Fast Fiction

তালিকার ওপরে উঠল তার নাম

গাড়ির দরজা খুলতেই রুমানাকে দুজন ছেলেপেলে দৌড়ে গিয়ে ছাতা ধরল, ফুলের থালা এগিয়ে দিল, আর মেহরীনের সামনে হাত তুলে এক গার্ড বলল, “আপা, একটু সাইডে দাঁড়ান। আগে কনের পক্ষ।”

ঢাকার বনানীর ভেন্যুর নামার লেন এমনিতেই ঠাসা—গাড়ির ধোঁয়া, আতরের গন্ধ, ফটোগ্রাফারের আলো, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ। তবু অপমানের জিনিস আলাদা করে দেখা যায়। রুমানা নামতেই খালাম্মা গিয়ে তার কপালে হাত ছুঁইয়ে বললেন, “এই যে আমাদের ঘরের মেয়ে।” আর মেহরীনের ট্রলির হাতলটা এক কর্মচারী কেবল ধরে রেখে দিল, যেন ভেতরে ঢোকা না-ঢোকার সিদ্ধান্তও তার নয়।

মেহরীন ট্রলির ওপর আঙুল শক্ত করল। হাতের ফোনটা নিচু করে ধরা, স্ক্রিনের আলো তালুর ভেতর আটকে। তিন বছর ধরে সায়েমের সঙ্গে তার সম্পর্ক আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা ছিল; বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছিলও। তারপর সায়েমের মায়ের হিসাব বদলেছে—কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের ভাগনি রুমানা, বড় ঘর, বড় নাম, বড় দরজা। মেহরীনকে আজ ডাকা হয়েছে “ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে সুন্দরভাবে থাকতে”—মানে, নতুন কনের পাশে নিচু হয়ে দাঁড়ানোর জন্য।

গার্ড আবার হাত তুলতেই মেহরীন সরে গেল না। সে ট্রলি ছেড়ে ব্যাগ থেকে পাতলা খাম বের করল। “এটা কার হাতে দেওয়ার কথা ছিল?”

খামের কোণে পুরোনো নীল কালি লেগে থাকা দাগ। গেটে দাঁড়ানো সুপারভাইজার চোখ কুঁচকে খামটা দেখল। ওপরে সোনালি অক্ষরে লেখা—ভিআইপি প্রবেশ টোকেন, সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিথি-অভিভাবক। নামটা এখনো ঢাকা। সুপারভাইজার খাম নিল না, শুধু বলল, “ওটা পরে দেখা যাবে, আপা। আগে পথ ছাড়েন।”

এবার রুমানা নিজে ঘুরে তাকাল। লাল শাড়ির ভারে তার হাঁটা ধীর, কিন্তু কণ্ঠ ধারালো। “মেহরীন, নাটক কোরো না। তোমাকে তো বলা হয়েছে, গেটের ভেতর ডানপাশে বসার জায়গা আছে। ভেতরে গিয়ে থেকো, বাইরে দাঁড়িয়ে সিন কোরো না।”

খালাম্মা তৎক্ষণাৎ জুড়ে দিলেন, “মেয়েমানুষের মান-ইজ্জত থাকে। এত মানুষের সামনে মুখ শক্ত করে কী লাভ? যা গেছে, গেছে। আজ বিয়ের দিন।”

মেহরীন খুব নিচু গলায় বলল, “যা গেছে, তা যদি সত্যিই যেত, আমাকে আজ এখানে ডাকতে হতো না।”

কথাটা বড় হয়নি, কিন্তু পাশে দাঁড়ানো দুই ফুপু মুখ টিপে একে অন্যের দিকে তাকাল। সুপারভাইজারের দৃষ্টি এবার খামের দিকে আরেকবার গেল। সে হাত বাড়াতে গিয়েও থামল, কারণ সায়েম এসে পড়েছে—সাদা পাঞ্জাবি, মুখে ক্লান্তি, চোখে সেই পুরোনো অভ্যাস: সবার সামনে নরম, ভেতরে নিজের সুবিধার দিকে।

সে মেহরীনের কাছাকাছি এসে চাপা গলায় বলল, “তুমি বুঝে চলো। প্লিজ। আজ শুধু ভেতরে গিয়ে বসে থাকো। পরে কথা বলব।”

মেহরীন তার দিকে তাকাল না। “পরে মানে, গেট পেরোনোর পর? যেখানে আমি আর কাজে লাগব না?”

