যাকে বাদ দিতে চেয়েছিল সবাই
লিফটের সামনে হাত তুলে রাশেদ স্যার বললেন, “মেহরাব, দাঁড়াও। তুমি না। আরিফ যাবে আগে।” আরিফের গলায় নতুন ঝোলানো পরিচয়কার্ড, হাতে কাগজে মোড়া অতিথি-প্যাকেট, তবু তার কপালে এমন ঘাম যে মোড়কের শুকনো কাগজ কচকচ শব্দ করছে। মেহরাব এক পা এগিয়েও থেমে গেল। পেছনে কৃষি-রপ্তানি গ্রুপের কর্মীরা, দুই বিদেশি ক্রেতার দোভাষী, আর এক পাশে নাসরিন খালা—যিনি গত শুক্রবার মেহরাবের মায়ের সঙ্গে বসে সাবিহার কথা তুলেছিলেন—সবাই দেখল, কম জানা লোকটাকে ভেতরে তোলা হলো, কাজটা করা লোকটাকে প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণও দেওয়া হলো না।
ঢাকার সকাল মানে ভিড়, ধাতব দরজায় প্রতিফলিত মুখ, আর সময়ের দমচাপা হিসাব। আজ তার চেয়েও বেশি কষ্টকর ছিল এই দাঁড় করিয়ে রাখা। রাত অবধি গুদামের হিসাব মিলিয়ে, ভোরে নারায়ণগঞ্জের লঞ্চঘাট থেকে নথি নিয়ে এসে, শার্টের হাতায় এখনো ভাঁজের শক্ত রেখা। সেই নথিগুলোই আজ দশতলার উপস্থাপনার আসল ভরসা। তবু লিফটের সামনে তাকে এমনভাবে আটকে রাখা হচ্ছে, যেন সে ভেতরের বাতাসও নষ্ট করবে।
মেহরাব শান্ত গলায় বলল, “আরিফ নমুনার তৃতীয় চালান দেখেইনি।” রাশেদ স্যার চোখ না তুলেই বললেন, “দেখার দরকারও নেই। উপরে কথা বলতে হয় পরিচয় নিয়ে, মাঠে নেমে বস্তা গোনা নিয়ে না।” তারপর একটু জোরে, যেন আশপাশের সবার শোনার জন্য, “কাজ কে করেছে, সেটা এক জিনিস। কক্ষে কার দাঁড়ানো মানায়, সেটা আরেক জিনিস।” নাসরিন খালা ওড়নার কিনারা চেপে ধরলেন। পাশেই সাবিহা, প্রশাসন শাখা থেকে নামা, হাতে ফাইল। সে মুখ তুলল না, কিন্তু মেহরাব দেখল তার আঙুল কাগজের ধারে থেমে গেছে।
প্রথম লিফট এসে খুলতেই রাশেদ স্যার আরিফকে কাঁধে হাত দিয়ে ভেতরে তুললেন। “এই যে, আমাদের প্রস্তুতি যার হাতে।” আরিফ ভেতরে ঢুকে ফ্যালফ্যাল করে বলল, “স্যার, ওই... ওই কোডটা?” রাশেদ স্যার ঠোঁট চেপে তাকে থামিয়ে দিলেন। “উপরে গিয়ে বলব।” দরজা বন্ধ হওয়ার আগে মেহরাব শুধু একবার বলল, “উপরে গিয়ে বলার সময় থাকবে না।” এই এক লাইনে আশপাশে ছোট্ট একটা ফাটল পড়ল। দোভাষী ছেলেটা ভুরু তুলল, সাবিহা এবার সরাসরি তাকাল, আর নিরাপত্তারক্ষী বুড়ো লোকটা রাশেদের পেছনের শূন্য জায়গার দিকে এমনভাবে চাইল, যেন কথাটা গায়ে লেগেছে।
পরের লিফট আসতে দেরি হলো। ততক্ষণে দশতলা থেকে একজন অফিস-সহকারী হন্তদন্ত হয়ে নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “স্যার, ক্রেতা-পক্ষের লগইন আটকে গেছে। নমুনার উৎস-নথি মিলছে না। তারা লাইভ ট্রেস চেয়েছে। আরিফ ভাই...” ছেলেটা থেমে গেল, কারণ আরিফ তো ওপরে, কিন্তু সোজা উত্তর নিয়ে কেউ নিচে নেই।
