Fast Fiction

ডিসপ্যাচের চেয়ারটা আবার আমার

লোহার শাটারের সামনে তৃতীয় ট্রলিটা এসে আড়াআড়ি আটকে যেতেই রাশেদ চেঁচিয়ে উঠল, “ওইটা আগে না, সিলেটেরটা আগে দাও—দাঁড়িয়ে থাকিস কেন?” ঢাকার কোল্ড-চেইন গুদামের লোডিং বেতে তখন কাঁচা মরিচের গন্ধ, ভেজা কার্টনের জল, আর অপেক্ষায় দাঁড়ানো তিনটা ট্রাকের ধোঁয়া একসাথে জমে আছে। ডিসপ্যাচের কাঁচঘেরা কনসোলের চেয়ারে বসে রাশেদ সুপারভাইজার মাউস টিপছে, আর মেহরাবকে পাঠানো হয়েছে মেঝেতে প্যালেট ঠেলতে। লাইন ফুলে উঠছে, গেটের বাইরে ড্রাইভাররা হর্ন ছাড়ছে, অথচ যেই মানুষটা এই রিলিজের ক্রম মুখস্থ জানে, তার হাতে আজ শুধু ঘেমে-ভেজা দড়ি।

মেহরাব ট্রলির চাকায় পা ঠেকিয়ে সেটাকে সোজা করল। পকেটের ভেতর আধাভাঁজ রসিদটা তার উরুতে খচখচ করছিল—মায়ের ওষুধের দোকানের বাকি, তিনদিন ধরে ভাঁজ খুলে আবার ভাঁজ করা। গত মাসে রাত জেগে এই বেয়ের সফটওয়্যার বদলানোর সময় সে-ই ছিল, কিন্তু আজ ভোরে এসে দেখে কনসোলের চাবি তার কাছ থেকে নিয়ে রাশেদ নিজের ল্যানইয়ার্ডে ঝুলিয়ে রেখেছে। দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবির সেই অপমান শুকনো কাগজের মতোই শব্দ করে।

“মেহরাব, ওদিকে থাকো,” কাঁচের ঘর থেকে রাশেদ আঙুল দেখাল। “সবাই সব পারে না। উপরে থেকে নির্দেশ আছে।”

উপরে বলতে কার কথা, সেটা বেতে দাঁড়ানো অনেকেই জানে। মালিকপক্ষের এক আত্মীয়ের সঙ্গে রাশেদের শালার আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে—এই গুদামে সেটা চাকরির যোগ্যতার চেয়েও ভারী। শীলা আপা, রেজিস্টার টেবিলের পাশে কাগজের মোড়কের খসখস শব্দ তুলতে তুলতে, একবার চোখ তুলে আবার নামিয়ে নিলেন। কামাল ড্রাইভার ট্রাকের দরজা থেকে বলল, “ভাই, চট্টগ্রামের লটে বরফ গলতেছে। আর কত?”

রাশেদ জবাব দিল, “আমারে শিখাইও না। আমি দেখতেছি।”

দেখছিল সে ভুল জিনিস। সে সিলেটের খালি ক্রেটওয়ালা ট্রাককে আগে ডাকল, আর খুলনার টমেটোভর্তি প্যালেটগুলোকে রোদমুখী রিসিভিং লেনের কোণায় ফেলে রাখল। শাটার-২ নামানো, শাটার-১ অর্ধেক খোলা, ভিতরে ফর্কলিফট ঢুকতে পারছে না, বাইরে ট্রলির মুখ গুঁজে আছে। মেহরাব একবার কাঁচের ঘরের দিকে তাকিয়েই বুঝল, রাশেদ কাগজের নম্বর দেখছে, লোডের অবস্থা না। এই বেতে কাগজ আগে নয়; আগে যায় যে মাল আগে নষ্ট হবে, তারপর যে ট্রাকের রুট সবচেয়ে দূর, তারপর খালি ফেরত।

সে চুপচাপ ট্রলি সরিয়ে শাটার-১-এর পাশে জায়গা করছিল, তখন রাশেদ বাইরে এসে সবার সামনে বলল, “অনেক দিন কনসোলে বসছিলে বলে নিজেকে মালিক ভেবো না। যেখানে দিছি, সেখানে কাজ করো।”

কামাল একটু গলা নামিয়ে, কিন্তু সবার শোনার মতো করেই বলল, “কনসোলে যার হাত চলে, তারে মেঝেতে দিলে এইটাই হয়।” কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল। প্রথম ফাটলটা ওখানেই পড়ল। রাশেদের মুখ শক্ত হয়ে গেল, সে সঙ্গে সঙ্গে কামালকে চুপ করিয়ে দিল, “ড্রাইভাররা নিজের গাড়ি দেখেন। ভিতরের ব্যাপারে বেশি কথা লাগবে না।”

