Fast Fiction

এখন আমরা একই পাশে

মেহজাবিন দুই হাতে ফেটে যাওয়া সারবস্তার মুখ চেপে ধরেছিল, আর সাদা দানার মতো ইউরিয়া তার আঙুলের ফাঁক গলে কাউন্টারের কিনারা বেয়ে মেঝেতে পড়ছিল, তখনই রাশেদা আপা খড়খড়ে গলায় বলল, “কে বলেছে তুমি গুদামের মাল ধরবে? তোমার কাজ রেজিস্টার, নায়িকা হওয়া না।” কথাটা এমনভাবে ছুড়ে দিল যেন মেহজাবিনই বস্তা ছিঁড়েছে। সামনের সরু কাউন্টারজুড়ে রাবারের সিল, ভাঙা ক্যালকুলেটর, কালি-লাগা পুরোনো কলম, আর তার সকাল থেকে না-খাওয়া ভাতের টিফিনবাক্স ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে ছিল। বাইরে ঢাকা শহরের বিকেলের হর্ন, ভেতরে পাখার কাঁপুনিতে ঝুলে থাকা ধুলো, আর দরজায় দাঁড়ানো দুজন ডিলার—একজন শিউলি খালার ভাসুরপো, আরেকজন রাশেদা আপার দুলাভাইয়ের চেনা—মুখ টিপে দেখছিল।

মেহজাবিন জবাব দিল না। হাঁটু দিয়ে বস্তা ঠেকিয়ে ডান হাতে কাছের খালি পলিথিন টেনে নিল, বাম হাত না সরিয়েই মুখটা মুড়ে বাঁধল। দানা গড়িয়ে পড়া থামল। কাঁধের ওড়না কনুইয়ে নেমে এসেছিল; সে দাঁত চেপে তা আবার তুলল। এই অফিসে তিন মাস হলো, কিন্তু এখনো কেউ তাকে নাম ধরে ডাকে না—“মেয়েটা”, “নতুনটা”, “ওই যে হোস্টেলে থাকে”—এটাই যথেষ্ট। তবু মাল কম পড়লে হিসাব তার টেবিলেই এসে থামে।

রাশেদা আপা এগিয়ে এসে বস্তাটা নিজের পায়ের আড়ালে টেনে নিল, যেন ক্ষতি সামলানোর কৃতিত্বও তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। “এই একটা জিনিস শিখো, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকজন আসে এখানে। যেভাবে-সেভাবে ঝাঁপ দিলে অফিসের মান থাকে?” দরজার কাছে দাঁড়ানো লোক দুজন মাথা নাড়ল। একজন বলল, “মেয়েপিলারে বেশি ছাড় দিলে এই হয়।” মেহজাবিন শুনেও যেন শুনল না; মেঝে থেকে দানা কুড়োতে কুড়োতে শুধু হিসাব করল—এক মুঠো, দুই মুঠো, কত কেজি কমল।

তখনই দ্বিতীয় ধাক্কা এল। ভ্যান থেকে নামানো আরেক চালানের তিনটা কার্টনের নিচের দিক ভিজে নরম হয়ে গেছে; তুলতেই কোণা ভেঙে বোতল গড়িয়ে পড়ল। কৃষি ওষুধের গন্ধ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। রাশেদা আপা এক ঝলকে চারপাশ দেখে গলার স্বর নামিয়ে আবার উঁচু করল—যেন গোপন কথা সবাই শুনুক। “চাবিটা কোথায়? গুদামের পেছনের গ্রিল না খুললে শুকনা জায়গায় নেব কীভাবে?” তারপর চোখ গিয়ে পড়ল মেহজাবিনের দিকে। “সকালে তোকে বলেছিলাম চাবি ফেরত দিতে।”

মেহজাবিন সোজা হয়ে দাঁড়াল। “আমি দুপুরেই দিয়েছি। আপনার টেবিলের কাগজের নিচে—”

