Fast Fiction

এক পরীক্ষাতেই সব ফাঁস

গেটের ভেতর ঢুকতেই নাজিয়া দেখল তার সেতারের বাক্সটা খুলে রাখা, আর তার নাম-লেখা সাদা কাগজের ওপর কালো মার্কার টেনে লিখে দেওয়া হয়েছে—“রাইসা রহমান: লাইভ রাউন্ড।” পাশের মঞ্চ থেকে ঘোষকের গলা ভেসে আসছে, আলো গরম হয়ে side wing পর্যন্ত এসে পড়ছে। এক স্বেচ্ছাসেবক নাজিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলল, “আপা, আপনি একটু সরে দাঁড়ান। এই লেনটা রাইসা আপার ওঠানামার জন্য।”

নাজিয়ার হাতে ধরা মেট্রোর কার্ডের ক্ষয়ে যাওয়া ধারটা আঙুলে কেটে যাওয়ার মতো ঠেকল। তিন মাস ধরে সে মোহাম্মদপুরের ভাড়ার ঘরে রাত জেগে রাগ ভূপালী, ইয়ামন, বেহাগ কষেছে; টিউশনি করে ভাড়া, মায়ের ওষুধ, আর মাহিন স্যারের ফি জুগিয়েছে। আজকের লাইভ রাউন্ডটাই ছিল তার দরজা। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই সে দেখল, দরজাটা অন্য কারও নামে খোলা।

রাইসা আপা বসে আছে মেকআপ-লাইটের নিচে, গলায় হালকা মলমলের ওড়না, কপালে ঝকমকে টিপ। তার খালা দুই বিচারকের টেবিলের কাছে গিয়ে নিচু গলায় হাসছে; আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা এখানে বাতাসের মতো ছড়ানো। রাইসা নাজিয়ার সেতারের তারে একবার ছুঁয়ে মুখ কুঁচকে বলল, “এটা এত শক্ত করে বাঁধা কেন? আমার হাতে কাটে। তানভীর, আমার জন্য নরম সেট-আপ করো।”

তানভীর, যে দুই সপ্তাহ আগেও নাজিয়াকে মেসেঞ্জারে লিখেছিল “তুইই পারবি,” আজ চোখ নামিয়ে শুধু বলল, “উপরে থেকে নির্দেশ আছে।” তারপর সেতারের মিজরাব-দানি তুলে রাইসার পাশে রাখল। নাজিয়ার দিকে না তাকিয়েই।

মাহিন স্যার এসে থামলেন, কিন্তু থামাটাও যেন দূরে থেকে। তার সাদা পাঞ্জাবির পকেটে পুরনো নীল কলমের কালি ছড়িয়ে দাগ পড়ে আছে। তিনি ধীর গলায় বললেন, “নাজিয়া, এখন গোলমাল করিস না। লাইভ অনুষ্ঠান। বসে থাক। সুযোগ এলে দেখা যাবে।” সুযোগ এলে—এই কথাটাই সবচেয়ে নোংরা। কারণ সুযোগ তো তার হাতেই ছিল, এখন সেটাই কেড়ে নিয়ে তাকে অপেক্ষার ভদ্র ভাষা শোনানো হচ্ছে।

একজন আয়োজক প্লাস্টিকের ভাঁজচেয়ার এনে side wing-এর একেবারে কোণায় রাখল, যেখানে পর্দার খুঁটির আড়াল পড়ে। “আপনি এখানে বসেন,” সে বলল, “মঞ্চের সামনে যাবেন না। ক্যামেরায় পড়ে যাবে।” চেয়ারের পাশে কাগজের কাপে রাখা চা ঠান্ডা হয়ে ওপরে পাতলা আস্তর ধরেছে, টেবিলে গোল দাগ পড়ে আছে। নাজিয়াকে এমন জায়গায় বসানো হলো, যেন সে প্রতিযোগী না, বাড়তি মালপত্র।

সে বসল না। সেতারের বাক্সের হাতলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। রাইসা আপা চোখ তুলে দেখে ঠান্ডা হাসল। “দেখো, প্রতিভা থাকলেই হয় না। উপস্থাপনাও লাগে। লাইভ স্টেজে স্থির থাকতে হয়।” কথাটা বিচারকদের শোনানোর মতো করে বলা। পাশেই রাইসার খালা যোগ করল, “মেয়েটা গ্রামের দিকের, কষ্ট করে শিখেছে, ভালো। কিন্তু এত বড় উৎসব... সব লেভেলের না।”

