Fast Fiction

তোমার দুঃখ আমাকে আর পেল না

মেহরীন ট্রের গ্লাস নামিয়ে বলেছিল, “এগুলো ভেতরে যাবে না, বরপক্ষের টেবিলে রাখেন”—ঠিক তখনই ফটকের দিকে হৈচৈ উঠল, আর খালা রাশেদা পানের বাটা হাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন স্বরে ডাকলেন, যেন ঘরের আসল মানুষ এসে গেছে, “সায়ন এসেছে! আরে, নাবিলা, দাঁড়া, ছেলেরে ভেতরে নে।” মেহরীনের হাতে থাকা শেষ গ্লাসটা কাচের টেবিলে ঠুকে উঠল। তার কবজিতে ঢাকা মেট্রোর কার্ডের ঘষা-ধরা ধারটা চামড়ায় খোঁচা দিল। যে বাড়িতে সকাল থেকে সে তালিকা মিলিয়েছে, গিফট-টেবিল সাজিয়েছে, রান্নাঘর থেকে ডাইনিং পর্যন্ত দৌড়েছে, সেই বাড়ির দরজায় এক মুহূর্তে তার কাজের মানুষ-হওয়াটাই যেন সবার কাছে বেশি ঠিক মনে হল।

সায়ন ঢুকল সাদা পাঞ্জাবিতে, পাশে নাবিলা—বউয়ের মত না, কিন্তু সে রকম করে আনা; আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা যেভাবে কাউকে আগেভাগে ঘরের ভেতর বসিয়ে দেয়। খালা রাশেদা মেহরীনের দিকে না তাকিয়েই বললেন, “তুই ওই সার্ভিংটা দেখ। এই সোফাটা ছেড়ে দে, ওরা বসুক।” সোফাটা মেহরীন নিজে দখল করেনি, অতিথিদের জন্য কভার সোজা করছিল। তবু হাত সরিয়ে নিতে হল, যেন তার আঙুলের দাগও অপমান। নাবিলা বসে হালকা হাসল, “আপু তো খুব ব্যস্ত।” সায়ন কেবল একবার তাকাল—চেনার মত, কিন্তু এগিয়ে আসার মত না।

এই বিয়েবাড়িতে মেহরীনের আসা কোনো অনুগ্রহে না। বরপক্ষের ফুপু তার মায়ের খালাতো বোন; ঢাকা শহরে এমন জোড়া-লাগানো সম্পর্কেই কাজ, নিমন্ত্রণ, সম্মান সব চলে। তার বাবা কৃষি অফিসে চাকরি করতেন, এখন অসুস্থ; গত শীতের ওষুধের টাকাটা মেহরীনই জোগাড় করেছিল, আর সায়ন তখন বলেছিল, “এখন বাড়িতে বলার সময় না।” সেই না-বলা কথা আজ নাবিলার পাশে বসে গা বাঁচিয়ে আছে, আর মেহরীন ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে।

ফটকের দিক থেকে তখন আরিফ হাপাতে হাপাতে ঢুকল। ও ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের গ্রুপে, এখন এক অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার কাজ করে। সে সরাসরি মেহরীনের কাছে এসে নিচু গলায় বলল, “তোর ফোন সাইলেন্ট? একজন বারবার করছে।” মেহরীন মাথা নাড়তেই আরিফ নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিল। স্ক্রিনে শোভা পাচ্ছে একটি ছোট বার্তা—‘হল বুকিংয়ের শেষ টাকাটা মেহরীন আপা আগেই পরিশোধ করেছেন। রসিদ কাকে দেব?’ নামটা ভেসে উঠেছে কমিউনিটি সেন্টারের ম্যানেজারের। আরিফ ফিসফিস করে বলল, “খালা রাশেদা আমার কাছে জানতে চেয়েছিল কার সঙ্গে হিসাব হবে। আমি বলিনি। এখন উনি নিজেই ফোন করছে।”

মেহরীন ফোন নিল না, শুধু স্ক্রিনটা দেখল। গিফট-টেবিলের নীচে রাখা ব্যাগে তার অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদ আছে—এতবার খোলা হয়েছে যে কাগজের মাঝখানে সাদা দাগ পড়ে গেছে। সে সেটাই বের করে ট্রের নীচে গুঁজে রাখল। প্রথমবারের মতো তার বুকের ভেতর কাঁপুনি কমল না, বরং ঠান্ডা হল।

