Fast Fiction

ফাঁকা ঘরটাও আমারই ছিল

মাহিরা ভাবি সাবিহার বইগুলো এক হাতে তুলে নিয়ে বলল, “এই টেবিলটা খালার বড় ছেলে দুদিন থাকবে, ও বসবে এখানে। তোর জিনিসপত্র ভেতরে রেখে দে।” একই সময়ে রান্নাঘর থেকে ডেকে উঠল, “ডালটা নামিয়েছিস? নাদিমের চা লাগবে।” দরজার পাশের হলুদ আলোটা ভনভন করছিল, আর সাবিহার অর্ধেক ভাঁজ করা বাজারের রসিদটা টেবিলের কোণায় চাপা পড়ে ছিল—সকালের ডিম, খালার ওষুধ, প্রিন্টআউটের টাকা, সব তার হাতেই গিয়েছিল।

সাবিহা চায়ের কেটলি নামিয়ে এনে ট্রেতে রাখল, তারপর কোনো কথা না বলে টেবিলের ওপর থেকে শুধু নিজের নীল ফাইলটা তুলে নিল। বইগুলো নেয়নি। টেবিলের ডানদিকের ড্রয়ারে সাদা টেপে লেখা ছোট্ট নামফলক—‘সাবিহা’—আঙুল দিয়ে সোজা করে দিল। “ড্রয়ারটা আমি বন্ধ করছি,” এতটুকু বলেই চাবিটা নিজের ওড়নার খুঁটে গুঁজে রাখল। ক্ষমা চাইল না। মুখও তুলল না।

মাহিরা ভাবি একটু থমকালো, তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল। “নাম লিখলেই কি নিজের হয়ে যায়? আত্মীয়স্বজনের জানাশোনায় তোকে রাখা হয়েছে পড়াশোনার সুবিধার জন্য, বাড়ির মেয়ে বানানোর জন্য না।” কিন্তু চায়ের ট্রে তার হাতেই তুলে নিল। সাবিহার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল; সে ট্রে এগিয়ে দিল, যেন হাতটা কাঠের।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের সেই ভাড়া বাসাটায় তিনটা ঘর, একটা সরু বারান্দা, আর মাঝখানে পড়ার কোণা। রাশেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি নিয়ে পড়ে; নাদিম কোচিং করে; খালা গ্রামের বাড়ি থেকে এসে উঠেছেন চেকআপের জন্য। এই বাসায় সাবিহা থাকত মাহিরা ভাবির দূর-সম্পর্কের আত্মীয়া হয়ে—যে আত্মীয়তার হিসেব সবাই জানে, কিন্তু দরকারমতো ভুলে যায়। সে বাচ্চাদের পড়ায়, বাজার করে, রাত জেগে নোট বানায়; বিনিময়ে থাকা আর পরীক্ষার আগে একটু নিশ্চিন্ত টেবিল-চেয়ার।

সন্ধ্যার পর খালার সামনে মাহিরা ভাবি এমনভাবে কথা বলল যেন ঘরের শৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়ার একমাত্র কারণ সাবিহার নাম-লেখা ড্রয়ার। “এখনকার মেয়েরা না, দুইদিন থাকতে দিলেই জায়গা দখল করে ফেলে।” খালা চশমা নামিয়ে সাবিহার দিকে তাকালেন, সেই দৃষ্টি পুরোপুরি কঠিন নয়, কিন্তু উদ্ধারও নয়। সাবিহা প্লেটে গরম রুটি তুলছিল। সে শুধু বলল, “রুটিটা নিন, খালা।” তারপর নিজের স্টুলটা আগের জায়গায়—পড়ার টেবিলের পাশেই—গুটিয়ে রেখে দিল। কেউ বসুক, সে স্টুলটা সরাবে না।

রাত বাড়তেই নাদিম গলদঘর্ম হয়ে পড়ার টেবিলে এসে দাঁড়াল। অনলাইন ফর্মের শেষ সময়, কিন্তু তার অ্যাডমিট কার্ডের স্ক্যান ফাইল খুলছে না। রাশেদ তখনও ফেরেনি; মাহিরা ভাবি ফোনে কারও সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা নিয়ে ব্যস্ত। নাদিম ছোট গলায় বলল, “আপা, তুমি না দেখলে হবে না।” সাবিহা বিছানার ধারে বসে নিজের পুরোনো আইডি কার্ডের ল্যানইয়ার্ডটা আঙুলে পেঁচাচ্ছিল। ভাঁজে ভাঁজে ক্ষয়ে গেছে, তবু ফেলে দেয়নি। সে চোখ তুলল, টেবিলটার দিকে তাকাল, যেখানে তার বইগুলো সরিয়ে নাদিমের কোচিং ফাইল রাখা।

“ভাবিকে বলো,” সে শান্ত গলায় বলল, “টেবিল তো এখন তোমাদের।”

নাদিম প্রথমে বুঝতেই পারল না। “কী?”

