Fast Fiction

যে টোপ ফেলেছিল, সে-ই ধরা

“এইদিকে না,” শাহেদা খালা সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে মেহরিনের কনুই চেপে ধরে বললেন, “উপরে যাবার আগে চেকলিস্টে সই দাও। কে কী করেছে, সব লেখা আছে।” লাল দাগ টানা কাগজটা তিনি বুকের কাছে তুলে ধরলেন, যেন অফিসের কাগজ না, রায়নামা। নিচে রান্নাঘর দিক থেকে গরম পোলাওয়ের গন্ধ উঠছে, ওপরে কনফারেন্স রুমে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা দেখে বসেছে দুপক্ষ। আর মেহরিন, সারাদিনের কৃষি-সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের শিফট শেষে কাঁধে ব্যাগ, আঙুলে বহুবার ভাঁজ-খোলা ওষুধের রসিদ, স্যান্ডেলের ফিতেতে ধুলো, ওই সরু ল্যান্ডিংয়েই আটকা।

শাহেদা খালার পেছনে সিঁড়ির মোড়ে একটা ছোট টেবিল পাতা, তার ওপর প্লাস্টিকের ফুলদানি, সস্তা কলম, আর কাগজের মোড়কের শুকনো খসখস শব্দ তোলা একটা ফাইল। যেন কারও ঘরে বিয়ের কথা দেখতে মানুষ বসেনি—এটা শুধু তাঁর নিয়ন্ত্রণের জায়গা। নিচে নাঈমা ভাবি ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, ওপরে রিফাতের মামা, খালারা উঠে যাচ্ছেন। সবাইকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, শুধু মেহরিনকে থামিয়ে কাগজ দেখানো হচ্ছে।

মেহরিন বলল, “আমি রান্নাঘর থেকে বরফ আনতে গিয়েছিলাম। ভাবি বলছিল—”

“তুমি সবসময় কেউ কী বলল সেটা বলো,” শাহেদা খালা ঠান্ডা গলায় কেটে দিলেন, “কাজ করো কম। অফিসে ছোট চাকরি করো বলে ভেবো না যে এখানে তোমার জন্য নিয়ম আলাদা হবে। আজকে যারা এসেছে, তারা জানতে চায় মেয়েপক্ষের মেয়ে কতটা গোছানো। রিফাতের সঙ্গে নাম জড়িয়েছে, তাই বলে মাথায় তুলব নাকি?”

নিচ থেকে এক কাজের মেয়ে ট্রে নিয়ে উঠতে চাইলে শাহেদা খালা সরে দাঁড়িয়ে তাকে যেতে দিলেন। মেহরিনের সামনে আবার কাগজ। প্রথম ঘরেই লেখা—চা পরিবেশন, টিক। মিষ্টি সাজানো, টিক। বড় খালুর ওষুধ মনে করানো, টিক। তার নিচে—অতিথি গ্রহণে দেরি, মেহরিন। পাশে খালি বক্স। আরও নিচে—ঊর্ধ্বতলায় অননুমোদিত প্রবেশ। পাশেও খালি বক্স। মেহরিনের চোখ আটকে গেল। এখনো সে ওপরে ওঠেনি। তবু দোষের জায়গা আগে থেকে রাখা।

শাহেদা খালা বললেন, “সই দাও। তারপর নিচে গিয়ে কাবাব গরম করো। ওপরে সবাই বসুক আগে। তোমার মতো মেয়েরা আগে উঠে গিয়ে বসে থাকলে দেখতে ভালো লাগে না।”

কথাটা এমন স্বরে বলা হল যে নিচে দাঁড়ানো ডেলিভারি বিভাগের রশিদুলও মুখ নামিয়ে ফেলল। সে দুপুরে মেহরিনের সঙ্গে গুদামের হিসাব মিলিয়ে গেছে; জানে মেহরিন না থাকলে আজকের অর্ডারের ফাইলই উঠত না। তবু এখানে, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে, কাজের দরকারি মানুষটা হঠাৎ শুধু “তোমার মতো মেয়ে”।

