Fast Fiction

যে হাত সরিয়েছিল, সেই হাতই ডাকল

“বে তিন খুলে দেন! বরফ গলছে!” কুদ্দুস গেটের দিক থেকে চিৎকার করতেই লোডিং বেয়ের সামনের ট্রাকের লাইন আরেক হাত এগোল, তারপর থেমে গেল। লক ঝুলছে, মোটা দাঁতের মাস্টার চাবি রাশেদের মুঠোয়, আর মেহজাবিনকে সে হাত তুলে থামিয়ে দিল যেন এই ভেজা ভোরও তার বাপের সম্পত্তি।

ঢাকার কাওরান বাজার-ঘেঁষা এই কৃষি সরবরাহের ইয়ার্ডে দেরি মানে টাকা না, মুখও যায়। তিনটা ট্রাকে ফুলকপি আর শিম, একটায় কাঁচা মরিচ; বরফ গলে পানি ঝরছে, কাগজের মোড়কের শুকনো ঘষাঘষি শব্দে বোঝা যায় প্যাকেট বারবার ধরা হচ্ছে। মেহজাবিনের আঙুলে ভাঁজ খোলা-বন্ধ করা রসিদের কাগজ, রাতের হিসাব মিলিয়ে সে জানে কোন ট্রাক আগে ছাড়লে লাইন খুলবে। কিন্তু রাশেদ আজ আবার তাকে ডিসপ্যাচ টেবিল থেকে সরিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, ঠিক অফিসঘরের দরজার সামনে, যেখানে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা থাকা সব লোকের চোখ সহজে পড়ে।

রাশেদ গলাটা চড়াল, “তুমি ওদিকে দাঁড়াও। আজ থেকে বেয়ের রিলিজ আমি দেখব। মালিকের নির্দেশ।”

মেহজাবিন রসিদটা ভাঁজ করল, তারপর সোজা গিয়ে ডিসপ্যাচের উঁচু স্টুলটায় বসল। এক মুহূর্ত। শুধু এক মুহূর্ত। তার হাত রেজিস্টারের ওপর, চোখ দরজার লক আর ট্রাকের মাথা গুনছে। রাশেদ এমনভাবে তাকাল যেন সে সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

“নামো,” সে বলল, এবার নিচু স্বরে, বেশি অপমানকর। “স্টুলে বসার শখ হলে বাড়িতে বসবে। এখানে হিসাব বুঝতে হয়।”

মেহজাবিন উঠে দাঁড়াল, ধীরভাবে। কিন্তু ওঠার সময় রেজিস্টারটা নিজের দিক থেকে তার দিকে ঠেলে না দিয়ে স্টুলের মাঝখানে উল্টো করে রেখে দিল। ছোট্ট কাজ। তবু তানভীর, মালিকের খালাতো ভাই, যে একটু দূরে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, চোখ তুলল। কুদ্দুসও গেট থেকে একবার তাকাল। প্রথম পুরস্কার এতটুকুই—স্টুলে কে বসে, সেটা দেখা হয়ে গেল।

রাশেদ তাড়াহুড়ো করে প্রথম ভুলটা করল দশ মিনিটের মধ্যে। শীতঘরের পাশের সরু লেন ফাঁকা না করেই সে দুই নম্বর ট্রাককে তিন নম্বর বেয়ের সামনে ডাকল। পেছনের গাড়ি আটকে গেল, সামনের প্যালেট নামার জায়গা বন্ধ। মজুরেরা ঠেলাগাড়ি নিয়ে মাঝপথে দাঁড়িয়ে, কেউ কার কথা শুনবে বুঝছে না।

মেহজাবিন বলল, “আগে মরিচের গাড়িটা এক নম্বরে নিন। ফুলকপি দুটো পরে ছাড়ুন। না হলে ঠেলাগাড়ি ঘুরবে না।”

রাশেদ তার কথার মাঝখানে হেসে উঠল, সেই সস্তা হেসে ওঠা, যার মানে—তুমি নারী, তুমি নিচে, চুপ। “তুমি আমাকে শেখাবে? কাগজ মিলিয়েছ, ঠিক আছে। ইয়ার্ড চালানো অন্য জিনিস।”