খালা রাশেদা কিছুক্ষণ পরই জোরে বললেন, “মেহরীন, তুই রান্নাঘরে যা—” তারপর আরিফকে দেখে থামলেন। আরিফ রসিদের কথা কারও মতো গোপন করল না; যে ধরনের লোক হালকা মজা করে সত্যি ফেলে দেয়, সে ভঙ্গিতেই বলল, “খালা, হলওয়ালারা আপনাকেই খুঁজতেছে। কিন্তু টাকা তো মেহরীন আপাই মিটাইছে। আপনাদের বিকাশে ঝামেলা ছিল নাকি?” কথাটা এমন জায়গায় পড়ল যেখানে সামনের সোফা, দরজার মুখ, এমনকি ডাইনিং থেকে ভেসে আসা চামচের শব্দও এক সেকেন্ড আটকে গেল। নাবিলার হাঁটুর ওপর রাখা হাত শক্ত হয়ে উঠল। খালা রাশেদার চোখ সরু।

“কীসের টাকা?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু সেই জিজ্ঞাসায় সন্দেহের চেয়ে ভয় বেশি।

মেহরীন এবার রসিদটা ভাঁজ খুলে এগিয়ে দিল। “হলের অগ্রিমের বাকি অংশ। আন্টি, সেদিন আপনি বলেছিলেন আজ সকালেই লাগবে। আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আপনি ব্যস্ত ছিলেন।” তার গলায় অতিরিক্ত নরমতা নেই, আবার অভিযোগও নেই। শুধু যার কাজ সে করেছে, সেই স্বর। রসিদে তার নাম, তার নম্বর, সময়। এক কোণে ছোট করে ‘পরিশোধিত’।

খালা রাশেদা কাগজটা নিলেন না। নাবিলার বাবা, যে এতক্ষণ অতিথিদের সঙ্গে বসে ছিলেন, তিনি উঠে এসে কাগজটা দেখে নিলেন। তারপর খুব সাধারণ ভঙ্গিতে বললেন, “তাহলে হিসাবের খাতা মেহরীনের কাছে থাকুক। কার কী বাকি, ও-ই জানে।” একটা খাতা টেবিল থেকে সরিয়ে মেহরীনের দিকে দেওয়া হল। ছোট কাজ না—কার হাতে খাতা থাকে, কে নাম লেখে, সেটা এই ঘরে আসন বদলের মতই স্পষ্ট। সোফায় বসানো মেয়ে থেকে মেহরীনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল; এবার দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তাকিয়ে দেখল, খাতা তার হাতে গেল।

সায়ন তখনও কিছু বলছে না। শুধু তার মুখের ওই সাবধানী চামড়া খুলে যেতে শুরু করেছে। মেহরীন দেখল, সে নাবিলার দিকে নয়, রসিদের দিকে তাকাচ্ছে। যে মুখ এতদিন ধরে নিজের সময়টাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেটার ওপর দেরিতে ধরা পড়া লজ্জা কেমন কাঁচা লাগে।

চাপটা এখানেই থামতে পারত, কিন্তু থামল না। খালা রাশেদা নিজের সুর ফেরানোর চেষ্টা করলেন। “টাকা দিলে দিলি, তাই বলে সবকিছুর মধ্যে সামনে আসতে হবে নাকি? মেয়েদের কিছু সীমা থাকে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা বলে সবাই তো—” তিনি বাকিটা শেষ করলেন না, কিন্তু নাবিলাকে চোখে চোখে ভেতরের ঘরে যাওয়ার ইশারা করলেন। তারপর সায়নের দিকে, “তুমি এদিকে বসো, ওসব হিসাবের ভিড়ে থাকতে হবে না।”

সেইটুকুতেই মেহরীনের কাঁধের উপর জমে থাকা সারাদিনের শক্তভাব আরেকটু সোজা হল। সে খাতাটা টেবিলে রাখল না। হাতে রেখেই সায়নের দিকে তাকাল। “থাকবে না, সেটাই তো সবসময় ঠিক করেছ।”

সায়ন চমকে তাকাল। এই প্রথম সে সরাসরি তার দিকে মুখ ফেরাল। “মেহরীন, এখন—”

