Fast Fiction

গেটটা শেষে ওদেরই বন্ধ

“ওই টার্নে দাঁড়াস না, মেহজাবিন—সরে যা। আজ ভোরের মিরপুর লাইন যাবে সোহেলের হাতে।”

রশেদ সাহেব চিৎকারটা এমনভাবে ছুড়ে দিলেন যেন পুরো ডিসপ্যাচ বেটা তার বাপের উঠান। ভোরের কুয়াশা তখনও ট্রাকের গায়ে লেগে, বাঁধাকপির পাতায় পানি, কাঁধে কাঁধে কুলি, আর মেহজাবিনের গলায় ঝুলে থাকা পুরোনো পরিচয়ফিতেটা ঘামে নরম হয়ে বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে। সে রুট-খাতার ওপর হাত রেখেছিল। রশেদ সাহেব এগিয়ে এসে তার কবজি সরিয়ে দিলেন, খাতাটা টেনে নিয়ে সোহেলের দিকে ছুড়ে দিলেন। মেহজাবিনের পায়ের কাছে কাঠের চাকার ঠেলাগাড়ি ঘষে গেল। তার মামা খালেদ, যিনি পাশের আড়তে ফুলকপি নামাতে এসেছেন, সব দেখলেন। আরও দুজন আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোক, যারা পরে বাড়ির টেবিলে খবর বয়ে নিয়ে যাবে, তারাও দেখল—ভোরের সবচেয়ে লাভের রুট থেকে তাকে হাত ধরে নয়, ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হলো।

মেহজাবিন এক পা পেছাল, কিন্তু সরে গেল না। এই মিরপুর লাইনেই দিনের বাড়িভাড়া ওঠে, ছোট ভাইয়ের কোচিংয়ের টাকা ওঠে, আর গত তিন মাস ধরে এই লাইনটা রশেদ সাহেব কেটে কেটে নিজের লোকদের দিয়েছেন। সে বলল, “খাতায় আমার নাম উঠেছে। গত রাতের কল-লিস্টে ছিল।”

“কল-লিস্ট আমি দেখি,” রশেদ সাহেব থুতনি উঁচু করলেন। “তোর কাজ থাকবে সাইডের ফেরত মাল গোনা। ভোরের উঠতি মাল পুরুষ মানুষ সামলাবে।”

সোহেল হাসল, যেন আগে থেকেই জিতে রাখা জিনিস শুধু হাতে নিচ্ছে। সে মেহজাবিনের কাঁধ ঘেঁষে সামনে উঠে দাঁড়াল। মেহজাবিনের চপ্পলের ভেতর রাতভর দাঁড়িয়ে থাকার শক্ত কড়া টনটন করল, কিন্তু সে তাকাল শুধু খাতার দিকে। সেখানে তার নামের ওপর মোটা দাগ টেনে সোহেলের নাম বসানো হচ্ছে। প্রত্যক্ষ, কালি শুকানোর আগেই।

ক্যাশঘরের ছেলে বাবু জানালার ভেতর থেকে লাল টোকেন বের করছিল। রশেদ সাহেব হাত বাড়িয়ে বললেন, “ওটারও দরকার নেই। মেহজাবিনের তুলতি আজ বন্ধ। সোহেলের নামে ছাড়ো।” বাবু একবার মাথা তুলল। তার চোখে চেনা দ্বিধা—কারণ সে জানে এই সকালের টোকেন মানে নগদ ছাড়, আর নগদ ছাড় মানে দিনের রোজগার। তবু সে টোকেনটা মেহজাবিনের দিকে না বাড়িয়ে সোহেলের সামনে রাখল। পাশে দাঁড়ানো কুলিরা শুনে ফেলল। মামা খালেদ মুখ নামিয়ে সিগারেট ধরাতে গিয়ে দুবার আগুন মিস করলেন।

এই একটায় থামেনি। দুই মিনিটের ভেতর রশেদ সাহেব আরও দুটো কাজ করলেন। তিনি তোলা-ছাড়ার পাতাটা উল্টে মেহজাবিনের নামের লাইনে ক্রস টেনে দিলেন, তারপর ক্যাশঘরের দিকে বলে দিলেন, “ওর পয়সার ছাড় দুপুরের আগে খুলবি না। ভুল করিস না।” কাগজ সরল, টোকেন সরল, নগদ-জানালার দিকও সরে গেল। মেহজাবিনের সামনে শুধু বোঁটকা ধোঁয়া আর ঠাণ্ডা লোহার বারের ছায়া রইল। যে কয়জন একটু আগে পর্যন্ত তার সঙ্গে এক লেনে দাঁড়িয়েছিল, তারা এখন পিঠ বাঁকিয়ে সোহেলের ট্রলিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