“আমার টেবিলে রাখলেই হলো? হাতে দেবে না? হারাইলে দায় কার?” রাশেদা আপা কথার সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্টার তার দিক থেকে সরিয়ে নিল, যেন হিসাবের জায়গাটাও আর তার নয়। সামনের লোকজন শুনে ফেলেছে। শিউলি খালা, যিনি পাশের ভাড়া বাসায় থাকেন আর সুযোগ পেলেই এসে অফিসে বসেন, কপালে হাত ঠেকালেন। “ওরে দিয়ে এত দায়িত্ব দেওয়াই ভুল আছিল। মেয়েটা ভালো হইলেও বাপ-মা কাছাকাছি নাই, ধরন-ধারণ কম।”

মেহজাবিনের গলা শুকিয়ে গেল। সে জানত চাবি দিয়েছে—বিকেলে নামাজের আগে, রাশেদা আপা ফোন কানে নিয়ে হিসাব বলছিলেন, তখনই। কিন্তু প্রমাণ? কাউন্টারের ধারে কালি-দাগওয়ালা কলমটা, ঠাণ্ডা টিফিনবাক্স, ছেঁড়া বস্তা—সব আছে; নেই শুধু সময়মতো দেখা একজন মানুষ। রাশেদা আপা চাপ বাড়াল, “দাঁড়িয়ে থাকবা না। নষ্ট মাল গুনো, আর গ্রাহকের সামনে মুখ সামলায়া কথা বলো।”

এই সময় নাঈম ভেতরের কাঁচঘেরা ছোট ঘর থেকে বেরোল। সে সাধারণত খুব বেশি কথা বলে না—মাল ওঠানো-নামানো, ফোনে অর্ডার মিলানো, এইসব করে। মালিকপক্ষের দূর সম্পর্কের ভাগনা বলে সবাই তাকে একটু আলাদা চোখে দেখে; সে নিজেও দূরত্ব রেখে চলে। হাতে সে সেই চাবিটাই ধরে আছে, ছোট লোহার রিংয়ে নীল প্লাস্টিকের টোকেন বাঁধা। “এটা আমি নিয়েছিলাম,” সে বলল, কণ্ঠস্বর বেশি জোরে নয়, তবু সবাই থামল। “আপা, আপনি ফোনে ছিলেন। মেহজাবিন টেবিলে রাখছিল। পেছনের গ্রিল আমি খুলে চালান ঢোকাতে গিয়েছিলাম, ফেরত দিতে দেরি হয়েছে।”

শিউলি খালার মুখের ভাঁজ বদলাল, তবে পুরো না। রাশেদা আপা এক মুহূর্ত থমকালেও গলা ভাঙল না। “তুমি নিলে আমাকে বলবা না?” নাঈম চাবিটা এগিয়ে দিল, কিন্তু তার হাত সরল না যতক্ষণ না রাশেদা আপা নিতে বাধ্য হলেন। ছোট, খুব ছোট একটা বদল ঘটল—দায় একা মেহজাবিনের গলায় ঝুলে রইল না। নাঈম তারপর নিচু হয়ে ভাঙা কার্টনের দুটো বোতল গড়িয়ে যাওয়ার আগে ধরে ফেলল। “এগুলো আগে উঠাই। পরে বকা দিও।”

কাজ থামল না। বরং দ্রুততর হলো। পেছনের শুকনা ঘরে ভাঙা চালান সরাতে হবে, নষ্ট আর ভালো বোতল আলাদা করতে হবে, আর সন্ধ্যার আগে ময়মনসিংহের দোকানে যাওয়া তালিকা মেলাতে হবে। রাশেদা আপা মুখে মুখে নির্দেশ দিতে লাগলেন, কিন্তু হাত কম চালালেন। “মেহজাবিন, নষ্টের তালিকা করো। নাঈম, বাইরে লোকজনকে বলো আজ ডেলিভারি একটু দেরি।” কথার ভেতরেও খোঁচা, “যা গণ্ডগোল হইছে, সামলাতে সময় তো লাগবেই।”

মেহজাবিন রেজিস্টার টেনে নিল। পাতার কোণে পুরোনো কলমের কালি ছড়িয়ে আছে; সে বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে নিল, তারপর লিখতে শুরু করল। বোতলের গায়ের সিরিয়াল, ফাটা সিল, আর্দ্র কার্টন। নাঈম একটার পর একটা ক্রেট তুলে পাশে রাখছিল। তার শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, কাচের বোতল ঠোকাঠুকির শব্দে চোখের কোণে টান। একবার সে চুপচাপ মেহজাবিনের ঠাণ্ডা টিফিনবাক্সটা কাউন্টারের কোলাহল থেকে সরিয়ে রেজিস্টারের পাশের নিরাপদ জায়গায় রেখে দিল। এতটুকু কাজও এখানে ঝুঁকি—দেখে ফেললে কথা হবে। মেহজাবিন তাকায়নি, শুধু বুঝেছিল।