সায়েমের চোয়াল শক্ত হলো। সে হাত বাড়িয়ে মেহরীনের খামটা নিতে চাইল। “এটা আমাকে দাও।”

মেহরীন খাম সরিয়ে নিল। “না।”

এই ‘না’-টা এত ঠান্ডা ছিল যে পাশের ক্যামেরাম্যান ছবি তুলতে তুলতে হাত নামিয়ে ফেলল। ছোটখাটো একটা থেমে যাওয়া তৈরি হলো—তাল মিলিয়ে দাঁড়ানো লোকজনের শরীর সামান্য কাত হলো, কে কাকে আগে নেবে সেটা বুঝতে।

ঠিক তখন ভেতর দিক থেকে আরেকজন দৌড়ে এল, বুকপকেটে ওয়াকি-টকি, গলায় পরিচয়ফিতা। সে সুপারভাইজারের কানে কিছু বলেই খামটার দিকে তাকাল। “সোনালি সিল আছে?”

মেহরীন খামটা এবার তার দিকে বাড়াল। লোকটা খুব সাবধানে সিল ছিঁড়ল। ভেতর থেকে শক্ত প্লাস্টিকের গেট টোকেন আর একটি কার্ড বেরোল। সে কার্ড পড়তে পড়তেই সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর চোখ তুলে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর বদলে গেল। “মেহরীন আপা?”

চারপাশের ফিসফাসে কাঁটা বেঁধে গেল।

লোকটা আরেক পা এগিয়ে এসে দুই হাতে কার্ড এগিয়ে দিল। “আপনার জন্য আলাদা লেন রাখা আছে। আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক স্যার আসার আগেই আপনাকে রিসিভ করার নির্দেশ আছে। আপনি ভেতরের এসকর্ট-অতিথি তালিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক।”

রুমানার ঠোঁট খোলা রইল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। খালাম্মা প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে গিয়ে বললেন, “এটা কী করে হয়? ওই দায়িত্ব তো—”

লোকটা বিনয়ের সঙ্গে কিন্তু স্পষ্টভাবে বলল, “যার নাম অনুমোদিত কার্ডে আছে, দায়িত্ব তার। তালিকায় পরিবর্তন আজ দুপুরে সিল হয়েছে।”

সুপারভাইজার সঙ্গে সঙ্গে গার্ডকে সরিয়ে দিল। যে হাত একটু আগেও মেহরীনকে সাইডে ঠেলছিল, সেই হাত এবার পথ ফাঁকা করল। “আপা, এই দিকে আসেন।”

এটা প্রথম ফাটল। মেহরীন নড়ল না। কার্ডটা হাতে নিয়েই সে জায়গা বদলাতে দিল সবাইকে—রুমানার সামনে থাকা ছোট দড়িটা সরিয়ে কর্মচারী মেহরীনের দিকে লেন খুলে দিল, আর রুমানার দলকে এক কদম পেছনে দাঁড়াতে হলো। মুখে কেউ কিছু বলল না, কিন্তু দাঁড়ানোর রেখা বদলে গেল।

সায়েম তাড়াতাড়ি হেসে ওঠার চেষ্টা করল। “আচ্ছা, ভুল বোঝাবুঝি। মেহরীন তো আমাদেরই মানুষ। ও-ই সামলাবে, সমস্যা কী?”

মেহরীন এবার তার দিকে তাকাল। “আমি ‘আমাদের’ ছিলাম যখন, তখন তুমি আমাকে গেটে নামার আগেই সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলে।”

তারপর সে সুপারভাইজারকে বলল, “এসকর্ট-অতিথি কোন লেন?”

