Fast Fiction

ওরা ভেবেছিল ও ঢুকতে পারবে না

“দাঁড়াও। ভেতরের গোলচত্বরে তোমার ঢোকার দরকার নেই,” রাশেদা খালা হাত তুলে মেহরিনের পথ আটকালেন, যেন নিজের বাড়ির ফটক নয়, আদালতের কাচঘেরা দরজা পাহারা দিচ্ছেন। উঠানের লাল-সাদা কাপড় পাতা বৃত্তের ওপরে ইতিমধ্যে চেয়ার সাজানো, মাঝখানে রুপার থালা, হলুদের বাটি, আর ভোটের জন্য রাখা রঙিন কার্ড। ফটকের ধারে দাঁড়িয়েই মেহরিন বুঝল—আজ তাকে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার মানুষ না, বাইরে রাখা মেয়ে হিসেবেই পড়ানো হবে।

তার হাতে আধভাঁজ করা একটা ফার্মেসির রসিদ ছিল; নানাভাইয়ের ওষুধ সে-ই কিনে এনেছে। গলায় পুরনো অফিসের পরিচয়পত্রের ফিতে, কোণায় ঘষে সাদা হয়ে গেছে। সে রসিদটা মুঠোয় গুঁজে নিল। সামনে বসা খালাতো ভাবিরা চোখ তুলল, আবার নামাল, যেমন কেউ বৃষ্টিতে ভিজে আসা কাজের মেয়েকে দেখে। এ বাড়িতে গত তিন বছর ধরে নানাভাইয়ের চেকআপ, ব্যাংকের লাইন, এমনকি গ্রামের কৃষি জমির খাজনার কাগজ পর্যন্ত মেহরিনই সামলেছে—কিন্তু আজকের বৃত্তে তার জন্য কোনো নামধরা আসন নেই।

“আমি নানাভাইয়ের ওষুধ দিয়ে যাই,” মেহরিন শান্ত গলায় বলল।

রাশেদা খালা ঠোঁট বাঁকালেন। “ওষুধ রান্নাঘরে রাখো। অতিথির জায়গা অতিথিদের জন্য। আর হ্যাঁ, আরিবের পাশে যে চেয়ারটা ছিল, সেটা সরাও। নীপার বসার কথা।”

এটা এত জোরে বলা হল যে বারান্দার দিকের কাকারা পর্যন্ত শুনলেন। এক কাজিন এগিয়ে এসে সত্যিই চেয়ারটা টেনে নিয়ে গেল। আরিব, সাদা পাঞ্জাবিতে, ভিড়ের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে নড়ল না। শুধু একবার তাকাল—এমন তাকানো, যেন তারও মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়েছে। ওই এক সেকেন্ডেই প্রথম চিড়টা পড়ল; পাশের এক পিসি নিচু গলায় বললেন, “চেয়ার সরানোটা কি দরকার ছিল?”

রাশেদা খালা ঘুরে সেই পিসিকেই শুনিয়ে বললেন, “দরকার আছে। যার পরিচয় এখনো ঠিক হয়নি, তাকে মাঝখানে বসানো শোভা পায় না। মেয়ে ভালো হলে কী হয়, বংশ-ঘর, মিল, মান-মর্যাদা—সব দেখতে হয়।”

মেহরিন ফটক পেরোল না। বরং চটি খুলে একপাশে রেখে সোজা উঠানের ধারঘেঁষা কলাপাতার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, যেখানে পরিবেশনের ট্রে রাখা। “ঠিক আছে,” সে বলল, “আমি বাইরে থাকি। কিন্তু নানাভাইয়ের ভোটের খাতা কোথায় রেখেছেন?”

এক মুহূর্তের জন্য রাশেদা খালার চোখ কেঁপে উঠল। আজকের অনুষ্ঠানটা অদ্ভুতভাবে আধা-রীতি, আধা-পরিবারি সিদ্ধান্ত—আরিবকে কার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বসানো হবে, সেটা নাকি বয়োজ্যেষ্ঠরা ‘মত’ দিয়ে ঠিক করবেন। মজা করে কার্ডও ছাপানো হয়েছে: সবুজ মানে সম্মতি, লাল মানে আপত্তি। ভোটের খাতা, কার্ডের হিসাব, কার নাম ডাকা হবে—সব রাশেদা খালার হাতে। নানাভাই অসুস্থ; তার মত না নিয়ে কিছু হয় না, কিন্তু তার কানে কে কী বলে দিচ্ছে, সেটাই আসল।