মেহজাবিন তখনও চুপ। শুধু ডানহাতে ফোনটা নিচু করে ধরল, তালুর ভেতর নীলচে আলো জ্বলে আবার নিভে গেল। রাত একটা বেজে তেইশে আসা এক কল-রেকর্ড সে আগেই আলাদা করে রেখেছিল। শামীম সুপারভাইজার তখন জ্যামে আটকে বাইরে, কিন্তু জেলাগুলো থেকে কোন মাল কোন রুটে ঢুকবে—তার আগের রাতের নিশ্চিতকরণ থাকে আর্কাইভ কক্ষে, সব রেকর্ড করা। রশেদ সাহেব ভেবেছিলেন, সেই ঘরের চাবি তিনি আগেই বশে এনেছেন। কিন্তু গত সপ্তাহে পুরোনো মামলা খোলা পড়েছিল—একটা হারানো চালান, একটা ডুপ্লিকেট ছাড়পত্র, আর সেই তদন্তের জন্যই কেন্দ্রীয় সরবরাহ দপ্তর থেকে নির্দেশ এসেছিল: রাতের নিশ্চিতকরণ কণ্ঠরেকর্ড ছাড়া সকালে কোনো রুট বদলানো যাবে না। কথা কম লোক জানে। মেহজাবিন জানে, কারণ ওই হারানো চালানের রাতে দোষ চাপানো হয়েছিল তার ঘাড়ে।

সে বাবুকে বলল, “ক্যাশ ধরে রাখো। চূড়ান্ত ছাড় এখনো হয়নি।”

রশেদ সাহেব ঘুরে এমন তাকালেন যেন মেয়েটা সীমা ভুলে গেছে। “তুই জানালা থামাবি? তোর দাঁড়াবার জায়গা নাই, আবার ছাড় থামাবি?”

মেহজাবিন ফোনটা কানে তুলল না। শুধু স্পিকারের ভলিউম বাড়িয়ে নিচু গলায় বলল, “আর্কাইভ কক্ষ? রাতের এক নম্বর নিশ্চিতকরণটা চালান। মিরপুর সকালের লেন।” তারপর সে ফোনটা রুট-টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখল।

ক্র্যাকল করা শব্দ উঠল, তারপর পরিষ্কার গলা—শামীম সুপারভাইজারের। “ভোরের মিরপুর লেন, কোড সাত-দুই। মাঠের ধরন কৃষি-নাশপণ্য। তত্ত্বাবধায়ক অপারেটর: মেহজাবিন। জরুরি নির্দেশ: এই লেনের ছাড় অন্য নামে সরানো যাবে না। আর্কাইভ কপি সংরক্ষিত।”

চারপাশের ঠেলাগাড়ির শব্দ যেন একসঙ্গে গিয়ে আটকাল। সোহেল যে বস্তাটা কাঁধে তুলছিল, সেটাই মাঝআকাশে নামিয়ে ফেলল। বাবুর আঙুল টোকেনের ওপর থেমে রইল। মামা খালেদ এবার মাথা তুললেন, আর চোখে এমন দৃষ্টি এল যেন বহুদিন ধরে ভেতরে ভেতরে ধরে রাখা সন্দেহ আচমকা দিক পেল।

রশেদ সাহেব ঝাঁপিয়ে ফোনটা ধরতে গেলেন। মেহজাবিন তার আগেই ফোনটা তুলে নিল। গলায় ঝুলে থাকা মলিন ফিতেটা বুক থেকে সরে এল; সে ফিতের নিচে আটকানো ছোট ধাতব অনুমতি-চিহ্নটা খুলে রুট-খাতার ওপর রাখল। “রাতের নিশ্চিতকরণে আমার টার্ন। কাগজে কাটাকাটি করে বদলালে চলবে না।”

“এইসব চালাকি আমার সামনে চলবে না,” রশেদ সাহেব দাঁত চেপে বললেন। কিন্তু তখনই প্রথম ট্রাকের ড্রাইভার জানালা থেকে মাথা বের করে চিৎকার দিল, “মিরপুর লেন কোনটা? মাল নরম, দাঁড় করাইয়া রাখলে পচবে!”

