যে জায়গা তারা দেয়নি, সেটাই অপেক্ষায় ছিল
মৌ ট্রে নামিয়ে আরেকটা ভেজা গ্লাস তুলতেই রাশেদা ভাবি তার কনুই সরিয়ে দিল, যেন মানুষের নয়, স্ট্যান্ডের জায়গা ঠিক করছে। “এখানে না, ওই পেছনের লাইনে দাঁড়াও। সামনের টেবিলে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকজন থাকবে।”
মৌ হাত থামাল না। সাদা কাগজে প্রিন্ট করা বসার তালিকা, তার ওপরে বারবার ভাঁজ খোলা-বন্ধে নরম হয়ে যাওয়া একখানা বাজারের রসিদ, আর পাশে ফেরত-ট্রে রাখার ধাতব র্যাক—সব একসঙ্গে সামলাতে সামলাতে সে কার প্লেটে বাদাম যাবে, কার চায়ে চিনি কম, কার জন্য নিরামিষ আলাদা রাখতে হবে, সব মুখস্থ বলে যাচ্ছিল। ঢাকা শহরের ভাড়া বাসার এই গমগমে ফ্ল্যাটে আজ আরিবের বড় খালার মেয়ের আংটি পরানো; কিন্তু রান্নাঘর, ডাইনিং, করিডর, সার্ভিস বারান্দা—সব জায়গায় লোক কম পড়লে প্রথম যে নাম ওঠে, তা মৌ। আর নাম ওঠে বলেই নামটা সহজে মুছেও ফেলা যায়।
রাশেদা ভাবি বসার তালিকার নিচের দিকে আঙুল ঠুকল। “তোর নাম আমি সরায়া দিছি। তুই খাইয়া নিবি পরে। আগে ট্রে চালা।”
মৌর গলায় পাতলা নীল ল্যানইয়ার্ডে ঝুলে থাকা কোচিং সেন্টারের পরিচয়পত্রটা ঘামে পিঠে লেগে ছিল। ভোরে ক্লাস নিয়ে সরাসরি এসেছে; বাসকার্ডের ঘষা-লাগা কোণ এখনো ব্যাগের বাইরে বেরিয়ে আছে। তালিকায় একদম ডান পাশে ছোট হরফে “মৌ” লেখা ছিল—আরিব নিজে লিখেছিল, কনের পক্ষের দুই কাজিনের পাশে। রাশেদা ভাবি কালো কলম টেনে তার ওপর দাগ কেটেছে।
মৌ ট্রের ভার এক হাতে সরিয়ে নিয়ে কাগজটা ভাঁজ করল। “দাগ কেটে দিলে নাম সরে যায়, ভাবি?”
রাশেদা ভাবি ঠোঁট বাঁকাল। “এত কথা না কইয়া কাজ কর। এখানে কারে কোথায় বসাইতে হয়, আমি জানি।”
মৌ তালিকাটা টেবিলে ফিরিয়ে রাখল না। নিজের এপ্রনের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। তারপর ধাতব র্যাকের এক কোণে যেখানে ছোট কাগজ সাঁটা ছিল—“৬ নম্বর ফেরত”—সেখান থেকে নিজের ট্রেটা তুলে নিল। “এই ট্রেটা আমি আর চালাব না,” সে খুব আস্তে বলল। “যেহেতু আমি শুধু কাজের মানুষ, আমার জায়গাও থাকল না—তাহলে লাইনে আর নামব না।”
কথাটা চিৎকার ছিল না। তবু কাছের খালা চামচ নামাতে ভুল করলেন, স্যুপের বাটি টুং করে উঠল। রাশেদা ভাবি হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল, “নাটক করিস না। একটু পরই আবার এসে ধরবি।”
মৌ আর কিছু বলল না। ট্রেটা সিঙ্কের পাশে নামিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। প্রথমবারের মতো হাত দুটো খালি হয়ে গেল তার।
এর অসুবিধা তিন মিনিটের মধ্যেই ধরা পড়ল। রাশেদা ভাবি তার নিজের ভাগ্নিকে ডেকে সামনে দাঁড় করাল, “এই, গেস্টদের প্লেট ধর।” মেয়েটা গরম শামি কাবাবের ট্রে তুলেই মুখ কুঁচকাল; কোন টেবিলে আগে যাবে বোঝে না, কার সামনে ঝুঁকতে হবে বোঝে না, দুইবার একই টেবিলে চা দিয়ে অন্যদিকে বাদ পড়ে গেল। ফেরত-ট্রের লাইন এলোমেলো হয়ে সিঙ্কের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। একটা কাপ পিছলে পড়ে ভাঙল। রান্নাঘর থেকে হালিম পাঠাতে দেরি হওয়ায় খালুর কণ্ঠ উঁচু হলো, “এই পাশটা এত আটকে আছে কেন?”
