Fast Fiction

আমার জন্য পাতা টোপে ও-ই ধরা

টোকেনটা মেহরিনের আঙুলে ছুঁইছুঁই করেই কাউন্টারের মেয়ে হাত গুটিয়ে নিল। “এইটা না,” সে মাথা তুলে পেছনের দিকে তাকাল, “রাশেদা আপার নির্দেশ আছে। আপনি সাইডে দাঁড়ান।”

মেহরিনের হাতে প্লাস্টিকের পুরোনো খাবারের বক্স। ভেতরের ভাত ঠান্ডা হয়ে দলা পাকিয়ে আছে; সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। বক্সটা সে কাউন্টারের ধাতব ধার ঘেঁষে রাখতেই পেছনের লাইন ঘাড় লম্বা করল। কৃষি ঋণের পুনঃনিবন্ধনের লাইন, কিন্তু এখানে টাকা আর সইয়ের চেয়ে বড় জিনিস ছিল কে কাকে কী নামে ডাকে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন ফিসফিস করল, “ওই যে সজীবদের খালাতো বোন না?” আরেকজন বলল, “হ, যারে গতবারও ফিরাইয়া দিছিল।”

গতবারের ওই ফিরিয়ে দেওয়া একদিনেই শেষ হয়নি। ঢাকা থেকে ফিরে উপহাস, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা ভরা টেবিলে নিচু চোখে বসা, আর মামাবাড়ির সামনে দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবিটা ট্রেতে রেখে আসা—সব একসঙ্গে জুটেছিল। আজ সে ইচ্ছে করেই আগে এসেছে, লাইনের প্রথম ভাগে। তবু রাশেদা ভাবি আগে থেকেই এসে দাঁড়িয়ে আছে, কাঁচা সোনালি কাজের ওড়না গায়ে, যেন এই কাউন্টার তার শ্বশুরবাড়ির বারান্দা।

“সাইডে দাঁড়াতে বলছি তো,” রাশেদা ভাবি এবার নিজেই বলল। “কাগজ অসম্পূর্ণ। আগে যাদের ফাইল ঠিক, তাদের হবে। তুমি পরে দেখো।”

মেহরিন মাথা না তুলেই বলল, “অসম্পূর্ণ কোনটা?”

রাশেদা ভাবি হাসল, সেই প্রকাশ্য, পাতলা হাসি। “সব কথা লাইনের সামনে বলা যায় না। নিজের অবস্থান বুঝতে হয়। আত্মীয়ের নাম থাকলেই আগে হওয়া যায় না।”

এই এক চুল বাড়তি কথাটাই লাইনে ছড়িয়ে গেল। কাউন্টারের কর্মচারী ইতস্তত করে রেজিস্টারের ওপর একটা হলুদ স্লিপ রাখল। ওপরের দিকে লাল কলমে লেখা—অস্থায়ী স্থগিত। নিচে মোটা হাতে সই: রাশেদা আক্তার। স্লিপটা এমনভাবে রাখা হলো, যেন সবার চোখে পড়ে। রাশেদা ভাবি আঙুল ঠুকে বলল, “নিয়ম আছে। স্থগিত না দিলে পরে ঝামেলা আমার ঘাড়ে আসে।”

পেছন থেকে সজীবের গলা এল, সে লাইন ভেঙে একপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। “ভাবি, ফাইলটা তো আমি গত রাতে মিলায়া দিছি। খালাম্মার জমির খতিয়ানও—”

“তুমি চুপ,” রাশেদা ভাবি তাকে থামিয়ে দিল। “ছেলেপেলে জানে না, বড়রা জানে। আর মেয়েদের কাজের ব্যাপারে ঢুকবি না।” তারপর এমনভাবে কাউন্টারের মেয়েকে বলল যেন ঘরের কাজের লোককে আদেশ দিচ্ছে, “হোল্ড ট্রেতে রাখো।”

হোল্ড ট্রে কাউন্টারের বাম পাশে, যেখানে ভুল কাগজ, ফেরত আসা টোকেন, আর দেরিতে জমা দেওয়া প্রবেশকার্ড পড়ে থাকে। মেহরিন দেখল, তার নীল টোকেনটা সেই ট্রেতে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। দেরিতে ফেরত দেওয়া পুরোনো চাবির মতো শব্দ হলো—টিক।

সে এবার মুখ তুলল। “আমার ফাইল আপনি ধরেননি, তারপরও স্থগিত?”