মেহজাবিন আঙুল তুলল। “তিন নম্বর ঘুরে সাত-দুইতে। সোহেলের দল দাঁড়াও। ওরা এই লেনে ঢুকবে না।”

কথাটা শোনা মাত্র দুজন কুলি, যারা মিনিটখানেক আগেও সোহেলের গায়ে গা লাগিয়ে ছিল, ট্রলি ঘুরিয়ে নিল। এক ঠেলাগাড়ির চাকা রশেদ সাহেবের জুতার নাক ছুঁয়ে কঁকিয়ে উঠল। আরেকজন চালান-বাহক গলির মুখে থেমে জিজ্ঞেস করল, “আপার লাইনে যাব?” প্রশ্নটা রশেদ সাহেবকে নয়, মেহজাবিনকে।

এইটুকুই প্রথম ফাটল। রশেদ সাহেব তর্জনী তুলে বললেন, “কেউ লাইন ঘুরাবি না। আমি বলছি।”

কেউ ঘোরাল না—মানে তার কথায় না। সবাই দাঁড়িয়ে রইল, চোখ মেহজাবিনের দিকে। অপেক্ষা করে থাকা মানুষের ভিড়ের ভেতর যে শীতলতা নামে, সেটা বেশি লজ্জার। আদেশ দিলেও শরীর না নড়া। মেহজাবিন এক এক করে দেখাল—“ওই নীল ট্রাক আগে। তারপর শাকওয়ালারা। ফেরত মাল সাইডে। সাত-দুই খোলা।”

গাড়ির নাক ঘুরল। সোহেলের দল গলির মুখে আটকা পড়ল। রশেদ সাহেবের হাতে থাকা খাতা তখন আর খাতা না, ফাঁকা কাগজের মতো লাগছিল।

এই সময় চাপটা অন্য দিক থেকে এল। ডিসপ্যাচ বেয়ের পাশের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন হাজেরা খালা—রশেদ সাহেবের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়া, আবার মেহজাবিনের মায়েরও জানাশোনা। তিনি বাজারে ফুলকপি তোলার বড় হিসেবি মানুষ। দুই চোখে এমন শীতল বিচার, যে তার সামনে অনেক পুরুষও গলা নামায়। তিনি এসে প্রথমে রশেদ সাহেবের দিকে তাকালেন, তারপর মেহজাবিনের দিকে। “এত ভোরে চিৎকার ক্যান? লোকজন দেখতাছে।”

রশেদ সাহেব যেন এই মুখটাই চাইছিলেন। “খালা, মেয়েটা কাজ জানে না, তবু জোর করছে। ডিপোর নিয়ম আছে।”

হাজেরা খালা মেহজাবিনকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপলেন। রাতভর কাজের ভাঁজ পড়া সালোয়ার, ধুলোমাখা জুতা, গলায় ঘষে ক্ষয়ে যাওয়া ফিতে। “বাপ-মরা মাইয়া, মান-সম্মান আছে। জোর কইরা সামনে দাঁড়ায় থাকলে নাম খারাপ হয়।”

এটাই ছিল রশেদ সাহেবের পুরোনো হাতিয়ার—কাজের সঙ্গে মুখরক্ষার চাপ বেঁধে ফেলা। যেন রুট চাইলে মেয়েটা লজ্জা হারায়। কিন্তু তাদের কথার মাঝেই পেছন থেকে আরেক ট্রাক ঢুকল। তারপর আরেকটা। চট্টগ্রাম রোডের জ্যাম খুলে একসঙ্গে তিনটে গাড়ি এসে পড়েছে—লাউ, বেগুন, টমেটো। কুলি কম, গলি সরু, আর একটা ভুল ডাক দিলে পুরো টার্ন বসে যাবে। এই নতুন ঢলই সবকিছু একসঙ্গে ধারালো করে দিল।

শামীম সুপারভাইজার তখনই দৌড়ে ঢুকলেন, কাঁধে ফাইলের ব্যাগ, চোখ লাল। “কারা সাত-দুই আটকাইছে?” তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন। রশেদ সাহেব মুখ খুলে কিছু বলার আগেই শামীম টেবিলের রেকর্ড-স্লিপে চোখ বুলিয়ে থামলেন। “রাতের নিশ্চিতকরণ বদলাইছে কে?”

