পাসটা হাতে যেতেই সব বদল
“ওই বেঞ্চে বসবেন না, এটা আমাদের সিরিয়ালের লোকজনের,” বলে নাসরিন ভাবি হাত বাড়িয়ে মেহজাবীনের ফাইলটা ঠেলে দিলেন এমনভাবে, যেন ফাইল না, কারও কনুই সরাচ্ছেন। পুরোনো নীল কভারের ভাঁজে ভাঁজে ঘাম লেগে গাঢ় হয়ে থাকা কাগজের ফাইলটা মেহজাবীন দুই হাতে আঁকড়ে ধরল। ভেতরে নবায়নের রসিদ, আধভাঁজ করা টোকেন স্লিপ, আর তার বাবার দোকানের কৃষি সরঞ্জাম আমদানির অনুমতিপত্র—সবই আছে। বেঞ্চে বসা তিনজন একসাথে একটু সরে গিয়ে আবার জায়গা আটকে নিল। মেহজাবীন দাঁড়িয়েই রইল।
ঢাকার পুরানা পল্টনের এই লাইসেন্স নবায়ন কেন্দ্রের করিডর এমনিই গরম, তার ওপর আজ শেষ তারিখের ভিড়। দোতলার আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে একটার পর একটা নাম ডাকা হচ্ছে, আর প্রতিটা ডাকে কাউন্টার পর্যন্ত যাওয়ার আগে কে বসে, কে দাঁড়ায়, কে কার সঙ্গে জানাশোনা দেখায়—সব দেখা যাচ্ছে। মেহজাবীনের কাঁধে সারারাতের দৌড়ঝাঁপের শক্ত হয়ে থাকা টান। ভোরে মিরপুর থেকে বাসে এসে নামার পর মেট্রোকার্ডের ঘষা-খাওয়া কিনারা বারবার আঙুলে লেগেছে; এখন সেই একই আঙুলে ফাইলের প্লাস্টিক কভার কেটে যাচ্ছে। আজ কাজ না হলে বাবার দোকানের অনলাইন বিক্রির চালান আটকে যাবে। ঈদের আগের চালান। টাকা থেমে গেলে শুধু দোকান না, বাড়ির ভাতও থেমে যাবে।
নাসরিন ভাবি নিজের সালোয়ারের ওড়না কাঁধে তুলে জয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি না বললে এরা বুঝে না। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা বলে একটা কথা আছে। যার ঘরের বউ, যার ঘরের ছেলে—আগে তাদের কাজ হবে। বাইরে থেকে এসে কেউ ফাইল ধরলেই মালিক হয় না।”
জয়া, খালাতো বোন, ঠোঁট বেঁকিয়ে মেহজাবীনের হাতে ধরা টোকেনটা দেখে বলল, “তোর তো নম্বর ছাব্বিশ। আমাদেরটা বারো। দাঁড়া না। এত তাড়া কীসের?”
“টোকেন আমি সাতটায় নিয়েছি,” মেহজাবীন শান্ত গলায় বলল।
“নিয়েছিস তো কী হয়েছে?” নাসরিন ভাবি এবার সরাসরি টোকেন স্লিপটা টেনে নিয়ে চোখ বুলিয়ে কাউন্টারের ভেতরে বসা শাওনকে দেখালেন। “ভাই, এই ফাইলটা পরে রাখেন। আগে আমাদের ‘রহমান এগ্রো’-র নবায়ন দেন। একই পরিবারের ব্যবসা। ফাইল একসাথে দেখেন।”
মেহজাবীন দেখল, শাওন একবার তার দিকে, একবার নাসরিন ভাবির দিকে তাকিয়ে ফাইলের স্তূপে হাত দিল। তারপর তার নীল ফাইলটা টেনে নিয়ে অন্য এক মোটা সবুজ ফাইলের নিচে গুঁজে রাখল। কাজটা এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে করল, যেন এটাই স্বাভাবিক। করিডরের বেঞ্চের ওপর বসা লোকজনের চোখ দুম করে নরম হয়ে গেল—যেদিকে সুবিধা, সেদিকেই।
“আমি দাঁড়িয়ে থাকব, কিন্তু আমার ফাইল নিচে দেবেন না,” মেহজাবীন বলল।
শাওন কাঁধ ঝাঁকাল। “আপা, বাইরে দাঁড়ান। ডাকলে আসবেন। ভেতরের কাগজ মিলাতে সময় লাগে।”
নাসরিন ভাবি তখনই শেষ আঘাতটা দিলেন। “আর একটা কথা, মালিকের সই ছাড়া কোনো কাগজ নড়বে না। ভাইয়া আজকে আসতে পারেনি, তাই আমি আছি। মেয়েদের হাতে এসব কাগজ দিলে কালকে সমস্যা হলে কে ধরবে?”
