সবার আগে ওঠার অধিকারটা আমার
দরোয়ান কবির হাত বাড়িয়ে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে মেহরিনের পথ আটকে দিল। “একটু থামেন আপা। উপরের তালিকায় নাম মিলাইতে হইব।” তার পেছন দিয়ে শাড়ির ঘের তুলে তিনজন খালা, এক জোড়া অফিসের অতিথি আর রাফির পাশে দাঁড়ানো চকমকে মেরুন পাঞ্জাবির এক মেয়ে সোজা উঠে গেল। ল্যান্ডিংয়ের দেয়ালে ঝোলানো সাদা বোর্ডে মোটা কালো মার্কারে লেখা—“পরিবার”, “ঘনিষ্ঠ আত্মীয়”, “বিশেষ অতিথি”, “সহায়ক দল।” সহায়ক দলে নিচে ছোট করে: ১৭. মেহরিন। তার ব্যাগের ভেতর কলমে লেগে থাকা পুরোনো নীল কালি আঙুলে ছাপ ফেলছিল, আর দিনের শেষে দৌড়াদৌড়িতে কাঁধের কাছের কুর্তিতে ভাঁজ শক্ত হয়ে ছিল। সকাল থেকে এই বাড়ির এনগেজমেন্ট রিসেপশনের ফুল, তালিকা, খাবারের হিসাব, সিট নম্বর—সব সে সামলেছে। এখন দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে পড়ে শোনানো হচ্ছে তার নিচের জায়গা।
মেহরিন একবার বোর্ডের দিকে তাকাল, তারপর কবিরের বাহুর ফাঁক গলে পুরো সিঁড়ি না উঠে ল্যান্ডিংয়ের দেয়ালের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াল। “নাম মিলাইতে সমস্যা নাই,” সে ঠান্ডা গলায় বলল, “বোর্ডটা একটু সোজা করে ঝুলাইয়া দেন। ১৭ নম্বরটা কাত হইয়া আছে।” আশেপাশের দুজন মেয়ে ঘাড় বাড়িয়ে তাকাল। ছোট, সামান্য, কিন্তু দৃশ্যমান—কবির হকচকিয়ে বোর্ডটা সোজা করল। ১৭ নম্বরটা কাত হয়ে থাকল না।
উপরে উঠতেই কাঁচের পাশের লম্বা করিডর থেকে রান্নাঘরের গরম মসলার গন্ধ, আতর, আর নিচের উঠোনে সাজানো আলো একসঙ্গে এসে লাগছিল। লিফটের ধাতব দরজায় আঙুলের পুরোনো মুছেমুছে যাওয়া দাগে নিজের মুখ ভেঙে দেখা যাচ্ছিল। মেহরিন সেই বিকৃত প্রতিফলনে রাফিকে দেখতে পেল—হেসে কথা বলছে, যেন এই থামিয়ে রাখা তারই প্রোগ্রামের অংশ। ঢাকার এই কৃষি-করপোরেট পরিবারের কাছে সে ছিল ছয় মাসের গোপন সমাধান: বিদেশে থাকা এক কাকার জমি-সংক্রান্ত উত্তরাধিকার জট ছাড়াতে রাফির “বিবাহিত” হওয়া দরকার, কাগজে, নিঃশব্দে, কাউকে না জানিয়ে। শর্ত ছিল, অনুষ্ঠান শেষ হলে বিচ্ছেদ, আর এর মধ্যে প্রয়োজনে সে পাশে থাকবে। পাশে থেকে সব কাজ করেছে, কিন্তু নাম পেয়েছে সহায়ক দলে।
রাফি ল্যান্ডিংয়ে নেমে এল, যেন সে দেরি হওয়া এক তুচ্ছ বিষয়ে শাসন দিতে এসেছে। “তুমি এখানেই থাকো,” সে এত জোরে বলল যে পাশের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকা দুই খালা থেমে শুনে ফেলল। “আজকে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, অফিসের ডিরেক্টররা আছে। তোমাকে আমি কাজের জন্য এনেছিলাম, মানে বুঝো তো—অস্থায়ী ব্যবস্থা। সব জায়গায় সবাইকে সামনে আনা যায় না।”
মেহরিন উত্তর দিল না। রাফি নিজেই আরও নামল। “ওপরে তোমার জন্য পাশের চেয়ার রাখা আছে। স্টেজের লাইনে আসার দরকার নাই। আর কাউকে কিছু বলতে যেও না, অপ্রয়োজনীয় অস্বস্তি হবে।”
“পাশের চেয়ার?” মেহরিন এবার তাকাল। “সকালের সিটিং প্ল্যানে ওই চেয়ারটা ডেলিভারি ছেলেদের জন্য ছিল।”
রাফির গলায় বিরক্তি জমল। “তুমি সীমা বুঝো। কাগজের সুবিধা আর পরিবারের মান এক জিনিস না। আমি তোমাকে সম্মান দিয়েছি, কিন্তু বউয়ের জায়গা আলাদা।”
খালাদের একজন ঠোঁট চেপে ফেললেন; অন্যজনের চোখ সোজা বোর্ডে গিয়ে পড়ল। রাফি নিজেই তার কথায় ঘা আরও গভীর করল। “মেয়েটা খুব কাজের, এই পর্যন্তই বলব। পরে ভালো ঘরে বিয়ে হবে, চিন্তা কইরো না।”
মেহরিনের মুখ শক্ত রইল। “আপনি আমার বিয়ের বাজারও ধরতেছেন নাকি?”