রশেদ সাহেব গলা নামিয়ে, কিন্তু আড়ম্বর না ছেড়ে বললেন, “সকালের প্রয়োজনে আমি—”

“আপনি পারবেন না,” শামীম কেটে দিলেন। “পুরোনো চালান মামলার পর এই ক্ষমতা রাতের কণ্ঠরেকর্ডের সঙ্গে বাঁধা। সাত-দুইয়ের অপারেটর মেহজাবিন। কে টোকেন সরাইছে?”

বাবু জানালার ভেতর কাশল, কিন্তু কিছু বলল না। ওই নীরবতাই যথেষ্ট। হাজেরা খালার চোখ এবার প্রথমবারের মতো রশেদ সাহেবের মুখে গিয়ে স্থির হলো। লোকটার কপালে পাতলা ঘাম বেরোচ্ছে।

চাপ সামলাতে রশেদ সাহেব ক্যাশঘরের সামনে রাখা উঁচু স্টুলে বসে পড়লেন। ওই স্টুলটা যার, জানালার ছাড়ের তাল তাকে ধরতে সুবিধা হয়। তিনি বললেন, “ঠিক আছে, রুট ও পাবে। কিন্তু ক্যাশ ছাড় আমার হাতে থাকবে। হিসাব আমি বসে ছাড়ব।”

মেহজাবিন এগিয়ে গেল। তার হাঁটা দ্রুত না, সোজা। সে স্টুলটার পিঠে হাত রাখল। “এই আসনে বসলে লেনের ছাড়ও আপনার নামে চলে যায়। আজ যাবে না। উঠেন।”

হাজেরা খালা দুই কদম দূরে। মামা খালেদ আর বাবু সামনে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকদের চোখে এখন আর কৌতূহল নেই, ওজন আছে। রশেদ সাহেব উঠলেন না। বললেন, “তুই আমাকে উঠাবি?”

মেহজাবিন স্টুলটা টান দিল। আকস্মিক, দৃশ্যমান। রশেদ সাহেব ভারসাম্য রাখতে গিয়ে হাত জানালার ধারে ঠেকালেন। বসার জায়গা সরে গেল, মর্যাদাটাও। সে স্টুলটা নিজের দিকে টেনে বাবুকে বলল, “জানালার ছাড় সাত-দুই, চার-এক, আর নতুন ঢোকা চট্টগ্রামের গাড়ি—সব আমার ডাক ছাড়া খুলবা না।”

বাবু মাথা নাড়ল। ছোট নড়াচড়া, কিন্তু পুরো ঘর সেটা দেখল।

তারপর ভাঙনটা দ্রুত হলো। নতুন তিন ট্রাকের ড্রাইভার জানালা দিয়ে পারমিট বাড়িয়ে ধরল। মেহজাবিন একটার কোণে সিল দেখে বলল, “চার-এক ডানে। বেগুন নামবে আগে। কুলি দাও দুইজন।” আরেকজনকে, “তোমার গাড়ি অপেক্ষা। কাগজে সময় মিলছে না।” সোহেলের দল ওঁত পেতে ছিল, কিন্তু সে চোখ তুলেই বলল, “তোমরা সাইডে। তোমাদের ছাড় বন্ধ। ফেরত মাল ধরো, না হলে বের হও।”

“এটা অন্যায়!” সোহেল গলা চড়াল।

“যা তোর নামে না, তা তুই ধরবি না,” মেহজাবিন বলল। “ভোরের লাভের লেন আমি চাইনি—আমার নাম কেটে নিয়েছিলে। এখন আমার ডাক ছাড়া এক বস্তাও নামবে না।”

রশেদ সাহেব তখন বুঝলেন, একটুখানি ভাগ দিয়ে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ বাঁচানো যাবে না। তিনি সামনে এসে নিচু গলায় বললেন, “দেখ, এতদূর নিস না। সকালের চাপ কাটুক, পরে বসে কথা বলব। সাত-দুই তুই নে, বাকিটা আগের মতো চলুক।”

মেহজাবিন খাতা খুলে নতুন ঢলের রুট লিখল। “আগের মতো কিছুই চলবে না।”