রাশেদ স্যার গলা শক্ত করলেন। “এইটুকু জিনিসও সামলাতে পারে না? বলো অপেক্ষা করুক।” সহকারী মাথা নাড়ল, “অপেক্ষা করতেছে না স্যার। ওরা বলছে, পাঁচ মিনিটে উৎস-ব্যাচ, নদীপথের গ্রহণ-সময় আর শুকানোর ঘরের রেকর্ড না মিললে আজকের বৈঠক বন্ধ।” কথাটা লবির মাঝখানে ছড়িয়ে পড়তেই যারা একটু আগে মুখ টিপে হাসছিল, তারাও সরে এসে কান পাতল। এই কৃষি-রপ্তানির চুক্তি ভেস্তে গেলে শুধু উপস্থাপনা না, অর্ধেক বছরের কাজ ডুবে যাবে।
রাশেদ স্যার এবার মেহরাবের দিকে তাকালেন বটে, কিন্তু সেই তাকানোতেও আদেশের বদলে অবজ্ঞাই বেশি। “তুমি চুপচাপ থাকো। বড়দের কথায় মাথা ঢোকানোর দরকার নেই।” মেহরাব সামনে এগিয়ে এল। তার হাতে বাদামী খামে মোড়া নথির কাগজ খসখস করে উঠল। সে খুব জোরে নয়, খুব আস্তেও নয়, এমন স্বরে বলল যে লিফটের সামনে দাঁড়ানো সবাই শুনতে পেল, “স্যার, আপনি যেহেতু আরিফ ভাইকে ‘প্রস্তুতির’ লোক বলে ওপরে পাঠালেন, একটা জিনিস বলেন—তৃতীয় চালানের নদীপথে গ্রহণ-সময় কোন রেজিস্টারে মেলাবেন? গুদাম-লগ, নাকি শুকানোর ঘরের সিল-খাতা?”
শব্দগুলো কাঁচের দেয়ালে ঠুকে ফিরে এল। রাশেদ স্যারের মুখ এক মুহূর্ত ফাঁকা হয়ে গেল। তিনি বললেন, “এইসব খুঁটিনাটি এখন—” মেহরাব কেটে দিল, “কোনটা?” সেটাই ছিল ফিরিয়ে দেওয়া প্রশ্ন। একটাই। ধারালো। রাশেদ স্যার এবার উত্তর দিলেন না; দিলেন ভঙ্গি। টাই সোজা করলেন, সহকারীকে তাকালেন, যেন অন্য কাউকে দোষী বানানো যায় কি না ভাবছেন। কিন্তু সহকারী চোখ নামিয়ে ফেলেছে। নাসরিন খালার মুখ শক্ত। সাবিহা এবার এক কদম এগিয়ে এসে শুধু বলল, “তৃতীয় চালানের শুকানোর ঘরের সিল-খাতা তো মেহরাবই এনেছে।”
লিফট এসে খুলল। ভেতরে ঢোকার আগেই রাশেদ স্যার বললেন, “চলো, তাহলে ওঠো। গিয়ে দেখাও।” মেহরাব ভেতরে ঢুকে দেয়ালের স্টিলের রেল ধরল। সে কারও মুখে আর তাকাল না। কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার আগে নিরাপত্তারক্ষীটা আরিফের জন্য ঝোলানো অস্থায়ী প্রবেশ-ফিতে খুলে মুঠোয় পেচিয়ে নিল—ছোট, কিন্তু চোখে পড়ার মতো বদল।
দশতলায় নেমেই ঝাঁকুনি। কাঁচঘেরা অপেক্ষাকক্ষে ক্রেতা-পক্ষের দুজন, দোভাষী, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সামিউল হক, আর সামনে বড় পর্দায় থেমে থাকা ট্রেসিং-তালিকা। প্রথম সারিতে নাম লেখা একটি গদিযুক্ত চেয়ার: “রাশেদ রহমান, সমন্বয়ক।” চেয়ারটা ফাঁকা, কিন্তু তার সামনে বোতলজাত পানি, ফোল্ডার, কলম সাজানো। মেহরাবের বুকের ভেতর কিছুই কাঁপল না; বরং লবির অপমানটা এখন কাজে পরিণত হয়েছে।
