Fast Fiction

যাকে বসতে দেয়নি, তার কাছেই ঢোকার মিনতি

“এই বেঞ্চে না, ওদিকে দাঁড়ান”—মাহিরা ভাবি নিজের ব্যাগটা বাড়িয়ে খালাম্মার বসতে যাওয়া জায়গাটা আটকে দিল, তারপর কাউন্টারের মেয়েটাকে চিবুক তুলে বলল, “আগে আমাদের নাম ডাকেন, রোগী খুব কষ্টে আছে।”

রাইসা খালাম্মার কনুই শক্ত করে ধরল। ঢাকা শহরের এই বেসরকারি ক্লিনিকের নিচতলার অপেক্ষার লাইন এমনিতেই গুমোট; গরম, স্যাঁতসেঁতে, আর জীবাণুনাশকের কটু গন্ধে বাতাস জিভে লেগে থাকে। খালাম্মার শাড়ির পিঠ ভিজে গেছে, নিঃশ্বাসে শোঁ শোঁ শব্দ। রাইসার হাতের মধ্যে অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদটা নরম হয়ে আছে—সকাল থেকে কতবার খুলে দেখেছে, আবার ভাঁজ করেছে, তার কাগজের কিনারা চিটচিটে। গত রাতের অগ্রিম জমা, সকালের ছাড়পত্র, আগের বুকিং—সব ওই কাগজেই।

কিন্তু মাহিরা ভাবি যেন কাগজ নয়, মানুষ নিয়েই লেনদেন করছে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার ভরসায় সে আগেই দুটো বেঞ্চ চেপে বসে আছে—একটায় সে, আরেকটায় তার দেবর রুবেল পা ছড়িয়ে। খালাম্মা বললেন, “মা, আমি একটু বসি—”

“এখন বসার জায়গা নাই,” মাহিরা ভাবি বলল, যেন ক্লিনিকটা তার বাপের। “যারা আগে আইছে, তারা বসবে। আর নামও আগে আমাদেরটাই। আপনারা বাইরে থাকেন।”

বাইরে নয়, ঠিক দরজার কাঠে এসে থামতে হলো রাইসাকে। আধখোলা কাচের দরজার ফাঁকে সে খালাম্মাকে দাঁড় করিয়ে রাখল; এমন এক থেমে থাকা, যেখানে ভেতরের সবাই দেখে, কিন্তু কেউ জায়গা দেয় না। পাশে এক বৃদ্ধা ঠোঁট চেপে সরে গেলেন, তবু জায়গা হল না। কাউন্টারে নাম ডাকা শুরু হলো—“রুবেল হোসেনের ফাইল।” তারপর আরেকজন। তারপর মাহিরা ভাবির কণ্ঠ, “এই যে, বলছিলাম না? আগে আমাদের।”

রাইসা প্রথমে কিছু বলল না। তার ডান হাতের বুড়ো আঙুলে পুরনো বাসকার্ডের ঘষা-করা ধার খচখচ করছিল, বাম হাতে রসিদ। শুধু কাউন্টারের সামনে গিয়ে কাগজটা মেলে ধরল। “আমাদের বুকিং ছিল সাড়ে দশটার। রোগীর নাম রহিমা খাতুন। আগেই অগ্রিম জমা দেওয়া।”

কাউন্টার-কর্মী চোখ তুলল, আবার মাহিরা ভাবির দিকে তাকাল। “একটু বসেন।”

“কোথায় বসব?” রাইসার গলায় উচ্চস্বরে ক্ষোভ ছিল না, ছিল খালি ধার। “আপনাদের ডাকার কাগজ আমার হাতে। তবু আমাদের নাম পেছায়া রাখা হইছে কেন?”

কাউন্টারের মেয়েটা ঠোঁট কামড়াল। মাহিরা ভাবি সবার শোনার মতো করে হেসে বলল, “এইসব কাগজ থাকলেই সব হয় না। এখানে নিয়ম জানে কে? আমি কথা বলছি ওপরের সঙ্গে। আপনারা গ্রাম দিক থেইকা আইসা ভাবেন, কাগজ দেখাইলেই হবে?”