“বাম পাশের কাচের গেট, আপা।”

খালাম্মা এগিয়ে এলেন। গলার স্বর বদলে গেছে—আদেশ আর অনুনয়ের মাঝামাঝি। “শোন, যা-ই থাক, আগে রুমানাকে ঢুকিয়ে দে। মেয়েটা আজ কনে। পরে তুই যা খুশি করিস। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা এত মানুষের সামনে আমাদের মান থাকে।”

মেহরীনের কাঁধের পাশ দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস এল; পাশের লিফটের ধাতব দরজায় আঙুলের পুরোনো ময়লা দাগ চকচক করছিল। তার মনে পড়ল, সায়েমের বাসার অতিরিক্ত চাবিটা সে গত মাসে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তবু ওরা আজও ধরে নিয়েছিল দরজার অধিকার তাদেরই। সে টোকেনটা মুঠোয় চেপে বলল, “আপনাদের মান যদি আমার দাঁড়ানোর জায়গা কেটে বানাতে হয়, তাহলে সেটা আপনাদেরই থাক।”

সায়েম এবার নিচু স্বরে নয়, সবার শোনার মতো বলল, “তুমি ব্যাপারটা জটিল করছ। কার্ডে নাম থাকলেই সম্পর্ক বদলে যায় না।”

মেহরীন স্থির গলায় বলল, “সম্পর্ক তুমি বদলেছ। প্রবেশাধিকার আমি রাখছি।”

শব্দগুলো ছুরি চালানোর মতো নয়; বরং দরজার লক ঘোরানোর মতো। একবার ঘুরে গেলে আগের অবস্থায় ফেরে না।

গেটের ভেতর থেকে প্রধান আয়োজক নিজে বেরিয়ে এলেন—সায়েমের মামা, যিনি এতক্ষণ বড় অতিথিদের রিসিভ করছিলেন। তিনি মেহরীনের সামনে এসে থামলেন, হাত বুকে ঠেকালেন। “মেহরীন মা, দেরি হয়ে গেছে। ভেতরে সবাই অপেক্ষা করছে। এই লেনটা তোমার জন্য খোলা রাখো।”

এই ‘মা’ সম্বোধনটা তিনি রুমানাকে দেননি। দিতেও পারলেন না। কারণ এখন তিনি কেবল আত্মীয় নন, আয়োজক; আর আয়োজকের মুখে যার জন্য আলাদা লেন, তার দাঁড়ানোর উচ্চতাই আলাদা।

রুমানা হঠাৎ এগিয়ে এসে বলল, “মামা, আমি কনে। আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে কেন?”

মামা তাকালেন, কিন্তু শরীর ঘোরালেন না। “তোমার প্রবেশ ভেতরের কল-সিগন্যালের পর। আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিথি-অভিভাবক।”

এবার ক্ষতটা দেখা গেল। রুমানার জন্য সাজানো সামনে-যাওয়ার ভঙ্গি বাতাসে ঝুলে রইল। তার পেছনের দুই কাজিন যে ফুলের ট্রে নিয়ে ছিল, তারা কাকে অনুসরণ করবে বুঝে ট্রে নামিয়ে নিল। সায়েম এক পা এগিয়ে আবার থামল; সে এই প্রথম বুঝল, এখানে প্রেম বা অস্বীকারের গল্প না, গেটের গল্প চলছে—কাকে আগে নেওয়া হবে, কার পেছনে কে হাঁটবে।

খালাম্মা শেষ চেষ্টা করলেন। তিনি প্রায় হাত বাড়িয়ে মেহরীনের কনুই ছুঁতে গিয়েও থেমে গেলেন, কারণ সুপারভাইজার তখন ইতিমধ্যেই তার পাশে দাঁড়িয়ে। “মেহরীন, বোকামি করিস না। রাগ আছে, ঠিক আছে। কিন্তু আজ যদি তুই আগে ঢুকিস, সবাই কী বলবে?”

মেহরীন টোকেনটা আঙুলে ঘুরিয়ে দেখল। প্লাস্টিকের কোণে চাপা আঁচড়, যেন অনেক দেরিতে ফিরিয়ে দেওয়া চাবির বদলি। “আজ যদি আমি পেছনে দাঁড়াই, কাল সবাই বলবে আমি নিজের জায়গা ছিল না বলেই পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম।”

সায়েম দ্রুত বলল, “আমি তো পরে বুঝিয়ে দেব—”

“তুমি?” মেহরীন তাকে থামাল। “যে আমাকে ‘পরে’ রেখে আজকের দরজা সাজিয়েছ, সে কাল কী বুঝিয়ে দেবে?”