রাফি বুঝল না, নাকি বুঝেও অবহেলা করল। সে হাত তুলে কবিরকে ইশারা করল, “ওকে আগে উঠাইয়ো না। পরিবার উঠুক, তারপর।”
তারপরেই ওপরে থেকে কড়া গলায় ডাক এল, “রাফি! বড়মামাকে আগে আনো।” সবাই সরে দাঁড়াল। সিঁড়ির মোড়ের ওপরে সায়মা খালা দাঁড়িয়ে, গায়ে গাঢ় সবুজ জামদানি, হাতে অতিথি-তালিকার ক্লিপবোর্ড। তিনি এই বাড়ির মেজবানের দায়ে ছিলেন, আর কে কখন উঠবে, কার পাশে কে বসবে—সব তার হাতে। বড়মামা ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এলেন, লাঠির আগা টকটক শব্দ করছিল। রাফি তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে পথ ছাড়ল, তার পাশের মেরুন পাঞ্জাবির মেয়েটা আঁচল টেনে নিল। এটাই ছিল ওঠার লাইন।
বড়মামা ল্যান্ডিংয়ে এসে থামলেন। চোখে ভারী চশমা, তবু বোর্ডটা পড়লেন। তারপর মেহরিনের দিকে তাকালেন, আবার সায়মা খালার দিকে। “এই মেয়েটা নিচে কেন?”
রাফি দ্রুত বলল, “ও কাজ দেখছে, মামা। পরে—”
সায়মা খালা কথার মাঝখানে কেটে দিলেন। “পরে না। আগে।” তিনি সোজা সিঁড়ির মাথা থেকে নেমে ল্যান্ডিংয়ে এলেন, যেন সবাইকে দেখিয়ে আসছেন। “মেহরিন, তুমি আগে ওঠো। বড়মামার ডান পাশে। ঘরের মেয়ে আগে, তারপর বাকিরা।”
রাফি জমে গেল। “খালা, আপনি ভুল বুঝছেন—”
“আমি খুব ভালো বুঝছি,” সায়মা খালা ঠান্ডা গলায় বললেন। “যে মেয়েটা তিন দিন ধরে এই বাড়ির রান্নাঘর থেকে বসার ক্রম, অতিথির কৃষি-মন্ত্রণালয়ের লোকজন কার পাশে বসবে—সব ধরে রেখেছে, তার নাম সহায়ক দলে কে নামায়? আর কেন?”