কথাটা এমন জোরে বললেন, যেন কাউন্টারকেও শোনাতে হবে, করিডরকেও শোনাতে হবে। দুজন বয়স্ক ব্যবসায়ী মাথা নাড়ল। একজন নিচু গলায় বলল, “ঠিকই তো। এখনকার মেয়েরা অনলাইন করে, কাগজপত্র বোঝে নাকি।”
মেহজাবীনের চোখ একবারও নড়ল না। শুধু বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে আধভাঁজ করা রসিদের ধারটা আরও গভীর হয়ে বসল।
ভেতরের দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে একজন পিয়ন নাম ডাকতে এল। “রহমান এগ্রো ট্রেডার্স।”
নাসরিন ভাবি উঠে দাঁড়ালেন এমন ভঙ্গিতে, যেন এই ডাকে করিডর নিশ্চিত হয়েছে কার ওজন কত। তিনি জয়াকে বসে থাকতে বলে সবুজ ফাইল হাতে নিয়ে ভেতরের দিকে এগোলেন। ঠিক তখনই মেহজাবীন এক পা সরিয়ে দরজার চৌকাঠের সামনে এসে দাঁড়াল। ফাইল থেকে একটা পাতলা স্বচ্ছ খাম বের করল। খামের ভেতরে নোটারি করা অংশীদারি দলিল, ব্যাংকের হালনাগাদ স্বাক্ষর নমুনা, আর একটি হলুদ কার্ড—পুরোনো, কোণা ক্ষয়ে যাওয়া, তবু স্পষ্ট।
“রহমান এগ্রো ট্রেডার্সের নবায়ন,” সে বলল, “সই কর্তৃত্ব বদলের নথি গত মাসে জমা হয়েছে। মালিক পক্ষ—মেহজাবীন রহমান।”
শাওন বিরক্ত মুখে হাত বাড়ালেও হলুদ কার্ডটা দেখেই থেমে গেল। কার্ডের ওপরে কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানিকারক সমিতির নবায়িত সদস্যচিহ্ন, নিচে নাম—মেহজাবীন রহমান। আরো নিচে সিল মারা অনুমোদন নোট: কার্যকর প্রতিনিধি ও স্বাক্ষরধারী। শাওনের মুখের আলগা ভরসাটা এক মুহূর্তে সরে গেল। সে তাড়াতাড়ি কম্পিউটারের পাশের রেজিস্টার টেনে নিল, পাতা উল্টাল, তারপর ফাইলের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে মেহজাবীনের নীল ফাইলটা সবুজটার নিচ থেকে বের করে ওপরে তুলল।
কাগজ ওঠার শব্দটা ছোট ছিল, কিন্তু বেঞ্চের সারি সেটাই শুনল। নাসরিন ভাবির পা দরজার অর্ধেক ভেতরে, অর্ধেক বাইরে থেমে গেল।
“আপনার নাম আবার বলেন,” শাওন এবার সোজা হয়ে বসে বলল।
“মেহজাবীন রহমান।”
শাওন ভেতরে মুখ বাড়িয়ে ডাক দিল, “মেহজাবীন রহমান, রহমান এগ্রো নবায়ন—অ্যাকটিভ ফাইল।”
সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চের ডান মাথায় বসা এক লোক উঠে দাঁড়াল, কারণ শাওন হাত দেখিয়ে বলেছে, “আপা, এই চেয়ারটা খালি করেন। উনি বসবেন।” বসা লোকটা আপত্তি করল না; এক সেকেন্ড আগেও যে জায়গা কেউ দেয়নি, সেটা এখন নিজে থেকেই সরে গেল। মেহজাবীন বসতে গিয়ে বসল না। চেয়ারের পিঠে ফাইল রেখে দাঁড়িয়েই বলল, “আমি ভেতরে যাব।”
নাসরিন ভাবির চোখে তখন প্রথমবারের মতো হিসেব কেঁপে উঠল। “শাওন ভাই, এক মিনিট। কাগজ তো এক। আগে আমরা ভেতরে কথা বলে—”
“আপনারা বাইরে অপেক্ষা করেন,” শাওন বলল, এবার গলায় সেবাদানের ভদ্রতা নেই, কেবল নিয়মের শুকনো ধার। “অ্যাকটিভ ফাইল যাঁর নামে, তিনি ভেতরে যাবেন।”
জয়া বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ওড়না আটকে ফেলল। নাসরিন ভাবি সরে যাওয়ার বদলে দরজার মুখে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালেন। “আমি ওর ভাবি। বাড়ির বড় বউ। ব্যবসা কিভাবে চলে আমি জানি। ওই মেয়েকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে ভুল কাগজে সই নিলে পরে দায় নেবেন?”