“তোমার জানার দরকার নেই,” খালা কড়া গলায় বললেন। “তুমি খাবারের দিকে দেখো। ভেতরের ব্যাপার বড়রা সামলাবে।”

“বড়রা?” মেহরিনের চোখ একবার ঘুরে গেল। “নানাভাইয়ের গত তিন মাসের রিপোর্ট, ডাক্তার দেখানো, ব্যাংক থেকে টাকা তোলা, গ্রামের জমির লিজ নবায়ন—এসব যখন বড়রা সামলাচ্ছিলেন না, তখন আমি ছোট ছিলাম না। আজ হঠাৎ ছোট হয়ে গেলাম?”

বাতাসে একটা পাতলা টান উঠল। পাশের করিডোরে লাইটের হালকা গুঞ্জন, ফ্যানের ঘূর্ণি, থালার ঠোকাঠুকি—সব যেন আরো স্পষ্ট শোনা গেল। রাশেদা খালা হাসলেন, তবে সেই হাসিতে দাঁত বেশি, উষ্ণতা কম। “ওসব উপকার করেছে বলে কেউ ঘরের মেয়ে হয়ে যায় না। উপকারের দাম দেওয়া যায়। সম্পর্কের আসন দেওয়া যায় না।”

নীপা তখন এসে দাঁড়িয়েছে—ঝকঝকে মেহেদি, কাঁচুলি, সঙ্গে তার মা। আরিবের পাশের খালি করা চেয়ারে তাকে বসিয়ে দেওয়া হল। ডাকা হল নাম ধরে। মেহরিনকে কেউ ডাকল না; শুধু রান্নাঘরের মেয়েরা তার দিকে ট্রে বাড়িয়ে দিল। ভিড়ের পাঠ একেবারে পরিষ্কার: যে বাইরে দাঁড়িয়ে, সে হেরে গেছে।

মেহরিন ট্রে নিল না। সে সরাসরি বারান্দার দিকে হাঁটল, যেখানে নানাভাইকে উঁচু পিঠওয়ালা চেয়ারে বসানো হয়েছে। রাশেদা খালার গলা পিছন থেকে ছুটে এল, “এই! ওদিকে এখন যাওয়া যাবে না।”

“কেন যাবে না?” মেহরিন থামল না। “ওনার ইনসুলিন আমি দিই। আজও দিয়েছি।”

দুই কাজিন মাঝপথে দাঁড়িয়ে ছিল; এক জন সরে গেল, আরেক জন কাঁধ ঘুরিয়ে পথ বানাল। এটুকুই যথেষ্ট ছিল। যারা একটু আগে মেহরিনকে এড়িয়ে চলছিল, তাদের পা বদলাল, কাঁধ ফিরল। উঠানের বৃত্তে যে রাস্তা নীপার দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার মাঝখানে ফাঁক পড়ে মেহরিনের দিকে নতুন পথ খুলে গেল। এক ফুপু নিজের ওড়না সামলে তার পিছু নিলেন। আরিবও এবার এগোল—সোজা নয়, বৃত্ত কেটে, যেন প্রকাশ্যেই পক্ষ বদলানোটা সবাই দেখে।

রাশেদা খালা দ্রুত সামনে এসে দাঁড়াতে গেলেন, কিন্তু নানাভাই তখনই কাশি তুললেন। মেহরিন তার হাতের পানির গ্লাস ধরিয়ে দিল। বৃদ্ধ লোকটার পাতলা আঙুল মেহরিনের কবজি চেপে ধরল। “খাতা কই?” নানাভাই কাঁপা গলায় বললেন, কিন্তু উঠানের এই নীরবতায় সবাই শুনে ফেলল।

রাশেদা খালার মুখের রং পাল্টে গেল। “আব্বা, আপনি এখন এসব—”

“খাতা,” নানাভাই আবার বললেন। “আর আমার মোবাইল।”

মোবাইলটা শেষ পর্যন্ত বারান্দার কুশনের নিচ থেকে বেরোল। স্ক্রিনের আলো হাতের তালুতে নিচু হয়ে জ্বলছিল; কেউ গর্ব করে দেখাচ্ছিল না, যেন লুকানো জিনিস ধরা পড়েছে। নানাভাই চশমা খুঁজে না পেয়ে মেহরিনকেই বললেন, “মেসেজটা পড়।”

