যে লাইনে আমাকে ঠেকাল, সেই লাইনই সরে দাঁড়াল
“দাঁড়ান,” গেটের সামনে লাল দড়িটা টেনে ধরে নাঈম বলল, “ভিতরের সারি আগে ঢুকবে।” তারপর আরিবার কাঁধের পাশ ঘেঁষে সোনালি কাজের শাড়ি পরা মাহিরাকে হাত দেখিয়ে ভেতরে পাঠিয়ে দিল। আরিবা এক পা এগিয়েও থেমে গেল; হাতে ধরা আধভাঁজ করা রসিদের কাগজ কচমচ শব্দ করল। এই কাগজেই দুপুরে কেকওয়ালার বাকি মিটিয়েছে সে, নিজের বিকাশ থেকে।
উঠানঘেরা প্রবেশমুখে তখন আলো, গুলাবজল, আতর, আর আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা ভরা চাউনি। কে আগে ঢুকল, কাকে থামানো হল—এখানে এসবই সম্পর্কের মাপ। আরিবার গায়ের শিফনের ওড়নার কিনারায় ধুলো লেগেছে; মাহিরার হিল টুং টাং করতে করতে সোজা ভিআইপি সিঁড়ির দিকে চলে গেল। আরিবা শুধু বলল, “নাঈম, আমাকে কে থামাতে বলেছে?”
নাঈম চোখ তুলল না। “সুলতানা খালা বলছেন, কনের ঘরের কাছের লোক আগে। আপনি একটু পাশে থাকেন।”
পাশেই দাঁড়িয়ে সুলতানা খালা মাথা কাত করে হাসলেন, এমন হাসি যেন অপমানও তিনি দান হিসেবে দিচ্ছেন। “আরে মা, এত কষ্ট কইরা জিনিসপত্র ধরেছ, তাই বলে সব জায়গায় সমান হওয়া যায়? বিয়ের ঘরে আপন-পরেরও তো হিসাব আছে। মাহিরা কিন্তু মানানসই। ঢাকার মেয়ে, বাবাদের কৃষি-রপ্তানির ব্যবসা, কথাবার্তা, চলাফেরা—সবই জমে। সবাই তো আর... বাইরে থেকে এসে ভিড়ে দাঁড়ালেই হয় না।”
কথাটা এত জোরে বলা হল যে কনের ফুপু, দুই চাচি, এমনকি ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চারাও থমকে তাকাল। “মানানসই” কার সঙ্গে, সেটা কেউ মুখে বলল না; না বললেও সবাই জানে। বছর দুই আগে রাফির সঙ্গে আরিবার কথা প্রায় পাকাই হয়েছিল। তারপর রাফির মায়ের দিকের এই খালাই বলেছিলেন, ছোট শহর থেকে উঠে আসা, ভাড়া বাসায় থাকা, চাকরি বদলানো মেয়ে দিয়ে এই পরিবারে মান থাকবে না। আজ রাফির চাচাতো বোনের বিয়ে, আর সেই পুরনো রায়টা আবার প্রকাশ্যে পড়া হচ্ছে।
আরিবা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার স্বর ঠান্ডা। “ঠিক আছে। তাহলে আমি পাশে থাকছি।” বলেই সে দড়ির বাইরে সরে গেল—কিন্তু সরে গিয়ে বেরিয়ে যায়নি। গেটের একপাশের সিমেন্টের খুঁটির কাছে দাঁড়িয়ে ব্যাগ খুলে ফোন নয়, একটা চাবির রিং বের করল। রিংয়ে ঝোলানো পিতলের চ্যাপ্টা টোকেনে কালো অক্ষরে লেখা—‘উত্তর সিঁড়ি / কনে-পক্ষ’। সে সেটাকে আঙুলে ঘুরিয়ে আবার মুঠো করল।
সুলতানা খালা এই নীরবতাকে ভীরুতা ভেবে আরো এগোলেন। “দেখছ? শিক্ষিত মেয়ে। নিজের জায়গা বুঝে।” তারপর কাছের এক ভাবিকে শুনিয়ে বললেন, “আমরা তো রাফির জন্য সেরা চাই। শুধু পুরনো পরিচয় দিয়ে হয়? সংসার টানতে বংশ লাগে, মান লাগে, সমান ঘর লাগে। মাহিরাকে দেখেন না—কেমন মানায়!”