মৌ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু এগোল না। তার না-যাওয়ার মধ্যে অদ্ভুত ঠাণ্ডা ছিল; রাগের গরম নয়, বহুদিনের ব্যবহারে শক্ত হয়ে যাওয়া একটানা সীমা। রাশেদা ভাবি দুবার তাকাল, সেই পুরনো ভরসায়—এখনই এসে সামলে দেবে। মৌ তাকালই না।
আরিব তখন বারান্দা ঘুরে ভেতরে ঢুকল। সারা দিন বাইরের লোক সামলে তার শার্টের কলার নুয়ে গেছে, কবজিতে মোবাইলের আলো নেভা-জ্বলা করছে। সে একবার ভাঙা কাপ, একবার আটকে থাকা ট্রে-লাইন, একবার মৌর খালি হাতের দিকে তাকাল। “কি হয়েছে?”
রাশেদা ভাবি উত্তর দিল দ্রুত, যেন আগে বললে সত্যি তারই হবে। “কিছু না। একটু মুড দেখাচ্ছে। ওরে বলছি পেছন দিক সামলাতে, এইটুকুতেই—”
মৌ এবার সরাসরি আরিবের দিকে তাকাল। “আমার নাম কাটা হয়েছে। সামনে বসার জায়গা না থাকলে সামনে কাজও করব না।”
আরিবের মুখে সঙ্গে সঙ্গে কিছু এল না। এই না-আসাটাই মৌর বুকের নিচে কাঁটার মতো বেঁধে থাকত; যখন দরকার, তখন সে লোকজনের সামনে কখনোই তাড়াতাড়ি কিছু বলে না। রাশেদা ভাবি সেই ফাঁকটা ধরল। “শুনছ? একটা মেয়ের এত বাড়বাড়ি ভালো না। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, লোকে কথা বলে। কাজ করতে আসছে, আবার টেবিলে বসবেও—”
“আমি কাউকে ধরিনি,” মৌ বলল। “ডাকছিলেন আপনারাই।”
এবার আরিব ছোট গলায় বলল, “এখন ঝামেলা কোরো না, মৌ।”
এই কথাটাই রাশেদা ভাবির জয় হয়ে যেতে পারত। মৌ দেখল, ফেরত-ট্রের র্যাকে ৬ নম্বর স্লট খালি পড়ে আছে, তার কাগজটা অর্ধেক খুলে আছে, যেন নাম মুছে ফেললেও জায়গাটা এখনো চিনতে পারছে। সে এপ্রনের ফিতা খুলে ভাঁজ করে সিঙ্কের পাশে রাখল। “তাহলে আমি বারান্দায় থাকি। কারও পথে থাকব না।”
সে সরে গেলে অসুবিধা আর ঢেকে রাখা গেল না। রাশেদা ভাবির ভাগ্নি একসঙ্গে চারটা গ্লাস নিয়ে পিছলে পড়ে না গেলেও অর্ধেক শরবত টেবিলক্লথে ঢেলে দিল। কনের পক্ষের এক ফুপু কপাল কুঁচকে ন্যাপকিন তুললেন। খালা তাড়াহুড়োতে ডায়াবেটিক অতিথির হাতে মিষ্টি চা ধরিয়ে দিলেন। রান্নাঘরের মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “আপা, ফেরত-ট্রে কোন লাইনে?” কেউ উত্তর জানল না। ৬ নম্বর স্লট খালি, অথচ ওটাই ছিল চলাচলের মাঝখানের সুবিধের জায়গা।
আরিব দুবার মৌর দিকে এল, আবার লোক ডাকার শব্দে সরে গেল। সে জানত মৌ এমনিতে রাগ দেখায় না; ভীড় বাসে ঠেসে এসে, কোচিং শেষে খালি পেটে দাঁড়িয়ে থেকেও কার আগে কার দরকার তা বুঝে যায়। তাই যখন সে চুপ করে সরে দাঁড়ায়, তখন তাতে ঝামেলার চেয়ে বড় কিছু থাকে। কিন্তু বড় কিছু দেখার অভ্যাস আরিবের ছিল না, বিশেষ করে ঘরে এত বড়দের সামনে।