মেহরিন পড়ল না; ফোনটা সবার দিকে উল্টে ধরল। ব্যাংকের বার্তা, হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, জমির লিজের স্ক্যান—সব জায়গায় জরুরি যোগাযোগ হিসেবে তার নাম। নিচে আজ ভোরের একটা ভয়েস নোট, নানাভাই নিজে পাঠিয়েছেন আরিবকে: “আমি থাকলে মেহরিন বাইরে থাকবে না। আমার ভোটের কার্ড আগে ওর হাতে যাবে।”

এইবার সত্যিকারের বদলটা হল শরীরে। নীপার মায়ের চওড়া হাসি থেমে গিয়ে ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। যে কাজিন একটু আগে চেয়ার সরিয়েছিল, সে আরেক পা পিছিয়ে গেল। দুই পিসি উঠে এসে মেহরিনের কাছাকাছি দাঁড়ালেন। আরিব বৃত্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে সোজা মেহরিনের পাশে এসে থামল, যেন এতক্ষণ যেখানে ছিল সেটাই ভুল জায়গা। উঠানের পথগুলো নতুন করে আঁকা হয়ে গেল—কারা কার দিকে যাচ্ছে, কারা কাকে ঘিরছে, সব বদলে গেল প্রকাশ্যে।

রাশেদা খালা এবার নরম হতে চাইলেন, আর সেটাই তাকে আরো ছোট করে দিল। “আরে, আমি তো ওকে অপমান করতে চাইনি। এত মানুষ, একটু নিয়ম না রাখলে হয়? মেহরিন চাইলে অবশ্যই ভেতরে বসবে। নীপা, তুমি একটু—”

“এখন চেয়ার বদলালে হবে না,” এক কাকা কড়া গলায় বললেন। “এতক্ষণ যেভাবে কথা বলা হল, তার পরে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত লাগবে।”

উঠানের মাঝখানে রঙিন কার্ডের থালা নামিয়ে রাখা হল। রাশেদা খালা ব্যস্ত হয়ে ঘোষণা করতে গেলেন, “এটা তো শুধু আশীর্বাদের রীতি—”

“না,” আরিব প্রথমবার জোরে বলল, “আজ যেটাকে আপনারা রীতি বানিয়েছেন, সেটাই সিদ্ধান্ত হবে। লুকিয়ে আর কিছু না।”

মেহরিন তার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। সে নানাভাইয়ের হাত থেকে ভোটের ছোট খাতাটা নিল। পাতায় নামের তালিকা, পাশে কার্ডের রং। তার নিজের নাম কোথাও নেই। নীপার নাম আছে, বড় করে। ওই অনুপস্থিতিটাই অপমানের শেষ গিঁট।

রাশেদা খালা ফিসফিস করে বললেন, “মেহরিন, এসব ভিড়ের মধ্যে বাড়াবাড়ি কোরো না। তুমি চাইলে পরে বসে কথা হবে। আমি আলাদা করে—”

“আলাদা করে কিছু লাগবে না,” মেহরিন বলল। তার গলা খুব ঠান্ডা, খুব স্পষ্ট। “আপনি যেহেতু সবাইকে সামনে এনে আমাকে বাইরে রেখেছেন, আমার উত্তরও সবার সামনেই হবে।”

এক দমে কয়েকটা গলা উঠল—“থাক”, “এখন না”, “মেয়েমানুষের নাম নিয়ে—”। কিন্তু সেগুলো আর বৃত্ত থামাতে পারল না। যারা একটু আগে খালার দিকে ফিরেছিল, তাদের কাঁধ এখন কেন্দ্রে। দেরিতে আসা অনুতাপের ডাকগুলো ওপরে ভাসল, নিচে জমল না।

মেহরিন খাতার ফাঁকা জায়গায় নিজের নাম লিখে দিল। কারো অনুমতি নিল না। কালির দাগ টেনে থামল, তারপর রুপার থালা থেকে একটা সবুজ কার্ড তুলে নিল। কার্ডটা মোটা, চকচকে, দূর থেকেও রং পড়ে। উঠানের লাল কাপড়ের মাঝখানে সে পা রাখল। ফটক থেকে যার ঢোকা বন্ধ করা হয়েছিল, সে এখন সোজা ভোটের বৃত্তের কেন্দ্রে।

রাশেদা খালা প্রায় ছুটে এলেন। “এই কার্ড তুমি তুলতে পারো না। কার হাতে যাবে, সেটা বড়রা—”

“বড়রা দেখছেন,” মেহরিন কেটে দিল। “আর শুনছেনও।”

