টাকার লাইন ঘুরে যেতেই ওরা থেমে গেল
“এই লেনটা না, পেছন দিক দিয়ে যান—স্টাফদের দাঁড়ানোর জায়গা ওখানে,” কালো কোট পরা ছেলেটা হাত তুলে রিদওয়ানের বুকের সামনে থামিয়ে দিল, যেন সে আমন্ত্রিত কেউ না, অতিরিক্ত মালপত্র নামাতে আসা লোক।
ঢাকার বনানীর ভেন্যুর সামনে সন্ধ্যার আলো তখন গাড়ির হেডলাইটে কাঁপছে। ফুলে মোড়া ফটকের ভেতর থেকে শहनাইয়ের রেকর্ড বাজছে, বাইরে ড্রপ-অফ লেনে সোনালি শিকল তোলা-নামানো হচ্ছে গাড়ি ধরে ধরে। রিদওয়ানের হাতে অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদ, তাতে আজ রাতের অতিথি-গাড়ির ক্রম, আর মানিব্যাগের স্বচ্ছ খোপে তার পুরোনো যাতায়াত কার্ডের ঘষা-লাগা কিনারা। এই লেনের তিনটা গাড়ি তারই তোলা—কৃষি রফতানিকারক মাহবুব স্যারের কোম্পানির পক্ষ থেকে। দেরিতে ফেরত পাওয়া ছোট্ট গেট-কার্ডটাও সে পকেট থেকে বের করেছিল, কিন্তু তার আগেই শারমিন ভাবি পাশ থেকে বলে উঠল, “ওকে সামনে আনবেন না। কাজের জন্য আসছে, কাজের জায়গায় থাকুক।”
কথাটা এমন জোরে বলা হল যে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো খালাম্মা পর্যন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। শারমিন ভাবির গায়ে গাঢ় নীল শাড়ি, চুলে সেলুনের গন্ধ, মুখে সেই আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা হাসি—যে হাসি দিয়ে মানুষ দরজা বন্ধ করে। তিনি হাত বাড়িয়ে রিদওয়ানের কাছ থেকে গেট-কার্ডটা নিয়ে কোটওয়ালা ছেলেটাকে দিলেন। “এটা আমার কাছে থাকবে। ওকে ভেতরের সোফায় বসানোর দরকার নেই। ড্রাইভার লাইনে থাকলেই হবে।”
রিদওয়ান একবারও কারও মুখের দিকে তাকাল না। শুধু বলল, “মাহবুব স্যারের গাড়ি সাতটা কুড়িতে ঢুকবে। সামনের লেন খালি রাখতে হবে।”
“আমরা জানি,” শারমিন ভাবি ঠোঁট সরু করল। “তুমি না বললেও অনুষ্ঠান চলবে।”
এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল। সে জানত কেন কথাটা এত কেটে গেল। নাঈমের বিয়ে, আর নাঈম একসময় তার সঙ্গে একই মেসে থাকা ছেলে, এখন শারমিন ভাবির দেবর। গত এক মাস রিদওয়ান অফিসের পর অফিস ছুটে মাহবুব স্যারের লোকজনের গাড়ি, গেস্ট-লিস্ট, নামানোর ক্রম সব বেঁধে দিয়েছে; কারণ স্পনসরদল খুশি না থাকলে ভেন্যুর অর্ধেক বাকি টাকা আটকে যেত। কিন্তু পরিবারের চোখে সে আজও “পরিচিত এক কাজের ছেলে”—যার হাত লাগে, মুখ লাগে না।
আরও দুটো গাড়ি এল। একটাতে কনের খালাতো ভাইরা, অন্যটাতে এক বিদেশফেরত মামা। সামনের লেনটা, যেটা রিদওয়ান কাগজে ধরে রেখেছিল স্পনসর-গাড়ির জন্য, শারমিন ভাবি সেটাতে নিজের লোক ঢোকাতে লাগল। “এইটা আগে, এইটা আগে,” বলে সে সিকিউরিটি ছেলেদের দিয়ে শিকল নামিয়ে দিল। রিদওয়ানের জায়গায় দাঁড়িয়ে নাঈমের ফুফাতো ভাই রাকিব ফোন কানে নিয়ে নির্দেশ দিচ্ছে, যেন সারাজীবন এ কাজ করেছে। রিদওয়ানকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হল সাইড লেনে, যেখানে ক্যাটারিংয়ের ভ্যান, ফুলের ট্রলি, আর ভাড়ার চেয়ারের গাদা।
একজন ড্রাইভার এসে ফিসফিস করে বলল, “ভাই, মাহবুব সাহেবের গাড়ি ফোন দিছে। কোন গেট?”
