Fast Fiction

সিঁড়ির ফাঁদ উল্টো ওর গলাতেই

“না, এই সিঁড়ি দিয়ে না—ওই পাশের টেপ মারা রাস্তায় যান,” রোকসানা ভাবি হাত তুলে মেহরিনের বুকের সামনে বাতাস কেটে দিল, যেন মানুষ না, মালপত্র ঘোরানো হচ্ছে। ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন অনুষ্ঠানকর্মী, নাঈম মামা, আর নিচে উঠতে থাকা দুজন আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ একসঙ্গে তাকাল। মেহরিনের হাতে ধরা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বক্সটা ধাতব রেলিংয়ে ঠেকল, টুং করে উঠল শব্দ। দরজার অর্ধেক খোলা ফাঁকে ভেতরের আলো দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু রোকসানা ভাবি ঠিক সেই ফাঁকটাই শরীর দিয়ে আটকে রেখেছে।

“আমি উপরের স্পনসর কক্ষে যাচ্ছি,” মেহরিন শান্ত গলায় বলল।

“তুমি?” রোকসানা ভাবির ঠোঁট বাঁকাল। “আজকে বড় মানুষদের আসা-যাওয়া। কৃষি-টেকের বোর্ডরুম কোনো সবার যাওয়ার জায়গা না। নিচের নিবন্ধন টেবিলে ফাইল ধরো, কাজে লাগবে। আত্মীয়ের মেয়ে বলে ঢুকে পড়া যায় না।”

কথাটা জোরে বলা হলো, যাতে আশেপাশের সবাই শুনে। নাঈম মামা গলা খাঁকারি দিলেন, কিন্তু সামনে এগোলেন না। মেহরিনের চোখ একবার নামল নিজের ডান হাতের আঙুলে—পুরনো কলমের কালি লেগে হালকা দাগ, সকাল থেকে নামের তালিকা, ফোন, অনুমতিপত্র সামলাতে সামলাতে শুকিয়ে গেছে। গত জীবনে ঠিক এই ল্যান্ডিংয়েই সে থেমে গিয়েছিল, মুখ নিচু করে নিচের টেবিলে নেমে গিয়েছিল, তারপর উপরের কক্ষে তার নামের জায়গায় অন্য কারও নাম ওঠে। সেই ভুলের দাম সে একা দেয়নি—মায়ের ঔষধ, ছোট ভাইয়ের সেমিস্টার ফি, ভাড়া বাসার বকেয়া, সব একসঙ্গে নেমে এসেছিল।

এইবার সে থামল, কিন্তু নামল না।

রোকসানা ভাবি ইতিমধ্যে কালো গ্যাফার টেপ দিয়ে করা সরু পাশের পথটা দেখিয়ে অনুষ্ঠানকর্মী সজিবকে বলেছে, “ওকে ওই ঘুরপথে নামাও। আর এই চাবিটা নিচের স্টোররুমে জমা দিয়ে রসিদ এনে দিতে বলো। দেরি হলে উপরে ওঠার দরকার নেই।”

দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবিটা মেহরিনের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হলো। ছোট ধাতব টোকেনটা তার খাবারের বক্সে ঠক করে লাগল। এ ছিল আদেশ না, ছোট করা। সজিব ইতস্তত করে বলল, “আপা, ওই দিকটা একটু ঘুরে—”

“যে রুটে অতিথি ওঠেন, আমি সেই রুটেই উঠব,” মেহরিন বলল।

রোকসানা ভাবি হাসল, সেই হাসিতে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা দম্ভ। “অতিথি? তোমাকে কে ডাকছে? এই অনুষ্ঠানটা কাদের টাকায়, কাদের নামে চলছে, একটু বোঝো। আমি উপরের ফ্লোরের চলাচল দেখছি। তোমার জন্য আলাদা নিয়ম হবে না।”

প্রথম চিড়টা সেখানেই পড়ল। ভেতর থেকে এক অনুষ্ঠানকর্মী দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে বলল, “ভাবি, কৃষিমন্ত্রীর উপদেষ্টার টেবিলের জন্য যে নীল ফোল্ডারটা—ওটা তো মেহরিন আপার কাছেই ছিল না?”

রোকসানা ভাবি এক মুহূর্ত থামল, তারপর চোখ না ফেরিয়েই বলল, “নিচে আছে। ও আগে স্টোররুমের চাবি জমা দিক।” মেহরিন কিছু বলল না। শুধু নীল ফোল্ডারটা খাবারের বক্সের নিচ থেকে খানিকটা ওপরে তুলল, যেন ভুল করে দেখা যায়। দরজার ফাঁক থেকে বেরোনো ছেলেটার চোখ সেখানে আটকে গেল। সেই এক সেকেন্ডে ল্যান্ডিংয়ের বাতাস বদলাল না, কিন্তু ফাটল দেখা গেল।

তবু রোকসানা ভাবি পিছু হটল না। বরং শক্ত হলো। “সজিব, দাঁড়িয়ে আছ কেন? ওকে নামাও। টেপের বাইরে কেউ যাবে না।”

