Fast Fiction

ফাঁদটা উল্টে ওকেই চেপে ধরল

“ওই কার্ট থামাও,” সাজেদা ভাবী হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, আর সামনের সবুজ প্লাস্টিক-ঢাকা প্যালেটটা ধাক্কা খেয়ে লোহার রেলিংয়ে ঠক করে লাগল। “রাশেদ, তোর সই ছাড়া এটা বের হয় কীভাবে? দুই বস্তা মরিচ কম। এখনই তালিকা খুল।”

ঢাকার কৃষি-সরবরাহ গুদামের ব্যাকলেনটা দুপুরের গরমে বাষ্প ছাড়ছিল। শাটারের ফাঁক দিয়ে ধুলোমাখা আলো ঢুকছে, ভেতরে আলুর গন্ধ, পচা টমেটোর টক, ডিজেলের ধোঁয়া। রাশেদের গলায় ঝুলে থাকা পুরোনো পরিচয়ফিতেটা ঘামে নরম হয়ে বেঁকে গেছে। সকাল থেকে টানা শিফটে তার কাঁধ শক্ত, শার্টের হাতায় ভাঁজ জমে আছে। তবু সে কার্টের হ্যান্ডেল ছাড়ল না। শুধু চেকলিস্টের দিকে তাকাল—নীল কালি, আগের টিকের ওপর নতুন টিক, কিছু ঘর চাপা দিয়ে আবার লেখা। পাশে রিলিজ স্লিপে এখনো শেষ সই পড়েনি।

সাজেদা ভাবী গুদামের কাগজপত্র ধরেন বহুদিন, কিন্তু সবাই জানে তিনি শুধু হিসাবরক্ষকের টেবিলে বসা মহিলা নন; মোবারক সাহেবের শ্যালিকা, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা জুড়ে তার কথা অনেক দূর যায়। কার সামনে কাকে ছোট করতে হবে, তিনি জানেন। আজও জানেন। তিনজন ঠেলাগাড়িওয়ালা, লেনের দারোয়ান, আর দরজার কাছে দাঁড়ানো নিপার সামনে তিনি রাশেদের দিকে তালিকাটা ছুড়ে বললেন, “কাল রাতের চাবি দেরিতে ফেরত দিছস। তার ওপর ঘাটতি। একসঙ্গে দুই দোষ। এখন বলবি, তুই দেখিস নাই?”

রাশেদ চাবিটা পকেট থেকে বের করে টেবিলের কোণায় রাখল। দেরিতে ফেরা চাবির রিংয়ে মরচে, মাথায় লাল রঙ উঠে গেছে। “আমি রাতের শেষ লক খুলে আবার বন্ধ করছি ভাবী। রিলিজ হয়নি। শেষ সই কার, আগে সেটা পড়েন।”

“আমাকে শেখাবি?” সাজেদা ভাবী ঠাণ্ডা গলায় বলেই পাশের জলিলকে বললেন, “দেখছেন? নিজের দোষ ঢাকতে কাগজ ঘুরাইতে চায়। লিখে রাখেন—লোডিং ত্রুটি, তত্ত্বাবধায়ক রাশেদ।” তিনি এত জোরে বললেন যে বাইরে ট্রাকের কেবিনে বসা চালকও মুখ বার করে তাকাল।

প্রথম ধাক্কাটা সেখানেই ফিরল। জলিল খাতা টেনে নিলেও সঙ্গে সঙ্গে লেখেনি। সে চেকলিস্টে আঙুল ছুঁইয়ে কুঁচকে গেল। “এখানে আগের কলমে ‘১৮’ আছে, ওপর থেকে ‘১৬’ করা। কার দাগ?”