“গ্রাম দিক” কথাটা বেঞ্চের লাইনজুড়ে নরম হাসি ছড়িয়ে দিল। রাইসা খেয়াল করল, খালাম্মার হাঁটু কাঁপছে। তার শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাড় মুছতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠছে। কৃষি ব্যাংকের ছোট শাখায় সারা জীবন হিসাব মেলানো এই নারী আজ দাঁড়িয়ে আছেন নাম ডাকার দয়ার ওপর।

রাইসা রসিদের সঙ্গে ছোট্ট একটা সাদা স্লিপ বের করল। “এটা ট্রান্সফার স্লিপ। সকালের বেড-রিলিজের পর পিকআপ লেনের গাড়ি ছাড়ার অনুমতি একটাই। রোগীর অভিভাবকের নামে। এখানে আমার নাম।”

মাহিরা ভাবির চোখ একবার নামের ওপর পড়েই শক্ত হলো। তারপর সে হাত বাড়িয়ে স্লিপটা প্রায় কেড়ে নিতে গিয়েছিল। রাইসা টেনে নিল। বেঞ্চের দুই পাশে যারা ছিল, তারা তখন আর নীরব না; এক নার্স পাশ দিয়ে যেতে যেতে ধীর হলো, এক মাঝবয়সি লোক কাগজের দিকে গলা বাড়াল। অপমানটা এবার শুধু কথার থাকল না—বসার জায়গা, ডাকের ক্রম, আর শেষে বেরোনোর পথ—সব চেপে রাখা হয়েছে।

“এটা তো আমার দেবরের নামে হওয়ার কথা,” মাহিরা ভাবি কষে বলল, নিচু স্বরে, কিন্তু চারপাশ শুনে ফেলার মতো। “আমি নিজে বলে রাখছি।”

“আপনি বলে রাখছেন, তাই?” রাইসা কাগজ ভাঁজ করল না এবার। “ক্লিনিকে টাকা আমি জমা দিছি, রোগী আমি আনছি, রাত জাগছি আমি। আপনার বলায় আমার নাম সরাইছে?”

কাউন্টার-কর্মী এবার ফাইল টেনে নিল। কম্পিউটারের পাশে রাখা মোটা রেজিস্টার ঘেঁটে নাম মিলিয়ে দেখল। রাইসা দেখল, মাহিরা ভাবির আত্মবিশ্বাস তবু টলেনি; সে যেন নিশ্চিত, ওপরের কারও ফোনে আবার সব ঘুরিয়ে নিতে পারবে।

রাইসা নিজের ফোন বের করল। নাম খুঁজে চাপ দিল। একবার, দু’বার। ওপাশ ধরতেই সে শুধু বলল, “সালমা আপা, নিচে অপেক্ষার লাইনে আছি। রহিমা খাতুনের বুকিংটা অন্যদিকে ঠেলে রাখা হয়েছে। আপনি এখনই রিলিজ-ডেস্কে বলেন, অভিভাবক নাম আর পিকআপ অনুমতি একসঙ্গে মিলায়া দিতে।”

এটুকুই। না অনুনয়, না ব্যাখ্যা। লাইনের লোকজন ঠিক সেই পরিমাণ শব্দই শুনল, যেটা শুনে বোঝা যায়—এখানে আরেকটা হাত আছে, যেটা কথায় না, নথিতে কাজ করে।

দুই মিনিটও লাগল না। ভেতরের করিডর থেকে এক সিনিয়র নার্স ফাইল হাতে বেরিয়ে এলেন। কাউন্টারের সামনে এসে থামলেন, রেজিস্টার নিজের দিকে টেনে নিলেন, তারপর সবার সামনেই ফাইলের ভেতর থেকে একটি সবুজ কভার বের করে কাউন্টারের ডান দিক থেকে বাঁ দিকে সরিয়ে রাখলেন। “রহিমা খাতুন। অভিভাবক—রাইসা সুলতানা। আগের বুকিং এটাই। ভুল পাশে চলে গেছিল।”

মাহিরা ভাবি উঠে দাঁড়াল। “না, এক মিনিট, আমি তো—”

নার্স তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, “আপনার নাম অন্য কেসে আছে। এটা ছাড়েন।” তারপর কাউন্টার-কর্মীকে বললেন, “এই ফাইল আগে ডাকেন।”