“আমি বহু বছর এই টার্ন চালাই,” রশেদ সাহেব এবার খোলাখুলি অনুনয়ের সুরে গেলেন, কিন্তু তাতে অহংকারের আঁশ এখনও লেগে। “কমসে কম আমার দলের দুইটা ট্রলি ঢুকতে দাও। মাল নষ্ট হবে।”

সে মাথা না তুলেই বলল, “যে লেন আপনি বন্ধ করেছিলেন, ওই লেন দিয়েই এখন ঢুকতে হলে আমার নাম ধরে বলতে হবে।”

চারদিকের শব্দের মাঝেও কথাটা ছুরি দিয়ে কাটা মতো স্পষ্ট গেল। রশেদ সাহেবের চোয়াল শক্ত হলো। এই প্রথম তিনি নাম ধরে ডাকার আগে থামলেন। থামাটাই তার ক্ষতি। পেছনে ট্রাকের হর্ন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কুলি, পাশে হাজেরা খালা—সব মিলিয়ে তার পুরোনো কর্তৃত্বের গায়ে ফাটল দেখা যাচ্ছিল।

তিনি বললেন, খুব নিচু গলায়, “মেহজাবিন… দুইটা ট্রলি ছাড়ো।”

“কোন লাইনের?” সে এবার চোখ তুলল।

“সাত-দুই।”

“না।” তারপর সে আঙুল ঘুরিয়ে অন্যদিকে দেখাল। “চার-এক খালি হচ্ছে। সেখানে ফেরত মাল যাবে। লাভের লেন না। ওদের ওইখানে পাঠান।”

সোহেলের মুখের রং বদলে গেল। তার দল ঠেলাগাড়ি ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু এবার ঘোরানোটা জয়ের পথে না, কাটা পড়া পথে। একটা ট্রলি বাম্পারে ঠেকে জোরে শব্দ করল। বাবু জানালার ভেতর থেকে প্রথম ছাড়ের টাকা গুনে রাখছিল, কিন্তু রশেদ সাহেবের দলের জন্য কোনো ডাক আসছিল না।

আরেক ঢল এল—সাভার থেকে কাঁচামরিচ, কুমিল্লা থেকে পেঁপে। এখন এককথার অপারেটর না থাকলে পুরো ডিসপ্যাচ বেই বন্ধ। শামীম শুধু একবার বললেন, “মেহজাবিন, টার্ন ধরো।” তারপর আর কারও দিকে তাকালেন না। এই এক বাক্যে সীল পড়ে গেল। মেহজাবিন কণ্ঠ উঁচু করল, “নীল ত্রিপলের গাড়ি আগে। কাঁচামরিচ সোজা বাঁয়ে। চার-এক বন্ধ রাখো যতক্ষণ না আমি বলি। বাবু, সাত-দুইয়ের তৃতীয় ছাড় দাও। রশেদ সাহেবের কাগজ জানালায় নিবা না।”

রশেদ সাহেব এবার জানালার ধারে নিজে কাগজ ঠেলে দিলেন। “এটা আগে ছাড়ো। আমার লোক আছে।”

বাবুর হাত কাগজ ছুঁয়েও তুলল না। সে জানালার ভেতর থেকে বলল, “আপার ডাক লাগে।”

রশেদ সাহেব এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলেন। এই এক সেকেন্ডেই যত অপমান জমে, অনেক চিৎকারেও তত হয় না। তিনি মেহজাবিনের দিকে ফিরলেন। “ছাড় দাও।”

মেহজাবিন তখন নতুন একটা পারমিটে সিল মেলাচ্ছিল। “আপনার দল চার-এক। নগদ ছাড়ও চার-এক খুললে। সাত-দুই বন্ধ।”

“মাল নষ্ট হবে।”

“আমারটাও হচ্ছিল।”

সে পারমিট ফেরত দিল একজন ড্রাইভারকে, তারপর বাবুর দিকে না তাকিয়েই বলল, “সাত-দুই শেষ গাড়ির ছাড় দাও। এরপর জানালা বন্ধ।” বাবু গোনা টাকা ধাতব থালায় রেখে জানালার ঠোঁটে ঠেলে দিল। থালাটা ঘষে ঘষে এগোল। মেহজাবিন শেষবার চোখ বুলিয়ে মাথা নাড়ল। বাবুর ভেতরের হাত থালার কিনারা ছেড়ে দিল। ক্যাশ-জানালার ঠোঁটে মুদ্রাভরা থালাটা এসে থেমে গেল।