মাগরিবের আজান উঠতেই বিদ্যুৎ ঝিমঝিম করল। পাখা ধীরে ঘুরে থেমে গেল। আধো অন্ধকারে দোকানের সামনের অংশে যারা ছিল তারা হইচই শুরু করল; কেউ ফোনের আলো জ্বালল, কেউ বলল মাল এখন নিলে ভুল হবে। ঠিক তখনই নতুন বিপদ—সামনের রিটেইলারের ছেলে চেঁচিয়ে উঠল, “এই কার্টনটাও ভেজা! সিল নড়তেছে। এখন নিলে দোকানে লোকসান আমার!” তার গলার সঙ্গে বাইরে বৃষ্টির গন্ধ মিশে আসছিল। লোডশেডিংয়ের মধ্যে তীক্ষ্ণ অভিযোগ সবকিছুকে আরও নগ্ন করে দেয়।

রাশেদা আপা তৎক্ষণাৎ পিছু হটলেন। “অন্ধকারে কিছু খুলবা না। কাল দেখা যাবে।” কাল মানে অভিযোগ পাকাপাকি, ক্ষতি কার ঘাড়ে পড়বে সেটা ঠিক হওয়া। মেহজাবিন টর্চ খুঁজতে গিয়ে দেখল ব্যাটারি শেষ। গুদামের কোণায় ঝুলে থাকা পুরোনো ঝড়লণ্ঠন আছে, কিন্তু তা জ্বালাতে তেল ঢালা দরকার। রাশেদা আপা বিরক্ত মুখে বললেন, “এত রাতে মেয়েমানুষকে গুদামে ঢুকতে হবে না। যা আছে থাক।”

রিটেইলারের ছেলে তখনও দাঁড়িয়ে, সঙ্গে তার মামা—চেনা লোক, কথা ছড়াতে সময় লাগবে না। মেহজাবিনের বুকের ভেতর জ্বলে উঠল। “যা আছে থাকলে কাল সবই আমার নামে যাবে,” সে প্রথমবার সরাসরি বলল। উত্তর শোনার জন্য দাঁড়াল না। ঝড়লণ্ঠনটা নামিয়ে টিনের ড্রয়ারে হাত ঢুকিয়ে ছোট বোতল থেকে কেরোসিন ঢালল। আঙুলে তেল লেগে গেল, গন্ধ উঠল। দেশলাই জ্বালাতে দুবার ব্যর্থ হয়ে তৃতীয়বার সলতেটা ধরল। হলুদ আলো দুলে উঠতেই তার ছায়া তাকের গায়ে বড় হয়ে গেল।

“মেহজাবিন,” রাশেদা আপার গলায় এবার কড়কড়ে সাবধানবাণী, “একলা ঢুকবা না।”

নাঈম তখনই সামনে এসে আরেকটা প্লাস্টিকের ক্রেট কাঁধে তুলল। “একলা না,” সে বলল। তারপর রিটেইলারের ছেলে আর তার মামার দিকে ঘুরে, যেন খুব সাধারণ কথা, “আপনারা দাঁড়ান। এখনই দেখি।” কথাটা বলেই সে গ্রিলের সামনে গিয়ে তালা খুলল। এই এক পা-ই যথেষ্ট—সে নিরপেক্ষ থাকল না।