নাজিয়া শুধু বলল, “সেতারটা আমার।”

“আজকের স্লটও আমার,” রাইসা আপা জবাব দিল। “প্রোগ্রাম আপডেট হয়েছে।”

মঞ্চে আগের প্রতিযোগীর তবলা থামল। ঘোষক পরের নাম বলার আগে sound check-এর জন্য রাইসাকে ডাকা হলো। সে সেতারটা কোলে তুলে নিল, কিন্তু বসার ভঙ্গিতেই ফাঁক ছিল—গোড়া নড়বড়ে, বাঁ হাতের কবজি শক্ত, ডান হাতে মিজরাব ধরা সাজানো। নাজিয়া এক পা এগোলেই তানভীর তার সামনে দাঁড়াল। “দাঁড়া,” সে ফিসফিস করল, “এখন গেলে ওরা তোকে security দিয়ে বের করবে।”

রাইসা প্রথম ঝংকার দিতেই টুং শব্দটা কেঁপে গিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। দ্বিতীয় তারে হাত দিলে ঝনঝন করে বেসুরো গর্জন উঠল; বাজনার ভেতরে খালি টিনের মতো আওয়াজ। বিচারকদ্বয়ের একজন কপাল কুঁচকে বললেন, “জওয়ারি বসেনি? এই সাউন্ডে লাইভ হবে না।”

রাইসা আপা তাড়াতাড়ি তানভীরের দিকে তাকাল। “মনিটরে সমস্যা।”

“মনিটরে না,” নাজিয়ার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল। তার গলা উঁচু নয়, কিন্তু কাছে দাঁড়ানো সবাই শুনল। “পর্দা তারটা ঘেঁষে গেছে। আর বাজের জওয়ারির নিচে সুতা সরে আছে।”

সবাই তার দিকে ফিরল। ওই এক মুহূর্তে side wing-এর বাতাস বদলায় না, বরং আটকে যায়। রাইসা হেসে উঠতে চাইল। “তুমি দূর থেকে বুঝলে?”

নাজিয়া আর উত্তর দিল না। তানভীরের কাঁধ এড়িয়ে সে সোজা সেতারের কাছে গেল। কেউ “এই” বলল, কেউ হাত বাড়াল, কিন্তু বিচারকের কণ্ঠ আগে এলো—“দেখুক।”

নাজিয়া হাঁটু গেড়ে বসল। বাঁ হাতে প্রধান তার সামান্য উঠিয়ে ডান হাতের নখের ডগায় জওয়ারির নিচের কালচে সুতাটা এক চুল টেনে বের করল, তারপর পর্দা আর তারের মাঝখানে আটকে থাকা সূক্ষ্ম সুতোর কণা ছাড়িয়ে দিল। সে তারটাকে পুরো টানল না; শুধু কুনি ঘুরিয়ে অর্ধেক স্বর নামাল, মিজরাব দিয়ে একবার ধীরে ঝংকার দিল, সঙ্গে সঙ্গে চিকারি ছুঁয়ে মিলিয়ে নিল। এবার আওয়াজ বেরোল কাঁচের ওপর পানি পড়ার মতো পরিষ্কার, দীর্ঘ, টানটান। বেসুরো গর্জন নেই, ঝাপসা নেই—খোলা সা side wing-এর কাপড়, লাইট, মানুষের গুঞ্জন ভেদ করে উঠে গিয়ে মঞ্চের কালো পর্দায় ঠেকল।

রাইসার মুখের গায়ের রঙ এক ধাপ সরে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে সেতারটা ফিরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু বিচারক হাত তুলে থামালেন। “আবার,” তিনি বললেন।

নাজিয়া না তাকিয়েই দ্বিতীয়বার ঝংকার দিল, তারপর মীড় টেনে রে-গা ছুঁয়ে আবার সা-তে ফিরল। এইটুকু পথেই স্পষ্ট হয়ে গেল, যন্ত্র কোথায় খোলে, আর কার হাতে খুলে। রাইসা ওই একই জায়গায় হাত দিতে গিয়ে আগেই কেন টিনের আওয়াজ তুলেছিল, তার আর ব্যাখ্যা লাগল না।