রিদওয়ান বলল, “এক মিনিট।” সে সামনে এগোতেই রাকিব হাত তুলে থামাল। “তুমি ড্রাইভারদের বুঝাও, সামনের অংশ আমরা দেখছি।”
“সামনের অংশ” বলতে যে অংশটা তারই বুকিংয়ের শর্তে রাখা, সেটা সবাই দেখল। শারমিন ভাবি সবার শোনানোর মতো গলায় বলল, “অনেকেই ছোটখাটো কাজ করে নিজেকে খুব দরকারি ভাবে। বিয়ের ঘরের রীতি আগে শেখা উচিত।”
খালাম্মা নীরবে দাঁড়িয়ে গেলেন, কপালের কাছে ওড়না টেনে। কেউ তাকে বাঁচাতে এগোল না। বরং রাকিব রিদওয়ানের হাতের অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদটা নিয়ে একবার দেখে আবার এমনভাবে ফেরত দিল যেন কাগজটা তার কাছেই ভুলে এসেছে। সেই ভাঁজের দাগ আরও মোটা হয়ে গেল।
ঠিক তখন রিদওয়ানের ফোন কাঁপল। স্ক্রিনে সোহেল—মাহবুব স্যারের প্রধান গাড়ির চালক। “ভাই, আমরা রাস্তার মাথায়। সামনের লেন রেডি তো?”
রিদওয়ান এক পা সরে গেল। দরজার ফ্রেমের পাশে সামান্য ফাঁকায় দাঁড়িয়ে, যেখানে আলো কম, সে খুব শান্ত গলায় বলল, “আপা, আপনারা কি স্পনসর রিংটা ব্যবহার করছেন?”
শারমিন ভাবি বিরক্ত হয়ে ফিরল। “এত প্রশ্ন কেন?”
“কারণ এটা আমার নামে ধরা,” রিদওয়ান বলল। “রিদওয়ান হোসেন, মাহবুব এগ্রো এক্সপোর্টের আগমন-সমন্বয়। রিং নম্বর দুই, দুইটা প্রাধান্য গাড়ি, একটা অপেক্ষমাণ ফাঁক। আপনারা যদি এটা ছেড়ে না দেন, আমি এখনই ছেড়ে নিচ্ছি।”
রাকিব হেসে উঠল। “এই ভিড়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা!”
রিদওয়ান আর তর্ক করল না। সে সোজা সিকিউরিটি ডেস্কের দিকে গেল—ডেস্ক না, লেনের মাথায় ছোট স্ট্যান্ড, যেখানে কাগজে গাড়ির নম্বর লেখা থাকে। সেখানকার মোটা দারোয়ান তাকে প্রথমে চিনতে পারেনি। রিদওয়ান মানিব্যাগ থেকে কোম্পানির সিল মারা কাগজটা খুলে ধরল, পেছন থেকে ফোনের রেকর্ড খুলে দিল; মাহবুব স্যারের অফিসের কণ্ঠ ভেসে এল, “রিং টু অনলি অন মি. রিদওয়ান’স রিলিজ।” দারোয়ানের চোখ নড়ল। রিদওয়ান কাগজের ওপর আঙুল রেখে বলল, “এখন। সামনের শিকল উঠবে শুধু আমার গাড়ির জন্য। বাকি সব সাইডে।”
কথাটা বলা মাত্র পরিবর্তনটা চোখে পড়ল। দারোয়ান রাকিবের হাত থেকে কাঁচা লাল ফিতা-ট্যাগটা নিয়ে রিদওয়ানের কাগজের উপর রাখল। পাশে থাকা দুই কর্মী একে অন্যের দিকে তাকিয়ে সামনের লেন খালি করতে ছুটল। যে সাদা গাড়িটা একটু আগে শারমিন ভাবি ঢুকিয়েছিল, সেটাকে হর্ন বাজিয়ে পিছিয়ে দিতে হল। দরজা খুলে নামতে যাওয়া মামা আবার বসে গেলেন, মুখ শক্ত করে। শিকলটা টক্ করে নেমে গেল।