ভাবি অস্বস্তিতে ঠোঁট চেপে হাসলেন। রাফি দুই ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল; তার পাঞ্জাবির কলার শক্ত, চোখে বিরক্তি আর সংকোচের মাঝামাঝি কিছু। কিন্তু সে চুপ। সেই চুপটাই আরিবার গায়ে সবচেয়ে ধারালো হয়ে লাগে।
আরিবা এবার সরাসরি রাফির দিকে তাকাল না। সে নাঈমকে জিজ্ঞেস করল, “কনের গহনার ট্রে কি ওপরে উঠেছে?”
নাঈম প্রথমবার কেঁপে উঠল। “না... মানে... বড় খালু বলছিলেন—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই উঠানের ভিড় কেটে হানিফ বড় খালু দ্রুত নামলেন। তাঁর পাঞ্জাবির বুকের কাছে ঘাম, হাতে অতিথি-তালিকার ফাইল। তিনি সোজা মাহিরার দিকে নয়, আরিবার দিকেই গেলেন। “তুমি এখানে? আমি তো তোমাকে খুঁজছি!” তাঁর কণ্ঠ এমন জোরে উঠল যে সিঁড়ির ধারে দাঁড়ানো ফটোগ্রাফারও ঘুরে তাকাল। “উত্তর সিঁড়ির চাবি তোমার কাছে। কনের গয়নাগাটি, নগদের খাম, কাবিনের ফাইল—সব ওপরে আটকে আছে। নাঈম, দাঁড়িয়ে আছ কেন? রাস্তা খোলো।”
এক মুহূর্তে শরীরের দিক বদলে গেল। নাঈম যে দড়িটা মাহিরার জন্য তুলে ধরেছিল, সেটাই সে এবার আরিবার সামনে নামাতে গিয়েও থেমে গেল, তারপর তড়িঘড়ি করে ওপরে তুলে ধরল। “এই দিক, আপা—এই দিক।” সে প্রায় সরে এসে আরিবার ব্যাগ হাতে নিতে চাইলো। মাহিরা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল; নাঈম তার দিকে হাত বাড়ালও না। বরং কাঁধ ঘুরিয়ে আরিবার জন্য পথ ঢেকে রাখল, যেন ভিড়ের কেউ ছুঁতে না পারে।
সুলতানা খালার ঠোঁটের হাসি এঁকে ওঠা রেখার মতো শুকিয়ে গেল। “চাবি ওর কাছে কেন থাকবে?” প্রশ্নটা তিনি হানিফ বড় খালুকে করলেন বটে, কিন্তু শোনালেন সবার জন্য।
হানিফ বড় খালু বিরক্ত গলায় বললেন, “কারণ বিয়ের তিন দিনের বাজার, হলের হিসাব, কনের মেকআপ রুমের লকার, সব আরিবাই সামলাচ্ছে। আমি কাউকে বিশ্বাস করলে চাবি দিই। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলেই তো দিয়েছি। আর কে আছে এখানে যে দুপুর থেকে একবারও বসেনি?”
কথা শেষ হতেই আরিবা মুঠো খুলে চাবির রিং দেখাল। পিতলের টোকেন আলোয় ঝলকে উঠল। শুধু চাবি নয়—তার শাড়ির আঁচলে তখন হানিফ বড় খালুর দেওয়া মেরুন ফিতের সরু এক ফালা বাঁধা, তাতে সোনালি অক্ষরে ‘আয়োজকপক্ষ’। একটু আগে ব্যাগের ভেতরে ছিল, সে নির্লিপ্ত হাতে তা কবজির কাছে জড়িয়ে নিয়েছে। এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। দড়ির ওপাশের মুখগুলো বদলে গেল; যারা মিনিটখানেক আগে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, তারা এখন চোখ নামিয়ে জায়গা ছাড়তে লাগল।
রাফি এগিয়ে এলো এবার, কিন্তু তার গলা নিচু। “আরিবা, আমি—”
“পরে,” আরিবা বলল। শব্দটা ছোট, কিন্তু থামিয়ে দেওয়ার মতো শক্ত। তারপর নাঈমকে বলল, “গেটের এ পাশ ফাঁকা রাখো। কনের নানি উঠবেন।”