রাত একটু গভীর হলে, অতিথিরা ডাইনিং থেকে ড্রয়িংরুমে সরে গেলে, করিডরে শুধু টিউবলাইটের গুনগুন আর এক্সহস্ট ফ্যানের শোঁ-শোঁ শব্দ রইল। মৌ সার্ভিস বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সিঁড়ির ধারে শুকনো বাতাস কম, নিচের রাস্তা থেকে ফুচকার টক গন্ধ ভেসে আসছে। তার আঙুলে এখনও স্টিলের ট্রের ঠাণ্ডা ভাব। এপ্রনের ওপর রাখা ভাঁজ-খোলা রসিদটা সে আবার দেখল—মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের কৃষি কলেজে ফরম ফিলাপের টাকা, নিজের বাসভাড়া—সব হিসেব ছড়ানো। এ বাড়িতে সে প্রথম এসেছিল আরিবের নোটস নিতে; পরে আরিবের মা তাকে ভালোবাসতেন, খেতেও বসাতেন। মা মারা যাওয়ার পর বসার জায়গাটা ধীরে ধীরে প্রথমে ছোট হলো, পরে অদৃশ্য।
“মৌ।”
আরিব এত আস্তে ডাকল যে মনে হলো, করিডরের আলোও শব্দটা শুনলে লজ্জা পাবে। সে কাছে এসে থামল, খুব বেশি নয়, আবার দূরেও নয়। “তুই গেলে আজ ভেঙে পড়ত। জানিস।”
মৌ হাসল না। “তবু বললি ঝামেলা না করতে।”
“সবাই ছিল।” আরিব গিলল। “আমি... আমি সময় মতো বলি নাই।”
“কথা না বললেও চলে,” মৌ বলল। “কাজেই তো সবাই ভরসা করে।”
আরিব এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর হাত বাড়িয়ে এপ্রনের ফিতাটা তুলল, কিন্তু মৌর দিকে বাড়াল না। “ফিরে আয়। প্লিজ।”
মৌর চোখ নামল তার হাতে। “কোথায়?”
প্রশ্নটা ছোট ছিল, কিন্তু তার ভিতরে সারা সন্ধ্যার অপমান দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু রান্নাঘরে ফিরে আসা নয়—কোথায়? পেছনের লাইনে? অদৃশ্য জায়গায়? নাম কেটে দেওয়া টেবিলের বাইরে?
আরিব এবার প্রথমবারের মতো উত্তর খুঁজে না পেয়ে থামল। “আমি ঠিক করি।”
মৌ মাথা নাড়ল। “আগে ঠিক করো। তারপর ডাকো।” সে এপ্রনের ফিতা তার হাত থেকে নিল না।
তারপর সবকিছু দ্রুত হলো, কারণ আর সময় ছিল না। শেষ পর্বের মিষ্টি-চা বেরোবে, ট্রে ফিরে আসবে একসঙ্গে, আর রাশেদা ভাবি ঠিক তখনই নতুন ব্যবস্থা করলেন—তার ভাবির মেয়েকে ৬ নম্বর ফেরত-লাইন ধরিয়ে দিতে। “ওখানে দাঁড়া, ফাঁক না রাখিস,” তিনি বললেন, যেন জায়গা একবার ভরে গেলে আর কাউকে মনে রাখতে হবে না।
মৌ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। মেয়েটা ৬ নম্বর স্লটে ট্রে নিতে গিয়ে কনুই আটকে ফেলল পাশের ৫ নম্বরে, দুটো একসঙ্গে ধাক্কা খেল। ফেরত আসা কাপ-পিরিচ জমে পথ বন্ধ। খালা বিরক্ত গলায় বললেন, “এভাবে হবে না।” রাশেদা ভাবি নিজে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াতে চাইলেন, কিন্তু ওদিকে ড্রয়িংরুম থেকে ডাক পড়ল—কনের চাচী বিশেষ কাপ চাইছেন। তার কণ্ঠে তাড়াহুড়ো এসে গেল।
সেই ফাঁকে আরিব রান্নাঘরের দরজার কাছে রাখা বসার তালিকাটা টেনে নিল। কালো দাগের ওপর তার আঙুল থামল। সে কারও দিকে তাকাল না, কাগজ ছিঁড়লও না। শুধু পাশের কলম তুলে “মৌ” নামটার নিচে আবার একটানা দাগ টেনে দিল, যেন কাটা নামকে ঘিরে নতুন করে জায়গা বাঁধছে। তারপর কাগজটা ডাইনিং-টেবিলের কোণে চাপা দিল স্টিলের জগ দিয়ে, যেখানে সবাই দেখলে দেখবে, না দেখলে না।
