Fast Fiction

যাকে কম ভেবেছিল, সে-ই ওপরে উঠল

রুবেল হাত তুলে মেহরিনের পথ আটকে দিল। “এই দিক না, আপা। সামনের ফটক দিয়ে কনের ঘনিষ্ঠরা যাবে। আপনি ডান পাশের করিডর দিয়ে যান—কাজের লোকেরা ওদিকেই ঢুকছে।”

কথাটা এমন জোরে বলল যে উঠানঘেরা বাসার আলো-ঝলমলে প্রবেশরিংয়ে দাঁড়ানো তিনজন খালা, এক ফুপু, আর সোনালি কাজের শাড়ি পরা তানজিলা সবাই শুনে ফেলল। তানজিলাকে সে সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে ভেতরে নামিয়ে দিল—“এই যে, ভাবি, সাবধানে”—আর মেহরিনের হাতে থাকা নীল ফাইল, আধাভাঁজ করা বিলের রসিদ, আর কলমের কালি-দাগওলা খামগুলোর দিকে একবারও তাকাল না।

মেহরিন এক সেকেন্ড থামল। সারাদিনের দৌড়ে তার কাঁধ শক্ত, কামিজের কনুইয়ে ভাঁজ বসে আছে। ঢাকা শহরের জ্যাম পেরিয়ে সে এসেছে শুধু নিমন্ত্রণ খেতে নয়। সায়েমের পরিবারের কৃষি রপ্তানির নতুন চুক্তির কাগজ, ব্যাংকের সংশোধিত কপি, আর বাগদানের মেহমানতালিকার আসনক্রম—সব তার ফাইলে। গত তিন মাস ধরে সায়েম রাত জেগে যেটা সামলাতে পারেনি, সেটা সে গুছিয়েছে। তবু ফটকে তার পরিচয় এক ঝটকায় নেমে গেল ‘কাজের লোক’ লাইনে।

সে করিডরের দিকে না গিয়ে সোজা রুবেলের হাতে গাড়ির চাবিটা তুলে দিল। “ভেতরে যে কাগজ লাগবে, সেগুলো এই ফাইলেই। ভুল হাতে গেলে আজ রাতে শুধু আসন নয়, চুক্তির অঙ্কও বসবে না। আমি ডান পাশের করিডরে গেলে ফাইলও সেখানেই যাবে।”

রুবেলের মুখ কেমন থমকাল। সে চাবি নিল, কিন্তু ফাইল নিতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল। সামনের আলোয় দাঁড়ানো তানজিলা ইতিমধ্যে ভেতরের মেহগনি দরজা পেরিয়ে গেছে। ওর জন্য লাল ফিতে বাঁধা মূল সিঁড়ি খোলা। মেহরিনের জন্য গুনগুন করা করিডরের টিউবলাইট, রান্নাঘরের ধোঁয়া, আর প্লাস্টিকের চেয়ার।

পাঁচ মিনিটও যায়নি, ভেতর থেকে এক লোক দৌড়ে বেরোল। মাথায় ঘাম, হাতে ফোন। “এক্সপোর্টের আসল কপি কার কাছে? নামের বানানে গরমিল! মুরব্বিরা বসে গেছেন—হেড-টেবিলের বোর্ডে দুই পক্ষের তালিকা ঝুলছে, এখন বদলাতে হবে।”

রুবেল তখনই মেহরিনের দিকে ফিরল, কিন্তু গলার ভঙ্গি বদলাল না। “আপা, ফাইলটা দেন। আপনি এই করিডরে একটু দাঁড়ান। ভেতরে ভিড়।”

মেহরিন ফাইল খুলে শেষ পৃষ্ঠাটা বের করল না। সে লোকটার দিকে তাকাল। “যার দরকার, সে আমার কাছ থেকে নিক। কপি বদলাতে শুধু কাগজ না, ক্রমও বদলাতে হবে। কোন নাম কোন লাইনে যাবে, সেটা আপনি জানেন?”

লোকটা থমকে গেল। “আপনি... জানেন?”

