Fast Fiction

রিলিজের আসনটা আবার আমার

ট্রলিটা বে-দরজার সামনে কেঁচোর মতো বেঁকে দাঁড়িয়ে ছিল, আর ড্রাইভাররা একসাথে চেঁচাচ্ছিল, “রিলিজ কই? গরম নামতেছে!” মাহিরা হাতে স্টিলের ট্রে চেপে পাস-বোর্ডের দিকে যেতেই রাশেদ কনুই ঠেকিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। “তুই পেছনে যা। নাম ডাকার কাজ আমার।”

দরজার ওপাশে হলওয়ে-আলোর একটানা ভোঁ ভোঁ শব্দ, ভিতরে বাষ্প, বাইরে লোডিং বেতে তিনটা পিকআপ, দুটো মাইক্রো, আর এক কোণায় জেলা থেকে আনা কৃষির সবজি-ভর্তি বস্তা ফেটে ধনেপাতা ছড়িয়ে আছে। শিফটের শেষে কাঁধ শক্ত হয়ে গেলেও মাহিরা চোখ নামাল না। আজ দেরি মানে শুধু খাবার ঠান্ডা হওয়া না; আজ ছিল বনানীর বড় বিয়ের চালান, শবনম খালার মুখ, প্রতিষ্ঠানের নাম, আর মাহিরার নিজের জায়গা—যেটা গত মাসে রাশেদ এসে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা দেখিয়ে কেড়ে নিয়েছিল।

সে ট্রেটা পাশে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “চার নম্বর কার্ট আগে গেলে সাত নম্বরের কাবাব বসে যাবে। পাস উল্টা ধরছেন।”

রাশেদ হেসে উঠল, যেন এই ঘামে ভেজা ব্যাকলেনও তার বসার ঘর। “আমারে শিখাস না। খালার ভাগ্নে আমি, বুঝছস? যে কার্টে বলব, ওইটাই যাবে।” সে লাল মার্কার দিয়ে বোর্ডে টান দিল, তিন নম্বরের ওপর পাঁচ নম্বর বসিয়ে দিল, আর রুবেলকে চেঁচিয়ে বলল, “বাম দরজা খোল! ওই ট্রলি বের কর!”

বাম দরজা খুলতেই ভেতরের দুই ট্রলি মুখোমুখি আটকে গেল। সামনেরটার ঢাকনা কাত হয়ে ঝোল পড়ল মেঝেতে, পেছনের ছেলেটা পা বাঁচাতে গিয়ে কাঁধ দিয়ে দেওয়ালে ঠুকে দাঁত চেপে রইল। ড্রাইভার জসিম গাড়ির চাবি আঙুলে ঘুরিয়ে থুতু ফেলে বলল, “এভাবে গেলে উত্তরায় পৌঁছাইতে রাত হইব।” কথাটা নিচু গলায়, কিন্তু শোনার মতো জোরে। চারদিকে যে যার কাজ থামায় না, তবু চোখের কোণ সব এখানে।

মাহিরা আবার এগোলে রাশেদ এবার পাস-বোর্ডটাকেই বুকের সাথে টেনে নিল। “তোর দরকার নাই। ট্রে ধর, নাম লিখে দে, ওই পর্যন্ত।” তারপর আরও জোরে, যেন সাক্ষী দরকার, “কিছু মানুষ বেশি দিন এক জায়গায় থাকলে ভাবে মালিক হইয়া গেছে।”

কথাটা ছুরির মতো গিয়ে লাগল, কারণ সবাই জানত কে রাত জেগে রিলিজ সিকোয়েন্স বানায়, কোন কার্টে কোন স্টেশন আগে বেরোবে, কোন ঢাকনা আগে বেঁধে দিলে ঝোল নড়বে না। শবনম খালা কখনো সামনে বলে না, কিন্তু মাসখানেক আগে ভাগ্নেকে বসিয়ে দেওয়ার দিন মাহিরার হাতে বে-চাবি দেরিতে ফিরেছিল—একটা লেট-রিটার্ন করা চাবি, যতটুকু দেরি ততটুকু অপমান। আজ আবার সেই একই খেলা। মাহিরা শুধু ট্রের ধারে লেগে থাকা তেল আঙুলে মুছে নিয়ে বলল, “তাহলে নাম ডেকে যান। কিন্তু আটকে গেলে দরজা আমার মতো খুলতে পারবেন না।”