মেহজাবীন এবার প্রথম তার দিকে পুরো ঘুরল। “যে কাগজে তুমি সকাল থেকে আমার টোকেন সরাচ্ছ, সে কাগজের দায় আমি তিন মাস আগে নিয়েছি।”
শাওন উঠে দাঁড়িয়ে কাউন্টারের ছোট গেট খুলে দিল। “আপা, ভেতরে আসেন।”
এইটুকু পথই ছিল আসল দেয়াল। মেহজাবীন গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বেঞ্চের সারির হিসেব পাল্টে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিন ভাবি আর জয়ার ফাঁকে যাঁরা এতক্ষণ সুবিধামতো জায়গা ধরে ছিল, তারা সরে বসল। জয়া বসার জায়গা হারাল। নাসরিন ভাবি দাঁড়িয়েই রইলেন; ভেতরে যাওয়ার মুখ তার জন্য খোলা নেই, বাইরে ফেরার মুখও নেই।
কাউন্টারের ভেতরে বাতাস ঠান্ডা না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আলাদা। শাওন রেজিস্টার, নবায়ন ফর্ম, পুরোনো অনুমতি সব মেহজাবীনের দিকে ঘুরিয়ে দিল। পাশের টেবিলে রাশেদ কাকা, সমিতির প্রবীণ প্রতিনিধি, ফাইল দেখে চশমা নামালেন। “এই নামটাই তো আপডেট করে পাঠানো হয়েছিল। কাগজ আটকে ছিল কেন?”
শাওন খুকখুক করে কাশল। বাইরে দাঁড়ানো নাসরিন ভাবির কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হল। “কাকা, আমি বলি? বাড়িতে তো ঠিক হয়েছিল—”
“বাইরে দাঁড়ান,” রাশেদ কাকা না তাকিয়েই বললেন। “ভেতরের কথা ভেতরে হবে।”
নাসরিন ভাবির মুখে তখন একসাথে রাগ আর তাড়া। “মেহজাবীন, তুই এমন করিস না। ভাইয়া জানে না। লাইসেন্সটা তো বাড়ির ব্যবসার। নবায়ন হয়ে গেলে পরে নাম ঠিক করে—”
মেহজাবীন টেবিলে দলিলটা খুলে দিল। সেখানে স্পষ্ট লেখা: পুরোনো ঋণ শোধের দায়ে, চলতি মূলধন বিনিয়োগের বিনিময়ে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও স্বাক্ষর ক্ষমতা মেহজাবীন রহমানের নামে হস্তান্তর। তার বাবার কাঁপা সই, নোটারি সিল, ব্যাংকের সিল—সব। গত তিন মাসে রাত জেগে লাইভে কৃষি মোটর, স্প্রে পাম্প, সেচের নল বিক্রি করে যে টাকা তুলেছে, তা দিয়েই দোকানটা ভেসে থাকা বন্ধ করেছে। অথচ সকালে এসে তাকে বেঞ্চেও বসতে দেয়নি।
রাশেদ কাকা ধীর গলায় বললেন, “নবায়নের নির্দেশ কার সইয়ে যাবে?”
শাওন কলম থামিয়ে তাকাল। এটাই ছিল আসল প্রশ্ন। কার নির্দেশে ফাইল ছাড়বে, কার নির্দেশে ডেলিভারি কপি উঠবে, কার নামে এ বছরের আমদানি সীমা খোলা হবে। বাইরে নাসরিন ভাবির নিঃশ্বাস পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
“আমার সইয়ে,” মেহজাবীন বলল।
নাসরিন ভাবি সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপালেন। “আচ্ছা, তোর নামে হোক। কিন্তু অতিরিক্ত দুটো পাম্পসেটের অনুমতিটাও ঢুকিয়ে দে। আমাদের সিলেটের অর্ডার রেডি। আর জয়ার নামে সাব-ডিলার যুক্ত করে দে। সব তো ঘরেরই—”
মেহজাবীন মুখ তুলল না। “না।”
শব্দটা ছোট। তবু বাইরে দাঁড়ানো দুজনের শরীর যেন একসাথে থমকাল।
“না মানে?” নাসরিন ভাবির কণ্ঠ চড়ে গেল। “এই কাজটা আজকে না হলে আমাদের চালান নামবে না।”
“আমার ফাইলের সঙ্গে তোমাদের কিছু ঢুকবে না।”
“তুই কি আমাদের কাটছিস?”