“আমি বানিয়ে দিয়েছি।” সে আধাভাঁজ রসিদের ভেতর থেকে ছোট্ট তালিকাটা বের করল—মেহমান, ব্যবসায়িক সাক্ষী, দুই পরিবারের বড়দের আসনক্রম। নিচে নীল কালিতে তার নিজের হাতের সংশোধন। “আর এই ভুলটা করেছে যে ছেলে, সে তানজিলার কাকাতো ভাইয়ের পাঠানো পুরোনো ফাইল থেকে কপি করেছে।”

এই প্রথম দৃশ্যমান ফাটলটা হল। পাশের এক খালা তানজিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও-ই বুঝি সব জানে বলছিলে?” রুবেল আর কিছু বলার আগেই ভেতর থেকে হাবিব সাহেব নিজে বেরিয়ে এলেন—সায়েমের চাচা, আজকের আয়োজক, যিনি এতক্ষণ উঠানের অন্য মাথায় অতিথি সামলাচ্ছিলেন।

তিনি আগে রুবেলের পাশ কাটিয়ে যেতেন। এবার থেমে দুহাত একসঙ্গে করলেন। “মেহরিন মা, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এইদিকে, এইদিকে আসেন।” ‘আপা’ থেকে হঠাৎ ‘মা’, তারপর ‘আপনি’—আলোয় শব্দ বদলাতে শুনে রুবেলের কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল।

হাবিব সাহেব নিজে মেহরিনের হাঁটার জন্য পথ ফাঁকা করলেন। গেটের প্রান্ত না ধরে মাঝের পাতা-ঢাকা রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেলেন। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় রুবেল সরে দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় ফুলের স্ট্যান্ডে ধাক্কা খেল। উঠানে বসা দুজন ব্যবসায়িক অতিথি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন; এরা সেই লোক, যাদের সামনে সায়েমের পরিবার বহুদিন ধরে ‘যোগ্য পাত্রী’ হিসেবে তানজিলার নাম চালাচ্ছিল।

ভেতরে গিয়ে দেখা গেল গোলমাল শুধু নামের বানানে নয়। দেয়ালের গায়ে ঝোলানো বড় সাদা র‍্যাঙ্ক বোর্ডে হেড-টেবিলের আসনক্রম দুই লাইনে ভাগ করা—“বরপক্ষ মালিকপক্ষ” আর “কনেপক্ষ অতিথি-প্রধান।” প্রথম লাইনের তিন নম্বরে তানজিলার নাম, পাশে ছোট হরফে “বিশেষ অতিথি”—যেন আগেই কেউ তাকে ভবিষ্যৎ ঘরের মেয়ে ধরে রেখেছে। মেহরিনের নাম নেই কোথাও। অথচ টেবিলের পাশে রাখা কাগজের ট্রেতে তার বানানো চুক্তি, তার সই-করা সংশোধনী, সব আছে।

“এই ভুলটা এখনই ঠিক করেন,” মেহরিন বলল। “বিশেষ অতিথি নামে কেউ বসবে না, যদি সে মালিকপক্ষের অনুমোদিত প্রতিনিধি না হয়।”

তানজিলা তখন লালচে মুখে এগিয়ে এল। “আপনি একটু নরম হয়ে বলেন না? আজ বাগদান, অফিস না। আর আমি তো সায়েমের...”

“কি?” মেহরিন তাকাল। “আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা? সেই জানাশোনা দিয়ে কে কোথায় বসবে, বোর্ডে তার নিয়ম লেখা আছে। পড়ুন।”

বোর্ডের নিচে ছোট ফ্রেমে লেখা—“রপ্তানি অংশীদার পরিবারের প্রধান, অনুমোদিত প্রতিনিধি, নিকট জ্যেষ্ঠ আত্মীয়—ক্রম অনুসারে।” তানজিলা আর পড়ল না। সায়েমও তখন সিঁড়ির বাঁক থেকে নামছিল, কপালে টান। তার চোখ একবার মেহরিনে, একবার বোর্ডে। সে বহুদিন ধরে দুই দিকেই কথা বলে এসেছে—পরিবারের কাছে তানজিলা, কাজে আর বিপদে মেহরিন।

হাবিব সাহেব নিচু গলায় বললেন, “বোর্ড নতুন করে লিখতে হবে। কিন্তু আব্বা না এলে—”

“আব্বা কেন আসবেন?” রাশেদার ভাবি, যিনি এতক্ষণ হাসিমুখে অতিথি সামলাচ্ছিলেন, এবার সামনে এলেন। “একটা আসন নিয়ে এত কথা! মেহরিন, তুমি আমাদের মেয়ের মতো। তুমি এই পাশের ভিআইপি টেবিলে বসো। তানজিলা ওদিকে থাকবে। সবার মানও রক্ষা হয়।”

