, সেই ভঙ্গি যার ভেতরে দাবি লুকানো থাকে—আমি সামনের মানুষ, আমাকে সরানো যায় না।

নাবিল ধীরে ধীরে সামনে এল। “তালিকাটা দিন।”

রেজিস্টার-ডেস্কের ছেলেটা কাঁপা হাতে তালিকা বাড়াল। নাবিল একবার ওপর থেকে নিচে দেখে বলল, “প্রথম প্রবেশ—মেহরীন। রেজিস্ট্রেশন, ভেন্ডর ক্লিয়ারেন্স, লাইভ সম্প্রচারের অনুমতি—সব ওর হাতে হয়েছে। ও আগে যাবে।”

রিমি ভাবি হাসলেন, সেই হাসিতে বিষের চিকচিক। “নাবিল, লোকজন আছে। যাকে নিয়ে তোমাদের কিছু আছে, তাকে আলাদা করে মান দিতে চাইলেই হয় না। ঘরের নিয়ম আছে।”

“আলাদা করে না,” মেহরীন বলল, এবার এত স্পষ্ট যে পেছনের বেঞ্চ পর্যন্ত শুনল, “আমার জায়গা ফিরিয়ে দিলেই হবে।”

বড় চাচা কড়া স্বরে বললেন, “মেয়েটা ভাষা শিখুক আগে।”

এইবার নাবিল থামল না। সে ব্যবস্থাপকের হাত থেকে মাথার টেবিলের কার্ডগুলো নিয়ে নিল। সাদা মোটা কাগজ, সোনালি অক্ষর। একটা কার্ডে লেখা—“রিমি আপা।” আরেকটায় ফাঁকা রেখা, এখনও নাম বসানো হয়নি। লবির সবাই সেটা দেখতে পাচ্ছে। নাবিল রিমি ভাবির কার্ডটা দুই আঙুলে ধরে বলল, “এটা ভুল গেছে।”

রিমি ভাবি এগিয়ে এলেন। “দাও। এসব পরে ঠিক হবে।”

“পরে না।” নাবিল কার্ডটা কাউন্টারের ওপর রাখল, তারপর সবার সামনে ছেলেটাকে বলল, “শুনেন। প্রথম ডাকবেন মেহরীনকে। ভেতরে মাথার টেবিলের বাঁ পাশে, আমার পাশের চেয়ার—ওর নামে কার্ড বসাবেন। রিমি ভাবির কার্ড উঠিয়ে ফেলেন।”

এক মুহূর্তে দৃশ্যটা চোখে পড়ার মতো বদলে গেল। ব্যবস্থাপক সোজা হয়ে দাঁড়াল। রেজিস্টার-ডেস্কের ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে তালিকার প্রথম লাইনে টিক দিল। সামনের বেঞ্চে যারা আগে হেলান দিয়ে বসেছিল, তারা গা সরিয়ে নিল। আর রিমি ভাবির মুখের রঙ এমনভাবে নামল, যেন কেউ সবার সামনে তার চুড়ির শব্দ থামিয়ে দিয়েছে।

“তুমি পাগল হয়েছ?” রিমি ভাবির গলা এবার চিকন। “আমার কার্ড তুলবে? এইসব আত্মীয়স্বজনের সামনে?”

নাবিল এবার তার দিকে না তাকিয়ে বলল, “মেহরীন, তুমি আগে যাও।”

মেহরীন নড়ল না। “শুধু আগে গেলে হবে না।”

নাবিল তার দিকে তাকাল। চারপাশে খালারা, চাচারা, কনের পক্ষের লোক, ভেন্যুর ছেলেরা—সবাই অপেক্ষা করছে, কে শেষ কথা বলে। মেহরীনের কাঁধে ব্যাগের ফিতার চাপের দাগ লাল হয়ে আছে। তার হাতে এখনও নীল কালি। সে স্পষ্ট গলায় বলল, “এখানেই বলো আমি কে। যাতে আর কেউ আমাকে পেছনে দাঁড় করাতে না পারে।”

রিমি ভাবি ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো এক পা এগোলেন। “এই মেয়ের এত সাহস!”

সেটাই তার ভুল হলো। সবাই তার ওই এগিয়ে আসা দেখল—কার্ড হারাতে থাকা মানুষের মরিয়া তেড়ে আসা। নাবিল হাত তুলে তাকে থামাল, আর সেই থামানোর ভঙ্গিতে প্রথমবার বোঝা গেল কার নির্দেশ আসল। “কেউ মেহরীনের পথ আটকে দাঁড়াবে না,” সে বলল। তারপর পরিষ্কার, ধীর, গায়ে কাঁটা-দেওয়া স্বরে যোগ করল, “ও আমার বেছে নেওয়া মানুষ। আজকের ভেতরের সব প্রথম অধিকার ওর। নাম লিখেন—মেহরীন নাবিলের সঙ্গে।”

বড় চাচা কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। ব্যবস্থাপক যেন আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল; সে ঝট করে ফাঁকা কার্ডে কলম চালাল। রেজিস্টার-ডেস্কের ছেলেটা প্রায় দৌড়ে দড়ি আরও সরিয়ে দিল। “আপা, এইদিকে। আগে আপনি।”

রিমি ভাবি এবার সত্যি আটকে গেলেন—লাইনের বাইরে, বেঞ্চের পাশে, নিজের কার্ড ছাড়া। তার মুখ খোলা, কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না। খালা নিচু গলায় কিছু বলতে চাইলেন, তারপর থেমে গেলেন; কারণ কাউন্টারের ওপর থেকে রিমি ভাবির কার্ড ইতিমধ্যে সরিয়ে একপাশে উল্টে রাখা হয়েছে। সোনালি অক্ষর দেখা যাচ্ছে না।

মেহরীন সামনে এগিয়ে গেল। প্রবেশদ্বারের কাছে এসে থামল না; বরং ব্যবস্থাপকের হাত থেকে নতুন কার্ডটা নিল। সাদা মোটা কাগজে তাড়াহুড়োর কালিতে লেখা—“মেহরীন।” সে একবার দেখে নিল, তারপর বলল, “বাঁ পাশে না। পাশাপাশি রাখবেন। আর প্রসেশন লাইনের শুরুতে আমার নাম আগে যাবে।”

ব্যবস্থাপক মাথা নেড়ে ভেতরে দৌড়াল। কাঁচের দরজা খুলতেই ভেতরের আলো লবির গরমের ওপর সাদা চাপ ফেলল। বেঞ্চে বসা, দাঁড়িয়ে থাকা, ফিসফিস করা সবাইকে পাশ কাটিয়ে মেহরীন সেই দরজা দিয়ে ঢুকে গেল, আর এবার কেউ তাকে থামানোর ভঙ্গিও করল না। দড়ি সরানো, তালিকায় টিক, কার্ড বদল—সব একসঙ্গে হয়ে গেছে; ফেরানো যাবে না।

ভেতরের প্রসেশন লাইনের পাশে মাথার টেবিল সাজানো। সাদা টেবিলক্লথের ওপর এক পাশে “নাবিল” রাখা, তার ডানদিকে নতুন কার্ডটা মেহরীন নিজেই বসাল। যেখানে রিমি ভাবির কার্ড থাকার কথা ছিল, সেখানে কিছু নেই—শুধু টেবিলক্লথের কোণা একটু তুলে ছিল, সে আঙুল দিয়ে সেটুকু নামিয়ে দিল। কাপড়টা নেমে এসে ফাঁকা জায়গার ওপর মসৃণ হয়ে স্থির হলো।