মেহরিন কলম ধরল না। কাগজের ডান পাশটা হালকা উঁচু। আঙুল ছোঁয়াতেই বুঝল, নিচে আরেকটা পাতার চাপা রেখা। কার্বনের দাগ। একই সঙ্গে দুটো কপি হচ্ছে। এক কপি এখানে থাকবে, এক কপি কার হাতে যাবে—বুঝতে কষ্ট হল না। শাহেদা খালা আজকের রাতকে কাগজে বেঁধে রাখতে চাইছেন।

উপরে থেকে রিফাতের গলা এল, “মেহরিন এসেছে?” শাহেদা খালা মাথা না তুলে বললেন, “ওকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছি। সবকিছুর আগে দায়িত্ব শেখা দরকার।”

এবার তিনি জোরে বললেন, যেন নিচে-ওপরে সবাই শুনতে পায়, “রিফাত ব্যাংকে চাকরি করে, নিজের ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট জমাচ্ছে। আর তুমি? গুদামের হিসাব, ফোন ধরা, লোকজনের পেছনে দৌড়। তবু আমরা তো মুখ দেখে কথা বলছি। সেই মুখটাই যদি ঠিক রাখতে না পারো, তাহলে আত্মীয়স্বজনের সামনে লজ্জা কে নেবে?”

বুকে জমে থাকা ক্লান্তি মেহরিনের কাঁধে আরও নেমে বসল। সকাল থেকে সে অফিসে সার ডেলিভারির ঝামেলা সামলেছে, তারপর অসুস্থ মায়ের জন্য ফার্মেসি থেকে ইনহেলার এনেছে, তারপর এই বাসায় ছুটে এসেছে কারণ শাহেদা খালা নিজেই বলেছিলেন, “তুমি না এলে আমি একা সামলাতে পারব না।” এখন সেই “সামলানো”র দাম হচ্ছে দাঁড় করিয়ে অপমান।

নাঈমা ভাবি নিচ থেকে বললেন, “খালা, বরফটা—” “মেহরিন নামুক আগে,” শাহেদা খালা কড়া চোখে বললেন, “আমি তালিকা ধরে কাজ করাই। না হলে শেষে সবাই বলে কিছু ঠিকমতো হয়নি।”

তিনি নিজে সিঁড়ির রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে এমনভাবে দাঁড়ালেন যে মেহরিন না ওপরে যেতে পারে, না নিচে নামতে পারে। ল্যান্ডিংয়ের সরু অংশটুকু তাঁর শরীর, টেবিল, আর ফাইল দিয়ে বন্ধ। দুজন মধ্যবয়সি ফুফু পাশ কাটাতে গিয়ে আঁচল গুটিয়ে ওপরে উঠে গেলেন; তাদের জন্য জায়গা হল। মেহরিনের জন্য হল না।

এই প্রথম খোঁচাটা মেহরিন বুঝল—শাহেদা খালা সবাইকে দেখাতে চাইছেন, পথ কার হাতে। সে একবার শুধু টেবিলের দিকে তাকাল। প্রথম পাতার নিচে চাপা দ্বিতীয় পাতায় কার্বনের কালো ছাপ উঁকি দিচ্ছে। উপরে ঘরগুলোর বেশির ভাগে টিক আগে থেকেই মারা। শেষ দোষের ঘর দুটো খালি রাখা। যেন অপেক্ষা।

মেহরিন শান্ত গলায় বলল, “আপনি যদি নামতে দেন, বরফ নিয়ে আসি। অতিথিরা অপেক্ষা করছে।”

“আমি বলেছি আগে সই।” “না পড়ে সই করি না।” “এই অহংকার অফিসে দেখিয়ো। ঘরের বড়দের সামনে না।”

নিচে কাঁচের জগে বরফ গলতে গলতে পানি ঝরছে। ওপরে কেউ ডাকল, “শাহেদা আপা, চা উঠছে না কেন?” শাহেদা খালা বিরক্ত হয়ে ঘুরে আধা সিঁড়ি উঠে উত্তর দিতে গেলেন, “আসছে, আসছে।” কিন্তু টেবিলটা এমন আড়াআড়ি রাখা যে তিনি উঠতেই নিচ থেকে একসঙ্গে দুজন কাজের ছেলে ট্রে নিয়ে চড়ে এল। তাদের আগে যেতে দিতে তিনি রেলিংয়ের ধারে শরীর সরালেন, আর নিজের পাতা ফাঁদেই আধা ধাপে থেমে গেলেন—ওপরে উঠতে পারছেন না, নিচে নামতে পারছেন না। টেবিলের কোণা তাঁর শাড়িতে আটকে গেছে, ট্রের গরম ধোঁয়া মুখে লাগছে, পেছনে আরেকদল আত্মীয় নামতে চাইছে।