“আমি দেখলেই বুঝি,” রাশেদা ভাবি বলল। “আমার স্বামীর ইউনিয়নের নাম শুনে এখানে অনেকে সুবিধা নিতে আসে। সবাইকে জায়গা দেওয়া যায় না।”

পেছনের লাইনে দাঁড়ানো বয়স্ক এক কৃষক গামছা কাঁধে নামিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তার চোখে কৌতূহল নয়, হিসাব। কার ফাইল আগে হলে তার দুপুরের ফেরি মিস হবে না—এইটুকু। দৃশ্যটা যত লম্বা হয়, তত তার ক্ষতি। এই ছোট স্বার্থটাই ঘরের বাতাসকে ধারালো করে রেখেছিল।

মেহরিন ব্যাগ থেকে কাগজ বের করল না। সে শুধু বলল, “তাহলে নিয়ম মেনেই করেন। কাউন্টারের সামনে করেন।”

রাশেদা ভাবি সেটা অপমান ভেবে নিল। “কাউন্টারের সামনে? খুব দরকার?” সে সুপারভাইজার ইমতিয়াজকে ডেকে নিল। লোকটা ভেতরের অর্ধেক-খোলা দরজায় এক মুহূর্ত থেমে ছিল; দরজার ফাঁকে কাঁধ, চোখে বিরক্তি—কাজ জমে যাচ্ছে। রাশেদা ভাবি তার দিকে ফিরেই গলায় মিঠে ভাব আনল, “ইমতিয়াজ ভাই, এই ফাইলটা শুধু হোল্ড না। রিরাউট দিন। বাইরে যাচাই ডেস্কে পাঠান। এখানে লাইনের কাজ থামবে।”

ইমতিয়াজ বলল, “যাচাই ডেস্ক তো আজ নিচতলায়—”

“তাহলে সেখানেই যাক।” রাশেদা ভাবি কাউন্টারের কালো কালি-দাগ ধরা কলমটা তুলে নিল। কলমের গায়ে পুরোনো দাঁতের দাগ। সে হলুদ স্লিপের নিচে আরেকটা ঘর টেনে লিখল—বহির্গমন যাচাই, ড্রপঅফ রুট। তারপর সই করে তারিখ বসাল। হাতের এক টানে, সবাইকে দেখিয়ে। “এখন সমস্যা নাই। এখানে না, ওখানে যাক।”

কাউন্টারের মেয়ে একবার মেহরিনের দিকে তাকাল, একবার স্লিপের দিকে। এই নতুন দাগটাই ছিল ফাঁদের বাড়তি পাক। এখানে প্রসেস হবে না, বাইরে ঘুরবে, আবার ফিরতে ফিরতে দুপুর পার। লাইন দেখে নেবে—ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মেহরিন ঠান্ডা গলায় বলল, “আরেকটা দাগ দেন। লিখেন—কাউন্টারে গ্রহণ অযোগ্য।”

রাশেদা ভাবি ভ্রু তুলল। “তুমি আমাকে শিখাইবা?”

“আপনি তো বললেন আমার কাগজ নেবেনই না। সেটা লিখে দেন।”

ইমতিয়াজ কুঁকড়ে উঠল। লিখে দিলে দায় স্পষ্ট হয়—সে জানে। কিন্তু রাশেদা ভাবি তখন লাইনের সামনে নিজের কর্তৃত্বে ফুলে আছে। “লিখে দিচ্ছি।” সে আরও নিচে লিখল—সামনের কাউন্টারে গ্রহণ নয়। আবার সই। এবার স্লিপটা সে আঙুলে ঠেলে এমনভাবে মাঝখানে রাখল যেন রায় পড়ে শোনানো হয়েছে।

