আসল ডিউটির মালিক আবার ফিরল
রিমা বাঁ হাতে রেজিস্টারের পাতা চেপে ধরে ডান হাতে তিনটা রিপোর্ট-ফোল্ডার এক লাইনে গুঁজে দিল, তারপর কুঁচকে যাওয়া ব্যাজের ফিতা গলায় দুলতে দুলতে বলল, “খালাম্মা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেটার সিবিসি আগে গেছে, এইটা পরে ডাকবেন।” কথাটা শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে সাব্বির ভাই ফাইলটা টেনে নিয়ে নাক সিটকাল, “তুমি রেজিস্টার ছুঁইলা কেন? তোমার কাজ ভেতরে স্যাম্পল নামানো, সামনের টেবিল না।”
করিডরের সাদা আলো গুনগুন করছিল, ফ্যানের বাতাসে চায়ের কাপের গায়ে ঠান্ডা রিং জমে ছিল। বেঞ্চে বসা রোগীর লোকজন তাকিয়ে আছে—কারও মাথায় টুপি, কারও হাতে প্রেসক্রিপশনের পলিথিন, কারও চোখে সেই পরিচিত ঢাকার ক্লান্ত তাড়া। রিমা কিছু বলল না। শুধু সাব্বিরের হাতের তলায় কাত হয়ে যাওয়া ফোল্ডারটা আবার সোজা করে রেজিস্টারের ওপর রাখল, যেখানে সিরিয়াল না মিললে দুইজন বৃদ্ধ লোক আরও আধাঘণ্টা বসে থাকবে। দৃশ্যটা এমন ছিল যেন সে সীমা ছাড়িয়ে গেছে; সত্যিটা ছিল, সে না ধরলে লাইনে আগুন লাগত।
সাব্বির ভাই আজ আবার নতুন শার্ট পরে এসেছে; কলার দাঁড় করানো, চুলে জেল, মুখে সেই অফিসি গলা। তার খালা মালিকপক্ষের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া—এখানে সবাই জানে। আরও জানে, রিমা রাতের শিফটে টানা দুই মাস লোক কমে গেলে মুখ বুজে কাজ করেছে, তবু তার নাম রোস্টারে পেন্সিলে, সাব্বিরেরটা কালি দিয়ে। অন্যায়টা রিমার কাছে পুরোনো, কিন্তু আজ বেঞ্চের সামনে সে রকম খোলাখুলি করে ধমক খাওয়া—ওটা ছিল নতুন।
তবু প্রথম ফাটলটা সেখানেই পড়ল। ভেতর থেকে মৌ মাথা বের করে বলল, “সাব্বির ভাই, ওই ইউরিন কালেকশনের ছাপা কাগজ কোথায়? রিমা আপু যেভাবে সাজায়, আমি কিছু পাইতেছি না।” বেঞ্চের দুইজন একসঙ্গে রিমার দিকে তাকাল। সাব্বিরের মুখের ভঙ্গি একচুল বদলাল না, কিন্তু ফাইলটা আর সরাল না। রিমা চুপচাপ তৃতীয় ড্রয়ার খুলে কাগজের গুচ্ছটা বের করে মৌর হাতে দিল। ছোট জয়; তবু সামনের টেবিলে দাঁড়িয়ে সেটা লুকোনো গেল না।
সন্ধ্যার ভিড় নামতেই চাপটা বাড়ল। তানভীর, মালিকের ভাগ্নে আর হিসাব দেখে, কাউন্টার থেকে মাথা বাড়িয়ে বলল, “রিমা, এই রিপোর্ট-ফোল্ডারগুলো ল্যাবে দিয়ে আসো, আর ফেরার পথে চাবিটা খালার রুমে দিও।” সে ফোল্ডারগুলো রিমার হাতে গুঁজে দিল, কিন্তু কাউকে বলল না এগুলোর দায়িত্ব এখন রিমার। সাব্বির তখন সামনের চেয়ারে বসে ফোনে কারও সঙ্গে হাসছিল। রিমা ফোল্ডার বগলে নিল, চাবিটা আঙুলে ঝুলল—দেরিতে ফেরত দেওয়া একটা চাবি, যা দিয়ে রাতের স্টোর খুলে সে আগেও কাজ বাঁচিয়েছে, কিন্তু মালিকানা কখনও পায়নি।