গ্যাফার টেপ মেঝেতে এমনভাবে মারা যে সিঁড়ির মোড় সরু হয়ে গেছে; একসঙ্গে একজনের বেশি যাওয়া যায় না। পাশের রুটটা স্টোররুম ঘুরে আবার পেছন দিয়ে উঠে আসে, কিন্তু মাঝখানে নিবন্ধন টেবিল, বাক্স, জলের জার—একটা লোককে ব্যস্ত রেখে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মেহরিন জানত। এই ফাঁদও সে আগে দেখেছে, শুধু আগেরবার চিনতে দেরি হয়েছিল।

সে চাবিটা হাতে নিয়ে নিচে নামল না। রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল বের করল। রোকসানা ভাবি সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এখন ফোনে নাটক কোরো না। কাজ থাকলে পরে—”

মেহরিন ইতিমধ্যে নম্বর টিপে স্পিকার না খুলেই বলেছে, “হ্যালো, মাহতাব স্যার? আমি মেহরিন। স্পনসর ক্লিয়ারেন্স কোড, ভিআইপি প্রবেশপথ আর সাইন-ইন ফাইল সব আমার কাছেই আছে। আমাকে ল্যান্ডিংয়ে ঘুরপথে নামিয়ে রাখা হয়েছে। আপনি কি উপরে অপেক্ষা করাবেন, না আমি এখনই মূল সিঁড়ি দিয়ে উঠছি?”

ওপাশের উত্তর শোনার দরকার পড়ল না। দরজার ভেতর থেকে একসঙ্গে দুজন নড়ল। উপরের দিক থেকে তাড়াহুড়া করে নেমে এলেন সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক; তার পেছনে আরেকজন অনুষ্ঠানকর্মী। “মেহরিন কোথায়?” তার গলায় এমন তাড়া, যাতে অযথা অভিনয়ের জায়গা থাকে না। “স্পনসর বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ওর ছাড়া খোলা যাবে না। মঞ্চে নাম ডাকার আগে সিল লাগবে।”

ল্যান্ডিংয়ের মানুষজন এবার সত্যি ঘুরে তাকাল। সজিবের হাত নিজে থেকেই পাশের টেপের রাস্তাটা ছেড়ে মূল সিঁড়ির দিকে সরে গেল। রোকসানা ভাবি এক পা ডানে সরে আবার নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু ততক্ষণে ভিড়ের চলাচল বদলে গেছে। যাঁরা উঠছিলেন, তাঁরা মেহরিনের দিকে পথ ছেড়ে দিলেন; যারা নামছিলেন, তারা থেমে গেল। কালো টেপে বানানো সরু পথটা হঠাৎই ফাঁকা পড়ে রইল, অথচ মূল সিঁড়ি খুলে গেল তার সামনে।

মেহরিন চাবিটা সজিবের হাতে দিল। “নিচের স্টোরে জমা দাও। রসিদ আমার ডেস্কে রেখো।” তারপর নীল ফোল্ডারটা বগলের কাছে তুলল। কোনো বক্তৃতা নয়, শুধু কাজের বণ্টন। সজিব “জ্বি” বলে নিল, যেন এতক্ষণ সে অন্য কারও নির্দেশে ছিলই না।

রোকসানা ভাবির কণ্ঠ তখনও উঁচু, কিন্তু ধার ভোঁতা। “এক মিনিট। উপরের চলাচলের দায়িত্ব আমার কাছে দেওয়া হয়েছে।”

জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, “ম্যাডাম, তালিকা বদলেছে। স্পনসর দিকের প্রবেশ ও সাইন-ইন এখন মেহরিন দেখবে। আপনি নিচের অতিথি আপ্যায়ন দেখুন।”

নিচের। শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু ল্যান্ডিংয়ে স্পষ্ট। নাঈম মামা চোখ নামিয়ে নিলেন। একটু আগেও যে আত্মীয়রা মেহরিনকে নিচের টেবিলের লোক ভেবেছিল, তারা এখন সরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বয়স্ক খালা ব্যাগ বুকে টেনে নিয়ে মূল সিঁড়িতে জায়গা করে দিলেন। দরজার ফাঁকে থেমে থাকা ছেলেটা পুরো দরজা খুলে ধরল। রোকসানা ভাবি পাশের টেপ মারা মোড়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেখানে কাউকে ঘুরিয়ে নামানোর কথা ছিল।

মেহরিন মূল সিঁড়িতে পা রাখতেই রোকসানা ভাবি শেষ চেষ্টা করল। “ফোল্ডারটা আগে আমাকে দিন। আমি নিয়ে যাচ্ছি। নিয়ম আছে।”

মেহরিন থামল না। “যার নামে ক্লিয়ারেন্স কোড, কাগজ তার কাছেই থাকবে।”