মেহরিন ওই সইয়ের দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাস নিল। তারপর ব্যাগ থেকে ছোট মোবাইলটা বের করে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটি নম্বরে চাপ দিল। “স্যার, আমি মেহরিন। আপনি বলেছিলেন, সরাসরি সমস্যা হলে একবার জানাতে। আমি এখন শ্যামপুর কৃষি ঋণ সেবা-কাউন্টারে। আমার রেজিস্টার নম্বর এক-চার-নয়-এফ। লাইভ রিরাউট হয়েছে। আপনি চাইলে ট্রেসটা এখনই দেখতে পাবেন।”

রাশেদা ভাবি ঠোঁট বাঁকাল। “কাকে ফোন দিচ্ছ? নাটক কোরো না।”

ওপাশের মানুষটা এত জোরে কথা বলল না যে লাইন শুনতে পায়, কিন্তু মেহরিন শুধু একবার বলল, “জি, এখনই।” তারপর ফোনটা কাউন্টারের ওপরে রাখল, স্পিকার চালু না করেই। ইমতিয়াজের নিজের ফোন কেঁপে উঠল। স্ক্রিন দেখে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি রিসিভ করল, “জী স্যার… জী, এখনই খুলছি।”

রাশেদা ভাবির গলায় এবার প্রথম খসখসে ভাব এল। “কোন স্যার?”

ইমতিয়াজ উত্তর দিল না। সে কাউন্টারের ভেতরের টার্মিনাল ঘুরিয়ে নিজের দিকে আনল, লগ খুলল, তারপর হলুদ স্লিপের নম্বর বসাল। স্ক্রিনের আলো তার চোখে পড়ে কাঁচের মতো হয়ে উঠল। “স্যার, এখানে… জী… হ্যাঁ, দ্বৈত চিহ্ন আছে। প্রথমে স্থগিত, পরে বহির্গমন যাচাই… জী… এবং ‘সামনের কাউন্টারে গ্রহণ নয়’… জী, হাতে সই করা।”

পেছনের লাইনে গুঞ্জন আর উঠল না; বরং যারা ভালো শুনতে চায় তারা চুপ হয়ে গেল। ইমতিয়াজের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে কীবোর্ডে আরেকবার চাপল। “ট্রেস দেখাচ্ছে, আবেদনকারী মেহরিন সুলতানা—ফিল্ড যাচাই সম্পন্ন, পুনঃপ্রবেশ অনুমোদিত, অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত। কেন্দ্রীয় অনুমোদন আজ সকাল আটটা আটান্ন।”

রাশেদা ভাবি এবার এগিয়ে এসে বলল, “কিন্তু আমি তো—”

ওপাশে কী বলা হলো, কেউ শুনল না। শুধু ইমতিয়াজের মুখের রং বদলে গেল। “জী স্যার। এখনই। লিখিত ট্রেস সংরক্ষণ করছি।”

মেহরিন তখনো কারও দিকে তাকাল না। তার কণ্ঠে বিন্দুমাত্র উঁচু স্বর নেই। “আমার ফাইল নিন। আর যিনি অনুমোদিত নথিতে লাইভ রিরাউট সই করেছেন, তার হাত থেকে হ্যান্ডলিং অধিকার সরিয়ে দিন। বাকিটা নিয়মে করুন।”

এই এক বাক্যেই ঘরের ভার সরল। ইমতিয়াজ সোজা হয়ে দাঁড়াল। “রাশেদা আপা, আপনি একপাশে আসেন।” সম্বোধন বদলে গেছে; একটু আগের মিঠে ঘনিষ্ঠতা নেই। “এই ট্রে, এই রেজিস্টার—আপনার ছোঁয়া বন্ধ। নুসরাত, মেহরিন আপার ফাইল সামনে আনো।”

হোল্ড ট্রে থেকে নীল টোকেন তুলে আনা হলো। মেহরিনের সামনে নতুন সাদা স্লিপ রাখা হলো—প্রক্রিয়াধীন। কাউন্টারের মেয়ে এবার তাকে ‘আপা’ বলল, “জাতীয় পরিচয়পত্রটা দিন।” একই কাউন্টারে, একই চোখের সামনে, কেবল সম্বোধন বদলাল না; কে কাজ পাবে আর কে থামবে সেটা বদলে গেল।

রাশেদা ভাবি হাত বাড়িয়ে স্লিপ ধরতে গেল। “এক মিনিট, এটা ভুল—”