গুদামঘর সরু, স্যাঁতসেঁতে, উঁচু তাকভরা কার্টন আর বস্তা। লণ্ঠনের আলোয় নড়বড়ে ছায়া পড়ছে। দরজার কাছে দাঁড়ালে সবাই দেখতে পাবে—এক ছেলে, এক মেয়ে, রাতে, ভেতরে। তবু কাজ করতে হলে ঢুকতেই হবে। মেহজাবিন আলোটা উঁচু করে ধরল, নাঈম নিচের ভেজা কার্টন টেনে বের করল। তারা কথা বলছিল কাজের ভাষায়, তবু প্রতিটি শব্দের নিচে আরেক স্তর টানটান। “এইটা খোলো।” “সিল চেক করো।” “শুকনা কাপড় দাও।” বাইরে শিউলি খালার ফিসফাস ভেসে এল, “মান-সম্মান বলতে কিছু নাই?” রাশেদা আপা তার জবাবে কী বললেন বোঝা গেল না, শুধু এতটুকু শোনা গেল—“মাল বাঁচাও আগে।”

একটা কার্টন খুলতেই বোঝা গেল নিচের সারির ছয়টা বোতলের গায়ে আর্দ্রতা, দুটোর গলায় সিল নরম। মেহজাবিন কাগজে আলাদা চিহ্ন দিল। নাঈম ভালো বোতলগুলো শুকনা ক্রেটে তুলছে। হঠাৎ ওপরের তাক থেকে আধফাটা সারবস্তা কাত হয়ে নামতে গিয়ে তার কাঁধে আঘাত করল। সে টলে উঠতেই মেহজাবিন লণ্ঠন নামিয়ে বস্তার নিচে কাঁধ গুঁজে দিল। দুজনের হাত একই সঙ্গে ভেজা জুটের গায়ে। ওজনটা এমন যে একজনের পক্ষে সামলানো যাবে না।

বাইরে থেকে রাশেদা আপা বললেন, “ছাড়ো! পরে দেখা যাবে!” কিন্তু “পরে” বলার উপায় নেই; বস্তা পড়লে নিচের বোতল সব শেষ। মেহজাবিন দাঁত চেপে বলল, “নাঈম, বাম দিক তোলেন। আমি নিচের ক্রেট টানি।” সে অপেক্ষা করল না আপার অনুমতির। নাঈম তার কথামতো কাঁধ ঘুরিয়ে ওজন নিল। জুটের আঁশ হাতে কেটে যাচ্ছিল, কেরোসিনের আলো দুলছিল, আর মেঝের ভেজা অংশে পা পিছলাচ্ছিল। তবু তারা বস্তাটা পুরো ফেলল না—ধীরে, একসঙ্গে, তাকের নিচ থেকে সরিয়ে আনল।

ঠিক তখন সামনের দিক থেকে আরেক অভিযোগ এল—“আমার ইনভয়েসে তিন পিস কম!” অন্ধকার, গরম, গুদামের গন্ধ, সবার নার্ভ আলগা। রাশেদা আপা দরজায় দাঁড়িয়ে এক পা ভেতরে, এক পা বাইরে। তিনি বুঝতে পারছেন না কোন আগুন আগে নেভাবেন। মেহজাবিন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “রেজিস্টারটা দিন।” “এখন?” “এখনই।” তার গলায় এমন কিছু ছিল যে আপা রেজিস্টার এগিয়ে দিলেন, প্রতিবাদ জুড়তে পারলেন না।

নাঈম বস্তার মুখ নিজের হাঁটুর নিচে চেপে ধরল। মেহজাবিন লণ্ঠনটা একটা খালি ড্রামের ওপর রেখে রেজিস্টারের পাতা উল্টাল। পুরোনো কালি-দাগওয়ালা কলমটা এবার নাঈম তার হাতে গুঁজে দিল; হাত ছোঁয়ার মতো ক্ষণিক, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার নয়। “ময়মনসিংহেরটা আগে কাটেন,” সে বলল। “তিন পিস কম না, দুই পিস আগে ভাঙা তালিকায় গেছে।” মেহজাবিন সিরিয়াল মিলিয়ে দেখাল। দরজার বাইরে দাঁড়ানো রিটেইলারের মামা নিজেই কাছে এসে আলোয় ঝুঁকল। মাথা নাড়ল। অভিযোগের গলাটা কেটে গেল।