রাশেদ যেন এই অপেক্ষাতেই ছিল। সে ভুল নাম ডাকল, “চৌধুরী হাউস—কার্ট পাঁচ, বের!” অথচ সেই চালান ছিল মোহাম্মদপুরের ছোট মিলাদ, বিয়েরটা দাঁড়িয়ে রইল। সামনে থাকা ড্রাইভার কার্ট ঠেলতেই পেছনের প্যালেট আড়াআড়ি সরে গিয়ে পথ বন্ধ হয়ে গেল। ঢাকনা টুং টাং করতে লাগল, একটা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচি আধখোলা হয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কেঁপে উঠল। রুবেল ফিসফিস করে বলল, “আপা, এইটা গেলে বনানীটা মরল।” পাশের ছেলেটা সোজা হয়ে দাঁড়ালও না; হাতে গ্লাভস, চোখ শুধু মাহিরার দিকে।

“মরবে না,” মাহিরা বলল, কিন্তু রাশেদকে না দেখে। “ডান দরজার সামনে দুই ইঞ্চি ফাঁক রাখলেই যাবে।”

“চুপ।” রাশেদ রেডিওটা কানে তুলে বলল, “বে-টু, গাড়ি ছাড়েন।” ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন এলো, “কোন অর্ডার?” রাশেদ থমকাল। এই থমকালোর শব্দও থাকে—রেডিওর গুঞ্জনের ফাঁকে হাওয়া কেটে যাওয়ার মতো। তারপর সে উলটা নম্বর বলল।

জসিম এবার সরাসরি হেসে ফেলল। “ভাইজান, ওইটা তো কনের বাড়ির না।”

হাসিটা ছোট ছিল, কিন্তু রাশেদের গাল টকটকে হয়ে উঠল। সে জসিমের দিকে আঙুল তুলল, “ড্রাইভারির কাম করেন, বেশি কথা কইবেন না।” তারপর মাহিরার দিকে কটমট করে, “তুই এদের মাথায় তুলছস।”

ঠিক তখনই ভেতর থেকে শবনম খালার কণ্ঠ এলো, কড়া আর হাঁপ ধরা—“রাশেদ! বারোশ প্লেটের বিরিয়ানি নামবে এখন, বে খালি কই?” তার পেছনে আরেকটা সংবাদ এসে পড়ল: গেটের বাইরে শেষ ট্রাক ঢুকেছে, মাওয়া থেকে মাছ আর মাংসের অতিরিক্ত চালান, কারণ কনের পক্ষ সংখ্যার হিসাব বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ফোনে কনের চাচা চেঁচাচ্ছে—“আর দশ মিনিট লেট হইলে স্টেজে বসা যাবে না।”

এক মুহূর্তে বেতে সব জায়গা কমে গেল। নতুন ট্রাক ঢুকতে না পারলে পিছনের রাস্তা বন্ধ, পুরনো চালান বেরোতে না পারলে হলঘর ঠান্ডা। রাশেদ পাস-বোর্ডে চোখ বুলিয়ে কিছুই ধরতে পারল না। সে এক দরজা খুলে আরেকটা বন্ধ করে, এক ট্রলি সামনের দিকে ঠেলে আবার থামিয়ে দিল। কার্টের চাকা ককিয়ে উঠল, দুটো ট্রে কাত হয়ে একটা স্যালাডের ঢিপি মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। শবনম খালা এসে দাঁড়াতেই রাশেদ বলল, “মানুষ কম, তাই...”

“মানুষ কম না,” মাহিরা কেটে দিল। “কমান্ড ভুল।”

শবনম খালা ঘুরে তাকালেন। সেই এক সেকেন্ডে রাশেদের মুখে আত্মীয়ের ভরসা ছিল, মাহিরার মুখে ছিল হিসাব। পেছনে হলওয়ে-আলোর ভোঁ ভোঁ, সামনে ড্রাইভারদের জমাট অপেক্ষা। “বে খুলতে হইব এখনই,” খালা বললেন, কিন্তু কাকে বললেন বোঝা গেল না।

রাশেদ আবার বোর্ডে হাত দিল, তারপর শেষমেশ নিজের হাতটাই কেঁপে উঠল। রেডিওতে একসাথে তিন দিক থেকে ডাক আসছে—“বে-ওয়ান?” “মাছ নামাব?” “বনানী লাইন?” সে বিরক্ত হয়ে রেডিও নামাতেই মাহিরা এগিয়ে গিয়ে বলল, “বোর্ড দেন।”

“না।”

পেছনের ট্রাক হর্ন দিল, লম্বা, বিরক্ত, বেয়াদব। সামনের কার্টে থাকা গরম হাঁড়ির ঢাকনা কেঁপে ধোঁয়া বেরোল। শবনম খালা চিৎকার করলেন, “যে পারে, সে ধরুক!”