উপরে উঠতে থাকা দুজন বড় অতিথি এসে ল্যান্ডিং সরু করে ফেলল। এখন কে কাকে পথ ছাড়বে, সেটাই দৃশ্য। রোকসানা ভাবি মূল সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক কাঁধ ঘুরিয়ে মেহরিনকে আগে যেতে জায়গা দিলেন। মেহরিন উঠে গেল এক ধাপ, দুই ধাপ। তার পেছনে দরজার ভেতরের লোকেরা নড়ল। রোকসানা ভাবি তখন পাশের টেপ মারা রুটের কোণ থেকে মূল সিঁড়ির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “একটু দাঁড়ান, ওই ফাইলটা চেক করা হয়নি।”

কেউ থামল না। কারণ এখন থামার অধিকারটা অন্য হাতে।

সে তখন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল—অতিদূর। মূল সিঁড়ির মুখ পুরো আটকে, মেহরিনের কনুইয়ের কাছ থেকে ফোল্ডার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে হাত বাড়াল। ফোল্ডারের প্লাস্টিক কভার কট করে বেঁকে গেল। উপরে ওঠা অতিথির একজন সরে যেতে গিয়ে রেলিংয়ে ধাক্কা খেলেন। জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক এবার পুরো ঘুরে দাঁড়ালেন।

“হাত সরান,” তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন।

রোকসানা ভাবি হকচকিয়ে হাত নামালেও মুখে বলল, “আমি তো শুধু যাচাই—”

“নথি আটকে, অনুমোদিত কর্মকর্তার পথ রোধ করে, অতিথির চলাচল বিঘ্ন করা—সব ক্যামেরায় উঠেছে।” তিনি পাশের অনুষ্ঠানকর্মীকে বললেন, “ওনার প্রবেশ-টোকেন এখনই নিষ্ক্রিয় করুন। নিচের আপ্যায়নও নয়। ওনাকে আর ফ্লোর-অ্যাক্সেস দেবেন না।”

এইবার আঘাতটা দৃশ্যমান হলো। পাশে থাকা কর্মী ছোট যন্ত্রে তার ঝুলন্ত টোকেন ছুঁইয়ে লাল আলো জ্বালাল। বীপ। আবার বীপ। আরেকজন এসে বলল, “ম্যাডাম, অনুগ্রহ করে এই ল্যান্ডিং ফাঁকা রাখুন।” সে “ভাবি” বলল না।

রোকসানা ভাবির মুখে তখন একসঙ্গে রাগ, অবিশ্বাস, আর দেরিতে এসে পড়া ভদ্রতা। “একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য এত—মেহরিন, তুমি বলো না—”

মেহরিন ধীরে ঘুরে তাকাল। এই তাকানোয় অনুনয় ছিল না, রাগও না; ছিল মালিকানা। “পথটা আপনি আটকে রেখেছিলেন। এখন সরে দাঁড়ান।”

এত কম কথায় এত বড় কাটাকাটি হয়, সেটা ল্যান্ডিংয়ের অনেকে হয়তো আগে দেখেনি। নাঈম মামা অস্থির হয়ে একবার এগোতে চেয়েও থেমে গেলেন; এখন যার দিকে দাঁড়াতে হবে, সেটা খুব স্পষ্ট। রোকসানা ভাবি আবার ফোল্ডারের দিকে হাত তুলতে গিয়েই বুঝল, চারপাশে জায়গা নেই। সামনে মূল সিঁড়ি দিয়ে লোক উঠছে, পেছনে টেপ মারা পাশের পথ, যেখানে বাক্স আর জলের জার ঠেসে আছে। সে নিজেই বানানো মোড়ে নিজেই গুঁজে গেছে।

জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক মেহরিনের দিকে হাত বাড়ালেন, “ফাইল।”

মেহরিন ফোল্ডার খুলে ভেতর থেকে সিল-করা অনুমতিপত্র বের করল, নিজের নামের নিচে আঙুল রাখল, তারপর কাগজটা তার হাতে দিল। “সাইন-ইন আমি উপরে সম্পন্ন করব,” বলেই সে একপাশে রাখা স্ট্যান্ড থেকে স্পনসর কক্ষের চাবির রিং তুলে নিল। দেরিতে ফেরত আসা চাবির ঠান্ডা ধাতু এইবার তার তালুতে ঠিকঠাক বসল।

রোকসানা ভাবি তখন নিচু স্বরে বলল, “আমি তো তোমার খারাপ চাইনি—”

মেহরিন তার কথা শেষ হতে দিল না। “তাই হলে দরজাটা আটকে রাখতেন না।”

তারপর সে মূল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। দরজার ফাঁক পুরো খুলে গেল, ভেতরের আলো সোজা পড়ে রইল সিঁড়ির গায়ে। ল্যান্ডিংয়ের মোড়ে, যেখানে কালো গ্যাফার টেপ মেরে ঘুরপথ বানানো হয়েছিল, মেঝের সঙ্গে ঘষা খেয়ে একপাশের টেপ নিজে থেকেই উঠতে শুরু করেছে; কোণটা কুঁচকে সরে যাচ্ছে, যেন আটকে রাখার জোর শেষ হয়ে গেলে পথও ফেটে যায়। মেহরিন হাতের চাবির রিংটা পকেটে রাখল, টেপ-ছেঁড়া সেই মোড় পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে দরজাটা ঠেলে দিল।