সাজেদা ভাবী ঝট করে তালিকাটা নিজের দিকে টানলেন। “সংখ্যা ঠিক করছি, এতে সমস্যা কী? কার্ট আগে ছাড়ো। ট্রাক অপেক্ষা করছে। মাল ফিরলে কমিশন কাটা যাবে।”

রাশেদ সেই কথাটাই ধরে ফেলল। কমিশন। এই মাসের বেতন থেকে যদি কাটে, বাসার ভাড়া যাবে, মায়ের ওষুধ যাবে। সে মাথা নিচু করল না। কার্টটাকে রিসিভিং লেনের সাদা দাগের ভেতর আরও ঠেলে আনল, যেন চাকা শাটারের একদম নিচে আটকে থাকে। “ছাড়ব,” সে শান্ত গলায় বলল, “শেষ সই দিয়ে ছাড়ব। আপনি যেভাবে চান, সেভাবেই।”

সাজেদা ভাবীর চোখ চিকচিক করে উঠল। তিনি এটাকেই ভয় দেখানোর সুযোগ ভাবলেন। “তাহলে শুন। এখনই কার্ট খুলে বস্তা নামা, আবার গুনে তোলা, তারপর তোর নামে ঘাটতির নোট। দেরি হলে ট্রাক ভাড়া তোর কাটতি থেকে যাবে। মোবারক ভাই আসার আগে সব শেষ চাই।”

নিপা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, কপালের ওড়না ঘামে লেগে গেছে। মোবারক সাহেবের ভাইঝি, সদ্য অফিসের কাজ শেখে। সে একবার রাশেদের দিকে, একবার চেকলিস্টের দিকে তাকাল। মুখ খোলেনি। এখানকার নিয়ম সে জানে—পরিবারের লোক কথা বললে অন্যেরা গিলে ফেলে।

রাশেদ উত্তর না দিয়ে গ্লাভস পরল। একে একে দড়ি খুলল, ত্রিপল সরাল, প্রথম সারির বস্তা নামাতে শুরু করল। সবাই দেখল, সে পালাচ্ছে না; বরং কাঁধে ওজন তুলে ঠিক সাজেদা ভাবীর টেবিলের সামনে এনে রাখছে। প্রতিটি বস্তা নামার সঙ্গে সঙ্গে সে নম্বরটা জোরে পড়ছে। “এক। দুই। তিন।” টালির ছাদের তাপের নিচে শব্দগুলো ধাতুর মতো বাজছিল।

সাজেদা ভাবী অধৈর্য হয়ে উঠলেন। “এভাবে ধীরেসুস্থে না। দ্রুত করো। জলিল, রিলিজে আমার আগের সই আছে, নিচে ওরটা নিন, তারপর গাড়ি ছাড়েন। পরে ঘাটতি ধরা হবে।”

রাশেদ তখন সপ্তম বস্তা কাঁধ থেকে নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “না, আগে নিচের শর্ত পড়ি।” সে রিলিজ স্লিপটা তুলে ধরল। নিচের ছোট অক্ষরে গুদামের নিয়ম—‘মধ্য-গণনার পরে পুনরায় সিল ভাঙলে, পুনর্লোডের দায় ও গণনাকারীর সই একই ব্যক্তির নামে যাবে।’ রাশেদ গলাটা উঁচু করেনি। শুধু কাগজটা এমন কোণে ধরল, যাতে জলিল আর নিপা দুজনেই পড়তে পারে।

সাজেদা ভাবী এক মুহূর্ত থমকালেন, তারপর তেড়ে এলেন। “কাগজ নামাও। আমি বলছি, তুই সই দে। আমি উপরে অনুমোদন দিছি।”

“আপনি উপরে অনুমোদন দিছেন,” রাশেদ বলল, “আর আমাকে এখন আপনার সামনে খুলে আবার গুনতে বললেন। তাহলে পুনর্লোডের গণনাকারী কে?”

এইবার উত্তর দেওয়ার তাড়ায় সাজেদা ভাবী নিজেই ফাঁদে পা দিলেন। “আমি। আমি দেখাচ্ছি না? কিন্তু দায় তোর, কারণ কার্ট তো তুই ধরছস। এইটুকু বুঝিস না?”