উঠানের শব্দ যেন অন্য সুর পেল। সিঁড়ির নিচে রাখা রূপালি ফুলদানির পাশে দুটো সারি বানানো ছিল—ডানের প্রশস্ত পথটা বরপক্ষের জ্যেষ্ঠ, কনের কাছের মানুষ আর বিশেষ অতিথিদের জন্য, বাঁয়ের সরু পথ দিয়ে বাকিরা। সুলতানা খালা এতক্ষণ মাহিরাকে ডানের পথের মুখে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, যেন ওখানেই তার স্বীকৃতি লেখা। আরিবা ওপরে উঠে, ল্যান্ডিংয়ে রাখা নাম-কার্ডের ট্রে হাতে নিল। কার্ডগুলো সাদা, মোটা কাগজে কালো অক্ষর। নিচে নামার আগে সে একবার এলিভেটরের ধাতব দরজায় নিজের প্রতিবিম্বে আঙুলের দাগ মাখা ঝাপসা ছাপ দেখল—চোখ দুটো শান্ত, ঠোঁট শক্ত।
নিচে নেমেই সুলতানা খালা শেষ চেষ্টা করলেন। “থামো, আগে মাহিরা যাবে। ওকে আমি কনের মায়ের পাশেই বসাব। সবাই দেখবে।”
আরিবা থামল, কিন্তু শুনতে নয়—জায়গা মাপতে। চারপাশে ফুপু, চাচি, কাজের ছেলে, ফটোগ্রাফার, রাফি, এমনকি কনের কাঁদতে-কাঁদতে নষ্ট হয়ে যাওয়া কাজল মেরামত করতে থাকা বিউটিশিয়ানও তাকিয়ে আছে। এই সিঁড়িতেই সিদ্ধান্ত পড়বে। সে ট্রে থেকে তিনটা নাম-কার্ড আলাদা করল। প্রথমটা তুলে নাঈমের হাতে দিল। “এটা কনের নানির। ডানের পথ, সামনে।”
দ্বিতীয়টা নিজের হাতে রেখে সিঁড়ির রেলিংয়ের প্রথম সোনালি ক্লিপে গুঁজে দিল—‘আয়োজকপক্ষ—আরিবা’। তারপর তৃতীয় কার্ডটা তুলে মাহিরার দিকে না বাড়িয়ে বাঁয়ের সরু পথের মাঝামাঝি শেষ চেয়ারের উপর রেখে বলল, “মাহিরা আপা অতিথি-সারিতে বসবেন। বরপক্ষের দূর সম্পর্কের সম্মানিত অতিথিদের সঙ্গে। ওখানে।”
সুলতানা খালা যেন প্রথমে শুনতেই পারলেন না। “কি বললে? তুমি ঠিক করবে?”
আরিবা এবার পুরো উঠানকে শোনাল। “আমি ঠিক করছি না, আমি সাজাচ্ছি। এই সিঁড়ি, এই বসার সারি, এই ওঠানামার পথ—হানিফ বড় খালু আমার হাতে দিয়েছেন। কনের নানি আগে উঠবেন, তারপর ফুপুরা। ডানের পথ এখন থেকে আটকে রাখবেন না। আর যাদের নাম-কার্ড নেই, তারা বাঁয়ের সারি ব্যবহার করবেন।”
এবার দৃশ্যমান ক্ষতটা হল সুলতানা খালার হাতেই। তিনি ঝটকা মেরে মাহিরাকে ডানের পথের মুখে টেনে আনতে গেলেন। নাঈম মাঝখানে শরীর ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—এই প্রথম, স্পষ্ট, প্রকাশ্য। “খালা, এই দিক বন্ধ,” সে বলল, কিন্তু ‘খালা’ সম্বোধনের ভদ্রতার নিচে কণ্ঠে ছিল কাজের নির্দেশ। “নানিজান উঠবেন।”
মাহিরা নিজের শাড়ির ভাঁজ সামলে দাঁড়িয়েছিল; এখন বুঝল, তাকে সরতে হবে। তবু সে বলল, “আমি তো—”
“আপনার কার্ড ওখানে,” আরিবা বাঁয়ের সারির দিকে তাকিয়েই বলল। “দয়া করে দেরি করবেন না। পেছনের লাইন আটকে যাচ্ছে।”