“আমি রাত জেগে করে দিই, তারপর সকালে আমার ড্রয়ার নিয়ে কথা হবে—এটা আর হবে না।” সাবিহা উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে গলি ভরে হর্ন, নিচের ফুচকার দোকানের ধোঁয়া, দূরের মসজিদের মাইকে এশার পরের ঘোষণা। ভেতরে হলুদ আলোয়ের ভনভন শব্দটা আরও স্পষ্ট।

মাহিরা ভাবি শেষে ফোন কেটে এসে বসল, কিবোর্ড টিপল, তিনবার ভুল পাসওয়ার্ড দিল, তারপর গজগজ করতে লাগল, “এইসব ছেলেপেলে সবকিছু শেষ রাতে করে।” নাদিমের মুখ শুকিয়ে গেল। খালা ভেতর ঘর থেকে ডেকে বললেন, “হবে তো?” কেউ উত্তর দিল না। সাবিহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের মধ্যে তার অস্বীকারের ওজন এমন ছিল যে মাহিরা ভাবি প্রথমবার তার দিকে সরাসরি তাকাল।

“এই জন্যই তোকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, দরকারে হাত লাগাবি,” মাহিরা ভাবির গলায় এবার আদেশের চেয়ে অস্থিরতা বেশি।

সাবিহা ঘুরে দাঁড়াল। “থাকতে দিয়েছেন, ঠিক। কিন্তু আমার বসার জায়গা থাকবে কি থাকবে না, সেটা যদি প্রতিদিন নতুন করে শুনতে হয়, তাহলে রাত বাঁচানোর কাজটাও প্রতিদিন হবে না।” কথাটা শেষ করে সে আবার চুপ। আর কিছু নয়।

দশ সেকেন্ডের সেই ফাঁকে নাদিমের আঙুল কাঁপতে কাঁপতে মাউস চাপছিল। মাহিরা ভাবি ঠোঁট কামড়ে বলল, “ঠিক আছে, তোর ড্রয়ার কেউ ধরবে না। আগে এটা কর।” কথাটা বলার সময় খালার দরজা আধখোলা; ভেতর থেকে শাড়ির খসখস শব্দ এল। শর্ত বদলেছে—শুধু কাজ নেওয়ার জোরে নয়, দরকারের চাপে।

সাবিহা টেবিলের কাছে গিয়ে বসেনি। সে দাঁড়িয়েই বলল, “চেয়ারটা সোজা করো।” নাদিম দ্রুত করল। তারপর সে ফাইল খুলে, স্ক্যানের নাম বদলে, সাইজ কমিয়ে, ফর্মে আপলোড দিল। দুই মিনিট। এত সহজ যে অপমানটা আরও কড়া হয়ে উঠল। সাবমিটের পর নাদিম হাঁফ ছাড়ল; মাহিরা ভাবি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। সাবিহা নিজের নীল ফাইলটা আবার টেবিলের কোণায় রেখে দিল। নামফলকটা যেখানে ছিল, সেখানেই।

পরদিন দুপুরে রাশেদ ফিরল। তার শার্টে ধুলোর দাগ, ব্যাগে কৃষি অনুষদের লোগো, হাতে আধভাঁজ করা একটা কাগজ—খালার টেস্টের ফি জমার রসিদ। সাবিহা রান্নাঘরে ডাল নাড়ছিল। রাশেদ এসে ফিসফিস করে বলল, “গত রাতে নাদিমের কাজ করে দিয়েছ?” সাবিহা শুধু বলল, “শেষ সময় ছিল।” রাশেদ কাগজটা ভাঁজ করে আবার খুলল, যেন অন্য কথা খুঁজছে। “ভাবি টেবিল নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে?”