মাহিন স্যারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি এক পা এগিয়ে থেমে গেলেন; যেন বুঝলেন, এই মুহূর্তে ব্যাখ্যা দিলে নিজের দিকটাই বেশি ফাঁস হবে। তানভীর ধীরে ধীরে নাজিয়ার সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। আয়োজক ছেলেটা যে চেয়ারটা কোণায় রেখেছিল, সেটি তুলে অন্যদিকে সরিয়ে দিল; তারপর সেতারের অতিরিক্ত মিজরাব-দানি, তানপুরার টিউনার, মাইকের অবস্থান—সব নাজিয়ার নাগালে এনে রাখল। সরানোর ভঙ্গিটাই ছিল আসল। একে একে জিনিসগুলো যার সামনে যায়, অধিকারও তার দিকেই ঘুরে যায়।

রাইসার খালা তৎপর হয়ে বললেন, “আচ্ছা, টেকনিক্যাল ঠিক করে দিয়েছে, ভালো কথা। এবার রাইসা বাজাবে।” কিন্তু দ্বিতীয় বিচারক ইতিমধ্যেই স্কোর-শিটের ওপর কলম ঠুকছেন। “লাইভ রাউন্ড মিনিটের মধ্যে শুরু। যে এখন যন্ত্র ধরেই পরিষ্কার সাউন্ড তুলেছে, সে-ই বসুক। আমরা collapse নিতে পারব না।”

“স্যার, এটা আমার slot—” রাইসার গলা এবার পাতলা।

নাজিয়া দাঁড়াল না, অনুমতিও চাইল না। সে শুধু সেতারটা কোলে টেনে নিল, গদিটা একটু ডান দিকে ঘুরিয়ে নিল যাতে মঞ্চের আলো সরাসরি হাতের ওপর পড়ে। রাইসা তার ওড়না ঠিক করতে করতে এগিয়ে এল, কিন্তু আয়োজক এবার হাত বাড়িয়ে তাকে থামাল। যে হাত কয়েক মিনিট আগে নাজিয়াকে চেয়ারে ঠেলে দিচ্ছিল, সেই হাত এখন রাইসার পথ আটকাল।

ঘোষকের গলা এল—“পরবর্তী শিল্পী...” নাম বলার আগে side wing-এ ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা উঠল। বিচারক সোজা বলে দিলেন, “নাজিয়া। এখনই।”

নাজিয়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল, তবু তার হাত শান্ত। সে বসে প্রথমে খোলা সা আর পা মিলিয়ে নিল, তারপর ভূপালীর আলাপ শুরু করল এত নিচু, এত সংযত স্বরে যে শুরুর দুই সেকেন্ডে মনে হলো এই গরম আলো, প্লাস্টিকের পর্দা, ঘাম, ফিসফাস—এসবের মধ্যে এ সুর টিকবে না। তারপর তৃতীয় টানে সে সা থেকে রে-তে এমন নিখুঁত মীড় দিল যে পাশে দাঁড়ানো ক্যামেরাম্যান নিজেই ট্রাইপড সরিয়ে নিল, লেন্সের কোণ বদলে গেল। সুর নিজের জায়গা কেড়ে নিতে জানে; তার জন্য কারও অনুমতি লাগে না।

সে আলাপ বড় করল না। দ্রুত জোড়ে ঢুকল। ডান হাতের রিদম ঘন হলো, বাঁ হাতের আঙুল পর্দা ছুঁয়ে লেগে থাকল, যেন প্রতিটি স্বরের আগে সে সেতারের ভেতর থেকে দরজা খুলছে। বিচারকদের টেবিলের দিক থেকে আর কোনো ফিসফাস এল না; শুধু একবার কাগজ সরে যাওয়ার শব্দ। নাজিয়া চোখ তোলেনি। side wing আর main stage-এর মাঝখানের এই অদ্ভুত সীমান্তে বসেই সে পুরো হল দখল করে ফেলছিল।

মাঝে এক জায়গায় দ্রুত তান নামাতে গিয়ে তবলচি এক মাত্রা এগিয়ে পড়েছিল। নাজিয়া তাকালও না; ডান হাতে ঝট করে এক অতিরিক্ত ঝংকার গুঁজে তাকে নিজের লয়ে টেনে আনল। তবলচির মুখে যে বিব্রত কৌতুক উঠেছিল, তা সঙ্গে সঙ্গে মুছে গেল। এটাই দ্বিতীয় ভাঙন—এখন শুধু রাইসা না, পুরো আসর নাজিয়ার গতিতে চলতে বাধ্য।

রাইসা side wing-এর খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আর সামনে আসার জায়গা পাচ্ছে না। সে একবার বলল, “ও আমার পিসটা বাজাচ্ছে।” কথা শেষ হতেই বিচারকের চোখ ওঠল না, শুধু হাতটা সামান্য নাড়লেন—চুপ। কথার দাম শেষ হয়ে গেলে মানুষের কণ্ঠ কেমন হালকা লাগে, side wing-এ সেটাই শোনা গেল।