“টেবিলটা সরাও!” তিনি কেঁপে উঠলেন।

মেহরিন সরাল না। কারণ টেবিলটা টানলেই উপরের ফাইল পড়ে যাবে, আর ট্রে হাতে ছেলেগুলো হোঁচট খাবে। রশিদুল তাড়াতাড়ি নিচ থেকে বলল, “খালা, আপনি আগে একপাশে হোন।” “আমি কীভাবে হব? এই মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন?” শাহেদা খালার স্বর এবার প্রথমবারের মতো টান খেল।

মেহরিন শুধু এক ধাপ সরে প্লাস্টিকের চেয়ারটার কোণে হাত রাখল। চেয়ারটাও তিনি আগে এমনভাবে টেবিলের পাশে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন যে পথ আর সরু হয়েছে। এখন সেই চেয়ার তাঁর হাঁটুর সঙ্গে ঠেকেছে। ওপরে নামতে থাকা রিফাতের মামা থেমে গেছেন; নিচের কাজের মেয়ে ট্রে কাঁপছে; শাহেদা খালা মাঝখানে আটকে।

রিফাত ওপর থেকে নেমে এসে একবার দৃশ্যটা দেখে থামল। “খালা, টেবিলটা তো পুরো পথ বন্ধ করে রেখেছেন।”

শাহেদা খালা মুখ শক্ত করলেন। “শৃঙ্খলা না থাকলে এটাই হয়। মেহরিন, ফাইলটা ধরো, আমি উঠি।”

মেহরিন ফাইল নিল, কিন্তু তাঁর হাত বাঁচিয়ে নয়। সোজা নিজের দিকে টেনে নিল। পাতাগুলো খানিক খুলে গেল। কার্বনকপি স্পষ্ট। প্রথম পাতায় কাজের তালিকা, দ্বিতীয় পাতায় শিরোনাম—“অতিথি সেবায় ঘাটতির দায়ী ব্যক্তি।” নিচে মেহরিনের নাম আগে থেকেই লেখা। পাশে খালি বক্স, শুধু টিকের অপেক্ষা।

এক মুহূর্তে মেহরিনের ভেতরের ক্লান্তি ঠান্ডা হয়ে গেল। শাহেদা খালা শুধু অপমান করছেন না; তিনি কাগজ বানিয়ে রাখছেন। পরে যে-ই বলুক, দেখাবেন—দেখো, মেহরিন নিজে স্বীকার করেছে। এটাই ছিল ফাঁদ।

তিনি নিচু গলায় বললেন, “ওটা দাও। তুমি বুঝবে না।” মেহরিন চোখ না তুলে জবাব দিল, “বোঝার মতোই লেখা।”

ওপরে রিফাত এসে রেলিং ধরে দাঁড়াল। তার মুখ শক্ত, কিন্তু সে কিছু বলার আগেই শাহেদা খালা হঠাৎ গলা চড়িয়ে দিলেন, “সবাই শুনুন—এই মেয়ে কাজ ফেলে ওপরে উঠতে চাইছে। আত্মীয়স্বজনের সামনে বসার এত শখ! রিফাত, তুমি নিচে যাও। আর মেহরিন, ফাইলটা রেখে একদম পেছনের সিঁড়ি দিয়ে রান্নাঘরে নামো। সামনের পথ তোমার জন্য না।”

কথাটা ঠিক সেই বাড়তি ধাক্কা, যেটা তিনি অভ্যাসে দিয়ে ফেললেন। “সামনের পথ তোমার জন্য না”—সামনে রিফাত, তার মামা, নিচে নাঈমা ভাবি, রশিদুল, দুই কাজের ছেলে, পাশের খালা, সবাই শুনল। একই সঙ্গে তাঁর চোখ ফাইলের দিকে—যেন মেহরিন এখনই বাধ্য হয়ে সেটায় সই করবে, তারপর পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নামবে। দোষ, অপমান, পথ—সব ঠিক করা।