রাশেদ বোর্ডটা শক্ত করে ধরেছিল, কিন্তু মাহিরা সেটা তার হাত থেকে টেনে নিল না। সে হাত বাড়িয়ে স্থিরভাবে অপেক্ষা করল। আরও এক সেকেন্ড দেরি হলে পেছনের লোডিং র‍্যাম্পে ট্রাক ঘুরে বসে সব আটকে যাবে। রাশেদ প্রথমে রেডিওটা তার দিকে ছুড়ে দিতে গিয়ে আবার ধরে ফেলল, যেন এটাই শেষ মর্যাদা; তারপর মাছের ক্রেট নামাতে আসা লোকেরা “সাইড, সাইড” বলে ধাক্কা দিতে শুরু করতেই সে গালি চেপে পাস-বোর্ডটা মাহিরার বুকে ঠেসে দিল, রেডিওও ধরিয়ে দিল। “নে, কর!”

বোর্ডের ভেজা ধার তালুতে ঠান্ডা লাগল, রেডিওর গরম প্লাস্টিক আঙুলে বসে গেল। মাহিরা এক ঝটকায় বোর্ড উল্টে সঠিক ক্রম সামনে আনল। “রুবেল, ডান দরজা পুরো খুলো না, অর্ধেক। জসিম ভাই, বনানী আগে—কার্ট চার, ছয়, তারপর দুই। মাছের ট্রাক বাইরে ধরে রাখেন, তিন মিনিট।” রেডিওতে সে বলল, “বে-ওয়ান শুনেন। বিয়ের চালান আগে ছাড়ব। কেউ নিজের থেকে গাড়ি নড়াবেন না।”

কেউ তর্ক করল না। এই না-তর্ক করা জায়গাটাই ছিল প্রথম ফেরত আসা আসন। রুবেল দৌড়ে গিয়ে ডান দরজা এমন কোণে ধরল যে আটকে থাকা দুই ট্রলি একে একে সরে গেল। মাহিরা নিজে সামনের কার্টের চাকা লাথি দিয়ে সোজা করে বলল, “এবার।” কার্ট বেরোল। পেছন থেকে আরেকটা। জসিম গাড়ির দরজা খুলে চেপে বসল, কিন্তু ইঞ্জিন না তুলেই মাহিরার হাতের ইশারা দেখল। সে আঙুল নামাতেই গাড়ি ছুটল।

রাশেদ একপাশে দাঁড়িয়ে বলল, “এই সিকোয়েন্সে মিলাদেরটা লেট—”

“লেট না,” মাহিরা বলল, চোখ না তুলেই। “ওদের ভাত ফাইনাল ফোড়নে। বের হলে নষ্ট হবে। সাত মিনিট ধরে রাখব।” সে বোর্ডে মার্কার চালিয়ে নম্বর বদলাল। “রান্নাঘরে বলেন, মিলাদের ডাল নামাক আগে।”

ভিতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো, “ঠিক আছে!” এইবারেও কারও মুখে প্রশ্ন নেই। কার্ট বেরোচ্ছে, খালি প্যালেট ভেতরে ঢুকছে, দরজার ভিড় কাটা পড়ছে। যারা একটু আগেও রাশেদের দিকে তাকিয়ে নিরাপদ দিক বেছে নিচ্ছিল, তারা এখন কেবল মাহিরার আঙুলের দিকে তাকাচ্ছে। এক কিচেন-হেল্পার গরম ট্রে বুকে চেপে দাঁড়িয়ে ছিল; মাহিরা না বলা পর্যন্ত সে এক পা-ও ফেলল না।

বেশি সময় পেল না সে। বনানীর গাড়ি বেরোতেই শেষ ট্রাক র‍্যাম্পে উঠে এল, আর ভিতর থেকে খবর এলো—কনের মায়ের পক্ষ নাকি মিষ্টির ট্রে দ্বিগুণ চেয়েছে, এখনই, একই চালানে। লোডিং বেতে সঙ্গে সঙ্গে গণ্ডগোল। আগে ছাড়া হলে মাছ নামবে না; মাছ না নামলে রাতের দ্বিতীয় শিফট বসে যাবে; আর মিষ্টি না গেলে মঞ্চে অপমান। শবনম খালা এবার সরাসরি মাহিরার কাছে এলেন, কিন্তু কথা বললেন রাশেদের দিকে তাকিয়ে, “বোর্ড ফেরত নে, সামলাস।”

রাশেদ হাত বাড়িয়ে দিল, যেন এই অল্পক্ষণ কিছুই না। “দাও।”

মাহিরা বোর্ডটা নিজের পাঁজরের কাছে টেনে নিল। “না। এখন দিলে আবার আটকে যাবে।” তার গলা উঁচু না, কিন্তু কাছের সবাই শুনল।

রাশেদের মুখে সেই প্রথম সত্যিকারের ফাটল দেখা গেল। “তুই কে হইছস? খালা, বলেন না!”