আরিফ পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে আটকে গেছে। “স্যার, এই ব্যাচ নাম্বারটা... একটার সাথে আরেকটা...” ক্রেতা-পক্ষের একজন কড়া স্বরে বললেন, “আপনারা উৎস বলতে পারছেন না। তাহলে আমরা কাকে বিশ্বাস করব?” রাশেদ স্যার ঢুকেই গলা তুললেন, “ছোটখাটো গরমিল। ঠিক হয়ে যাবে।” সামিউল হক চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। “গরমিল? আজ সকালের এই স্লটের জন্য আমি মালয়েশিয়া দিকের দলকে সময় ধরে রেখেছি। কে উত্তর দেবে?”
মেহরাব আরিফের পাশ কাটিয়ে সামনে গেল। রাশেদ স্যার হাত বাড়িয়ে তাকে থামাতে চাইলেন। “তুমি পেছনে থাকো।” মেহরাব সেই হাতের দিকে তাকিয়েও দেখল না। সে খাম খুলে তিনটি কাগজ বের করল—গুদাম-গ্রহণ, শুকানোর ঘরের সিল-খাতা, নদীপথে ওঠানামার সময়-নথি। কাগজ খোলার শুকনো শব্দে ঘরের বাতাস কেটে গেল। “তৃতীয় চালান,” সে বলল, “দুইটা রেজিস্টারে নয়, তিনটায় মিলবে। কারণ ওইদিন বৃষ্টির জন্য শুকানোর ঘর বদলানো হয়েছিল। পুরোনো ব্যাচ নম্বরের পাশে হাতে লেখা সংশোধন আছে। আরিফ ভাই যে তালিকা খুলছেন, সেটা প্রথম খসড়া।” সে দ্রুত সঠিক নম্বরটা দেখাল, পর্দার অপারেটরকে বলল কোন ঘরে কী বসাতে হবে, আর দোভাষীর দিকে না তাকিয়েই যোগ করল, “সময়টা নিন—বিকেল ৫টা ১৭। কারণ তখনই বার্জ থেকে শেষ বস্তা নামানো শেষ।”
পর্দায় লাল চিহ্ন একে একে সবুজ হয়ে উঠল। ক্রেতা-পক্ষের লোকটা চশমা নামিয়ে কাগজের ওপর ঝুঁকল, তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল। অপারেটর বলল, “মিলে গেছে।” আরিফ পিছিয়ে এল এত দ্রুত যে তার কোমর প্রথম সারির টেবিলে লেগে বোতল কেঁপে উঠল। রাশেদ স্যারের মুখে এবার শুধু বিরক্তি না, কিছুটা আতঙ্কও ফুটে উঠল। কারণ ঘরটা এখন জানে, কে মুখস্থ কথা বলছিল আর কে কাজ জানত।
সামিউল হক মেহরাবের হাতে থাকা কাগজ নিলেন, একবার দেখলেন, তারপর উচ্চস্বরে বললেন, “এই উপস্থাপনা এখন থেকে মেহরাব চালাবে।” রাশেদ স্যার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকতে চাইলেন, “স্যার, ও ফিল্ডের ছেলে। ক্লায়েন্টের সামনে—” “চুপ।” এক শব্দে সামিউল হক তাকে থামালেন। তারপর আরও জোরে, যেন পেছনের সারি, দরজার মুখ, লিফট থেকে সদ্য নামা লোকজন—সবাই শুনে রাখে, “আজ থেকে এই কৃষি-ট্রেসিং প্রকল্পে নির্দেশ মেহরাব দেবে। আরিফ, তুমি নোট নেবে। রাশেদ, তুমি বসে শোনো—যদি বসার জায়গা পাও।”
ঘরে কেউ হাসল না; তার চেয়েও বেশি অপমানজনক হলো এই যে কেউ প্রতিবাদও করল না। দোভাষী সোজা হয়ে দাঁড়াল, অপারেটর তার কনসোল ঘুরিয়ে মেহরাবের দিকে দিল, সাবিহা দরজার পাশে থেকে এসে অতিরিক্ত ফাইলটা মেহরাবের নাগালে রাখল। নাসরিন খালা, যিনি কাকে কীভাবে সম্ভাষণ দিতে হয় তা নিয়ে সবসময় সচেতন, আজ প্রথমবার রাশেদ স্যারকে এড়িয়ে সরাসরি বললেন, “মেহরাব, তোমার লাগবে এমন কাগজ আলাদা করে দিই?”