জলিলের কলম মাঝআকাশে থেমে গেল। রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে বস্তার মুখের সিলের দিকে আঙুল দেখাল। “তাহলে লিখেন—মধ্য-গণনা শুরু, নির্দেশদাতা ও গণনাকারী সাজেদা আক্তার।” সে টেবিল থেকে লাল স্ট্যাম্প-প্যাড টেনে জলিলের সামনে রাখল। “এটা ছাড়া পরের বস্তা খুলব না।”

শাটারের বাইরে ট্রাকের হর্ন বাজল। চাপ হঠাৎ উল্টো দিকে বেঁকে গেল। সাজেদা ভাবী এতক্ষণ যে গতিতে সবাইকে ঠেলছিলেন, সেই একই গতিতে তাকে এখন নিজের নাম লিখতে হবে—না লিখলে গাড়ি আটকে থাকবে, লিখলে দায় তার ঘাড়ে। তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন, “মোবারক ভাই এলে দেখে নেবেন। তোর চাকরি একদিনও থাকবে না।”

রাশেদ এবার কার্টের সামনে দাঁড়াল, দুহাত হ্যান্ডেলে। “গাড়ি এখানেই থাকবে যতক্ষণ না কাগজের ক্রম মেলে। আপনি বলছেন খুলতে, আপনার নাম লিখেন। না হলে আগের সিলেই বের হবে, আর তখন ঘাটতি কাগজে উঠবে আপনার সংশোধনের পাশে।”

নিপা প্রথমবার এগিয়ে এল। তার কণ্ঠ শুকনো, কিন্তু স্পষ্ট। “খালামণি, আগের টিকের ওপর টিক দিলে তো সংশোধন-সই লাগে।” সে চেকলিস্টের তৃতীয় সারিতে আঙুল দিল। “এখানে আপনার আদ্যক্ষর আছে, কিন্তু সময়ের ঘর খালি।”

সাজেদা ভাবী নিপার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন মেয়েটা ঘরের মধ্যে পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। “তুমি চুপ থাকো।”

ঠিক তখনই মোবারক সাহেব ঢুকলেন। ধূসর পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, ভুরু কুঁচকে আছে; বাইরে কার সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছেন বোঝা যায়। তিনি এসে প্রথমে আটকে থাকা কার্ট, তারপর বস্তার সারি, তারপর টেবিলের কাগজ দেখলেন। “এখনও ট্রাক ছাড়ে নাই কেন?”

সাজেদা ভাবী দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেন। “এই ছেলেটা গড়িমসি করছে। দুই বস্তা কম, আবার কথা শুনায়। আমি—”

“একটু দাঁড়ান,” রাশেদ কেটে দিল। সে এমনভাবে বলল যে কাজের লোকেরাও মাথা তুলল। “আপনার সামনে পড়ি। আগের সংখ্যা আঠারো। ওপর থেকে ষোলো করা। সংশোধন-সই আছে, সময় নাই। তারপর আমাকে মাঝপথে সিল ভেঙে আবার গুনতে বলা হইছে। নিচের শর্ত অনুযায়ী, পুনর্লোডের দায় গণনাকারীর। আমি সই দেওয়ার আগেই কার্ট থামানো হয়েছে।”

মোবারক সাহেব কাগজ নিলেন। জলিল তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় স্লিপটাও এগিয়ে দিল, যেখানে উপরের অনুমোদনে সাজেদা ভাবীর সই, আর নিচের খালি ঘর রাশেদের জন্য। নিপা চুপচাপ সিল-ভাঙা দড়িটা এনে টেবিলে রাখল। পাতলা নাইলনের কাটা অংশটা সবার চোখে পড়ল।

মোবারক সাহেবের পড়ার ভঙ্গি বদলে গেল। তিনি চেকলিস্টের ওপর ঝুঁকে লাইন মিলালেন, তারপর রিলিজের ছোট হরফের শর্তে আঙুল রেখে জলিলকে জিজ্ঞেস করলেন, “মধ্য-গণনা লিখছে কে?”

