Fast Fiction

চাপ পড়তেই কে ভুয়া ধরা গেল

হাতগাড়িটার সামনের চাকা র‌্যাম্পের ধাতব ঠোঁটে ঠক করে আটকে গেল, আর একই সঙ্গে রেডিওতে কর্কশ শব্দ উঠল—“বে তিন দাঁড়িয়ে আছে, ছাড়পত্র কোথায়?” মাহিরা হাত বাড়িয়েই ছিল রিলিজ বোর্ডের দিকে, ঠিক তখনই রাশেদ সুপারভাইজার তার কবজি ছুঁয়ে নয়, সরাসরি ঠেলে পাশ কাটিয়ে দিল। “আজকে বোর্ডে বসবে তানভীর। তুই সাইডে যা।”

ভোরের ভেজা বাতাসে পেঁয়াজের ঝাঁজ, কাঁচা মরিচের কাটা গন্ধ, আর প্লাস্টিক মোড়ানো কৃষি পণ্যের ঠান্ডা সোঁদা গা বেয়ে ঘুরছিল। ঢাকা শহরের পাইকারি সরবরাহকেন্দ্রের এই পেছনের লোডিং বে-তে দেরি মানে শুধু ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা না—মাল নষ্ট, টাকা কাটা, মালিকের গালি, আর আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মহলে নাম ডোবা। মাহিরার ডান পকেটে আধভাঁজ করা রসিদ কুঁচকে ছিল; গতকাল মায়ের ওষুধের বিল। সে বোর্ড ছাড়েনি কোনোদিন ভুল করে। আজ তাকে সরানো হলো লোক দেখিয়ে।

তানভীর, রাশেদের খালাতো ভাই, সদ্য ইস্ত্রি করা শার্টে হাতা গুটিয়ে চেয়ারে বসল। সে বে-কি আঙুলে ঘোরাল, যেন এই ছোট ধাতব টুকরোটা খেলনা। জসিম গেটকিপার দুদিক তাকিয়ে থেমে রইল; কার হাতে চাবি যাবে, সেইখানেই আজকের মুখরক্ষা। শিউলি আপা পেছনে কাগজের পাতলা মোড়ক চেপে ধরেছিলেন, খসখসে শব্দ হচ্ছিল। মাহিরা একবার শুধু বলল, “বে তিন আগে, তারপর পাঁচ। পাঁচের প্যালেট উঁচু।”

রাশেদ ঠোঁট বাঁকিয়ে সবার শোনার মতো বলল, “তুই এখন শেখাবি? তানভীর অফিসের ছেলে। কাগজ বোঝে।” তারপর বোর্ডটা তানভীরের দিকে ঠেলে দিল। প্রথম পুরস্কারটা উল্টো গেল—চেয়ার, বোর্ড, রেডিও—সব এক ধাক্কায় মাহিরার হাত থেকে তুলে অন্যের সামনে রাখা হলো।

মাহিরা সরে গেল ঠিকই, কিন্তু চলে গেল না। র‌্যাম্পের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আটকে থাকা ট্রলিটার হাতল তুলে এক চাপে সোজা করল। তানভীর তখন রেডিওতে ভুল বে নম্বর বলে ফেলেছে—“পাঁচ ছাড়ো।” সঙ্গে সঙ্গে বে পাঁচের শাটার অর্ধেক উঠে আবার থেমে গেল, কারণ ভেতরে প্যালেট কাত হয়ে ছিল। লোকজনের মুখ থেকে একসঙ্গে শব্দ বেরোল। একটি বস্তা ছিঁড়ে আলু গড়িয়ে নর্দমার কালো জলে পড়তে লাগল।

“কে বলছে পাঁচ?” জসিম চেঁচাল।

“আমি বলছি,” তানভীর কড়া গলায় উত্তর দিল, কিন্তু তার গলা কাঁপল। রাশেদ তাড়াতাড়ি সামনে এসে বলল, “একটু গণ্ডগোল, সামলে নাও।” কথাটা বলেই সে মাহিরার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন দোষটা দাঁড়িয়ে থাকলেই তার। এইটাই তার কায়দা—কাজ ভুল হাতে দেবে, ভাঙন নামলে নিচের লোককে ময়লা মুছতে ডাকবে।