শারমিন ভাবির চোখে প্রথমবার দ্বিধা দেখা দিল। “একটু পরে তো আমাদের পক্ষের বড় গাড়িটা আসবে,” সে দ্রুত বলল, এবার আর সবার শোনানোর মতো গলায় নয়। “ওটাও সামনেই নামাতে হবে।”
রিদওয়ান রসিদটা ভাঁজ করে পকেটে ঢুকাল। “রিং টু ভরে গেছে। নতুন ছাড় আমি দেব।”
মাহবুব স্যারের কালো এসইউভি ঢুকতেই তিনজন কর্মী একসঙ্গে ছুটে গেল। শিকল উঠল, গাড়ি সোজা কার্পেটের মুখে এসে থামল, দরজা খুলে ভেতর থেকে মাহবুব স্যার নামলেন, সঙ্গে তার স্ত্রী আর মেয়ে। ভেন্যুর ম্যানেজার নিজে এগিয়ে এসে সালাম দিল। নাঈম, যে এতক্ষণ ভেতরে ছিল, দৌড়ে নেমে এল সিঁড়ি থেকে; তার হাসিটা মুহূর্তে বদলে গেল যখন দেখল মাহবুব স্যারকে রিদওয়ান পথ দেখিয়ে নিচ্ছে। “এইদিকে, স্যার,” রিদওয়ান শুধু এতটুকু বলল।
শারমিন ভাবির পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন আত্মীয় তাড়াতাড়ি নিজেদের অবস্থান বদলাল। একটু আগেও যে চেয়ারটা নাকি “ড্রাইভার লাইনের”, সেটার সামনে দিয়ে এখন তারা সরে দাঁড়াচ্ছে। খালাম্মা সিঁড়ির মাথা থেকে নেমে এসে মাহবুব স্যারের স্ত্রীকে অভ্যর্থনা করতে লাগলেন, কিন্তু তার চোখ একবার রিদওয়ানের মুখ ছুঁয়ে গেল। সেই চোখে এবার উপেক্ষা ছিল না; ছিল হিসাব বদলে যাওয়ার চাপা অস্বস্তি।
এর মধ্যেই আরেকটা খবর এসে পড়ল—শারমিন ভাবির বড় ভাইয়ের গাড়ি, যাকে নিয়ে এত আয়োজন, রাস্তায় পৌঁছে গেছে। রাকিব ছুটে এসে বলল, “ভাবি, ওদের গাড়ি ঘুরে এসেছে। শিকল তুলতে বলেন।”
শারমিন ভাবি এবার সরাসরি রিদওয়ানের কাছে এল। তার গলার ধার নরম, কিন্তু তাড়াহুড়োয় কাটা। “শোনো, ওটা আগে ঢোকাও। আমাদের মানসম্মানের ব্যাপার। মাহবুব সাহেব তো নেমেই গেছেন।”
রিদওয়ান সোজা দাঁড়িয়ে ছিল। সামনের লেন এখন তার নির্দেশে চলেছে; এক গাড়ি ঢোকে, এক গাড়ি সরে, কার দরজা খুলবে আগে, কার ফুল হাতে লোক দাঁড়াবে—সব তার এক কথায়। সে দেখল শারমিন ভাবির নখে তাজা লাল রং, আর কপালের কাছের চুল সামান্য খুলে গেছে। এতক্ষণ যে নার্ভহীন নিশ্চিন্তি ছিল, সেটা নেই।
“আপনাদের গাড়ির জন্য রিং থ্রি,” সে বলল।
“রিং থ্রি তো পাশের গলি দিয়ে!” শারমিন ভাবির গলায় অবিশ্বাস। “আমার ভাই কি ওদিক দিয়ে নামবে?”