ভিতরের ব্যাপার তখন বাইরেই ফেটে পড়ছিল। শাটার-২ হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে অর্ধেক নেমে আটকে গেল। ভিতরে রাখা আলুর প্যালেটের এক কোণা বেঁকে দরজার ট্র্যাকে গেঁথে গেছে। রাশেদ ভুল রিলিজ দিয়ে দুই নম্বর লাইনের স্ক্যান বন্ধ করে ফেলেছে, ফলে পরের তিনটা ট্রলি সিস্টেমে আটকে আছে। স্ক্যানার লাল আলো টিপটিপ করছে, কনসোলে সতর্কসংকেত উঠছে, আর ট্রাকের সারি থেকে গালি ভেসে আসছে।

রাশেদ প্রথমে নিজেই স্ক্যানার নিয়ে দরজার সামনে এল। দুইবার টিপল, তিনবার টিপল, লাল আলো নেভল না। শীলা আপা ভেতর থেকে বললেন, “রিলিজ লক পড়ছে। আগের ক্রম না খুললে হবে না।” রাশেদ তার দিকে কড়া চোখে তাকাল, যেন তাকালেই ব্যবস্থা খুলে যাবে।

শাটারের নিচে আটকে থাকা প্যালেটটা একটু আর নামলে টমেটোর কার্টন ফেটে যাবে—মেহরাব সেটা এক নজরে দেখে ফেলেছিল। সে এগিয়ে গিয়ে শুধু বলল, “স্ক্যানার দেন। আগে দুই নম্বর লক ছাড়তে হবে, তারপর শাটার উঠবে।”

“তুমি দূরে থাকো,” রাশেদ হিসহিস করল, কিন্তু ওই সময়েই উপরের অফিস থেকে ল্যান্ডফোন বেজে উঠল। শীলা আপা ধরেই মুখ শক্ত করলেন। “মালিক সাহেব লাইনে। খুলনার গাড়ি নড়ছে না কেন জিজ্ঞেস করছেন।”

রাশেদের কাঁধে যেন কেউ বস্তা চাপিয়ে দিল। সে আবার স্ক্যানারে আঙুল চালাল, লাল আলো এবার দীর্ঘ শব্দ করে উঠল। কামাল ট্রাক থেকে নেমে এল। আরেক ড্রাইভার বলল, “আর পাঁচ মিনিট গেলে পেছনের লাইন রাস্তায় উঠে যাবে।” মেঝেতে দাঁড়ানো কুলি ছেলেগুলো রাশেদের মুখ না দেখে মেহরাবের দিকে তাকাচ্ছিল। কার হাত ধরলে গতি ফিরবে, তারা বুঝে ফেলেছে; শুধু অনুমতির দেরি।

রাশেদ এক সেকেন্ড দাঁত চেপে রইল। তারপর এমন ভঙ্গিতে যেন জিনিসটা সে দয়া করে দিচ্ছে, স্ক্যানারটা মেহরাবের দিকে বাড়িয়ে দিল। “একবার করো। নষ্ট করলে কিন্তু—”

মেহরাব তার কথা শেষ হতে দিল না। স্ক্যানারটা হাতে নিয়েই সে হাঁটু গেড়ে ট্র্যাকের পাশে ঝুঁকল, লাল লাইনের কোড পড়ে উঠল, “শাটার-২ স্থির। শাটার-১ পূর্ণ খোলো। খুলনার প্যালেট আগে বের হবে। আলুরটা পিছাও। রুবেল, বাঁ দিক থেকে টান।” কথাগুলো নরম ছিল, কিন্তু ওজন ছিল। লোকজন সেগুলো মানল।

দুই টিপে সে লক ছাড়াল না; আগে ভুল রিলিজ বাতিল করে সঠিক লাইনে খুলনার নম্বর তুলল, তারপর শাটার-১ তুলতে বলল। দরজা ওপরে উঠতেই ঠান্ডা বাতাসের সাথে ভেজা সবজির গন্ধ বেরিয়ে এল। রুবেল আর মকবুল মিলে বেঁকে থাকা আলুর প্যালেটটা পিছিয়ে নিল। মেহরাব স্ক্যানার তুলে নতুন ক্রম দিল—“টমেটো এক, কাঁচামরিচ দুই, খালি ক্রেট পরে। কামাল ভাই, গাড়ি মাথা সোজা রাখেন, পেছনে দিও না।”