তানভীর কাপ নামিয়ে ফেলল। পাশের অফিসের ধোঁয়াটে কাঁচে আঙুলের পুরনো দাগ, মুছে আবার লেগে থাকা স্মাজের ভেতর মেহজাবিন নিজের মুখ এক সেকেন্ডের জন্য দেখল—শুষ্ক, শক্ত, কিছুই বোঝা যায় না। রাশেদ সেটা ভুল পড়ল। সে উচ্চস্বরে বলল, “সবাই শুনেন, আমার কথা ছাড়া কোনো গেট খুলবে না। চাবি আমার কাছে।”

এইবার অপমানটা শুধু কাজের ছিল না। কুদ্দুসের ভায়রার ছেলে এখানে মজুর, তানভীর মালিকপক্ষের আত্মীয়, পাশের হিসাবরক্ষক মেহজাবিনের মামার চেনা মানুষ। যে-ধরনের ছোট ব্যবসায় নামের সাথে বাড়ির পথও জোড়া থাকে, সেখানে এভাবে কেটে দেওয়া মানে দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখা।

লাইন মোটা হতে হতে একসময় চিৎকার বদলে গেল হিসাবি আতঙ্কে। মরিচের ট্রাকের চালক কেবিন থেকে নেমে বলল, “আপা, আর দশ মিনিট গেলে বাজারদর পড়ে যাবে।” সে রাশেদের দিকে না, মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে বলল। রাশেদের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

তবু সে দ্বিতীয় ভুলটা করল। “দুই নম্বর বেয়ের রোলার নামাও,” বলে সে এমন একটা দরজা খুলতে গেল যেটার ভেতরে আগের রাতের ফেরত খালি ক্রেট এখনো সরেনি। দরজা অর্ধেক উঠেই আটকে গেল। ভেতর থেকে ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে পচা পাতার গন্ধ বেরোল। বাইরে ট্রাক, ভেতরে জ্যাম, মাঝখানে তার হাতে মাস্টার চাবি—কিন্তু কোনো চলন নেই।

কুদ্দুস এবার আর চিৎকার করল না, দৌড়ে এল। “রাশেদ ভাই, পাঁচটা বাজতে চলল। ফজরের পরেই দ্বিতীয় লট ঢুকবে।”

রাশেদ চাবির গোছা ঝাঁকাল, ভুল তালায় ভুল দাঁত বসাল। ধাতব খটখট শব্দে মেহজাবিনের মাথা গরম হলো না; বরং ঠান্ডা হলো। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “চাবিটা দিন।”

“পিছিয়ে যান।”

“চাবিটা দিন। না দিলে তিন মিনিট পরে পুরো লেন বন্ধ।”

রাশেদ এবার হাত উঁচু করল, যেন তাকে ছুঁয়ে সরিয়ে দেবে। ঠিক তখনই পেছনের ট্রাকের হর্ন লম্বা টান দিল, আর এক মজুর চিৎকার করল, “বরফের বাক্স ভাসতেছে!”

মেহজাবিন অপেক্ষা করল না। সে পাশ কাটিয়ে ঠেলাগাড়ির উপর রাখা লোহার হুক টেনে নিল, আটকে থাকা রোলারের নিচে গুঁজে এক ঝাঁকুনি দিল। “জসিম, খালি ক্রেট ডানে। সোহেল, মরিচের গাড়ি এক নম্বরে ব্যাক নাও। কুদ্দুস চাচা, এক মিনিটের জন্য গেটের ডান পাশ বন্ধ রাখেন। ওই নীল ট্রাক ঢুকবে না।”

রাশেদ চেঁচাল, “কেউ নড়বা না!”

কেউ নড়ল না—তার কথায় না। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড। তারপর জসিম খালি ক্রেট টেনে সরাল। সোহেল দৌড়ে গেল চালকের দিকে। কুদ্দুস গেটের শিক টেনে অর্ধেক নামিয়ে দিল। যেটা এতক্ষণ আদেশে হচ্ছিল না, সেটাই কাজের তাড়নায় হয়ে গেল।

মেহজাবিন হাত বাড়িয়ে রাশেদের কবজির কাছ থেকে চাবির গোছা কেড়ে নিল। পুরোটা না—প্রথমে শুধু তিন নম্বর বেয়ের চাবিটা দাঁত দেখে টেনে আলাদা করল, তারপর ঠক করে তালায় বসাল। দরজা খুলে উঠতেই সে পেছনে না তাকিয়ে বলল, “দুই নম্বর বন্ধ। ওখানে ফেরত ক্রেট। তিন নম্বর দিয়ে ফুলকপি নামবে, এক নম্বরে মরিচ ছাড়ো। উল্টো করলে সব পচবে।”