“এখনই,” মেহরীন কেটে দিল। দরজার পাশের সরু করিডরে টিউবলাইটের ভনভন শব্দ, রান্নাঘর থেকে ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ, মানুষের হেঁটে যাওয়ার ঘষা—সবকিছুর মাঝেও তার গলা পরিষ্কার শোনা গেল। “তুমি যখন আমার বাড়িতে এসে বলেছিলে অপেক্ষা করতে, তখনও নাবিলার সঙ্গে তোমাদের কথা চলত। যখন বাবা হাসপাতালে, আমি টাকা পাঠালাম, কাগজ ধরলাম, অনুষ্ঠানের তারিখ বাঁচালাম—তখন তুমি আমাকে কাউকে পরিচয় দাওনি। আজও দিলে না। আমি কাজের সময়ে দরকারি, মানুষের সামনে না।”

নাবিলা থেমে গেছে। খালা রাশেদা এবার সত্যিই বিরক্ত। “এইসব কথা বিয়েবাড়িতে বলে—”

মেহরীন তার দিকেই না তাকিয়ে বলল, “বিয়েবাড়িতেই তো বলা দরকার, খালা। কারণ লুকোনোটা সবসময় ঘরের ভেতরেই হয়েছে। বাইরে শুধু আমার কাজটা দেখা গেছে।”

সায়নের ঠোঁট কাঁপল। “আমি তখন পারিনি। বাড়ির চাপ ছিল। নাবিলার বিয়ের কথাও তখন ঠিক ছিল না—”

“তুমি পারোনি না,” মেহরীন বলল, “তুমি সুবিধামতো চুপ ছিলে। ওই চুপ থাকার ভেতরেই আমি ছিলাম তোমার ফাঁকা জায়গা। জরুরি হলে ডাকবে, সামনে এলে চিনবে না।”

শব্দগুলো ঘর চিরে বেরোলেও সে চিৎকার করল না। এটাই বেশি ধারালো হল। সায়নের মুখে তখন এমন অবস্থা, যেন কেউ তার পরা ভদ্রতার কাপড়টা সামনেই নামিয়ে দিয়েছে। নাবিলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে কিছু বলল না; শুধু সরে গেল—এই সরে যাওয়াটাই যথেষ্ট। খালা রাশেদা আরেকবার বললেন, “মেহরীন, তুই সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস।”

মেহরীন খাতাটা নাবিলার বাবার দিকে বাড়িয়ে দিল, আবার ফেরত নিল। “না, আমি আমার সীমা ঠিক করছি। কে হিসাব রাখবে, কে ফটকে দাঁড়াবে, কে ভেতরে যাবে—সেটা আপনারা অনেক দিন ঠিক করেছেন। আজ থেকে আমার অংশটা আমি ঠিক করব।”

এরপরের কয়েক মিনিটে ঘর নিজের মতো চলতে চাইল। কেউ পান বাড়াল, কেউ বাচ্চাকে ডেকে সরাল, কেউ অকারণে ফোনে তাকাল। কিন্তু ছোট্ট বদলটা লুকোনো গেল না। ডাইনিংয়ের চাবির গোছা, যেটা এতক্ষণ রাশেদা খালার আঁচলের কোণে বাঁধা ছিল, সেটা তিনি নিজেই খুলে মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। “ক্যাটারিংওয়ালাদের দেখে আয়।” স্বরটায় আদেশ ছিল, কিন্তু ভরসাও ছিল। আরিফ হেসে ফেলল না, এটুকুই তার শালীনতা।

মেহরীন চাবি নিল। কাঁধে সারাদিনের দৌড়ের শক্ত ব্যথা, স্যান্ডেলের ভেতর ফোস্কা ওঠা চামড়া, শাড়ির কুঁচিতে লেগে থাকা রান্নাঘরের ধোঁয়ার গন্ধ—সব মিলিয়ে সে করিডর পেরোল। পেছনে সায়নকে আরেকবার ডাকতে শুনল না। তবু তার জানা ছিল, এ ঘরে এখন তার চুপ থাকা আর আগের মতো নিরীহ নয়।

গিফট-টেবিলটা বারান্দার মুখে। লাল-সোনালি কাগজে মোড়া বাক্স, খাম, শুকনো ফুল, ফিতা। মেহরীন হিসাবের খাতা নামিয়ে ঠিক তখনই তার ফোন কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে নাম—সায়ন। একবার। তারপর আবার। সে তাকিয়ে রইল। উত্তর দিল না। তৃতীয়বার বেজে উঠতেই আরিফ এসে বলল, “ও বাইরে দাঁড়ায় আছে।”

মেহরীন ফোনটা উল্টো করে টেবিলে রাখল। “থাক।”