“তোমরা সকাল থেকে যে লাইনে আমাকে কেটেছ, ওটাই রেখো,” মেহজাবীন বলল, এবার শাওনের দিকে তাকিয়ে। “নবায়ন শুধুই মূল পারমিট। কোনো অতিরিক্ত সংযোজন, কোনো সাব-ডিলার এন্ট্রি, কোনো সংশোধনী আজ নেবেন না। ফাইলে নোট দিন—পরবর্তী আবেদন আলাদা টোকেনে, আলাদা যাচাইয়ে।”
শাওনের কলম এবার সত্যিকারের দ্রুত চলল। রেজিস্টারের মার্জিনে সে লাল কালিতে নোট লিখল। তারপর থেমে বলল, “রিলিজ নির্দেশও দেবেন?”
“হ্যাঁ,” মেহজাবীন বলল। “নবায়িত কপি কাউন্টার হস্তান্তর হবে শুধু আমার জাতীয় পরিচয়পত্র মিলিয়ে। অন্য কাউকে নয়।”
রাশেদ কাকা একবার মাথা তুললেন। “নিশ্চিত?”
মেহজাবীন নীল ফাইলের ভেতর থেকে পরিচয়পত্র বের করে রাখল। কার্ডের কোণা ক্ষয়ে গেছে, যেমন প্রতিদিনের যাতায়াতে ক্ষয়ে যায়। “নিশ্চিত।”
বাইরে নাসরিন ভাবির গলা এবার বদলে গেল। ধার নরম হল না, কিন্তু কর্তৃত্ব ভেঙে গিয়ে তাড়া বেরিয়ে পড়ল। “মেহজাবীন, এত কড়া করিস না। অন্তত কপিটা আমি নিয়ে যাই। ভাইয়াকে বুঝিয়ে—”
“না,” মেহজাবীন আবার বলল। এবার সে কাউন্টারের পাশে রাখা ছোট সিলপ্যাডটা নিজের দিকে টেনে নিল। “শাওন, মূল ফাইলটা দিন।”
শাওন ফাইল এগিয়ে দিল। নবায়ন ফরমের শেষ পাতায় যেখানে মালিক পক্ষের নির্দেশ দরকার, সেখানে মেহজাবীন কলম ধরে সই করল। তারপর নিচে পরিষ্কার অক্ষরে লিখল: ‘হস্তান্তর নিষেধ। প্রত্যক্ষ গ্রহণকারী—মেহজাবীন রহমান।’ রাশেদ কাকা সই মিলিয়ে মাথা নাড়লেন। আরেকজন কর্মচারী পাশ থেকে পারমিটের রাবার সিলটা এগিয়ে দিল।
এই মুহূর্তে নাসরিন ভাবি শেষবারের মতো চেষ্টা করলেন। দরজার চৌকাঠ ছাড়িয়ে আধা পা ঢুকেই বললেন, “কাকা, আমি শুধু এক মিনিট—”
রাশেদ কাকা হাত তুললেন না; শুধু শাওনের কণ্ঠ আগে বেরোল, শুকনো আর প্রকাশ্য। “ম্যাডাম, বাইরে অপেক্ষা করেন। নতুন টোকেন নিয়ে আলাদা আবেদন করবেন।”
কথাটা বেঞ্চের ওপর ধপ করে পড়ল। জয়া, যে এতক্ষণ দরজার কাছে জায়গা ধরে ছিল, সরে গিয়ে দেয়ালে ঠেকল। নাসরিন ভাবির আধা পা নিজেই পিছলে ফিরে এল। ভেতরে আর তার কোনো জায়গা নেই; বাইরে সে এখন কেবল অপেক্ষমাণদের একজন।
মেহজাবীন সিলটা হাতে নিয়ে একবার ফর্মের নির্দিষ্ট ঘর মিলিয়ে দেখল, তারপর শক্ত করে নামাল। ‘পারমিট নবায়িত’—লালচে কালি ভিজে উঠে কাগজে বসে গেল। সে সিল তুলে ফাইলটা কাউন্টারের ধার ঘেঁষে রাখল। নতুন পারমিট সিলের কালি ধীরে ধীরে গাঢ় হলো, তারপর শুকোতে শুরু করল।