মাহিরা ট্রলিটা নামিয়ে শিউলি আপার হাত থেকে তালিকা কেড়ে নিল না; শুধু আঙুল দেখিয়ে বলল, “এই ক্রমে না গেলে দুটো লেনই বন্ধ হবে।” শিউলি আপা মুখ টিপে রইলেন, তারপর তালিকাটা সামান্য তার দিকে কাত করলেন। খুব ছোট এক ফাঁক। বোর্ড না, কিন্তু তথ্য। মাহিরা সেটুকুই নিল। “জসিম ভাই, তিন নম্বরের ডানপাশ ফাঁকা রাখেন। বাম দিকের কার্ট আগে নামান। আর পাঁচ নম্বর থামান।”

রাশেদ চটে উঠল, “তোমাকে কে বলেছে?” মাহিরা তাকালও না। “আলু নামছে। মরিচ চাপ খাচ্ছে। পাঁচ খুললে কলা ভাঙবে।”

এই এক লাইনে আশপাশের তিনজন শ্রমিকের শরীর ঘুরে গেল। একজন ছেঁড়া বস্তা চেপে ধরল, আরেকজন বে পাঁচের চাকা আটকাতে কাঠ গুঁজে দিল। মাহিরা হাত তুলে ক্রম বলল, “এক—বাম কার্ট নামাও। দুই—তিন নম্বরের অর্ধেক দরজা। তিন—প্যালেট নিচে না নামিয়ে রশি কাটবা না। জসিম ভাই, এখন ডাকেন।”

জসিম রেডিও তুলল, কিন্তু চোখ তানভীরের দিকে। তানভীর চেয়ারে বসে আছে, রেডিও তার হাতে, অথচ কী বলবে বুঝছে না। রাশেদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তানভীর, কল দে।” তানভীর মুখ খুলে আবার বন্ধ করল। তখন মাহিরা এক পা এগিয়ে এসে রেডিও না ছুঁয়ে কথাগুলো ছুঁড়ে দিল, “বে তিন, অর্ধেক ওঠাও। বাম কার্ট আগে। হাতে ধরো। এখন।”

জসিম তার নিজের রেডিওতেই সেই কথাগুলো বলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ধাতব শাটার কাঁপতে কাঁপতে উঠল। এক হাতগাড়ি ঢুকল। আরেকজন শ্রমিক মাহিরার বলা মতো রশি কাটল। প্যালেট কাত হলো না। আটকে থাকা লাইন আবার নড়ল—দরজা, চাকা, গলা, হুইসেল—সব একে একে।

তানভীর চেয়ারে বসে থেকেও কেন্দ্র থেকে সরে গেল। রাশেদ সেটা ঢাকতে চাইল। “আচ্ছা, ও দাঁড়িয়ে বলুক, বোর্ডে তানভীরই থাকবে।” কিন্তু বোর্ডে বসা মানেই নিয়ন্ত্রণ—এখন সেটা শুধু কাগজে। প্রতি আধমিনিটে কেউ না কেউ মাহিরার দিকে ফিরছে। “আপা, চার আগে?” “এই ট্রলি কোন লেনে?” “এই বস্তা নামাব?” মাহিরা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল। “না।” “এখন।” “ডান।” “থামেন।” তার গলা যত কম, কাজ তত দ্রুত।

পেছনের লিফটের স্টিলের প্যানেলে পুরনো মুছামুছির দাগ আর হাতের ছাপ জমে ছিল। সেই অস্পষ্ট আয়নায় মাহিরা এক ঝলক দেখল—তানভীরের গলায় ঘাম, রাশেদের চোয়াল শক্ত, আর নিজের মুখে কিছুই নেই। পকেটের আধভাঁজ রসিদটা তার উরুতে খচখচ করছিল। সে জানত, একবার কাজ বাঁচালে ওরা সেটাকেও ধার করা সুবিধা বানাতে চাইবে।

সেটাই হলো। বে দুইয়ের ছোট চালান ছাড়ার সময় তানভীর আবার ভুল ক্রম ধরল; ভারী প্যালেট আগে এনে পথ আটকাল। রাশেদ এবার গলা নরম করল, কিন্তু সবার সামনেই। “মাহিরা, একটু বলো তো।” অনুরোধের শব্দ, ভেতরে আদেশের ভঙ্গি। মাহিরা কাছে গিয়ে দাঁড়াল না। দূর থেকেই বলল, “ভারীটা পেছনে। আগে শাকপাতা। নইলে গরমে শেষ।” তারপর থেমে যোগ করল, “বোর্ডে যে বসবে, এই ক্রম তার জানা লাগে।”