চুলার আগুনে ডালের ওপর ফেনা উঠছিল। সাবিহা কাঠের চামচ চালিয়ে বলল, “আপনি থাকেন না। থাকলে বুঝতেন।” কথাটায় অভিযোগ ছিল, তবে কান্না নয়। রাশেদ অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “আজ রাতে পড়তে বসো। আমি আছি।” সাবিহা মাথা নাড়ল, কিন্তু বিশ্বাস করল না। এই বাসায় ‘আমি আছি’ কথাটা দুপুরের মধ্যে যতটা শক্ত, রাতে আত্মীয় এলেই ততটাই পাতলা হয়ে যায়।

সত্যিই সেদিন রাতেই নতুন গোলমাল। খালার বড় ছেলে শরীফ ভাই হঠাৎ এসে উঠলেন, সঙ্গে আরেক আত্মীয়। ড্রইং-ডাইনিং একসাথে করা ঘরে তোশক পাতা হলো, বারান্দায় বাড়তি চেয়ার এল। মাহিরা ভাবি মুখে ক্লান্ত হাসি মেখে সবার সামনে বলল, “সাবিহা, তুই আজ বইপত্র গুছিয়ে ভেতরে রাখ। বাইরে পুরুষ মানুষ থাকবে।” সে এমনভাবে বলল, যেন সাবিহার পড়া নিজেই লজ্জার জিনিস।

সাবিহা এবার কোনো জবাব দিল না। নিজের নীল ফাইল, কলমদানি, আর ট্রানজিট কার্ডের ক্ষয়ে যাওয়া ধারওয়ালা ছোট পার্সটা নিয়ে সোজা বারান্দায় চলে গেল। পড়ার কোণার চেয়ার ফাঁকা রইল, টেবিলের একপাশ খালি, কিন্তু ড্রয়ারের নামফলক নড়েনি। মাহিরা ভাবি দুবার বলল, “শুনছিস?” সাবিহা শোনেনি এমন ভান করল না; শুধু ফিরে তাকাল না। নিচের রাস্তায় রিকশার বেল বাজছিল, আর বারান্দার গ্রিলে তার হাত শক্ত হয়ে ছিল।

রাত আরও গভীর হলে রাশেদ বারান্দায় এল। ঘরের ভেতর থেকে থালা-বাসনের শব্দ থেমে গেছে, শুধু করিডরের আলোটা জ্বলে আছে, সেই পরিচিত ভনভন। রাশেদ নিচু গলায় বলল, “তুমি ভেতরে এসে পড়তে পারো।” সাবিহা হেসে ফেলল, শুকনো একটুখানি হাসি। “কোথায়? যে জায়গাটা আমার, সেটা যদি আমাকে মুখে চেয়ে নিতে হয়, তবে সেটা আমার না।”

রাশেদ গ্রিলের ওপারে কালো আকাশের দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ পর বলল, “আমি সকাল হলে ঠিক করে দেব।” সাবিহা এবার তার দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে ক্লান্তি, অপরাধবোধ, আর সেই অদ্ভুত দেরি—যা সবসময় সত্যি হয়, কিন্তু সময়মতো নয়। “ঠিক করার দরকার নেই,” সে বলল। “আমি কাল সকালে হলে উঠব। কোচিং সেন্টারের লাইব্রেরিতে বসব। যদি আমার জায়গা থাকে, থাকবে। আমি চাইব না।”

ফজরের আগেই সে বেরিয়ে গেল। ছোট ব্যাগ, নীল ফাইল, একটা শাল। দরজার কাছে জুতোর সারির ওপর দেয়ালে কয়েকটা হুক—রাশেদের, নাদিমের, মাহিরা ভাবির ব্যাগের জন্য। এক কোণে সাদা টেপে লেখা ছোট্ট ‘সাবিহা’ নামটা ঝুলছিল, তার ক্ষয়ে যাওয়া ল্যানইয়ার্ড সাধারণত সেখানেই থাকে। আজ সে ল্যানইয়ার্ডটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল, কিন্তু হুক থেকে নামফলক খুলল না। দরজা টেনে নামার আগে একবার শুধু তাকাল। তারপর সিঁড়ি নেমে গেল।

দিনটা দীর্ঘ হলো। কোচিং সেন্টারের লাইব্রেরিতে বসেও অক্ষর কাঁপছিল। দুপুরে খালার মিসড কল, নাদিমের দুটো বার্তা, মাহিরা ভাবির কিছুই না। রাশেদের একটাই বার্তা: “সন্ধ্যায় ফিরবে?” সাবিহা উত্তর দিল না। সে চাইছিল সন্ধ্যা হোক, বাড়ির ভেতর রুটিনে সবাই নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যাক, তখনই বোঝা যাবে কে কাকে কোথায় ধরে রাখতে চায়।