শব্দ করে চাকা ঘুরল। আটকে থাকা প্রথম ট্রলি বেরিয়ে গেল। তার পেছনে দ্বিতীয়টা। শাটার-২ আবার ওপরে উঠল। ভেতর থেকে শীলা আপা রেজিস্টারের পাতায় নতুন নম্বর বসাতে বসাতে বললেন, “এইটাই ঠিক।” তিনি এটা রাশেদকে নয়, কাজকে উদ্দেশ করে বললেও, কথাটা রাশেদের গায়েই লাগল।

এক মিনিট আগেও যে ছেলেরা রাশেদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, তারা এখন মেহরাবের হাতের ইশারা দেখছে। মেহরাব থামল না। “সিলেটের খালি ক্রেট লাইনের বাইরে নাও। খুলনার বরফ আগে। কাঁচা মরিচের ওপর আর কিছু চাপাবে না। শাটার-২ খোলা রাখো, কিন্তু রিসিভিং লেন ফাঁকা করো।” ক্রম বদলাতেই জট ছাড়তে লাগল। এক ট্রাক বেরোল, আরেকটা পেছন থেকে ঢুকল। ভুল ক্রমের পুরো ক্ষতিটা ঢেকে ফেলতে পারবে না, কিন্তু বেটা আবার চলতে শুরু করেছে—এটাই যথেষ্ট ছিল সবাইকে পাশে টানতে।

রাশেদ আবার কাঁচঘরে উঠে গিয়ে কনসোলের পাশে দাঁড়াল। চেয়ারে বসার সাহস করল না; বোধহয় বুঝেছে, বসা আর চালানো এক জিনিস নয়। তবু মুখ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা ছাড়ল না। “ঠিক আছে, এখন দাও। আমি দেখি,” সে বলল, যেন স্রোত ফেরার পর নদীর মালিকানা দাবি করছে।

মেহরাব তখন তৃতীয় রিলিজের আগে শীলা আপার দিকে হাত বাড়িয়ে ডিসপ্যাচ স্লিপ নিল। পাতলা কাগজের মোড়কের শুকনো শব্দ উঠল। সে এক পলকেই দেখল—শেষ বড় চালানটা গাজীপুরমুখী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের চুক্তির মাল; এইটা দাঁড়িয়ে গেলে উপরের অফিস শুধু চিৎকার করবে না, মাথা নামাবে। রাশেদও সেটা দেখে ফেলেছে। তাই সে এবার কাঁচঘর থেকে নেমে সরাসরি মেহরাবের হাতের স্ক্যানারের দিকে হাত বাড়াল।

“দাও,” রাশেদ নিচু গলায় বলল, কিন্তু চারপাশ শুনে ফেলল। “এইটা আমার স্টেশন।”

মেহরাব স্ক্যানার পেছনে টেনে নিল না। সে সেটাকে নিজের বুকের কাছে স্থির রাখল, অন্য হাতে কাগজটা শীলা আপার টেবিলে ঠেসে রাখল। “রিলিজ চলছে,” সে বলল। “মাঝপথে হাত বদল হলে আবার লক পড়বে।”

“তুমি আমারে নিয়ম শিখাইবা?” রাশেদের কণ্ঠ চড়ে গেল। সে এবার কনসোলের দিকে ঘুরে মাউস ধরতে গেল, যেন উপর থেকে পাশ কাটিয়ে নিচে জিতে নেবে। “লগইন তো আমারেই আছে।”

মেহরাব এক পা আগে গেল। কাঁচঘরের দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে তার কাঁধ দিয়ে পথ আটকাল। বাইরে কামাল ইঞ্জিন বন্ধ করে অপেক্ষা করছে; ভিতরে প্যালেট জ্যাকের ধাতব মুখ মেঝেতে ঠকঠক করছে; সকলের চোখ এবার একই জায়গায়। এইটুকু দেরিতে গাজীপুরের চালানও আটকে যাবে। রাশেদ সেটা জানে, তবু হাত বাড়াচ্ছে—এটাই তার শেষ জেদ।

“সরে দাঁড়াও,” রাশেদ বলল, আর মেহরাবের বাহু সরাতে হাত দিল।

মেহরাব সেই হাত কবজি থেকে ধরে নামিয়ে দিল। জোরে নয়, কিন্তু এমনভাবে যে রাশেদের নিজেরই ভারসাম্য কেঁপে উঠল। “শাটার খুলা,” মেহরাব পেছন না ফিরে বলল। “গাজীপুরের প্যালেট বের হবে। কেউ থামাবেন না।”