শবনম খালা চুপ। এই চুপটাই বেতে আরও জোরে বাজল। ড্রাইভাররা গাড়ি অর্ধেক চালু করে অপেক্ষা করছে, রুবেলের হাত দরজার চৌকাঠে, ভেতর থেকে মিষ্টির ট্রে নিয়ে দুই মেয়ে দাঁড়িয়ে। আত্মীয়ের ভরসা তখন আর কাগজের চেয়ে ভারী না। রাশেদ এগিয়ে এসে বোর্ড ধরতে গেল। মাহিরা শরীর ঘুরিয়ে তার হাত খালি বাতাসে পড়তে দিল, তারপর রেডিও ঠোঁটের কাছে তুলল।

“সবাই শুনেন,” সে বলল, “বনানীর পর মিষ্টির ট্রে একই গাড়িতে উঠবে, ওজন ভাগ করে। মাছের ট্রাক পাঁচ মিনিট বাইরে। মিলাদ লাইন স্থির। বে-টু, মিষ্টির কার্ট ছাড়েন এখন। জসিম ভাই, গাড়ি বন্ধ কইরেন না। রুবেল, মাঝের রাস্তা খালি।”

একসাথে তিনটা জিনিস নড়ল। ভেতর থেকে মিষ্টির কার্ট বেরিয়ে এলো, বাইরের ট্রাক একটু পেছাল, আর জসিম গাড়ি সামনে এনে এমন কোণে ধরল যে দুই চালান একসাথে তোলা যায়। রাশেদ আবার “না, আগে—” বলতে গিয়ে থেমে গেল, কারণ তার কথা শুনে কেউ নড়ল না। তার নিজের ডাকা লোকটাও না। সে হাত নামিয়ে ফেলল, যেন হঠাৎ বুঝেছে তার গলায় এখন কোনো দরজা খোলে না।

মাহিরা বোর্ডে নতুন দাগ টেনে শেষ ক্রম বেঁধে দিল। “এইটার পর মাছ। এর আগে কিছু না।” রাশেদ এবার নিচু গলায়, চাপা তাড়ায় বলল, “দে, আমি দাঁড়াই।” মুখে অনুরোধের চেয়ে বেশি ছিল বাঁচার চেষ্টা; এত লোকের সামনে পুরোটা হারাতে সে রাজি না।

মাহিরা তাকে দেখলও না। শেষ কার্টের চাকায় নিজের পা ঠেকিয়ে ধরে মিষ্টির ট্রে উঠতে দিল, তারপর হাত নামাল। “ছাড়েন।”

গাড়ি বেরিয়ে গেল। তার বাতাসে ঝোল, কাবাব, গরম মশলার গন্ধ একসাথে পেছনে টেনে নিল। পেছনের ট্রাক তখনই র‍্যাম্পে উঠল। রুবেল মাহিরার চোখের ইশারা বুঝে মাঝের পথ খুলে দিল। শবনম খালা একপা সরে দাঁড়ালেন; সরে দাঁড়ানোটা ছোট, কিন্তু এতেই বোঝা গেল বে-দরজার মুখে কার পাশে জায়গা।

মাহিরা রেডিও নামিয়ে আবার তুলল। “বে-ওয়ান, মাছ নামান। কার্ট তিন ভিতরে। দরজা অর্ধেক রাখেন।” পাস-বোর্ডটা তখনও তার বাহুর নিচে আটকানো, ভেজা, দাগপড়া, কিন্তু আর ধার করা না।

লোডিং বের পেছনের ক্রসলেনে হলওয়ে-আলোর ভোঁ ভোঁ এখন একটু দূরে শোনায়। খালি কার্ট গড়িয়ে যাচ্ছে, ভরা কার্ট ঢুকছে, মাঝের পথে কেউ আর তাকে সরাচ্ছে না। মাহিরা শেষবার রেডিওতে ছোট্ট ক্লিক দিল—“এবার ছাড়েন”—আর স্ট্যাটিকের খসখসে শব্দ ধীরে পরিষ্কার হয়ে গিয়ে কেটে গেল।