মাগরিবের পর সে ফিরল। গলির মুখে ভাজা বেগুনির গন্ধ, সিঁড়িঘরে স্যাঁতসেঁতে সিমেন্টের ঠান্ডা, ওপরে উঠতেই করিডরের আলোয়ের ভনভন শব্দ। দরজা পুরো বন্ধ ছিল না। ভেতরে টিভির আওয়াজ কম, থালাবাসন ধোয়ার ছিটে শব্দ। বাসা ফেরার এই সাধারণ সময়টাই আজ তার বুক ধুকপুক করাচ্ছিল। সে ইচ্ছে করেই গলা খাঁকারি দিল না, কলিং বেলও টিপল না। নিজের মতো ঢুকে পড়ল—যেন দেখতে চায়, না বললেও জায়গা থাকে কি না।

প্রথমেই তার চোখ গেল পড়ার কোণায়। কাল রাতের বাড়তি তোশক গুটানো, শরীফ ভাইয়ের ব্যাগ সরে গেছে। টেবিল মুছে রাখা। ডানদিকের চেয়ারটা দেয়াল থেকে টেনে আগের জায়গায় আনা। কোণায় তার নীল ফাইল নেই—কারণ সেটা তার হাতেই—কিন্তু টেবিলের ড্রয়ারের সাদা টেপে ‘সাবিহা’ লেখা নামফলক নতুন করে চাপা দেওয়া হয়েছে, পাশের খোসা ওঠা অংশে আঙুলের ছাপের মতো মসৃণতা। টেবিলের নিচে ছোট স্টুলটাও রাখা, কেউ বসেনি অনেকক্ষণ—ধুলো অক্ষত।

সাবিহা দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের ভেতর থেকে মাহিরা ভাবির গলা এলো, কারও সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা, যেন কিছুই ঘটেনি। এই না-ঘটা জিনিসটাই সবচেয়ে কষ্টের, আবার সবচেয়ে স্পষ্ট। রাশেদ রান্নাঘরের দিক থেকে বেরিয়ে এল, হাতে ভেজা গ্লাস। সে কিছু বলল না। শুধু একবার চোখ নামিয়ে পড়ার কোণার দিকে দেখাল, তারপর জুতোর সারির পাশের দেয়ালের দিকে হাঁটল।

সাবিহাও ঘুরে তাকাল। দেয়ালের হুকের লাইনে রাশেদের কালো ব্যাকপ্যাক, নাদিমের কোচিং ব্যাগ, মাহিরা ভাবির হাতব্যাগ। মাঝখানে একটুখানি ফাঁকা। সেই হুকের সাদা টেপে লেখা ‘সাবিহা’ নামটা নতুন নয়; পুরোনো ঘষায় ধূসর, ঠিক নিচের দেয়ালে ল্যানইয়ার্ড বারবার লেগে থাকা চিকন দাগ। কিন্তু আজ ওই হুকে অন্য কিছু ঝোলানো হয়নি। পাশের বাড়তি কাপড়ের ব্যাগটা সরিয়ে অন্য হুকে তোলা। জায়গাটা খালি রেখে দেওয়া হয়েছে।

রাশেদ ভেজা গ্লাসটা সিঙ্কে রেখে এসে মেঝে থেকে সাবিহার ব্যাগটা নিল না, ধরতেও গেল না। শুধু জুতোর সারির পাশে একটু সরে দাঁড়াল, যাতে হুকটার নিচে জায়গা খুলে যায়। সেই একচুল সরে দাঁড়ানোতেই তার পক্ষ নেওয়া ছিল, কিন্তু শব্দ ছিল না। সাবিহা ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগ থেকে ক্ষয়ে যাওয়া ল্যানইয়ার্ডটা বের করল। আঙুলে একবার সোজা করল। তারপর ‘সাবিহা’ লেখা হুকেই সেটা ঝুলিয়ে দিল। নিচের দেয়ালে পুরোনো ঘষার দাগের সঙ্গে নতুন দাগ মিলে গেল, আর পড়ার কোণার পাশে দেয়ালজোড়া হুকের লাইনে তার নামের হুকটা আগের মতোই খোলা রইল, শুধু তার জন্য।