সেই ‘মেয়ের মতো’ শব্দটাই সবচেয়ে সস্তা শোনাল। মেহরিন হাসল না। “মেয়ের মতো হলে নাম লুকিয়ে পাশের টেবিলে বসতে হয় কেন? আমি যদি প্রতিনিধি হই, মালিকপক্ষের লাইনে নাম উঠবে। না হলে ফাইল নিয়ে আমি বের হচ্ছি।”

এক মুহূর্তে চারপাশের আওয়াজ অন্যরকম হয়ে গেল—বাসনের টুংটাং একই রইল, কিন্তু কথার গতি থেমে গিয়ে যেন কারও গলায় আটকে থাকল। সায়েম এক পা নেমে বলল, “মেহরিন, এখন বের হয়ে গেলে ঝামেলা হবে।”

“ঝামেলা তো তোমরাই করেছ,” সে বলল, চোখ না তুলে। “কাজ নেবে, নাম নেবে না—এটা ঝামেলা না?”

রাশেদার ভাবি এবার সোজা কৌশল বদলালেন। “ঠিক আছে, তোমার নাম উঠবে। কিন্তু বোর্ডে তানজিলার পরে। ওকে তো সবাই ধরে নিয়েছে—”

“ধরে নেওয়া আর লিখে দেওয়া এক জিনিস না,” মেহরিন কেটে দিল। “আমাকে পরে রাখার মানে কী, সেটা সবাই বুঝবে। আমি অস্পষ্ট জায়গায় বসি না।”

উঠানের ওপাশে হঠাৎ ফটকের কাছে গাড়ি থামার শব্দ হল। পরপর দুজন নেমে এলেন—একজন সাদা পাঞ্জাবিতে, কাঁধে ধূসর শাল; সায়েমের দাদা মাহবুব করিম, যিনি এই কৃষি রপ্তানি ব্যবসার আসল মালিকপক্ষের প্রধান। তাঁর সঙ্গে হিসাবরক্ষক, হাতে সিলমোহর লাগানো খাম। এতক্ষণ যাদের নাম নিয়ে সবাই তর্ক করছিল, সেই কর্তৃত্ব নিজে দরজায় এসে দাঁড়াল।

মাহবুব করিম ভেতরে ঢুকেই বোর্ডের সামনে থামলেন। “এত দেরি কেন? সাক্ষীরা বসে গেছে।”

কেউ কিছু বলার আগে মেহরিন ফাইল খুলে সামনে ধরল। “চুক্তির সংশোধিত কপি, অনুমোদিত প্রতিনিধির তালিকা, আর হেড-টেবিলের সঠিক ক্রম। পুরোনো ফাইল থেকে ভুল নাম উঠেছে।”

রাশেদার ভাবি দ্রুত বললেন, “আসলে মেয়েদের মধ্যে একটু ভুল বোঝাবুঝি—”

মাহবুব করিম তার কথা শেষ হতে দিলেন না। “ভুল বোঝাবুঝি বোর্ডে ওঠে কী করে?” তিনি খাম থেকে চশমা বের করে পড়লেন। “অনুমোদিত প্রতিনিধি—মেহরিন চৌধুরী। তিন মাসের দর-কষাকষি, ব্যাংক সংশোধন, ক্রেতাপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ—সব নথিভুক্ত।” তিনি সায়েমের দিকে ফিরলেন। “তুমি সই করেছ।”

সায়েমের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। “জি... করেছি।”

“তাহলে নাম কোথায়?”

কেউ উত্তর দিল না। দেয়ালে ঝোলানো বোর্ডের সামনে টুলে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা হাত নামিয়ে রাখল। মার্কার কলমের ঢাকনা খোলা, কালির মাথা কাঁপছে। তানজিলা এক পা পেছাল, কিন্তু ততক্ষণে মাহবুব করিম নিজে হাত বাড়িয়ে বোর্ডের উপরের ডান দিকের চুম্বক-কার্ড টেনে নামালেন—“তানজিলা—বিশেষ অতিথি।” কার্ডটা নামিয়ে টেবিলের উপর রাখলেন। শব্দটা ছোট ছিল, কিন্তু উঠানে বসা কাছের লোকেরা সবাই শুনল।