রাশেদ স্যার শেষ চেষ্টা করলেন। “একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে এত বড়—” মেহরাব এবার প্রথমবার তার দিকে তাকাল। চোখে রাগ নেই, মিনতিও নেই। শুধু স্থিরতা। “ভুল বোঝাবুঝি লিফটের সামনে হয়নি স্যার। ওখানে আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।” কথাটা বলেই সে সামিউল হকের দিকে ফিরল, “উৎস-নথির অংশ আমি নেব। তারপর চতুর্থ চালানের আর্দ্রতার পার্থক্য দেখাব। দেরি পুষিয়ে যাবে।” সামিউল হক মাথা নাড়লেন। “শুরু করুন। সবাই, ওর নির্দেশ মেনে চলুন।”
মেহরাব সামনে গিয়ে পর্দার পাশে দাঁড়াল না; সে কেন্দ্রে দাঁড়াল, যেখানে সাধারণত সমন্বয়ক দাঁড়ায়। সাবিহা টেবিল থেকে একটি কালো চাবির রিং তুলে এনে তার পাশে রাখল—সংরক্ষণকক্ষের চাবি, যেটা গত দুই সপ্তাহ ধরে রাশেদ স্যারের ড্রয়ারে ছিল। মেহরাব চাবিটা হাতে নিয়ে একবার ওজন মাপল, তারপর নিজের ফাইলের ওপর রাখল। এই ছোট্ট আওয়াজেই যেন আরেক দফা পাল্টে গেল ঘরের ভারসাম্য।
উপস্থাপনা শুরু হওয়ার আগে সামিউল হক প্রথম সারির দিকে তাকিয়ে বললেন, “সমন্বয়কের আসন সামনের কাগজে যেমন লেখা আছে, তেমনই থাক। নাম পরে বদলাবে। এখন যার কাজ, সে দাঁড়িয়ে থেকেই পুরো ঘর চালাতে পারছে।” মেহরাব মাইক্রোফোন নিল না। দরকারও পড়ল না। সে সোজা বলল, “চতুর্থ চালানের পাতাটা খুলুন। আর এই কক্ষের পরের সব নথি আমার কাছে আসবে, অন্য কারও টেবিলে নয়।”
সামনের সারিতে নাম-লেখা গদিযুক্ত চেয়ারটা তবু ফাঁকাই রইল। তার সামনে পানি অছোঁয়া, কলম সোজা, ফোল্ডার বন্ধ। প্রথম সারির বাকি চেয়ারগুলো ভর্তি, মাঝখানে শুধু সেই সংরক্ষিত আসনের শূন্যতা কেটে আছে—আর মেহরাব নিজের ফাইল, চাবি আর খসখসে কাগজের নথি নিয়ে ঘরের কেন্দ্র দখল করে দাঁড়িয়ে রইল।