এই প্রথম কেউ রাশেদের নির্দেশ না শুনে তার সামনে অন্য নির্দেশ মানল। রুবেল সঙ্গে সঙ্গে শাটারের সুইচ টিপল। কামাল ট্রাকটা সোজা লাইনে আনল। শীলা আপা রেজিস্টারের পাতা উল্টে নতুন স্লিপ বের করলেন, কিন্তু এবার সেটা রাশেদের দিকে নয়, মেহরাবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। কাজের জায়গায় সেবা-খাতার মতো সেই টেবিলটাও পাশ বদলাল।

রাশেদের মুখের চামড়া টেনে গেল। “এইটা অবাধ্যতা,” সে বলল, তবু স্বর আর আগের মতো ওঠেনি। উপরের অফিসের ফোন আবার বেজে উঠল। কেউ ধরল না।

মেহরাব স্ক্যানারে ধারাবাহিক তিনটা টিপ দিল। “লাইন তিন মুক্ত। লোড স্টেট ঠিক। প্যালেট ছাড়ো।” ধীরে, তারপর দ্রুত, গাজীপুরের সবুজ চিহ্নওয়ালা প্যালেটটা গড়িয়ে এল। চাকার নিচে জল চিটকে উঠল। শাটারের কিনারা ঘেঁষে সেটাকে বাইরে নিতে নিতে মকবুলের কপাল থেকে ঘাম টুপ করে কার্টনের ওপর পড়ল। আরেক সেকেন্ড দেরি হলে কার্টন ঠুকে ছিঁড়ে যেত; মেহরাব মাথা ঘুরিয়ে বলল, “ডান দিক ফাঁকা। এখন।”

প্যালেট ঠিকঠাক ট্রাকে উঠতেই রাশেদ হঠাৎ পাশ কাটিয়ে কাঁচঘরে ঢোকার চেষ্টা করল। তার ধারণা ছিল, বড় লোড বেরুলেই সবাই ঢিলে হয়ে যাবে; তখন সে কনসোল ছুঁয়ে আবার মালিকানা দেখাবে। মেহরাব সেটা আগেই ধরেছিল। সে স্ক্যানার বাম হাতে নিয়ে ডান হাত দিয়ে দরজার কাঁচ ঠেলে বন্ধ করল। রাশেদের হাত কাঁচে লেগে সরে গেল, আঙুলের ছাপ আর পুরনো মুছেমুছে না-যাওয়া দাগ একসাথে লেপ্টে রইল। ভিতরে ঢুকতে না পেরে তাকে বাইরে দাঁড়িয়েই দেখতে হল, বেটা তার গলা মেনে চলছে।

“শেষ স্লট,” মেহরাব বলল। “খালি ক্রেট পরে যাবে। আগে বরফসহ মরিচের গাড়ি ছাড়ো।”

কেউ প্রশ্ন করল না। রুবেল খালি ক্রেটের ট্রলি নিজে থেকেই সাইডে সরাল। কামাল পেছন থেকে হর্ন দিয়ে অন্য গাড়িকে ইশারা করল। শীলা আপা কাগজে সিল মেরে এগিয়ে দিলেন। রাশেদ এবার আর সামনে এল না। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাই বদলে গেছে; যেন ধার করা কর্তৃত্ব হঠাৎ গায়ে বড় হয়ে গেছে।

মেহরাব শেষ রিলিজ টিপল। “শাটার নামাও, এক নম্বর লেন ফাঁকা। পরের গাড়ি দশ মিনিট পর।” মরিচের গাড়ি নড়ে গেল। পেছনের জটও সঙ্গে সঙ্গে সরে না, কিন্তু রাস্তা ধরার মুখ পেয়ে গেল। কাজের জায়গায় এতক্ষণ যে বিশৃঙ্খলা তার নাম ধরে ডাকা হচ্ছিল, সেটা এখন একেকটা সঠিক নির্দেশে সরে যাচ্ছে।

সে কাঁচঘরে ঢুকে কনসোলের সামনে দাঁড়াল। রাশেদের ঝোলানো ল্যানইয়ার্ড থেকে চাবিটা অনেক আগেই নামিয়ে টেবিলের কোণায় রাখা হয়েছিল; কে রেখেছে, কেউ বলেনি। মেহরাব সেটা তুলে কনসোলের ড্রয়ারে ঘুরিয়ে খুলল, ডেস্কে হাত রাখল, তারপর নিজের আঙুলে লগইনের ঘর ছুঁল। পর্দায় কনসোল লগইন ভেসে উঠল। সে নিজের নামের ঘরে চাপ দিল। পর্দা খুলে গেল।