তিনি হাত বাড়িয়ে মেহরিনকে ইশারা করলেন। দৃশ্যটা সেখানে বদলে গেল। বড়মামা নিজের লাঠিটা একটু সরিয়ে জায়গা করলেন। মেহরিন উঠতে গেলে রাফি মাঝপথে দাঁড়ানো ছিল; সরতে তার এক মুহূর্ত দেরি হলো। সেই এক মুহূর্তই সবাই দেখল—যাকে সে থামিয়ে রেখেছিল, তার জন্য এখন তাকে ল্যান্ডিংয়ের সরু মোড়ে পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। মেহরিন তার পাশ ঘেঁষে ওপরে উঠল, বড়মামার আগে না, কিন্তু তাঁর সঙ্গে একসারি হয়ে। রাফি পেছনে পড়ে গেল। উঠোনের আলো নিচ থেকে এসে তার মুখে এমন পড়ল, যেন সে নিজের বাড়ির সিঁড়িতেই অতিরিক্ত মানুষ।
ওপরে উঠতেই চোখ বদলাতে শুরু করল। যেই খালারা একটু আগে শুনছিলেন, তারা আর মেহরিনকে সহায়ক মেয়ে হিসেবে দেখলেন না। অফিসের এক অতিথি, যাকে সে সকালে আসন নম্বর বুঝিয়েছিল, এবার দাঁড়িয়ে সালাম দিল। সায়মা খালা ক্লিপবোর্ডটা তার হাতে ধরিয়ে বললেন, “এখন থেকে শেষ ওঠার ক্রম তুমি বলবা।” এতে রাফির মুখে প্রথম ফাটলটা দেখা গেল—সে দ্রুত এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, “খালা, আমি সামলাই। ওকে নিয়ে ভুল সিগন্যাল যাবে।”
“যে সিগন্যাল তুমি দিতে চেয়েছিলে, সেটা তো গেছেই,” সায়মা খালা বললেন, আর ক্লিপবোর্ড ছাড়লেন না, যতক্ষণ না মেহরিন হাতে নিল।
রাফি তখন কণ্ঠ নামিয়ে ফেলল। তবু যারা কাছাকাছি, তারা শুনতে পেল। “মেহরিন, এসো, ওদিকের কর্নারে বসি। তোমাকে সামনের সারিতে না রাখলেও কেউ অপমান করছে না। আমি পরে সব বুঝিয়ে বলব। তুমি যা পাওনা, আমি দেব। আলাদা বাসার অগ্রিমও দিয়ে দেব। আজকে শুধু দৃশ্য কোরো না।”
“দৃশ্য?” মেহরিনের হাতে ক্লিপবোর্ড ছিল, কিন্তু তার চোখ গিয়ে পড়ল ল্যান্ডিংয়ের দেয়ালের ওই সাদা বোর্ডে। “আপনি আমাকে লুকাইয়া কাজ নিয়েছেন, সামনে এনে নাম কাটছেন, আবার বলতেছেন দৃশ্য না করতে?”
রাফি আরও কাছে এল, মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করছে। “শোনো, বাস্তব বুঝো। ওরা যার কথা ভাবছে, সে অন্যজন। তোমার সম্মান আমি আলাদা করে রাখব। ওই পাশের সোফায় বসো, পরে নিচে গিয়ে কথা বলি।”
পাশের সোফা। আবার পাশ। আবার আড়াল। মেহরিন তখনই সিদ্ধান্ত নিল, কথা আর কোণায় হবে না। সে সোজা সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে নেমে এল, যেখানে বোর্ডটা দেয়ালে ঝুলছে, আর নিচ থেকে ওপরে ওঠা সবাইকে সেটা পড়তেই হচ্ছে। সায়মা খালার ক্লিপবোর্ডে আজকের প্রক্রিয়ার তালিকা, আর বোর্ডে নাম ও ক্রম। দুটোই এখন দৃশ্যমান সত্য।
কবির তখনও নিচে-ওপরে লোক তুলছে। মেহরিন বলল, “বোর্ডটা নামান।” তার গলা উঁচু নয়, কিন্তু কাটার মতো সোজা। কবির দ্বিধায় রাফির দিকে তাকাল। রাফি দ্রুত নেমে এলো। “থাক, দরকার নাই,” সে বলল, কণ্ঠে প্রথমবার তাড়াহুড়ো। “এটা ইভেন্টের বোর্ড।”
মেহরিন তার দিকে না তাকিয়ে বলল, “ইভেন্টেরই তো। কে আগে উঠবে, কে কোথায় দাঁড়াবে—এই বোর্ডেই লেখা।” তারপর নিজেই হাত বাড়িয়ে বোর্ডের নিচের হুক খুলে নিল। সাদা প্লাস্টিক বোর্ডটা কাঁধের সমান উচ্চতায় নামিয়ে আনতেই সেখানে লেখা সব নাম আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। “মার্কারটা দিন।”