বাইরে ফটকের দিক থেকে জুতোর শব্দ এগিয়ে এল। সায়ন বারান্দার মুখে থামল; ভেতরে ঢোকা তার জন্য এই প্রথম একটু খরচের হয়ে গেল। সে হাতে ছোট একটা বাক্স ধরে আছে, গাঢ় নীল কাগজে মোড়া, ওপরে পাতলা ফিতা। তার চোখের নীচে চাপা ক্লান্তি, কিন্তু সেটাও দেরি করে আসা মানুষের সাজানো ক্লান্তি। “তোর জন্য এনেছিলাম,” সে বলল। “অনেক দিন আগে কেনা ছিল না। আজই নিয়েছি। কথা ছিল—”

“কথা ছিল?” মেহরীন পুনরাবৃত্তি করল, যেন শব্দটার ধার পরীক্ষা করছে।

সায়ন এক পা এগোল না। “আমি ভুল করেছি। তখন সবাইকে সামলাতে গিয়ে—”

“না,” মেহরীন বলল, “তুমি নিজেকে সামলেছ। বাকিদের আড়াল করেছ।”

সে বাক্সটা এগিয়ে ধরল। “নাও। অন্তত এটা রাখ। ফোনটা ধরো একবার।”

ফোন আবার কাঁপল। টেবিলের উপর উল্টো করে রাখা স্ক্রিনে আলো জ্বলে নিভল, কাঠের পলিশে কাঁপুনির শব্দ লেগে রইল। মেহরীন তাকাল না। তার চোখ স্থির সায়নের হাতে ধরা বাক্সে। গিফট-টেবিলের ওপরে জায়গা আছে, কিন্তু তার হাতে নেই।

সায়ন এবার খুব নিচু গলায় বলল, “মেহরীন, আমি দেরি করে ফেলেছি, জানি। কিন্তু তুই এমন করে কেটে দিস না।”

মেহরীন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। এত কাছে যে সায়ন ভাবতে পারে, হয়তো সে বাক্সটা নেবে। কিন্তু সে শুধু টেবিলের এক পাশে খাতা সরিয়ে রাখল, যাতে বাক্স রাখার জন্য জায়গা তৈরি হয়—নেওয়ার জন্য নয়, নামিয়ে রাখার জন্য। “তুমি যেটা দেরি করেছ,” সে বলল, “ওটা জিনিস না। পরে হাতে ধরিয়ে দিলেই হয় না।”

সায়নের আঙুল কেঁপে উঠল। সে তবু বাক্সটা নামাল না। “একবার কথা—”

“ফোনটা বাজতে দাও,” মেহরীন বলল। “আজ উত্তর না পেলেও তুমি মরবে না। আমি পেরেছি।”

তারপর সে নিজেই বাক্সটার দিকে হাত বাড়াল। সায়নের মুখে এক মুহূর্তের হালকা আশা দেখা দিল। মেহরীন বাক্সটা নিল না; শুধু তার কব্জির নীচে হাত রেখে ঠেলে গিফট-টেবিলের উপর নামিয়ে দিল। নীল কাগজে মোড়া বাক্সটা অন্য উপহারের পাশে বেমানানভাবে থেমে রইল। ফোন আবার কাঁপল। সে এবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েও দেখল না।

সায়ন ফিসফিস করে বলল, “আমি তোকে হারাতে চাইনি।”

মেহরীন মাথা তুলল। “তুমি আমাকে রাখতে চাওনি। হারানোটা পরে হয়েছে।”

এবার সে ফোনটা তুলে নিল। সায়নের মুখ শক্ত হয়ে উঠল—যেন শেষ দয়ার অপেক্ষা। কিন্তু মেহরীন কল কেটে দিল না, ধরলও না। বাজতে বাজতেই সে ফোনটা বাক্সের পাশে রেখে দিল। “এখানেই থাকুক,” সে বলল। “যেটা দেরিতে আসে, সেটা দরজার বাইরে না থাকলে টেবিলেই ভালো।”

সে ঘুরে দাঁড়াল। দু-পা গিয়ে থামল না, ফিরে তাকালও না। শুধু হাতের আঙুলে লেগে থাকা ফিতার এক ঢিলে মাথা টেনে সরিয়ে দিল, যেন পথের বাধা। তারপর হাত সরিয়ে নিল।

গিফট-টেবিলের কিনারায়, উত্তরহীন ফোনটার পাশে, নীল ফিতেটা চেপে গিয়ে সমান হয়ে রইল; মেহরীনের হাত সরে যাওয়ার পরও আর উঠল না।