খালার রুমের সামনে থামতেই ভেতর থেকে চাপা গলা ভেসে এল। “মেয়ে ভালো, কাজও পারে,” খালা বলছিলেন, “কিন্তু আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে না? রাত-বিরাতে সামনের টেবিলে রাখলে কথা উঠবে। সাব্বির থাকতেই মেয়েমানুষকে সামনে বসাইতে হয় নাকি?” আরেকটা বয়স্ক কণ্ঠস্বর বলল, “সম্মান-অসম্মান বুঝতে হবে। ঢাকায় কাজ করছে বলে সব একরকম না।”
রিমা দরজায় নক না করে চাবিটা হুকেই ঝুলিয়ে দিল। ধাতব ঠোক্করের ছোট শব্দে ভেতরের গলা এক মুহূর্ত থামল। সে দাঁড়াল না, শুনলও না আর। কিন্তু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অপমান তার হাঁটার ভঙ্গি শক্ত করে দিল। ফোল্ডারগুলো সে ল্যাবে জমা দিয়ে ফেরার পথে দেখল, সামনের টেবিলে সিরিয়াল এলোমেলো, একটা বাচ্চা কাঁদছে, আর সাব্বির লোকজনকে একই কথা তিনবার জিজ্ঞেস করছে।
মাঝরাতে সিস্টেম বসে গেল। প্রিন্টার রিপোর্ট ছাড়ছে না, অনলাইন এন্ট্রির পৃষ্ঠা আটকে আছে, আর যাদের কাল সকালের বাসে ময়মনসিংহ ফিরতে হবে তারা বেঞ্চ থেকে উঠে কাউন্টারের কাছে ভিড় করল। সাব্বির গলা চড়িয়ে বলল, “নেটওয়ার্ক সমস্যা, সবাই বসেন।” কিন্তু কেউ বসল না। এক বৃদ্ধা বললেন, “বউমার আল্ট্রাসনো রিপোর্ট লাগব এখনই।” আরেকজন কৃষি অফিসের পরিচয় দিয়ে বলল, “কাল ভোরে ফিল্ডে যামু, রিপোর্ট না নিলে ডাক্তারের কাছে যামু কেমনে?”
এইখানেই সিস্টেমের লুকোনো সত্যি বেরিয়ে এল। ল্যাব থেকে মৌ দৌড়ে এসে বলল, “হাতে লেখা ট্যাগ মিলাইতে পারতেছি না। কে এন্ট্রি করছিল?” সাব্বির থমকাল। কারণ রাত্রির পুরনো নিয়ম ছিল—কম্পিউটার আটকে গেলে রিমাই হাতে রেজিস্টার মিলিয়ে ফোল্ডার চালায়। কিন্তু আজ তাকে সে সামনের টেবিল থেকে সরিয়ে রেখেছিল। রিমা তখন পাশের ট্রলিতে রক্তের খালি ভায়াল গুছাচ্ছিল। সে ট্রলিটা ঠেলে এনে কাউন্টারের পাশে থামাল, “রেজিস্টারটা এদিকে দিন।”
সাব্বির তৎক্ষণাৎ বলল, “তুমি আমার টেবিল নিয়া চিন্তা করো না। আমি সামলাই।” কথার সঙ্গে সঙ্গে সে ভুল ফোল্ডার এক রোগীর হাতে ধরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বলে উঠল, “এই নাম তো আমার না।” বেঞ্চের সামনে হালকা গুঞ্জন উঠল; এবার সেটা ভয়ের, রাগের নয়। তানভীর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে কাগজ কেড়ে নিয়ে রিমার দিকে তাকাল। সিদ্ধান্ত নিতে তার তিন সেকেন্ড লাগল। তারপর সে কাউন্টারের পাশের খালি স্টুলটা টেনে রিমার দিকে সরিয়ে দিল। “বসো। হাতের রেজিস্টার মিলাও আগে।”