“এখনো কেউ না,” জলিল বলল, গলায় ভয় মিশে। “ম্যাডাম মুখে বলছিলেন খুলতে।”

“মুখে বললে কাগজ বদলায়?” মোবারক সাহেবের গলা নিচু ছিল, কিন্তু ধারালো। তিনি সাজেদা ভাবীর দিকে তাকালেন না, বরং রাশেদকে বললেন, “কার্ট কে থামাইছে?”

“ওনিই,” রাশেদ বলল। “আমি বের করার আগে।”

“আর এখন খোলার নির্দেশও উনিই দিছে?”

“জি।”

মোবারক সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। লেনের গরম বাতাসে এক মুহূর্ত কেউ নড়ল না। তারপর তিনি টেবিলের পাশে থাকা রাবারের সিল তুলে জলিলের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। “নতুন নোট খোলেন। মধ্য-গণনার নির্দেশদাতা—সাজেদা আক্তার। পুনর্লোড ও ঘাটতি যাচাই একই নামে। রাশেদের আগের সই স্থগিত।”

সাজেদা ভাবী ফেটে পড়লেন। “আপনি আমারে সবার সামনে—? আমি কি চুরি করছি? আত্মীয় মানুষকে এভাবে—”

মোবারক সাহেব এবার তাকালেন। “আত্মীয় বলেই কাগজে দাগ চাপা দেবেন? গুদামের মুখ আলাদা, বাসার টেবিল আলাদা। এখানে যে নাম দাগ টানে, সেই নামই দায় নেয়।”

শব্দগুলো নিপার মুখে কাঁপন তুলল। বাইরের চালক আবার হর্ন দিল, আরও জোরে। ঠেলাগাড়িওয়ালারা বস্তার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল, কারণ এখন কাজের দিক পাল্টে গেছে। রাশেদ বুঝল, আসল মুহূর্ত এখনো বাকি। সাজেদা ভাবী যদি এখানেই পিছিয়ে যান, সব আবার নরম কথায় মিলিয়ে যাবে। তাকে এক ধাপ বেশি ঠেলতে হবে—কিন্তু নিজের মুখ দিয়ে না, নিয়মের হাত দিয়ে।

সে কার্টের পাশে রাখা তালা-চেইন তুলে শাটারের রিংয়ে লাগাল, তারপর চাবিটা মোবারক সাহেবের দিকে নয়, টেবিলের ওপর খোলা রিলিজ স্লিপের পাশে রাখল। “যেহেতু মধ্য-গণনা আপনার নির্দেশে,” সে সাজেদা ভাবীকে বলল, “লোডিং বে এখন আপনার নিয়ন্ত্রণে। আমি তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে খালি করার কাজ করব, কিন্তু রিলিজ-শেষ সই, ঘাটতি নোট, আর ট্রাক ভাড়া-বিলম্ব—সব আপনার নামের নিচে যাবে। এই শর্তেই খুলব।”

“তুই আমাকে আদেশ দিছস?” সাজেদা ভাবীর কণ্ঠ ভেঙে গেল।

“না,” রাশেদ বলল, “আপনার নিজের খোলা শর্ত ফেরত দিচ্ছি।”

সে জলিলের দিকে না তাকিয়েও জানত লোকটা লিখছে। কলমের খসখস শব্দ উঠছিল। নিপা এবার বস্তার সারির পাশে গিয়ে দাঁড়াল, হাতে গণনার খাতা। সে খালামণির দিকে আর গেল না। এই ছোট সরে দাঁড়ানোতেই সম্পর্কের দূরত্ব চোখে পড়ে গেল।

সাজেদা ভাবী শেষ চেষ্টা করলেন। “রাশেদ, কার্টটা আগে সরাও। ট্রাক দাঁড় করায়ে রাখলে ক্ষতি বাড়বে।”

“বাড়বেই,” রাশেদ বলল, “যেভাবে আমার নামে বসাতে চেয়েছিলেন। এখন আপনার নামে বসবে। কার্ট সরবে যখন আপনি ‘মধ্য-গণনা শুরু’তে সই দেবেন আর সময় লিখবেন।”