কথাটা শুনে শিউলি আপা প্রথমবার সরাসরি রাশেদের দিকে তাকালেন। জসিম বে-কি চুপচাপ কোমর থেকে খুলে হাতে নিল, কিন্তু তানভীরকে দিল না। ছোট ছোট জিনিসে মান নড়ে। রাশেদ সেটা টের পেলেও ফিরিয়ে আনতে পারল না। সে শুধু বলল, “এখন ঝামেলা কোরো না।”

ঝামেলা তো থামছিলই না; বরং গা বাঁচিয়ে দাঁড়ানোদের গায়ে এসে পড়ছিল। বাইরে চট্টগ্রামগামী বড় ট্রাক ঢুকে গেছে—ডক-লেনের শেষ ছাড়পত্র তার জন্য। মাছ আর সবজির মিশ্র চালান; সময় পেরুলে পুরো কনসাইনমেন্টের ক্ষতি। এই ট্রাক বের না হলে পেছনের তিনটা কার্ট, দুইটা প্যালেট, আর গেটের সামনের লাইন একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে। রেডিওতে কণ্ঠ ভাঙল—“শেষ লেন আটকে আছে। তিন মিনিট।”

রাশেদ তাড়াহুড়ো করে তানভীরের দিকে ফিরল। “এটাই কর, এটাই সহজ। আগে ডান দরজা, পরে—” মাহিরা এবার সরাসরি বলল, “ডান দরজা খুললে শেষ। কার্ট ঢুকে গলায় আটকে যাবে।”

তানভীর তবু রেডিও তুলল। তার কণ্ঠে জোর আনতে গিয়ে শব্দ ফেটে গেল, “ডান—” ঠিক সেই মুহূর্তে জসিমের হাতে বে-কি কাঁপল, একজন শ্রমিক পিছলে পড়ে হাঁটু ঠুকল, আর পেছনের কার্টের চালক ব্রেক চেপে চাকা ঘষে ধোঁয়া তুলল। দৃশ্যটা একসঙ্গে সবাইকে দেখিয়ে দিল—আরেকটা ভুল মানে ডক বন্ধ।

রাশেদ শেষ চেষ্টা করল। সবার সামনে মাহিরাকে কেটে দিয়ে বলল, “তুই দূরে থাক। ভুল হলে দায় তোর না।” মাহিরা তার দিকে হাঁটল। না দ্রুত, না নাটক করে। শুধু সোজা। চেয়ারের পাশে এসে রিলিজ বোর্ডে হাত রাখল। রাশেদ বোর্ড সরাতে গেল, কিন্তু সে আগে তুলে নিল। কাঠের বোর্ডের ধারে পুরনো আঙুলের ঘষা, কোণে ফাটা টেপ, সব তার হাতচেনা। “দায় যার কাজ, বোর্ডও তার,” সে বলল।

তানভীর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে চেয়ারের পা ধাক্কা দিল। চেয়ারের লোহার পা কংক্রিটে ঘষে কানে খারাপ শব্দ তুলল। রাশেদ হাত বাড়িয়ে রেডিও বাঁচাতে চাইল, কিন্তু মাহিরা এবার সেটাও তার হাত থেকে নিল—ছিনিয়ে নয়, চেপে ধরে, যেন দেরিতে ফেরত পাওয়া চাবি নিজের পকেটে তোলা হয়। “জসিম ভাই,” সে না তাকিয়েই বলল, “বে-কি।”

এক মুহূর্তের থেমে থাকা। তারপর জসিম বে-কি মাহিরার তালুতে রাখল। এত লোকের সামনে কার হাতে চাবি গেল, সেটা কথার চেয়ে বড়। রাশেদের গলা নিচে নেমে গেল, “মাহিরা, পরে কথা হবে।” সে উত্তর দিল না। বোর্ডে চোখ রেখে দ্রুত বলল, “শুনেন—শেষ লেন। আগে বাঁ পাশের দুই কার্ট আধা হাত পিছাও। মাঝের ফাঁক খালি। তিন নম্বর থেকে শুধু পাতলা প্যালেট ছাড়ো। ডান দরজা বন্ধই থাকবে। গেট খোলার কল আমার পরে।”