রিমা বসে পড়ল না, দাঁড়িয়েই কাজ শুরু করল। সে ফোল্ডারগুলো নিজের পাশে টেনে নিল, সিরিয়াল নম্বরের নিচে আঙুল নামাল, দুইজনের নাম আলাদা করে মৌকে বলল, “এইটা আগে, এইটা আটকা।” লোকজনের ভিড় নিজে থেকে দুই ধাপ সরে গেল। সাব্বির দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এইভাবে করলে পরে ঝামেলা হলে কে নেবে?” রিমা একবারও তার দিকে তাকাল না। “যার কাজ, সে নেবে,” বলেই সে রেজিস্টারের ওপর ফাইলের সোজা রেখা টেনে দিল। ওই এক লাইনেই টেবিলের দখল বদলে গেল।
চাপ সামলে ওঠার আগেই আরেকটা ধাক্কা এল। প্রসূতি রোগীর পরিবার এসে হাজির—চোখে আতঙ্ক, হাতে অগ্রিম জমার স্লিপ। রিপোর্ট জরুরি, ডিউটি ডাক্তার ফোনে রাগছে। সাব্বির এবার গলা নরম করে বলল, “রিমা, তুমি তো জানো—একটু আমার হয়ে ফ্রন্টটা দেখে দাও।” এই “আমার হয়ে” কথাটাই ওর চেনা কৌশল; দায় রিমার, কৃতিত্ব তার। রিমা ফাইল থেকে মুখ না তুলে বলল, “আপনার হয়ে না। যার রিপোর্ট, তার কাজ বন্ধ হবে না—এই পর্যন্ত।”
তানভীর চুপ করে শুনছিল। তার মুখে কাঁচা দাড়ি, চোখের তলায় রাত জাগা। আজ সন্ধ্যায় সে-ও রিমার হাতে ফোল্ডার গুঁজে দিয়েছিল নাম না দিয়ে; সে অন্যায়টা জানত, শুধু সুবিধা নিয়েছিল। এখন সে কাউন্টারের ভেতরে এসে সাব্বিরকে সরে দাঁড়াতে বলল, “চেয়ার ছাড়েন।” সাব্বির হাসল, “তুমি আমাকে শেখাইবা?” খালাও তখন করিডরের মাথায় এসে দাঁড়িয়েছেন, ওড়নার খুঁট আঙুলে পাকানো। বেঞ্চের লোকজন চুপ, কিন্তু সেই চুপে সবাই শুনছে।
তারপর শর্টকাটটা পুরো ভেঙে পড়ল। ভেতর থেকে ডাক্তারখানার সহকারী দৌড়ে এসে বলল, “ওটি-পেশেন্টের গ্রুপিং রিপোর্ট কই? এখনই লাগে।” সাব্বির কাউন্টারের নিচে, ড্রয়ারে, উল্টাপাল্টা ফোল্ডারে খুঁজতে লাগল। ভুল এন্ট্রির ভিড়ে সে নিজেই বুঝতে পারছে না কোনটা কোথায় গেছে। শিশুর কান্না, ফ্যানের শব্দ, আলোয়ের গুনগুন—সব একসঙ্গে কষে বেঁধে গেল। রিমা হাত থামাল না। সে জানত, ওটি-পেশেন্টের রিপোর্ট হারালে আজকের রাত এখানেই ফেটে যাবে।
মৌ ল্যাবের দরজা থেকে চিৎকার করে বলল, “লাল দাগ দেওয়া ফোল্ডারটা কার কাছে?” কথাটা শুনেই তানভীরের চোখ কাউন্টারের ওপর ছড়ানো কাগজে ঘুরল, তারপর থেমে গেল সাব্বিরের কনুইয়ের নিচে চাপা পড়া মোটা নীল ফোল্ডারে। সেটাই ছিল রাতের ভার—সই, জরুরি রশিদ, হাতে লেখা সংশোধন, সব একসঙ্গে। সে একটানে ফোল্ডারটা টেনে বের করল। সাব্বির ধরে রাখতে গেল, পারল না। তানভীর সেটা কাউন্টারের কিনারায় এনে রিমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