ইমতিয়াজ হাত তুলে থামাল। “না। আপনি এখন কোনো ফাইল ধরবেন না। কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে, আপনার সই-করা রিরাউট লগ করা থাকবে। তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত আপনি শুধু অপেক্ষা করবেন।”

ওই বয়স্ক কৃষক, যে এতক্ষণ দুপুরের ফেরির কথা ভাবছিল, নিজের টোকেন বুকের কাছে চেপে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে হাসি নেই, কিন্তু চোখে পড়ল হিসাব বদলে গেছে। পেছনের এক নারী আবেদনকারী ওড়না টেনে নিল; একটু আগে যে কৌতূহল ছিল, এখন সেটা সাবধান দূরত্ব। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা যাকে দিয়ে অপমান করানো যায়, তাকে দিয়েই আবার নিজের মুখও পুড়তে পারে—ঘর এতটুকু বুঝে ফেলেছে।

ইমতিয়াজ হলুদ স্লিপটা কাউন্টার থেকে সরিয়ে স্বচ্ছ খামে ভরল। খামের মুখ সিল করতে করতে বলল, “লাইভ রিরাউটের পর কেন্দ্রীয় ট্রেস মিলেছে। সামনের কাউন্টারে গ্রহণ অযোগ্য লেখা বাতিল। মেহরিন সুলতানার নিবন্ধন এখনই হবে।” তারপর লাইনের সামনে স্পষ্ট করে ডাকল, “মেহরিন সুলতানা।”

রাশেদা ভাবির মুখ শুকিয়ে কাগজের মতো হয়ে গেল। “আমি সজীবদের বড় ভাবি। আমাকে এভাবে—”

“এখানে আত্মীয়তার ডাক লাগবে না,” ইমতিয়াজ কেটে দিল। “এখানে রেকর্ড লাগবে।”

মেহরিন কাগজ এগিয়ে দিল। জমির খতিয়ান, পুনঃপ্রবেশ অনুমোদন, পরিচয়পত্র—সব একে একে স্ক্যান হলো। সিল পড়ল। রেজিস্টার তার দিকে সরিয়ে দেওয়া হলো সইয়ের জন্য। কলম ধরতেই সে পুরোনো কালি-দাগের খোঁচা আঙুলে টের পেল, ঠিক সেই দাগ যেটা দিয়ে রাশেদা ভাবি তার পথ ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল। মেহরিন নিজের সই টানল একবারেই। তারপর কলমটা রেজিস্টারের ওপর না রেখে, ইমতিয়াজের দিকে ফিরিয়ে দিল।

“ড্রপঅফ কপি কোন পথে?” সে জিজ্ঞেস করল।

ইমতিয়াজ বলল, “সার্ভিস এক্সিটের পাশের মোড় ঘুরে বাঁ দিকে। তবে আপনার জন্য ভেতরের সরাসরি পথ খোলা থাকবে।”

মেহরিন মাথা নেড়ে বলল, “রেজিস্টারে যেটা খোলা, আমি সেই পথেই যাব।” তারপর খাবারের ঠান্ডা বক্সটা তুলে নিল, কাউন্টারের কোণায় অনেকক্ষণ পড়ে থাকা দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবিটার পাশে এক মুহূর্ত চোখ রাখল, এবং সাদা স্লিপ ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে হাঁটা দিল।

সার্ভিস এক্সিটের পাশের ড্রপঅফ মোড়ে পৌঁছে সে কাগজ দেখিয়ে ভেতরের কর্মচারীকে পাশ কাটাল। পেছন থেকে তড়িঘড়ি পায়ের শব্দ এল—রাশেদা ভাবি নিশ্চয়ই শর্টকাট ধরে সামনে কাটিয়ে উঠতে চাইছে, যে রুটটা সে নিজের হাতে স্লিপে এঁকে দিয়েছিল। মেহরিন আর পেছনে ফিরল না। মোড় ঘুরতেই কালো বলার্ড দুটির মাঝের চেনটা হঠাৎ টান টান হয়ে উঠে তার পেছনের শর্টকাট আড়াআড়ি বন্ধ করে দিল।