আরিব তখন তার থেকে এক কদম পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, ইচ্ছে করেই। সামনে নয়—যেন পথ সে দিচ্ছে, দাবি সে করছে না। মেহরিন সেটা বুঝল। এ সিদ্ধান্ত কেউ তার হয়ে নেবে না।

সে সবুজ কার্ডটা নামাল না। বরং মাথার ওপরে তুলল। “আমি অপমানের শর্তে এই বাড়িতে ঢুকব না,” সে বলল। “রান্নাঘরের ধারে দাঁড়িয়ে, লুকিয়ে, নামহীন হয়ে না। যদি এ বাড়িতে আমার জায়গা থাকে, তা হবে প্রকাশ্যে। নানাভাইয়ের ভোটের প্রথম কার্ড আমার হাতে—এই কথাটা ওনার। আর আমার কথা এই: আমি কারো দয়া নই। আমাকে যারা বাইরে রেখেছে, তাদের শর্তে আমি ভেতরে আসছি না।”

রাশেদা খালা হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নামাতে গেলেন। তার কবজির চুড়ি ঠোক্কর খেল, শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু খালি উঠানে খসে পড়া সম্মানের মতো বাজল। মেহরিন এক চুলও সরল না।

আরিব এবার এগিয়ে এল, কিন্তু মেহরিনের হাত ছুঁল না। সে শুধু সবার দিকে মুখ করে বলল, “আমার নামের কার্ডও দিন।”

থালা থেকে আরেকটা সবুজ কার্ড তুলে তাকে দিতে গিয়ে রাশেদা খালার হাত কেঁপে গেল। এক পিসি সেই কার্ডটা সরাসরি আরিবের হাতে দিলেন। এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। থালার নিয়ন্ত্রণ খালার হাত থেকে বেরিয়ে গেল প্রকাশ্যে।

মেহরিন তখনো কার্ড উঁচু করে। আরিব নিজের কার্ড বুকের সমান তুলে বলল, “আমি যে জায়গায় বসব, সেখানে মেহরিনের নাম লুকিয়ে থাকবে না।”

রাশেদা খালা এবার আর কর্তৃত্বের গলায় কথা বলতে পারলেন না। “আরিব, তুমি বুঝে— লোকজন আছে— নীপাদের—”

“লোকজন দেখুক,” মেহরিন বলল। “আজ দেখার জন্যই তো আমাকে ফটকে থামানো হয়েছিল।”

সে খাতাটা খুলে মাঝখানে ধরে সবার দিকে ঘুরিয়ে দিল। নীপার নামের নিচে টানা দাগ। তার নিচে নিজের হাতের লেখা—মেহরিন। তারপর সবুজ কার্ডটা সেই নামের ওপর স্থির করে ধরে বলল, “যার আপত্তি আছে, লাল কার্ড তুলুন। কিন্তু আমি লুকিয়ে ঢুকব না। আমার নাম উঠানে পড়ে গেছে। এখন নাম মুছে দিলে দাগ থাকবে।”

কেউ সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড তুলল না। বরং যা হল, তা আরো কঠিন। দুই কাকা নিচু হয়ে থালা থেকে সবুজ কার্ড নিলেন। এক ফুপু নিজের চেয়ার সরিয়ে বৃত্তের ভেতর জায়গা ছাড়লেন। নীপার মা যে হাতে এতক্ষণ আঁচল চেপে ছিলেন, সেই হাত ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল। রাশেদা খালার ডান হাত এখনও আধা-তোলা, কিন্তু তাতে আর আদেশ নেই, শুধু বাতাস আঁকড়ে ধরা।

“মেহরিন,” নানাভাইয়ের কাঁপা গলা বারান্দা থেকে এল, “ওখানেই দাঁড়া।”

সে দাঁড়িয়েই রইল। তার গলায় পুরনো পরিচয়পত্রের ফিতে, হাতে আধভাঁজ রসিদের কুঁচকে থাকা কাগজ, মাথার ওপরে তোলা সবুজ কার্ড। উঠানের বৃত্ত তার চারপাশে খুলে গেছে। মাটিতে আঁকা ভোটের ঘরের মাঝখানে সে খাতাটা নিজের পায়ের কাছে রাখল, কার্ডটা আরেকবার উঁচু করে বলল, “আমার জায়গা লিখে রাখুন।”

তারপর সে কার্ডটা নামাল না। ভোটের বৃত্তের ওপর তোলা সবুজ কার্ড স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, আর ঠিক সামনেই রাশেদা খালার দুই হাত ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল।