Fast Fiction

ডাকের তালিকায় আমার নামটাই উঠল

“দড়িটা ধরেন—ভিতরে এখন আপনাদের লাইন না,” দরজার হোস্ট ইমরান হাত বাড়িয়ে নওরীনের সামনে লাল ভেলভেটের কিউ-রোপ টেনে ধরল।

গোল্ডেন আলোয় ভেসে থাকা ঢাকার ওই বিয়ের হলের প্রবেশমুখে সবাই এক মুহূর্তে তাকাল। নওরীনের হাতের পাতলা খামের কোণে পুরোনো কলমের কালি ছোপ, কবজিতে ভাঁজ পড়ে যাওয়া পরিচয়ফিতা—দুপুর থেকে সে কনের পক্ষের হিসাব, উপহার-তালিকা, অতিথির ফোন সামলেছে। এখন সামনের আইল-এজ দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রথম সারির পারিবারিক আসনের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ তার সামনে দিয়ে দুজন দূর-সম্পর্কের খালা, তারপর মাহিরা আপার এক বান্ধবী, তারপর এমনকি মেকআপ-আর্টিস্ট পর্যন্ত অনায়াসে ভেতরে চলে গেল।

নওরীন থামল, কিন্তু সরে দাঁড়াল না। কাঁধের ব্যাগ থেকে ছোট্ট পিতলের চাবিটা বের করে সে ইমরানের টেবিলের ওপর রাখল। চাবিটা ফিরিয়ে দেওয়ার শব্দটা শুষ্ক ছিল। “ব্রাইড-রুমের আলমারির চাবি। যেহেতু আমার ঢোকার অধিকার নেই, দায়িত্বও থাকল না।”

এবার ফিসফাসটা একটু উঁচু হলো। পাশের করিডোরে টিউবলাইটের গুনগুন, পাখার শোঁ শোঁ, আতর মেশানো খাবারের গন্ধ—সবকিছুর ভেতরেও অপমানের শব্দ আলাদা শোনা যায়। মাহিরা আপা, কনের জ্যাঠাতো বোন, সামনের ফুলের খিলানের আড়াল থেকে এগিয়ে এলেন। ভারি শাড়ির কাঁধ টেনে তুলে তিনি এমনভাবে হাসলেন যেন নওরীন অতিরিক্ত কিছু চাইছে। “আরে, দায়িত্ব আর জায়গা এক জিনিস না, নওরীন। কাজ করেছ, সেটা আমরা জানি। কিন্তু সামনের সারি আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকজনের জন্য। সব জায়গায় দাঁড়ালে মানায় না।”

কথাটা তিনি এত জোরে বললেন যে ভেতরের ফটোগ্রাফারও লেন্স নামিয়ে তাকাল। নওরীন দেখল, তার মামাতো খালু রাশেদ চাচা একটু এগিয়ে এসে আবার থেমে গেলেন; মুখে দ্বিধা, চোখে হিসাব। মাহিরা আপা সুযোগটা আরও চেপে ধরলেন। “ওকে গিফট-ডেস্কের পাশ দিয়ে পাঠাও। মেয়েপক্ষের সাহায্য করেছে, ওখানেই থাকুক। সামনে বসলে লোকজন প্রশ্ন করবে—কে? কী পরিচয়?”

নওরীনের গলা শুকিয়ে গেলেও মুখ ঠান্ডাই রইল। “প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় থাকলে প্রশ্ন বন্ধ হয় না, আপা।”

“তুমি আমাকে শেখাবে?” মাহিরা আপার কণ্ঠে এবার খোলাখুলি বিদ্রূপ। “একটা ভাড়া বাসায় থেকে, ছোটখাটো অফিসের কাজ করে, দুদিন আসা-যাওয়া করে কেউ পরিবারের ভেতরের লাইনে উঠে যায় না। কনের বড়ো মামা আসবেন, গ্রামের আত্মীয় আসবেন, কৃষি জমির হিসাব যাদের হাতে, তারা বসবেন আগে। তুমি সীমা বুঝো।”

কথাগুলো ছুরি হয়ে যায় যখন ওগুলো সাক্ষীর সামনে বলা হয়। ইমরান ইতস্তত করে আবার দড়িটা টানল। এবার সে নিচু স্বরে নয়, সবার শোনার মতো বলল, “আপা, আপনি একটু সাইডে দাঁড়ান। ভিআইপি লেন আটকে রাখবেন না।”

ভিআইপি লেন। শব্দটা হলের সোনালি সাজের চেয়েও বেশি ঝলসে দিল। নওরীন ইমরানের মুখের দিকে তাকাল না; সে শুধু টেবিলের ওপর নিজের দেওয়া চাবিটার পাশে খামের ওপর আঙুল রাখল। আজকের উপহার-রেজিস্টারের লেখা তার হাতেই, কার নাম কোন টেবিলে, কোন আত্মীয় কখন এসেছে—সব সে জানে। অথচ এখন তাকে সরে দাঁড়াতে বলা হচ্ছে যেন সে ভাড়াটে লোক।

রাশেদ চাচা শেষ পর্যন্ত গলা খাঁকারি দিলেন। “মাহিরা, মেয়েটা সকাল থেকে আছে। এতটা বলা লাগে?”

“চাচা, আপনার মায়া আছে, কিন্তু হলের নিয়মও আছে।” মাহিরা আপা চোখ না সরিয়েই বললেন, “আর একটা কথা—সামিউল যদি কাউকে কোথাও বসাতে চায়, সেটা আরেক কথা। কিন্তু এখন বরের পক্ষ ঢুকছে। এই মুহূর্তে নাটক চাই না।”

সামিউলের নাম আসতেই দু-তিনটা মুখ আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল। নওরীন ঠিক এটাই চায়নি—তার সম্পর্ককে এমনভাবে বাতাসে ছুঁড়ে দেওয়া, যেন সে ভেতরে ঢুকতে চেয়ে কারও দয়ায় ভর করছে। সে খামটা টেবিলে রাখল। “ভালো। আমার নাম যেখানেই মানায়, ওখানেই লিখে দিন। কিন্তু আমার হাতে লেখা রেজিস্টার আর চাবি আমি ফিরিয়ে দিলাম।”

সে ঘুরে করিডোরের আধো-অন্ধকার দিকে এক পা সরতেই ভেতর থেকে তাড়াহুড়োর শব্দ উঠল। দুজন ক্যাটারিং ছেলেকে সরিয়ে, শেরওয়ানির ওপর গায়ে চাপানো পাঞ্জাবি ধরে, সামিউল প্রায় দৌড়ে এল। গলার পাঞ্জাবির বোতাম খুলে গেছে, চোখ লাল, কিন্তু থামার ভঙ্গিতে এমন এক অভ্যাসগত কর্তৃত্ব ছিল যে ইমরানের হাত নিজে থেকেই দড়ির ওপর থেকে সরে গেল।

“কে চাবি ফিরিয়েছে?” সামিউল প্রথমে টেবিলের দিকে তাকাল, তারপর নওরীনের দিকে। “এটা এখানে কেন?”

মাহিরা আপা দ্রুত এগিয়ে এলেন। “তুই এখন এসব নিয়ে—”

“আপা, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করিনি।” কথাটা সামিউল খুব জোরে বলেনি, কিন্তু আশপাশের গুঞ্জন কেটে গেল। তারপর সে ইমরানের দিকে ঘুরল। “আপনি নওরীনকে আটকেছেন?”

ইমরান কেঁপে উঠল। “না মানে... আমাকে বলা হয়েছিল সামনের লেন—”

এক মুহূর্ত আগে যে ছেলেটা “আপা, সাইডে দাঁড়ান” বলছিল, সে এবার দুহাত একসাথে করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “নওরীন আপা, দুঃখিত। আপনি এদিকে আসেন।” সম্বোধন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরও বদলে গেল; দড়িটা সে নিজের দিকে না টেনে বাইরে সরিয়ে দিল, টেবিলের সামনে ফাঁকা পথ খুলে গেল।

মাহিরা আপার মুখের রঙ পাল্টে গেল। “ইমরান, তুমি—”

কিন্তু ইমরান এখন আর তার দিকে তাকাচ্ছে না। “নওরীন আপা, সামনের আইল-লেন খালি করুন,” সে পাশের দুই অতিথিকে সরিয়ে দিল, “উনি যাবেন।”

এইটুকুতেই হলের ভেতরের চোখের দিক বদলে গেল। যে মেয়েটাকে একটু আগে গিফট-ডেস্কের পাশে পাঠানো হচ্ছিল, তাকেই এখন জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। তবু নওরীন দাঁড়িয়ে রইল। সে কারও মুখে সান্ত্বনা শুনতে আসেনি। তার চোখ সামিউলের ওপর গিয়েই থামল। “কোথায় যাব?”

প্রশ্নটা নরম ছিল না, আর ব্যক্তিগতও না। সামিউল বুঝল। তার পরিবার, কনের পরিবার, ক্যামেরা, বৃদ্ধা ফুফুরা, ভিড় করা কাজের লোক—সবাই শুনছে। সে এক পা সামনে এসে পরিষ্কার গলায় বলল, “প্রথম সারির ডান পাশের আইল-সিট। আমার নামে রাখা আসনের পাশে। নওরীনের জন্য।”

মাহিরা আপা প্রায় ফেটে পড়লেন। “তুই পাগল হয়েছিস? এখন সবার সামনে—”

“সবার সামনেই,” সামিউল কেটে দিল। “কারণ সবার সামনেই ওকে থামানো হয়েছে। আর শোনেন—গিফট-রেজিস্টারে, রিসেপশন তালিকায়, আমার অতিথি নয়, আমাদের পরিবারের সম্মানিত জন হিসেবে নওরীনের নাম আগে উঠবে। লিখে দিন।”