পেছনের লাইন সত্যিই থেমে ছিল। রূপালি থালায় শরবত ধরা ছেলেটা এক পা তুলে নামাতে পারছিল না; দুইজন খালাতো ভাই ফোন হাতে দাঁড়িয়ে কাকে আগে ভিডিও করবে বুঝছিল না; কনের মায়ের এক বান্ধবী নিজের ভারী গয়না তুলে ধরে জায়গা খুঁজছিলেন। এই আটকে থাকা সময়ের মালিকানা হঠাৎ আরিবার হাতে চলে গেল। সে হাত তুলে বাঁয়ের সারির দুই চেয়ারের দূরত্ব বদলাল, একটাকে আরো পেছনে সরাল। “এখানে,” সে মাহিরার কার্ডের পাশে খালি জায়গা দেখাল, “এটা ওদের সারি।”
সুলতানা খালার গলা নেমে গেল, অথচ ততক্ষণে সবাই শুনে ফেলেছে। “আরিবা, এত মানুষের সামনে—”
“মানুষের সামনেই তো আপনি তুলনা করছিলেন,” আরিবা বলল। তার স্বর উঁচু নয়, কিন্তু ধার ঠিকরে পড়ে। “এখন মানুষের সামনেই বসার জায়গা ঠিক হচ্ছে। ভুল হলে পরে বদলাব। এই মুহূর্তে পথ আটকাবেন না।”
রাফি যেন অবশেষে সাহস কুড়োতে পেরে এক ধাপ এগোল। “খালা, ছেড়ে দিন। আরিবা জানে কি করছে।”
সেই বাক্যটাই সুলতানা খালার জন্য শেষ ধাক্কা হল। এতক্ষণ যার নীরবতায় তিনি ভর করেছিলেন, সেই ছেলেই এখন তার কর্তৃত্বের উপর আরেকটা দড়ি টেনে দিল। তিনি মাহিরার কনুই ছেড়ে দিলেন, কিন্তু মুখ সামলাতে না পেরে বললেন, “একটা চাবি হাতে পেয়ে কেউ কেউ—”
আরিবা সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুঠো থেকে চাবির রিংটা বের করে হানিফ বড় খালুর ফাইলে রেখে দিল। শুকনো ধাতব শব্দ উঠল। “চাবি কাজের জন্য ছিল, কাজ শেষ হলে ফেরত যায়,” সে বলল। তারপর কবজির মেরুন ফিতেটা টেনে সোজা করল। “কিন্তু এই ফিতা এখনো আমার হাতেই আছে। পথ আমি-ই ছাড়াব।”
হানিফ বড় খালু মাথা নাড়লেন, যেন ঘোষণার দরকারই নেই। নাঈম ততক্ষণে ডানের পথ একেবারে খালি করে দিয়েছে। আরিবা নিজে কনের নানির হাত ধরতে এগিয়ে গেল, ধীরে ধীরে তাঁকে সিঁড়ির প্রথম ধাপে তুলল। তারপর ফুপুদের নাম ধরল, একজন একজন করে। প্রত্যেকবার ডানের প্রশস্ত পথ খুলে গেল, বাঁয়ের সরু পথে বাকি অতিথিরা থেমে রইল। মাহিরা সেই থেমে থাকা সারিতেই দাঁড়িয়ে, নিজের কার্ডের কাছে নড়ার অপেক্ষায়।
শেষ চেষ্টা এল একেবারে ল্যান্ডিংয়ের মুখে। সুলতানা খালা হঠাৎ বললেন, “তুমি তো অতিথি, আয়োজক নও। নিজের নাম সামনে লাগালে হল?”
আরিবা ল্যান্ডিংয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াল। তার শাড়ির আঁচল সিঁড়ির ধাতব কোণে এসে থামল। সে রেলিংয়ের ক্লিপে গোঁজা নিজের কার্ডটা একটু উঁচুতে সরিয়ে দিল, যেন নিচ থেকে আরো স্পষ্ট দেখা যায়। সোনালি অক্ষরের মেরুন ফিতা কবজিতে জ্বলল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “অতিথি হলে গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আয়োজক বলেই আপনাদের থামাতে পারছি। এখন মাহিরা আপা বাঁয়ের সারি দিয়ে উঠবেন—সবাইয়ের পরে নয়, কিন্তু ডানের পথ দিয়ে না। নাঈম, ওই কার্ডের সামনে কেউ দাঁড়াবে না।”
সে কার্ডটা ল্যান্ডিংয়ের ধারে রয়ে গেল; কবজির মেরুন ফিতা পড়ন্ত আলোয় পড়া যায় এমন উঁচুতে। নিচের ধাপে তার শিফনের আঁচলের কিনারা স্থির হয়ে ঝুলে রইল।