তারপরের কাজটা নিছক কাজ, কিন্তু এই অফিসে এর চেয়ে বড় পাল্টা-জবাব নেই। ভালো বোতল, আলাদা ক্রেট। নরম সিল, নষ্টের তালিকা। ফাটা সারবস্তা, নতুন পলিথিনে ভরে বাঁধা। রাশেদা আপা প্রথমে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, পরে চুপ করে সরে দাঁড়ালেন, কারণ কেউ আর তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না; সবার চোখ এখন কাজের দিকে, আর কাজটা চালাচ্ছে মেহজাবিন আর নাঈম। রিটেইলারের ছেলে একবার জিজ্ঞেস করল, “এইগুলো আজকেই নিতে পারমু?” মেহজাবিন না তাকিয়েই বলল, “ভালো ক্রেটগুলো নিন। নষ্টেরটা বাদ। সই দেন।” ছেলেটা সই দিল।

শেষ ধাক্কা এল যখন বেরোনোর জন্য ক্রেট আর নতুন করে বাঁধা সারবস্তা একসঙ্গে সামনের অংশে নিতে হলো। আলাদা আলাদা নিলে তিনবার যাতায়াত, ততক্ষণে বৃষ্টি নামবে। রাশেদা আপা বললেন, “নাঈম, তুমি বস্তা নাও। মেহজাবিন, তুমি লণ্ঠন ধরো।” পুরোনো খেলার নিয়ম—ওজন একদিকে, দৃশ্যমান কাজ আরেকদিকে। মেহজাবিন মাথা তুলল। “না। এই বস্তার মুখ আবার খুলে যাবে। দুইজন ধরে নিতে হবে।” সে লণ্ঠনের হুকটা বস্তার পাশে বাঁধা দড়িতে আটকে দিল, যেন আলোও সেই ওজনের সঙ্গে যাবে। “আমি সামনে ধরি।”

এক মুহূর্তের জন্য কারও মুখে কথা রইল না। তারপর নাঈম কোনো অনুমতি চাইল না। সে বস্তার পেছনের অংশ কাঁধে তুলল, মেহজাবিন সামনের গিঁট আর দড়ি একসঙ্গে ধরে নিল। মাঝখানে ঝুলে থাকা লণ্ঠন দুলে দুলে আলো ফেলছিল তাদের কবজি, শার্টের হাতা, ওড়নার কিনারে। দরজায় সরে দাঁড়াতে হলো রাশেদা আপাকে। শিউলি খালা ঠোঁট চেপে রইলেন; বলার মতো কথা থাকলেও এই চলমান জিনিস থামানোর ভাষা নেই। তারা দুজনে একই বোঝা নিয়ে কাউন্টার পেরিয়ে সামনের খোলা অংশে এল, প্রয়োজনীয় লোকজনের সামনে, কোনো ঘোষণা ছাড়া। কাজ শেষ করার ভঙ্গিটাই বাকিদের অপ্রয়োজনীয় করে দিল।

বাইরের বৃষ্টি তখন পাতলা। শেষ ক্রেট গাড়িতে উঠিয়ে সইসাবুদ মিলিয়ে দিতে দিতে অনেকটা রাত নেমে গেছে। সামনের শাটার অর্ধেক নামানো। রাশেদা আপা হিসাবের কাগজ জড়ো করছেন, কিন্তু কাকে কী বলতে হবে বুঝে উঠতে পারছেন না। নাঈম গুদামের তালা লাগিয়ে ফিরে এলে মেহজাবিন আগে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। সে বস্তা নয়, লণ্ঠন-বাঁধা কাপড়ের ব্যাগটা তুলল—ভেতরে রেজিস্টার, নষ্টের তালিকা, সিল, চাবি। দড়িটা তার হাতে কাটছিল। সিঁড়ির প্রথম মোড়ে এসে সে থামল, ব্যাগটা মাঝখানে নামাল না, শুধু ধরার ভঙ্গি বদলে ফাঁকা অংশটা ছেড়ে দিল।

নাঈম কিছু না বলে অন্য পাশের দড়ি ধরল। দুজনের হাতের মাঝখানে লণ্ঠনটা বাঁধা, সিঁড়ির অন্ধকারে হলুদ আলো দুলে তাদের হাতা ছুঁয়ে এপাশ-ওপাশে সরে যাচ্ছিল। তারা এক ধাপ না উঠে, না নেমে, সেই মোড়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল; ব্যাগের ভার দুজনের মাঝখানে স্থির, আলোটি আবার দুলে উঠল।