এইটুকু দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল। সামনে বেঞ্চে বসা তিনজন, খালা, মৌ—সবাই দেখল, রাতের জ্যান্ত বোঝা কার হাতে ফিরে যাচ্ছে। তানভীরের গলায় কোনো ঘোষণা ছিল না, কেবল ক্লান্ত, খসখসে স্বর, “এটা নাও। তুমি ছাড়া এখন কেউ পারতেছে না।” শব্দের ভেতরে দেরি ছিল, লজ্জাও ছিল, কিন্তু দেরিতে পাওয়া সম্মানের সঙ্গে রিমা আপস করল না। সে “এখন বুঝছেন?” বলল না। “আমার টেবিলে আসেন”ও বলল না। শুধু দুই হাতে ফোল্ডারটা নিল, নিজের পাশে রাখল, আর বলল, “স্টিকার আনেন। আর কেউ ফাইল ছুঁইবেন না।”
এরপর কাজের গতি বদলে গেল। রিমা নীল ফোল্ডার খুলে ভাঁজের মধ্যে থেকে লাল দাগ দেওয়া পাতাটা বের করল, মৌকে নম্বর পড়ে শোনাল, তানভীরকে রশিদের সিরিয়াল মিলাতে বলল, আর রোগীর পরিবারকে সরাসরি জানাল, “দশ মিনিট। বাইরে দাঁড়ান না, এইখানেই থাকেন।” তার গলায় আদর ছিল না, কিন্তু ভরসা ছিল। খালা একবার কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন; কারণ এই মুহূর্তে কথায় মুখরক্ষা হবে না, রিপোর্টেই হবে।
সাব্বির একপাশে সরে দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ পুরোপুরি যায়ওনি। দুবার ফোল্ডারে হাত দিতে গিয়ে রিমার “না” শুনে হাত নামিয়ে নিল। সে আর ভাইসুলভ ভঙ্গিতে কথা বলল না। রাতের ভেতর এই বদলটাই ছিল সবচেয়ে ধারালো—চেয়ার, টেবিল, ড্রয়ার সব আগের জায়গায়, কিন্তু কাদের দিকে চোখ ফিরছে, কে নির্দেশ দিলে লোক নড়ছে, সেটা পাল্টে গেছে। রিমা একটার পর একটা নাম ডেকে রিপোর্ট ছাড়ল। বৃদ্ধা বউমার আল্ট্রাসনো পেলেন। কৃষি অফিসের লোক ভোরের বাস ধরার কাগজ হাতে নিল। ওটি-পেশেন্টের পরিবার স্বাক্ষর করে ছুটল ভেতরে।
চাপের মোচড় শেষ হতে হতে রাত অনেক। লোক কমে গেছে, বেঞ্চের ওপর কুঁচকে থাকা টিস্যু, একপাশে সরানো চায়ের কাপ, রেজিস্টারের কোণে কালি লেগে থাকা আঙুলের ছাপ। তানভীর ধীরে ধীরে রিমার কাছে এল। তার হাতে রোস্টারের পাতাটা, আর রিমার পুরনো ব্যাজের ক্লিপ খুলে যাওয়া দেখে সে নতুন ক্লিপটা টেবিলে রাখল। “আগামীকাল থেকে সামনের শিফটটাও তুমি ধরবা,” সে বলল, খুব নিচু গলায়, যেন দেয়ালও না শোনে। “নাম আমি নিজে লিখে দেব।”
রিমা ফোল্ডার বন্ধ করল। “নাম লাগবে কাজের জায়গায়,” সে বলল, “মুখরক্ষার লাইনে না।” কথাটা তানভীরের গায়ে লাগল, বোঝা গেল। তবু সে পাতাটা সরিয়ে দিল রিমার দিকে; এ বার কোনো অভিনয় নেই, কোনো আত্মীয়ের ছায়া নেই। শুধু জায়গা ছেড়ে দেওয়া। রিমা রোস্টারের পাতা নিজের দিকে টেনে নিল, নীল ফোল্ডারটা বগলে রাখল।
করিডরের আলো এখনও গুনগুন করছে। টুলর্যাকের ছায়ায় গিয়ে সে হাতের দস্তানা-জোড়া খুলে হুকেতে ঝুলিয়ে দিল। রাবারের ফিতে নরম শব্দে লেগে উঠল—টুপ করে, তারপর হালকা টান খেয়ে আবার বসে গেল।