নাজিয়া গৎ বাঁধা প্রদর্শনী করল না। সে দ্রুত এক দৌড়ে দক্ষতা দেখিয়ে থামল না, বরং একই সুররেখায় ছোট ছোট ঘূর্ণি তুলল, প্রতিটা ঘূর্ণির শেষে খোলা সা-তে ফিরে এসে প্রমাণ করল নিয়ন্ত্রণ তার। মঞ্চের সামনে দর্শকের অংশ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু প্রতিধ্বনি বদলে গেছে—ছিটেফোঁটা কাশি নেই, মোবাইলের চাপা টুংটাং কমে গেছে। সে জানে, এখন আর তার বিরুদ্ধে কারও আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা কাজ করছে না; কারণ যন্ত্রের সত্য শোনার পর মানুষ নিরাপদ পক্ষ বদলাতে খুব দেরি করে না।

জোড়ের পর সে ছোট গত ধরল। ডান হাতের ঝাঁপটায় গতি বাড়ল, বাঁ হাতের গমক ধারালো হলো, তারপর আচমকা নিখুঁত বিরতি। এই বিরতিটাই আসরকে হাঁটুতে নামাল। বিচারকদের একজন সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন; অন্যজন স্কোর-শিট টেনে কাছে নিলেন। রাইসার খালা তখনও ঠোঁটে হাসি আটকাতে চেয়ে বসে, কিন্তু তার আঙুলের নখ নিজের তালুতে গেঁথে আছে।

শেষ পর্বে নাজিয়া যে তানটা তুলল, সেটাই পুরো রাতের গলা টিপে ধরল। দ্রুত, কিন্তু পরিষ্কার; একটাও স্বর ফসকাল না। রে-গা-পা-ধা উঠে আবার মীড়ে নেমে সা-তে এসে এমনভাবে থামল, যেন বহুক্ষণ ধরে বন্ধ একটা দরজা ভিতর থেকে খোলা হলো আর সঙ্গে সঙ্গে সব ভেতরের মিথ্যে বাতাস বেরিয়ে গেল। শেষ ঝংকারে তার কবজি থামার সঙ্গে সঙ্গে তবলচিও থামল। কেউ “বাহ” বলার সুযোগ পেল না। কারণ সঠিক জায়গায় থামা বাজনার মতোই কর্তৃত্বের কাজ।

নাজিয়া ধীরে সেতারটা নামিয়ে রাখল, মিজরাব খুলে বাক্সের ওপর রাখল না—সরাসরি নিজের আঙুলে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বিচারকেরা ইতিমধ্যে দ্রুত লিখছেন। রাইসা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আমি অন্তত—”

আয়োজক এবার পরিষ্কার গলায় বলল, “আপা, পথ ছাড়েন।” এই এক লাইনেই বিকেলের সব পক্ষপাত উল্টে গেল। রাইসা থেমে গেল; তার সামনে দিয়ে সাউন্ডম্যান নাজিয়ার জন্য মাইকের উচ্চতা আরেকটু নামিয়ে দিল, যেন পরের নির্দেশও তার কাছ থেকেই আসবে।

মাহিন স্যার কাছে এসে খুব নিচু গলায় বললেন, “নাজিয়া, আমি—”

নাজিয়া তাকাল না। “স্যার, বাক্সটা বন্ধ করে দিন।”

তিনি কিছুক্ষণ স্থির রইলেন। তারপর সত্যিই ঝুঁকে সেতারের খালি কেসের ঢাকনা নামিয়ে দিলেন। মালিকানার শেষ শব্দটাও নাজিয়া কথা ছাড়া বলিয়ে নিল।

নাজিয়া দুই হাতে সেতার তুলে বিচারকদের টেবিলের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। আলো এখন আর তাকে কেটে আলাদা করছে না; সোজা পড়ছে। সে থামল, স্কোর-শিটের দিকে একবারও না তাকিয়ে যন্ত্রটা নিজের কাঁধে তুলে নিল, তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

বিচারকদের টেবিলের ওপর সাদা স্কোর-শিটটা আলোয় চেপে পড়ে রইল; পাশে ঠান্ডা চায়ের গোল দাগ শুকিয়ে গাঢ় হয়ে আছে। কেউ আর পুরনো নামটা ফেরত লেখার মতো কিছু নিয়ে বসে নেই।