সেই এক টানেই বেঞ্চের হিসাব বদলে গেল। যে জায়গাটা একটু আগে আটকে রাখা ছিল, রুবেল নিজের পা নামিয়ে নিল। পাশে বসা বৃদ্ধা খালাম্মার দিকে শরীর সরিয়ে দিলেন। “আপা, বসেন।” খালাম্মা বসতেই তার হাঁটু থেকে কাঁপুনি নামল, কিন্তু মুখের ক্লান্ত ভাঁজ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাইসা দাঁড়িয়েই রইল।

কাউন্টার থেকে ডাক এল, “রহিমা খাতুনের পক্ষের লোক?” রাইসা এগোল। কাউন্টার-কর্মী এবার তার দিকে কাগজ বাড়িয়ে দিল। “ভর্তি-ছাড়পত্রের স্বাক্ষর দেন। পরে গাড়ির লাইনে এই নামই যাবে।”

মাহিরা ভাবি তখনও দাঁড়িয়ে, কিন্তু আগের মতো সোজা না। তার গলার ভিতরের জোরটা কোথায় যেন আটকে গেছে। “আচ্ছা, আগে আমাদেরটা করলেই তো পারতেন। এত নাটক লাগত না।”

রাইসা শুনল, উত্তর দিল না। খালাম্মার কাঁধে হাত রাখল শুধু। পাশের বেঞ্চে বসা লোকজন এখন কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে, কিন্তু নিরাপদ দিকে—যেদিকে কাগজ গেল, সেদিকেই। এ শহরে মর্যাদা অনেক সময় মানুষের হাতে থাকে না; থাকে কোন ফাইলটা কার দিকে সরল, তাতে।

আরো এক দফা নাম ডাকা, সই, ওষুধের কাগজ, বিল মেলানো—সবকিছুর ভেতর একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল: কর্মীরা এখন রাইসার মুখ চেনে। কে দাঁড়াবে, কে জানালার কাছে যাবে, কার কাগজ আগে নেবে—ছোট ছোট সব দিকেই সরে গেল দৃষ্টি। মাহিরা ভাবি বার দুয়েক এগিয়ে এসে কিছু বলতে চেয়েছিল, প্রতিবারই কেউ না কেউ বলেছে, “একটু দাঁড়ান”, “ওদেরটা আগে”, “এই রোগী রিলিজে আছে।” বেঞ্চের লাইনে আটকানো মানুষদের সামনে এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। ক্ষমতা ঘোষণা করতে হয়নি; বসার জায়গা আর ডাকার ক্রমই বলে দিল।

দুপুর গড়িয়ে যখন রিলিজ-ডেস্ক থেকে স্ট্রেচার নামল, তখন শেষ গেটটা সামনে দেখা গেল—পিকআপ লেন। নিচতলার সামনের ফাঁকা জায়গা, দুই পাশে বেঞ্চ, মাঝখানে হলুদ রঙের চেইন-বারিয়ার টাঙানো। ভেতরে এক সময়ে একটাই গাড়ি ঢুকবে। রোগী তুলতে অনুমতি মিললে চেইন উঠবে, না মিললে বাইরে দাঁড়ানো গাড়ি, মানুষ, আত্মীয়—সবাই আটকে থাকবে। সেলিম, যে ভোরে খালাম্মাকে নিয়ে এসেছে, সে ভ্যানগাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধ সোজা করছিল। তার শার্টে সারাদিনের ভাঁজ, চোখে ঘুমহীন লাল রেখা।

রিলিজ-ডেস্কের লোক কাগজ দেখে বলল, “রহিমা খাতুনের গাড়ি প্রস্তুত রাখেন। অভিভাবক কোথায়?”