চলন ফিরে আসার শব্দ খুব আলাদা। ঠেলাগাড়ির চাকা কাঁপতে কাঁপতে চলল, প্যালেটের কাঠ ঘষল, চালকেরা গালি বন্ধ করে গিয়ার পাল্টাল। পাঁচ মিনিট আগে যে ইয়ার্ডে শুধু রাশেদের গলার জোর ছিল, সেখানে এখন দিকনির্দেশের শব্দ ছোট, কাটাকাটা, কার্যকর। “ওইটা আগে।” “ডানে।” “থামেন।” “এখন।”

রাশেদ প্রথমে হুমকি দিল। “চাবি ফেরত দাও, নইলে—”

তার “নইলে” শেষ হলো না। কারণ তখন মরিচের ট্রাক ঢুকে গেছে, বরফের পানি আর গাড়ির নিচে জমছে না; ফুলকপির প্যালেট নামছে; লাইন ভাঙছে। তানভীর ফোন কানে দিয়েও কথা বলছে না, শুধু তাকিয়ে আছে। রাশেদের হাতে এখন কেবল খালি হাওয়া আর তার নিজের কণ্ঠ, যেটা কাজে লাগছে না।

মেহজাবিন রেজিস্টার টেনে নিল ডিসপ্যাচ টেবিলে। “কুদ্দুস চাচা, গেট স্লিপ আগে মরিচের। তারপর দুইটা ফুলকপি। চালকদের নাম ডাকি, কেউ চেঁচাবেন না।” কাগজের পাতায় কলম চলল দ্রুত। সে রসিদের অর্ধভাঁজ করা কাগজ খুলে নম্বর মিলিয়ে বলল, “খুলনা-৪৩২১ আগে। চট্টগ্রাম-৮৮১৫ পরে। মাঝখানে কেউ ঢুকবে না।”

এবার লোকজন তার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে হঠাৎ নতুন কিছু হয়ে যায়নি; বরং তারা দেরিতে বুঝেছে পুরোনো ঠিক জায়গাটাই কোথায়। দুইজন চালক রাশেদের পাশ কাটিয়ে সোজা টেবিলের কাছে এল। এক মজুর জিজ্ঞেস করল, “আপা, খালি ক্যারেট কোন পাশে?” রাশেদ একই সময়ে বলল, “আমি বলছি—” কিন্তু ছেলেটা তার দিকে তাকালও না।

এখানেই তার মুখ হারানো শুরু। তানভীর কাছে এসে খুব নিচু স্বরে রাশেদকে বলল, “মামা পথে আছে।” কথাটা ছোট, কিন্তু ধারালো। রাশেদের কপালে ঘাম উঠল, যদিও ভোর এখনো ঠাণ্ডা। সে হঠাৎ গলার স্বর পাল্টে মেহজাবিনকে বলল, “ঠিক আছে, তুমি সাময়িক দেখো। পরে হিসাব হবে।”

মেহজাবিন চোখও তুলল না। “এক নম্বর শেষ হলে চার নম্বরের পাট খোলো। তিন নম্বরে খালি জায়গা রেখো।”

মালিক হাশেম সাহেব এলেন তখন, স্যান্ডেলের ফিতে ভিজে, পাঞ্জাবির নিচে দ্রুত হাঁটার রাগ নিয়ে। তিনি লেনের মাথায় দাঁড়িয়ে প্রথমে ট্রাকের লাইন দেখলেন, তারপর খোলা তিন নম্বর বেয়েতে কাজের গতি, তারপর অফিসঘরের সামনে রাশেদ আর মেহজাবিনকে। প্রশ্ন করার দরকার পড়ল না; দৃশ্য নিজেই জবাব দিচ্ছিল।

রাশেদ আগে এগিয়ে গেল। “স্যার, ছোট একটা গণ্ডগোল ছিল। আমি সামলে—”

হাশেম সাহেব হাত তুলেই তাকে থামালেন। তার চোখ গেল মেহজাবিনের হাতে ধরা চাবির অংশে, তারপর রেজিস্টারে, তারপর যে ট্রাকগুলো ঠিক ক্রমে নড়ছে সেখানে। দূরে আরেকটা গাড়ি লাইন ধরেছে; ক্ষতি এখনো থামেনি, কিন্তু জমা পড়া ক্ষতির গলা চেপে ধরা গেছে।

রাশেদ মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টাটা করল। “স্যার, মেয়েরা এই ভোরে ইয়ার্ড—মানে, কথা তো উঠবেই। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে—”