কেউ একজন রান্নাঘর থেকে আনা কালো মার্কার বাড়িয়ে দিল। মেহরিন ঢাকনা খুলে প্রথমে “সহায়ক দল” লাইনের ১৭ নম্বরের পাশে নিজের নামের ওপর এক টান দিল না; পুরো লাইনটাকেই আড়াআড়ি কেটে দিল। শব্দ হলো, শুকনো বোর্ডে মার্কারের খসখসে ঘষা। তারপর ওপরে, “পরিবার” অংশের নিচে ফাঁকা জায়গায় বড় অক্ষরে লিখল—“মেহরিন রহমান — বৈধ স্ত্রী।” তার নিচে নম্বর দিল ৩। বড়মামা ১, সায়মা খালা ২, তারপর সে। থামল না। “বিশেষ অতিথি” অংশে যেখানে রাফির নাম ছিল ২, সেটাকে মুছে “পরিবারের পর” লিখে নামিয়ে দিল ৬ নম্বরে। নিচে আরেক টানে নতুন রেখা টানল, যেন লাইনটা সত্যিই কেটে গেছে।
রাফি এবার তার কব্জি ধরতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ সিঁড়ির দুই দিকেই মানুষ দাঁড়িয়ে। “তুমি পাগলামি কোরো না,” সে দাঁত চেপে বলল। “এটা নামাও।”
মেহরিন বোর্ডটা দেয়ালের দিকে ঠেসে ধরে স্পষ্ট গলায় বলল, “কাগজে বিয়ে যখন আপনার জমির উত্তরাধিকার বাঁচায়, তখন আমি অস্থায়ী না। সবার সামনে সিঁড়িতে উঠার ক্রমে যখন আমাকে সহায়ক বানান, তখন উত্তরও সবার সামনে হবে। আজকের অনুষ্ঠান এই বাড়ির পরিবারের নামে। আমি সেই লাইনের বাইরে না। আপনি থাকবেন আমার পরে।”
এই এক কথাতেই তিনটে জিনিস একসঙ্গে ঘটল। দৃশ্যমান ক্ষতি—রাফির নাম চোখের সামনে নিচে নেমে গেল। ক্ষমতা উল্টে গেল—বোর্ডটা তার হাতে, ক্রমটা সে বলছে। আর রাফি নিজেই অস্থির হয়ে উঠল—সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল, কে আগে তার দিকে ফিরছে আর কে বোর্ড পড়ছে। তার মেরুন পাঞ্জাবির সঙ্গিনী এক পা পিছিয়ে গেল; কবির এবার নির্দেশের জন্য রাফির দিকে নয়, মেহরিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সায়মা খালা নিচে নেমে এলেন, কিন্তু থামালেন না। শুধু বললেন, “ক্রম পড়ে শোনাও।”
মেহরিন বোর্ডটা আবার হুকে ঝুলিয়ে দিল, এবার সোজা, একদম চোখের সমান্তরালে। তারপর ক্লিপবোর্ড মিলিয়ে উচ্চস্বরে পড়ল, “এক—বড়মামা। দুই—সায়মা খালা। তিন—মেহরিন রহমান। চার ও পাঁচ—জ্যেষ্ঠ খালারা। ছয়—রাফি।” শেষ নামটা বলেই সে চোখ তুলল। “কবির ভাই, এখন থেকে এই ক্রমে উঠাবেন।”
রাফি মরিয়া হয়ে ফিসফিস করল, “আমাকে আলাদা করে অপমান করার দরকার ছিল না। চলো, আমি এখনই ঘোষণা ছাড়া তোমাকে সামনের চেয়ার দিচ্ছি।”
মেহরিন তাকাল না। “পাশের চেয়ারও না, লুকানো ঘোষণা-ও না। যে লাইন আপনি কেটেছেন, সেটা আমি দেখিয়ে ফিরাইছি।”
সে নিজের শাড়ির আঁচল কাঁধে গুঁজে বোর্ডের ডান পাশে ছোট খোপে লাল স্টিকার-নম্বর বসাতে শুরু করল—১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬। আঙুলে আগের নীল কালি, তার ওপর নতুন লাল রঙ। ৩ নম্বরটা নিজের নামের পাশে চাপিয়ে দিল, ৬ নম্বরটা রাফির লাইনের সামনে। তারপর এক ইঞ্চি সরে দাঁড়িয়ে দেখল সংখ্যাগুলো সমান হয়েছে কি না। দেয়ালের ধারে নিচে রাখা চায়ের কাপের ঠান্ডা চা থেকে গোল দাগ পড়ে আছে ছোট টেবিলে; অপেক্ষা যত লম্বা ছিল, দাগও তত ঘন। মেহরিন বোর্ডের কিনারা সোজা করল, হাত ছেড়ে দিল।
র্যাঙ্কিং ওয়ালে নতুন ক্রমটা স্থির হয়ে রইল—১, ২, ৩ তার লাইনে; ৬ রাফির নিচের পাশে। সংখ্যাগুলো আর কাত হল না।