মোবারক সাহেব কথা বাড়ালেন না। তিনি শুধু টেবিলের ওপর সইয়ের জায়গায় আঙুল রেখে থাকলেন। সেটা আদেশের চেয়েও শক্ত ছিল। শাটারের লোহার গায়ে রোদের তাপ চিকচিক করছিল, বস্তার মুখ থেকে শুকনো মরিচের গন্ধ উঠছিল, আর সাজেদা ভাবীর হাতের চুড়ি একবার টং করে বেজে থেমে গেল যখন তিনি কলম ধরলেন।

সই পড়তেই রাশেদ চেইন খুলল না। সে আগে জলিলের লিখে রাখা নতুন নোট পড়ল—নির্দেশদাতা, গণনাকারী, বিলম্ব-দায়। তারপর কার্টের প্রথম সারি আবার তুলতে বলল। কিন্তু এবার যেভাবে সাজেদা ভাবী তাকে আগে ঠেলছিলেন, ঠিক সেই উল্টো নিয়মে। “আপনি সামনে দাঁড়ান,” সে বলল। “সংখ্যা আপনি পড়বেন, আমি তুলব। ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে আপনার সংশোধন-সই।”

সাজেদা ভাবী দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। প্রথম বস্তা উঠল, তিনি সংখ্যা পড়লেন। দ্বিতীয় বস্তায় গলা শুকিয়ে গেল। তৃতীয় বস্তায় দেখা গেল দুই বস্তা কম না; বরং আগের সারি সরিয়ে পেছনের দুই বস্তা চেপে রাখা ছিল, সংখ্যার ঘরে কালি কেটে তা মিলানো হয়েছে। জলিল তড়াক করে আগের চেকলিস্টের পাশে নতুন গণনা বসাল। পুরোনো তালিকার জোড়াতালি এখন আরও কদর্য লাগছিল।

মোবারক সাহেব তখনই সিদ্ধান্ত দিলেন। “আজকের রিলিজ বন্ধ। নতুন তালিকায় যা মিলবে, সেই হিসেবে ট্রাক যাবে। আর পুরোনো চেকলিস্ট তদন্তে থাকবে। রাশেদ, তুমি বে-নিয়ন্ত্রণে থাকো। সাজেদা, তুমি এখানেই বসে সব সংশোধন শেষ করো।”

এবার সত্যিকারের ভাঙনটা দেখা গেল। সাজেদা ভাবী আর কাউকে থামাতে পারলেন না, কাউকে তাড়াতেও না। নিপা নতুন খাতা রাশেদের হাতে দিল, পুরোনোটা টেবিলে খুলে রাখল। ঠেলাগাড়িওয়ালারা এখন রাশেদের ইশারায় চলছে; কে কোন বস্তা ধরবে, কে শাটারের ধারে রাখবে, সব সে বলছে। ট্রাকচালক কেবিন থেকে নেমে সিগারেট ভেঙে ফেলে দিল—অপেক্ষার খরচ যার নামে উঠবে, সে এখন জানে।

শেষে রাশেদ টেবিলের কাছে গিয়ে পুরোনো চেকলিস্টটা নিজের দিকে টানল। নীল কালির ওপর লাল কলমে জলিল নতুন চিহ্ন বসিয়েছে, প্রতিটি বদলানো ঘরের পাশে নির্দেশদাতার সই। রাশেদ রিলিজের খালি নিচের ঘরে নিজের সই করার বদলে লিখল, “স্থগিত—নতুন গণনা অনুযায়ী।” তারপর চাবিটা তুলে আবার নামিয়ে রাখল, ঠিক খোলা চেকলিস্টের কোণায়। কাগজটা একটু কেঁপে উঠল, আর সাজানো টিকচিহ্নগুলোর লাইন উল্টো কোণে ঘুরে গিয়ে তার দেওয়া স্থগিত-নোটের দিকে বেঁকে রইল।