শ্রমিকরা নড়ল সঙ্গে সঙ্গে। একজন কার্ট পেছাল, আরেকজন কাঁধ দিয়ে প্যালেট ঠেলল, শাটার নিচে-ওপরে এক বিটে উঠল। তানভীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল, এখন সে পথরোধ ছাড়া আর কিছু না। শিউলি আপা তার কাগজ মাহিরার বোর্ডের নিচে গুঁজে দিলেন; অফিসিয়াল তালিকা এখন ঠিক সেই হাতের নিচে, যেটাকে মিনিটখানেক আগেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মাহিরা রেডিও ঠোঁটের কাছে নিল। “গেট, শুনতেছেন? শেষ ছাড়পত্র। বাঁ ফাঁক ঠিক হলে তিন সেকেন্ড পরে খুলবেন। আগে না।” ওপাশে কর্কশ শব্দ। “কনফার্ম?” “কনফার্ম। আমার কল ছাড়া না।”

রাশেদ আবার ঢুকতে চাইল, মরিয়া হয়ে। “এখন খুলে দে, সময় নাই!” মাহিরা প্রথমবার তার দিকে সরাসরি তাকাল। “আপনি এক সেকেন্ডও ধরতে পারছেন না। আমি তিন সেকেন্ড ধরব।” কথাটা ঠান্ডা, কাটার মতো। কাছের লোকজন মুখ ঘুরিয়ে নিল; কারও হাসি না, কিন্তু রাশেদের দাঁড়িয়ে থাকা ভেঙে গেল।

বাঁ পাশের দুই কার্ট সরে যেতেই মাঝখানে সরু পথ খুলল। মাহিরা হাত তুলে গুনল, “এক... দুই...” তিনে পৌঁছানোর আগেই তানভীর ভুল করে ডানদিকের শ্রমিককে ইশারা দিতে গেল। লোকটা থামল, কারণ এখন সে আর তার দিকে তাকাচ্ছে না। “তিন।” মাহিরা রেডিওতে বলল, “গেট খুলুন। তিন নম্বর পাতলা প্যালেট ছাড়ো। এখন ট্রাক।”

ধাতব শব্দে গেট উঠল। পাতলা প্যালেট স্লাইড করে গেল, শেষ কার্ট তার পেছন দিয়ে কাঁটা সুঁইয়ের ফাঁকে সুতো ঢোকার মতো পার হয়ে গেল। চট্টগ্রামগামী ট্রাক ধীরে সামনের দিকে গড়াল, তারপর পুরো মাথা ঘুরিয়ে ডক ছাড়ল। যে ডান দরজা খুললে সব আটকে যেত, সেটা বন্ধই রইল। ভুল অপারেটরের সব দাপট সেই বন্ধ দরজার মতো নিস্তেজ দাঁড়িয়ে থাকল।

ট্রাকের পেছনের চাকা র‌্যাম্প ছাড়তেই রাশেদ হাত বাড়িয়ে যেন কিছু ফেরত চাইতে গেল—বোর্ড, রেডিও, মুখরক্ষা, কিছু একটা। কিন্তু তার হাতে কিছুই এলো না। তানভীর পাশ সরিয়ে দাঁড়াল, নিজের চেয়ারের দিকে তাকিয়েও বসল না। বোর্ড মাহিরার বাম হাতে, বে-কি ডান হাতে, রেডিও তার কাঁধের কাছে। এইবার কেউ তাকে “সাইডে যা” বলল না; বলার জায়গাও আর থাকল না।

মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় কল দিল, যেন এই দখল কোনো অভিনয় না, কাজের ধারাবাহিকতা। “বে দুই ধরে রাখেন। পাঁচ নম্বর এখন খুলবেন না। জসিম ভাই, পরের লাইন আমার কলের আগে ছাড়বেন না।” তার কণ্ঠে তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু কারও জন্য ফাঁকও নেই। রাশেদ আর একবার বলল, অনেক নিচু গলায়, “বোর্ডটা—” মাহিরা কথাটা শেষ করতে দিল না। “বোর্ড থাকুক যেখানে কাজ চলে।”

লোডিং বে-র পেছনের সরু ক্রসলেনে সে এক কদম সরে দাঁড়াল। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে গায়ে পুরনো টেপের দাগ, কোণে ছেঁড়া কাগজের মোড়ক, আর কংক্রিটের ধুলো। রেডিওতে শেষবার টুক করে শব্দ হলো। তারপর স্থির গুঞ্জনের ভেতর থেকে ঝিরঝিরে ঝাপসা কমে পরিষ্কার হলো। মাহিরা বোর্ডটা বগলের কাছে টেনে এনে বলল, “পরেরটা ছাড়েন।”