“আজ যারা বুকিং ধরে এসেছে, তারা সামনের রিং দিয়ে নামবে।” রিদওয়ান দারোয়ানের দিকে না তাকিয়েই বলল, “তালিকা অনুযায়ী।”
শারমিন ভাবি হাত বাড়িয়ে তার কনুই ছুঁতে গেল, খুব নিচু গলায়, “এভাবে কোরো না। সবাই দেখছে।”
“দেখুক,” রিদওয়ান বলল না। সে শুধু কনুই সরিয়ে নিল। এর মধ্যেই পরের স্পনসর-গাড়ি এসে রিংয়ের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে—একটা রুপালি সেডান, কাচ কালো। দারোয়ান প্রশ্নবোধক চোখে তাকাতেই রিদওয়ান হাত তুলল। “ওপেন।”
শিকল উঠল। রুপালি গাড়ি ঢুকে এল, দরজা খুলতেই দুজন কর্মী ছাতা আর ফুল নিয়ে পাশে দাঁড়াল। সেডান থেকে নামলেন বিদেশি ক্রেতা প্রতিনিধি আর তার স্থানীয় অংশীদার; ভেতর থেকে ফটোগ্রাফারও নেমে এসে সামনে ফ্ল্যাশ মারল। সিঁড়ির মাথায় নাঈম আটকে গেল—একসঙ্গে দুই দিক সামলাতে পারছে না। তার পরিবার যাকে নিয়ে সামনের কার্পেটে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সে গাড়ি তখনও বাইরে।
বাইরে, মূল রিংয়ের আগে, শারমিন ভাবির ভাইয়ের গাড়ি হর্ন দিল একবার, তারপর আরেকবার। রাকিব দৌড়ে শিকলের কাছে এসে দারোয়ানকে বলল, “এটা আমাদের। উঠান।”
দারোয়ান এবার তার দিকে তাকালও না। সে রিদওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শারমিন ভাবি প্রায় ফিসফিস করে বলল, “রিদওয়ান, একবার। শুধু এই একটা।”
রিদওয়ানের ফোন আবার কাঁপল। সোহেল বলছে, শেষ গাড়িটা ঘুরে এসেছে—মাহবুব স্যারের বিশেষ অতিথি। সেই গাড়িটাই আজ রাতের সবচেয়ে ভারী নাম। সামনে কার্পেট, ক্যামেরা, ফটকের ফুল, সব এখনো প্রস্তুত। কিন্তু লেন একটাই।
শারমিন ভাবি শেষ চেষ্টা করল। সে দ্রুত দারোয়ানের সামনে গিয়ে বলল, “শিকল তুলুন। আমি বলছি।”
তার “আমি বলছি” মাঝপথেই ভেঙে গেল। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে রিদওয়ান বুকপকেট থেকে ছোট্ট সাদা অনুমতি-চিরকুটটা বের করে দারোয়ানের হাতে দিল—মাহবুব এগ্রোর শেষ আগমনের মুক্তি। কাগজে সিল, সময়, নম্বর। দারোয়ান সঙ্গে সঙ্গে বাঁশির ছোট্ট শব্দ করল। দুই কর্মী ছুটে গিয়ে সামনের ফাঁক পরিষ্কার করল। শারমিন ভাবির ভাইয়ের গাড়িকে হাত তুলে থামিয়ে দেওয়া হল শিকলের বাইরে, যেখানে হেডলাইট এসে সোনালি চেইনে আটকে থাকে।
কালো মার্সিডিজটা বাঁক নিয়ে ঢুকল। শিকল উঠতেই গাড়ি সোজা কার্পেটের কিনারে এসে থামল। দরজা খুলে ধরল দুজন কর্মী, ম্যানেজার নিচু হয়ে স্বাগত জানাল, নাঈম প্রায় দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে বসা অতিথি নামতেই ফটকের আলো আর ফ্ল্যাশ একসঙ্গে পড়ল তার জুতোর ওপর। সেই আলোয় বাইরে আটকে থাকা গাড়িটার কাচে শারমিন ভাবির মুখ ভেঙে ভেঙে দেখা যাচ্ছিল—সে এখন আর নির্দেশ দিচ্ছে না, অপেক্ষা করছে।
রিদওয়ান দারোয়ানের হাত থেকে শিকলের মাথাটা নিল, একবার রাস্তার ফাঁক দেখে সোহেলের গাড়ির দিকে ইশারা করল, তারপর পিকআপ লেনের ফাঁকে এক পাশের চেইন তুলে দিল, আর অন্য পাশের চেইন নিচেই রেখে দিল।