রাইসা এগিয়ে গেল। মাহিরা ভাবি তখনই দ্রুত এসে দাঁড়াল, হাঁপ ছুটে গেছে একটু। “দেখেন, আমাদের গাড়িটা আগে ঢুকুক। আমরাও তো অনেকক্ষণ বসে আছি। মানুষজন আছে, বাচ্চা আছে।”

রিলিজ-ডেস্কের লোক চোখ নামিয়ে তালিকা দেখছিল। তারপর বলল, “পিকআপ অনুমতি একসঙ্গে মিলানো। একই নামে রুট খোলা হবে। যিনি অনুমোদিত, তার রোগীর গাড়িই আগে ঢুকবে। এরপর পরেরটা।”

এই কথাটাই যেন মাহিরা ভাবির মুখের রং কেটে দিল। একটু আগে পর্যন্ত ধার করা জানাশোনায় যে পথ আটকে রেখেছিল, সেই একই পথের চাবি এখন রাইসার হাতে। চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল—ওষুধের প্যাকেট হাতে, বিলের খাম হাতে, রোগীর আত্মীয়, ড্রাইভার—তারা থেমে গেল না, কিন্তু তাকানো থামাল না।

মাহিরা ভাবি এবার নিচু গলায় এল। “রাইসা, আগে আমাদেরটা ঢুকতে দাও। রুবেলের মা-ও কষ্টে আছে। পরে তোমাদেরটা যাবে।”

রাইসা তার দিকে তাকাল। এই প্রথম নয়—সকালের বেঞ্চ, নাম ডাকা, কাগজ সরানো—সবকিছুর হিসাব এখন এই চেইনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে খালাম্মার স্ট্রেচারের হাতল ধরে সেলিমকে বলল, “গাড়ি সামনে আনো।”

মাহিরা ভাবি আরেক পা এগিয়ে এল। “শুনছ? আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে তো, পরে কী লাগবে কে জানে। এত কড়া হয়ো না।”

রাইসা রিলিজ-ডেস্কের লোকটার দিকে ঘুরে খুব সোজা গলায় বলল, “রহিমা খাতুনের গাড়ি ঢুকান। স্ট্রেচার রেডি।”

ওই লোক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে হাত তুলে পাহারায় থাকা কর্মচারীকে ইশারা করল। কিন্তু পুরনো দাপট একবার শেষ চেষ্টা করল—মাহিরা ভাবি চেইনের সামনে গিয়ে বলল, “এক মিনিট, আগে এইটা—”

কর্মচারী হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। “লাইন পিছনে রাখেন। অনুমতির রোগী আগে।”

এতক্ষণে ক্ষতিটা দেখা গেল। মাহিরা ভাবির পেছনে দাঁড়ানো রুবেল গাড়ির দরজা খুলে রেখে থমকে আছে; বেঞ্চের লাইন থেকে তাদের সঙ্গে থাকা এক বয়স্কা মহিলা উঠে এসেও মাঝপথে থেমে গেলেন। তারা ঢোকার মুখে এসেও ঢুকতে পারছে না। তাদের গাড়ির সামনের চাকা চেইনের বাইরে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে, আর সেলিমের ভ্যান ধীরে ধীরে ভেতরের ফাঁকা লেনে ঢুকে পড়ছে।

স্ট্রেচার তোলা শুরু হলে মাহিরা ভাবির গলায় সেই আগের তাচ্ছিল্য আর থাকল না। “রাইসা, পরে ঝামেলা কইরো না। আগে আমাদের গাড়িটা এক মিনিট—”

রাইসা খালাম্মার পাতলা কম্বলটা গুছিয়ে দিল, তারপর পিকআপ লেনের মুখে দাঁড়ানো কর্মচারীকে বলল, “চেইন নামানো থাকবে। আমাদের গাড়ি বের না হওয়া পর্যন্ত আর কাউরে ঢুকাইবেন না।”

কর্মচারী মাথা নাড়ল। সেলিম গাড়ি স্টার্ট দিল। হলুদ চেইনটা এক পাশে তুলে ধরা হলো, শুধু ওই একটুখানি ফাঁক খুলে। রাইসা হাত রেখে খালাম্মার স্ট্রেচার থেকে গাড়ির সিটে ওঠানো শেষ দেখল, তারপর নিজে সামনের দরজায় হাত দিল। গাড়ি নড়তেই ফাঁকের ওপরের চেইন আবার নিচে নামল; তাদের গাড়ির জন্য উঠল, অন্য পাশটা বেঞ্চের লাইনসহ আটকে রইল।