মামা এবার একেবারে পরিষ্কার নির্দেশ দিলেন, “গেট লেন এক—খুলুন। মেহরীনকে এসকর্ট করুন।”

একজন নারী-সহযোগী এগিয়ে এলেন, মাথা নত করে। “আপা, এই দিকে।”

এখানেই সায়েম ভাঙল। সে হাত বাড়িয়ে টোকেনটা ছুঁতে চাইল, যেন অন্তত এই অঙ্গভঙ্গিটা দিয়ে বোঝাতে পারে, সবকিছুর কেন্দ্রে সে-ই আছে। “মেহরীন, এক মিনিট। আমরা এটা অন্যভাবে—”

মেহরীন হাত সরাল না, বরং টোকেনটা মুঠো থেকে বের করে সবার সামনে তুলে ধরল। “অন্যভাবে অনেক হয়েছে।”

গেটের সামনে দুটো লেন। ডান পাশের লেনটি বড়, ফুলে সাজানো, কনের প্রবেশের জন্য। বাঁ পাশের কাচঘেরা লেনটি সোজা, নিঃশব্দ, কিন্তু স্ক্যানার লাগানো—যাদের প্রবেশ অনুমোদন-নির্ভর, তাদের পথ। এতক্ষণ সবাই ধরে নিয়েছিল বাঁ পাশের লেন কেবল কাজের লোক, অফিসিয়াল অতিথি, কিংবা দরকারি কিন্তু গৌণ মানুষের জন্য। এখন সেই লেনের সামনে সুপারভাইজার নিজে দাঁড়িয়ে দড়ি সরিয়ে রাখল, আর নারী-সহযোগী মেহরীনের অর্ধেক কদম পেছনে গিয়ে অবস্থান নিল। কে কাকে অনুসরণ করছে, সেটা হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে গেল।

রুমানা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “ওই লেন দিয়ে গেলে আমি কোথায় যাব?”

সুপারভাইজার চোখ না তুলেই বলল, “আপনি অপেক্ষা করবেন, ম্যাডাম। আপনার সিগন্যাল হলে ডান লেন।”

ম্যাডাম। আপা নয়। মা নয়। সম্পর্কের ভাষা সরে গেল, শুধু আটকে থাকা সৌজন্য রইল।

খালাম্মার মুখে আর মান-ইজ্জতের ভাষা নেই, এখন কেবল তাড়া। “মেহরীন, দাঁড়া—আগে রুমানাকে যেতে দে। এরপর তুই যাস। এক কদম তো।”

মেহরীন এক কদমও সরে দাঁড়াল না। সে নিজের জায়গা দিয়ে উত্তর দিল। নারী-সহযোগী তার ডান পাশে, সুপারভাইজার সামান্য সামনে, মামা পেছন থেকে পথ দেখানো অবস্থায়। সায়েম আর রুমানার দলকে দড়ির ওপারে থামিয়ে রাখা হলো। এই থামিয়ে রাখাটাই ছিল আসল আঘাত—কেউ তাদের গাল দিল না, কেউ ব্যাখ্যাও করল না; তবু সবাই দেখতে পেল, কর্তৃত্ব কোথা থেকে চলেছে আর কোথায় আটকে গেছে।

সায়েম শেষবার বলল, এবার গলায় অনুনয় স্পষ্ট, “মেহরীন, প্লিজ। অন্তত আমাকে সঙ্গে নিতে দাও।”

মেহরীন তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “যেখানে আমার জায়গা কাটতে তোমার আপত্তি ছিল না, সেখানে আমার সঙ্গে হাঁটার অধিকার তোমার নেই।”

সে টোকেনটা স্ক্যানারের দিকে বাড়াল। কাচের গেটের ওপর নরম সবুজ আলোর রেখা এক মুহূর্ত স্থির থেকে ছড়িয়ে গেল। নারী-সহযোগী তার সঙ্গে ঘুরে ভেতরের লেনে পা মেলাল, আর স্ক্যানার সবুজ হয়ে উঠল।