মেহরিন তখনই ফাইলের উপরের চেকলিস্টটা দুহাতে গুছিয়ে ভাঁজ থেকে খুলে নিল। কার্বনচাপা দ্বিতীয় পাতাটা সরে উঠে পড়ল। “অতিথি সেবায় ঘাটতির দায়ী ব্যক্তি”—শিরোনামটা একেবারে মুখে এসে গেল। নিচে মেহরিন নামের পাশে খালি বক্স, কিন্তু ওপরে যেসব কাজের টিক মারা, তার দুইটার পাশে ছোট নোট—“নির্দেশদাতা: শাহেদা।” আর একেবারে নিচে, শেষ সারিতে, কার্বনের উল্টো চাপায় অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠেছে—“প্রবেশপথ অবরুদ্ধকরণে পরিবেশন বিলম্ব।” সেই ঘরেও টিকের অর্ধেক চাপা। বুঝি আগে পাতা মিলিয়ে রাখার সময় কলম লেগে গেছে।

রিফাতের মামা চশমা নামিয়ে কাগজের দিকে তাকালেন। রশিদুল ট্রে-ধরা ছেলেদের থামাল। শাহেদা খালা হাত বাড়িয়ে ছিনিয়ে নিতে গেলেন, “এটা কাজের কাগজ—”

মেহরিন সরে গেল না। খুব স্থিরভাবে চেকলিস্টটা তাঁর বাড়ানো হাতের ওপর ফিরিয়ে দিল, ঠিক তখনই বলল, “যেহেতু সামনের পথ আমার জন্য না, এটা আপনার কাছেই থাকুক।”

শাহেদা খালা রাগে কাগজটা টেনে নিতেই ভাঁজ উল্টে গেল। উপরের সই-করার পাতাটা নিচে, কার্বনকপি ওপরে উঠে এল। সবার চোখের সামনে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—মেহরিনের নাম আগে থেকে লেখা, দোষের বক্স আগে থেকে রাখা, আর শেষ সারিতে শাহেদা খালার নিজের নির্দেশের পাশে কার্বনের চেপে যাওয়া টিক। তিনি এত তাড়ায় টেনে নিয়েছেন যে কলমের নিব কাগজে টেনে একটা মোটা দাগ গিয়ে পড়েছে সেই শেষ লাইনের ঘরে। “প্রবেশপথ অবরুদ্ধকরণে পরিবেশন বিলম্ব”—তার পাশের বক্স পুরোপুরি ভরে গেছে।

একসঙ্গে তিনটা জিনিস ঘটল। ট্রে হাতে ছেলে দুটো পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠে গেল—পথ খুলে গেল, কিন্তু শাহেদা খালা আর সরে দাঁড়াতে পারলেন না; কাগজ, টেবিল, শাড়ি, রেলিং—সব মিলিয়ে তিনি নিজেই ল্যান্ডিংয়ের গিঁটে আটকে। রিফাত নিচে নামার বদলে দাঁড়িয়েই রইল, প্রথমবার খালার আদেশ না মেনে। আর নাঈমা ভাবি ধীরে ধীরে বললেন, “খালা, চা উঠতে দেরি হল কার জন্য, কাগজেই তো লেখা আছে।”

শাহেদা খালার মুখের রং বদলে গেল। তিনি কিছু বলতে গিয়ে শব্দ খুঁজে পেলেন না; এতক্ষণ যে স্বরে সবাইকে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন, সেই স্বরই যেন গলায় উল্টো আটকে আছে। মেহরিন আর তাঁর দিকে তাকাল না। সরে গিয়ে টেবিলের ওপর ফাইলটা সমান করে রাখল, উপরের পাতাটা খুলে দিল, কার্বনের উল্টো-সোজা দাগগুলো যেন আরও পরিষ্কার দেখা যায়। তারপর নিজের ব্যাগটা কাঁধে চড়াল।

ল্যান্ডিংয়ের টেবিলে খোলা চেকলিস্টটা পড়ে রইল; টিকগুলো ঘুরে এখন শাহেদা খালার নিজের লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে, আর মেহরিন ইতিমধ্যে সিঁড়ি পেরিয়ে চলে গেছে।