এরপর সে সোজা ট্রে-র্যাকের দিকে গেল। ৬ নম্বর স্লটে রাশেদা ভাবির ভাবির মেয়ের হাত থেকে ট্রেটা নিয়ে পাশের খালি স্টুলে রাখল। মেয়েটা অবাক হয়ে সরে দাঁড়াল। আরিব র্যাকের ছোট কাগজটা খুলে ফেলল না; শুধু আঙুল দিয়ে সোজা করল, “৬” সংখ্যাটা আবার চোখে পড়ার মতো করে। তারপর সে পিছন ফিরে, একেবারে সাধারণ গলায়, যেন খুব স্বাভাবিক কাজের নির্দেশ দিচ্ছে, বলল, “এই লাইনটা থাকবে। মৌ নেবে।”
রাশেদা ভাবি তখনই ভেতর থেকে ফিরে এলেন। “ওরে আবার সামনে আনছ? এত লোকের মধ্যে—”
আরিব এবার তার দিকে তাকাল, কিন্তু গলা তুলল না। “এই লাইনটা ওর। বদলাবে না।” কথাটা এমনভাবে বলা যে তর্ক করলে কাজ থেমে যাবে, আর কাজ থামার দায় কার, তা সবাই চোখে দেখছে। রাশেদা ভাবি আরেকটা কথা মুখে এনেও আটকে গেলেন; কারণ ঠিক সেই সময়ে একসঙ্গে তিনটা ট্রে ফিরে এসেছে, আর ৬ নম্বর স্লট খালি রাখা না হলে সব দাঁড়িয়ে যাবে।
আরিব এরপর মৌর দিকে ফিরল। ডাকা নয়, মিনতি নয়, কোনো বড় ঘোষণা নয়। শুধু তার হাতে এপ্রনের ভাঁজ করা ফিতাটা দিল। “এখন?”
মৌ সেই হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝল, এই প্রথম সে তাকে কাজে ফেরাতে নয়, জায়গায় ফেরাতে এসেছে। তবু সে সঙ্গে সঙ্গে এগোল না। ফিতাটা নিয়ে ধীরে ধীরে কোমরে বাঁধল। তারপর র্যাকের কাছে গিয়ে ৬ নম্বর স্লটের সামনে দাঁড়াল, কিন্তু ট্রে তোলার আগে ছোট কাগজটা একবার আঙুলে চেপে ঠিক করল। তার নিজের হাতেই স্লটটা সক্রিয় হলো।
একটার পর একটা ট্রে ফিরতে লাগল। মৌ বাঁ-হাতে খালি কাপ আলাদা, ডান হাতে প্লেট, মাঝখানে চামচ ফেলে না দিয়ে সোজা সিঙ্কে চালান করল। যে জায়গায় পাঁচ মিনিট আগেও ঠাসাঠাসি ছিল, সেখানে আবার চলাচল খুলে গেল। খালা দূর থেকে শুধু একবার মাথা নাড়লেন; কোনো প্রশংসা নয়, কিন্তু অস্বীকারও নয়। রাশেদা ভাবি আর কাছে এলেন না। অতিথিরা কিছু বুঝল কি না, তা আর জরুরি রইল না; কারণ ট্রে ফেরার লাইনে কে কোথায় দাঁড়ায়, এই ঘরের ভেতরে সেটাই সত্যি।
শেষ দফার চা গিয়ে গেলে আর শব্দ কমতে লাগল। ডাইনিং টেবিলের ফুল ঝিমিয়ে পড়েছে, সিঙ্কের কাছে লেবুর খোসা জমেছে, করিডরের টিউবলাইট একই গুনগুনে জ্বলছে। মৌ শেষ ট্রেটা নামিয়ে দুটো কাপ আলাদা করল। তারপর নিজের ট্রেটা—সামান্য আঁচড় পড়া স্টিলের, পাশে ছোট নীল স্টিকার—ধুয়ে এনে ৬ নম্বর স্লটে ঠেকিয়ে রাখল। এক মুহূর্ত পর আরিবের হাত এসে পাশের ট্রেগুলো একটু সরিয়ে দিল, যেন ওই এক স্লট ভরে থেকেও খালি রাখা হচ্ছে। করিডরের গুনগুন আগের জায়গায় ফিরে গেল।