লিখে দিন। শব্দটা বাতাসে স্থির হয়ে থাকল। টেবিলে রাখা মোটা রেজিস্টার খোলা ছিল। তার ওপর নওরীনের নিজের হাতের লেখা নামগুলো, টেবিল নম্বর, আত্মীয়ের পরিচয়। সামিউল কলমটা তুলে নিল, কিন্তু লেখেনি। সে কলমটা নওরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল।

এটাই ছিল আসল ফাঁক। যদি সে কাঁদত, বা সামিউলের পাশে চুপচাপ দাঁড়াত, তবে এটা প্রেমিকের জেদ হতো। কিন্তু নওরীন কলম নিল, টেবিলের কাছে এগোল, আর রেজিস্টারের ওপর ঝুঁকে প্রথম লাইনটার নিচে টান দিল। তার আঙুলের পুরোনো কালি-ছোপ আবার স্পষ্ট হলো। সে নিজের নাম লিখল না; সে আগের লেখা এক আত্মীয়-সারির আগে গাঢ় করে লিখল—“নওরীন—সামনের ডান আইল, পারিবারিক আসন।”

রেজিস্টারের পাতাটা ঘুরিয়ে সে ইমরানের সামনে ধরল। “এখন পথ দেখান।”

এবার ক্ষতিটা দৃশ্যমান হলো। মাহিরা আপা ঝট করে পাতাটা টেনে নিতে গেলেন, কিন্তু সামিউল তার কব্জি না ছুঁয়েও মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল। লাল পাথরের চুড়ি ঠুকে শব্দ করল, তিনি হাত নামাতে বাধ্য হলেন। রাশেদ চাচা মাথা নিচু করে একবার রেজিস্টার দেখলেন, তারপর সরে গিয়ে নিজের পাশে দাঁড়ানো দুই আত্মীয়কে বললেন, “পাশ দিন।” যারা একটু আগে নওরীনের দিকে উপরে নিচে তাকাচ্ছিল, তারা এখন নিজেদের কাপড় সামলে দেয়ালের সঙ্গে সরে যাচ্ছে। আইল-এজের গুঞ্জন যেন টেনে ছোট করা হলো।

মাহিরা আপা শেষ চেষ্টা করলেন, এবার কণ্ঠে অনুনয়ের বদলে হিসহিসে রাগ। “নওরীন, তুমি অন্তত এইটুকু বুঝো—এভাবে গেলে কথা হবে।”

নওরীন পাতাটা বন্ধ করল না। “কথা তো হচ্ছিলই, আপা। শুধু এখন লেখা বদলেছে।”

সে টেবিলের ওপর রাখা পিতলের চাবিটা তুলে নিল, কিন্তু ব্যাগে রাখল না। চাবি, খাম, রেজিস্টারের কলম—সব হাতে নিয়েই সে কিউ-রোপের দিকে এগোল। ইমরান এত তাড়াতাড়ি দড়ি সরাল যে ধাতব স্ট্যান্ড কেঁপে উঠল। সামনের লাইনে দাঁড়ানো এক খালা বিব্রত মুখে পেছনে সরে গেলেন, তার পরে আরেকজন। যে ভিআইপি লেনের কথা বলে নওরীনকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই লেনের মাথায় এখন জায়গা খালি।

সামিউল একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন দাবি সে করেছে, কিন্তু জায়গা দখল করবে না। নওরীন একবার তার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো ভেজা ক্ষমা নেই, শুধু উত্তেজিত সতর্কতা—এই মুহূর্তটা সে হারাতে চায় না। নওরীন বুঝল, শেষ কাজটা তাকেই করতে হবে।

সে পরিষ্কার গলায় বলল, “আমার নাম যেখানে লেখা হয়েছে, আমি সেখানে দাঁড়াব। কেউ যদি আপত্তি করেন, এখনই রেজিস্টারে কেটে দিন।”

কেউ এগোল না। মাহিরা আপার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। ইমরান দড়িটা দুই হাতে তুলে পুরোপুরি একপাশে রাখল। নওরীন সামনে পা দিল—এক পা, আরেক পা—প্রথম সারির ডান দিকের আইল-লেনের একেবারে মাথায় গিয়ে থামল। তার হাতে চাবি ঠান্ডা, কলমের নিবে আলো, খামের কোণ ভাঁজ পড়া। পেছনের সারি আর সামনে নেই; তারা এখন তার পরে।

আরেকবার মাহিরা আপার গলা উঠল, এবার ভাঙা। “এইভাবে—”

নওরীন না ফিরে বলল, “এভাবেই।”

সে বাম হাতে কিউ-রোপটা নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিল। দড়িটা গোল হয়ে দুলে উঠল, তারপর পুরো লেনজুড়ে একপাশে সরে গিয়ে খোলা পথ রেখে ঝুলতে থাকল।