তারপর তিনি হিসাবরক্ষকের খাম থেকে আরেকটা কার্ড বের করলেন। মোটা কালো অক্ষরে লেখা—“মেহরিন চৌধুরী—মালিকপক্ষ অনুমোদিত প্রতিনিধি।” তিনি সেটা প্রথম লাইনের দুই নম্বর স্থানে আটকে দিলেন, নিজের নামের ঠিক নিচে, সায়েমের নামের ওপরে। “এটাই ক্রম। সাক্ষীরা এই লাইন দেখবে।”

দৃশ্যটা এত স্পষ্ট ছিল যে কারও ব্যাখ্যার সুযোগ রইল না। রুবেল বোর্ডের নীচে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হাত গুটিয়ে ফেলল, যেন সে আর কিছু ছুঁতে সাহস পাচ্ছে না। রাশেদার ভাবির গলায় আটকে থাকা হাসিটা এবার শুকনো হয়ে গেল। তানজিলার কপালের টিপ একপাশে সরে গেছে; সে কার্ডের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন নাম বদলালে মুখও বদলে যায়।

কিন্তু পুরোনো পক্ষ শেষ চেষ্টা ছাড়ল না। রাশেদার ভাবি তাড়াতাড়ি বললেন, “কার্ড তো লাগলই, এখন বসার সময় একটু এদিক-ওদিক করলে সমস্যা কী? মেহরিন, তুমি দাদার পেছনের সারিতে—সম্মান কমবে না।”

মেহরিন এবার প্রথমবারের মতো সবার সামনে এগিয়ে গিয়ে টেবিলের হেড-চেয়ারের পাশের খালি আসনে হাত রাখল। সাদা কাভারের ওপর সোনালি কাগজে দুই নম্বর লেখা। “কার্ড যদি এই লাইনে থাকে, আমি এই লাইনেই বসব। পেছনের সারি সম্মান না, গোপন করা। আজ আমি গোপন হয়ে বসব না।”

সায়েম যেন কিছু বলতে চেয়েছিল। মেহরিন তার দিকে তাকাল না। মাহবুব করিম ধীরস্বরে বললেন, “বসো।” তারপর সবার শোনার মতো করেই যোগ করলেন, “যে কাজ করেছে, নামও তারই আগে থাকবে। এই বাড়িতে আজ থেকে এ নিয়ম কেউ বদলাবে না।”

মেহরিন চেয়ার টেনে বসল। চেয়ারের শব্দে টেবিলের কাঁচের গ্লাস কেঁপে উঠল। সায়েমকে নিজের নামের নিচের আসনে গিয়ে বসতে হল; তার হাতে ধরা ফোনটা টেবিলে উল্টো হয়ে পড়ে রইল। তানজিলার জন্য রাখা সামনের ছোট্ট প্ল্যাকার্ড এক কর্মচারী তুলে নিয়ে পাশের অতিথি-সারিতে সরিয়ে দিল। সরানোর সময় কাগজের কোণ ভেঙে গেল; ‘বিশেষ অতিথি’ লেখা অংশটা ভাঁজ খেয়ে নিচে ঝুলে রইল।

হাবিব সাহেব তখন এমন ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন, যেন এতক্ষণ থেকে এই পথটাই ঠিক ছিল। “মেহরিন মা, পানি দেব?” তিনি নিজের হাতে গ্লাস এগিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ আগে যে লোক তাকে করিডরে দাঁড় করাতে দিয়েছিল, সে এখন টেবিলের পাশে শরীর একটু ঝুঁকিয়ে কথা বলছে। এই পরিবর্তন কেউ না দেখার উপায় ছিল না।

মেহরিন গ্লাস নিল, কিন্তু চোখ তুলল দেয়ালের বোর্ডে। উপরের লাইন এখন পড়া যায় স্পষ্ট করে—১. মাহবুব করিম। ২. মেহরিন চৌধুরী। ৩. সায়েম করিম। নিচের লাইন এক ধাপ করে নেমে গেছে। যে কার্ডটা নামানো হয়েছে, সেটা আর উপরে ফিরতে পারেনি।

র‍্যাঙ্কিং ওয়ালের পাশে ডিজিটাল গণনাপর্দায় টেবিল নম্বর বদলের শেষ সংখ্যা থেমে রইল। উপরের মালিকপক্ষের লাইনে মেহরিন চৌধুরীর নাম কালো অক্ষরে স্থির, আর নিচের সারির সংখ্যা একবার ঝিলিক দিয়ে থেমে গেছে—২, ৩, ৪—তার পর আর নড়েনি।