হাশেম সাহেব এবার তার দিকে পুরো ঘুরলেন। “কথা তো উঠছেই,” তিনি বললেন, শান্ত স্বরে। “কিন্তু কাজের কথা উঠছে না তোমার নামে।”

এই আঘাতটা সামনে দাঁড়ানো সবার জন্য যথেষ্ট ছিল না, তাই পরেরটা এল আরও খোলাখুলি। তিনি রাশেদের হাত বাড়ানো দেখে নিজের পকেট থেকে চাবির লেদারের ট্যাগ বের করলেন—মাস্টার সেটের বাকি অংশ, যেটা রাতে অফিসে থাকে। রাশেদের দিকে না দিয়ে তিনি সোজা মেহজাবিনের টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। “আজ থেকে ভোরের রিলিজ তুমি দেখবা,” বললেন তিনি। “মাস্টার চাবি তোমার কাছে থাকবে, শিফট শেষে ক্যাবিনেটে জমা দিবা।”

রাশেদের মুখের রঙ ঠিক তখন বদলাল। প্রথমে লাল, তারপর ফ্যাকাসে। “স্যার, আমার মানে—সবার সামনে?”

“সবার সামনেই তো সমস্যা করছ।”

হাশেম সাহেব চাবির গোছাটা মেহজাবিনের হাতে দিলেন। ভারী ধাতুর ঠাণ্ডা ওজন তার তালুতে বসতেই পাশে দাঁড়ানো কুদ্দুস সরল ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, “আপা, চার নম্বর এখন খুলব?” প্রশ্নটা আসলে সিদ্ধান্তের সীল।

মেহজাবিন চাবি কোমরে ঝুলিয়ে নিল না; হাতে রেখেই বলল, “চার নম্বর না। আগে এক নম্বরের খালি প্যালেট বের করো। জসিম, পথ ফাঁকা। কুদ্দুস চাচা, পরের গাড়ি ঢোকান।” তারপর সে রাশেদের পাশ দিয়ে এমনভাবে হেঁটে গেল যেন মাঝখানের ফাঁকটা সবসময়ই তার ছিল।

রাশেদ আবার কিছু বলতে চাইল। শব্দ বেরোল, জোর বেরোল না। তানভীর এবার তার দিকে না তাকিয়ে চালকদের নাম ডাকার তালিকা মেহজাবিনের কাছে বাড়িয়ে দিল। কর্মচারীরা কার নির্দেশ শুনছে, চালকেরা কার চোখের ইশারা ধরছে, গেট কোন কণ্ঠে উঠছে-নামছে—ইয়ার্ডের সবকিছু একসাথে উত্তর দিল। রাশেদের কর্তৃত্ব কাগজে থাকলেও মেঝেতে আর ছিল না।

পরের চল্লিশ মিনিট সে-ই সময়ের মতো কেটে গেল—টেনে, ঠেলে, হিসাব মিলিয়ে। মেহজাবিন এক বেয়ে থেকে আরেক বেয়েতে ঘুরল; কোথাও কাঁচা মরিচ আগে, কোথাও নরম টমেটো ছায়ায়, কোথাও ফেরত খালি ক্রেট সরিয়ে পথ খোলা। কেউ তার দিকে তাকিয়ে অনুমতি চাইলে সে এক শব্দে উত্তর দিল, আর কাজ হয়ে গেল। রাশেদ দু-একবার কথা বলতে ঢুকেছিল, কিন্তু মজুরেরা তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই মেহজাবিনের দিকে তাকিয়েছে। এইটাই সবচেয়ে কষ্টের: সরাসরি অপমান না, অকার্যকর হয়ে যাওয়া।

সূর্য উঠতে না উঠতেই প্রথম জমা লাইন ভেঙে গেল। শেষ ফুলকপির প্যালেট নামার পর হাশেম সাহেব আর দাঁড়ালেন না; তিনি শুধু অফিসঘরের দরজায় একবার দেখে ভেতরে গেলেন। সেখানে দেয়ালে লোহার ছোট কী-ক্যাবিনেট, কাচে চুনের দাগ, নিচে পুরনো হিসাবের ধুলো। শিফট নামতেই মেহজাবিন ভেজা হাত ওড়নায় মুছে, মাস্টার চাবির গোছাটা তুলে সেই ক্যাবিনেটের ফাঁকে ঝুলিয়ে দিল। ধাতু একবার, দু’বার ঠোকাঠুকি করে দুলল। তারপর শব্দ থেমে গেল।