সবাই ভেবেছিল আমি বাদ
রুবাইয়া খালা মেহরিনের হাত থেকে গাড়ির চাবিটা কেড়ে নিয়ে এমনভাবে উঁচু করলেন, যেন ওটা কোনো ভুল লোকের হাতে ধরা পড়া জিনিস। “এটা তোমার কাছে কেন?” তাঁর গলার ধার পার্কিং লেনের সিমেন্টে ঠুকে ফিরে এল। “সাব্বিরকে নিতে কে যাবে, সেটা বড়রা ঠিক করেছে। তুমি ভেতরের বক্সগুলো গুছাও।” পেছনে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখগুলো একসাথে ঘুরে তাকাল। কারও হাতে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বিরিয়ানির বক্স, কারও কাঁধে শাড়ির আঁচল, কারও চোখে সেই একরকম তৃপ্তি—যেন কারও মান নামাতে পারলে রাতটা ঠিক জমে।
মেহরিন হাত নামাল না। চাবি ছেড়ে দিয়েও আঙুল সোজা ছিল। পুরোনো নীল বলপেনের কালি লেগে থাকা দাগটা আজও বাম তর্জনীর গাঁটে শুকনো নীল রেখা হয়ে আছে; তিন মাস ধরে অতিথি-তালিকা, ফটোগ্রাফারের অগ্রিম, খাবারের হিসাব—সব সে লিখেছে। সাব্বিরের মায়ের কথায় এই পুরো আয়োজন সে টেনে তুলেছে, কারণ সাব্বিরের বাবা কৃষি মন্ত্রণালয়ের বড় কর্মকর্তা, আর “সম্মানজনক” বাগদানের অনুষ্ঠানটায় কোনো গরমিল চলবে না। এখন সেই একই লোকজনের সামনে তাকে বক্স গোনা মেয়ে বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সে খুব শান্ত গলায় বলল, “চাবি যদি অন্যের হাতে দেন, আমার কাছে রাখা গেটের অতিরিক্ত চাবিটাও এখনই নিয়ে নিন, খালা। পরে খুঁজে বেড়াতে হবে না।” বলে সে পার্স খুলে ছোট রিং-এ বাঁধা দ্বিতীয় চাবিটা বের করল। দেরিতে ফেরত দেওয়া জিনিসের মতো সেটা ধাতব শব্দ তুলে রুবাইয়া খালার তালুতে পড়ল। দুই পাশের দুই ফুফু একবার চোখাচোখি করল। প্রথম চিড়টা সেখানেই পড়ল—যা লুকিয়ে করা যেত, তা মেহরিন নিজেই সবার সামনে ফিরিয়ে দিল।
রুবাইয়া খালা একটু থমকালেন, তারপর ঠোঁট টেনে বললেন, “আহা, নাটক করার দরকার নেই। মেয়েদের একটু বুঝে চলতে হয়। বাগদান হয়েছে মানেই সব অধিকার হাতে চলে আসে না।”
সাব্বির তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা পাঞ্জাবির ওপর জওহরকোট, ফোন হাতে, মুখে সেই পুরুষদের মাপা নিরপেক্ষতা—যেখানে অন্যায় দেখে চুপ থাকাই নিজের সম্মান রক্ষা মনে হয়। মেহরিন তাকাল। সে চোখ সরিয়ে বলল, “মা, লেট হয়ে যাচ্ছে। নাঈমা আপা গেলে হবে। মেহরিন ভেতরটা সামলাক।”
নাঈমা আপা, সাব্বিরের খালাতো বোন, এগিয়ে এসে চাবি নিল এমন ভঙ্গিতে, যেন সে আগে থেকেই এই কাজের স্বীকৃত মানুষ। “আমি নিয়ে আসছি,” সে বলল। “ও এতক্ষণ কাজ করেছে, এখন একটু থাকুক।” কথাটা দয়া শোনাল, অধিকার নয়। পাশেই এক খালা ফিসফিস করলেন, “কাজের মেয়ের মতো সব সামলায়, কিন্তু জায়গা চিনতে শেখেনি।” শাড়ির কড়া সুগন্ধি আর ডিজেল গন্ধ মিশে গলা কষে ধরল।
মেহরিনের সামনে প্লাস্টিক টেবিলে কয়েকটা ঠান্ডা খাবারের বক্স রাখা। একটার ঢাকনা বেঁকে গেছে; ভেতরের কাবাবে তেল জমে সাদা হয়ে উঠেছে। সে একটা বক্স তুলে সোজা করল, তারপর টেবিলের পাশে সরে দাঁড়াল, যেন সে আদেশ শুনেছে। কিন্তু সরে গিয়েও লেনটা ছাড়ল না। গ্যারেজের লিফটের ধাতব দরজায় মুছেও না ওঠা আঙুলের ছাপ, আলোয় চকচক করা গাড়ির বাম্পার, ড্রাইভারদের চাপা হাসি—সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে শুধু জায়গাটা ধরে রাখল।
কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে লোকজন ঝরতে ঝরতে নেমে আসছিল। এই অনুষ্ঠানটা ছিল আনুষ্ঠানিক বাগদান আর ব্যবসায়িক শুভেচ্ছা—দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজন, সাব্বিরের বাবার দফতরের কয়েকজন, আর সেই বিশেষ অতিথি, আরমান রহমান। ঢাকার বড় কৃষি-প্রযুক্তি গোষ্ঠীর উত্তরাধিকারী, সাব্বিরের বাবার প্রকল্প-সংক্রান্ত অংশীদার, যার একবার আসা মানেই অনুষ্ঠানটার ওজন বদলে যাওয়া। আসার সময় আরমানের গাড়ি দেরি করেছিল, তিনি নিজেই নামতে নামতে মেহরিনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “পার্কিং কোথায় ফাঁকা?” মেহরিন পথ দেখিয়ে গাড়ি ঢুকিয়েছিল, তারপর তাঁর চালকের কাছ থেকে নিরাপত্তার কারণে কী-টোকেন নিয়ে নিজের ব্যাগে রেখেছিল। রুবাইয়া খালা তখনই বলেছিলেন, “খুব সাবধানে রেখো।”
এখন আরমান বেরোবেন। আর সেই বেরোনোর মুখে মেহরিনকে হঠাৎ অদৃশ্য করে দেওয়ার কাজটা যেন আরও জরুরি হয়ে উঠল। রুবাইয়া খালা কণ্ঠ উঁচু করলেন, “মেহরিন, ওই টোকেনটা নাঈমাকে দাও। অতিথি বিদায়ের দায়িত্ব ও নেবে। তোমার দরকার নেই।”
সবাই শুনল। “দায়িত্ব” শব্দটা ইচ্ছে করেই বলা। যে কাজটা মেহরিন করছিল, সেটা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে—এবার শুধু চাবি না, প্রকাশ্য ভূমিকা। নাঈমা আপা হাত বাড়িয়ে দিল। সাব্বির আবারও চুপ।
মেহরিন টোকেনটা ব্যাগ থেকে বের করল। ছোট পিতলের টুকরো, কালো মার্কার দিয়ে লেখা ১৭। সে একবার ঘুরিয়ে দেখল, পেছনে আরমানের চালকের কলমের চাপা দাগ। তারপর সোজা নাঈমার হাতে দেওয়ার বদলে পাশের নিরাপত্তারক্ষীর ডেস্কে রেখে বলল, “যার গাড়ি, তার সামনেই দেব। ভুল হলে আমার নামে যাবে না।” কথাটা চিৎকার ছিল না। কিন্তু চারপাশে দাঁড়ানো কয়েকজনের কাঁধ একসাথে শক্ত হয়ে উঠল। নাঈমার হাত মাঝআকাশে থেমে গেল।
রুবাইয়া খালার মুখ কষে গেল। “তোমাকে এত সাহস কে দিল?”
মেহরিন বলল, “যে আমাকে কাজটা করতে বলেছিল, খালা।”
এক সেকেন্ডের বেশি না—তবু সেই এক সেকেন্ডে জায়গার ভর পাল্টে গেল। দুইজন কাকা, যারা এতক্ষণ নাঈমার পাশে দাঁড়িয়েছিল, অস্বস্তিতে আধা পা সরল। এক ড্রাইভার মেহরিনের পাশে রাখা টেবিলটা একটু টেনে দিল যাতে চলার পথ খোলে। এক ফুফাতো ভাই ফিসফিস থামিয়ে গলাটা সোজা করল। কাঁধ, পা, পথ—চেনা নিরাপদ দিক থেকে একটুখানি বেঁকে গেল মেহরিনের দিকে। যেন ভিড় হঠাৎ বুঝে ফেলেছে, ভুল লোককে সামনে করা হয়েছে।
এই ফাটলটুকুই রুবাইয়া খালাকে বেশি ক্ষিপ্ত করল। তিনি এগিয়ে এসে ডেস্ক থেকে টোকেনটা তুলে নাঈমার হাতে গুঁজে দিলেন। “আমি বলছি, ও নেবে। এখানে কার কথা চলবে, সেটা বুঝে চল।” তারপর মিষ্টি মুখ করে পেছন ফিরলেন, কারণ আরমান রহমান সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন। তাঁর সঙ্গে দুজন সহকারী, এক বয়স্ক চাচা, আর সাব্বিরের বাবা। সবাই একটু জায়গা ছেড়ে দিল।
আরমান নামছিলেন ধীরে, কিন্তু তাকাচ্ছিলেন একেবারে সোজা সামনে। গাড়ির লেনের মাথায় এসে তিনি থামলেন। নাঈমা আপা হাসি মেখে টোকেন তুলে ধরল। “এই নিন, আমরা—”
“মেহরিন কোথায়?” আরমানের প্রশ্নটা ওর বাক্য কেটে দিল।
যে কয়েকজন সরে গিয়েছিল, তারা এবার পুরোপুরি সরে গেল। মাথা ঘুরল, চোখ ঘুরল, দুই কাঁধের ফাঁক বদলাল। নাঈমার হাত এখনও উঁচু, কিন্তু মানুষজনের শরীর আর তার পাশে বলয় বানিয়ে নেই। লেনের মাঝখানে একটা সরু ফাঁক সোজা খুলে গেল, আর সেই ফাঁকের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেহরিন। ওর শাড়ির পাড়ে সিমেন্টের ধুলো, হাত ফাঁকা, মুখ শক্ত।
সাব্বিরের বাবা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “ও ভেতরের কাজ দেখছিল, আরমান সাহেব। নাঈমা আছে তো—”
আরমান চোখ না ফিরিয়েই বললেন, “আমি ওকেই বলেছিলাম।” তাঁর ডান হাত বাড়ানো, কিন্তু নাঈমার দিকে নয়। ফাঁকের ওপারে মেহরিনের দিকে। “টোকেন।”
রুবাইয়া খালা সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়লেন। “আহা, ছোটদের নিয়ে কী আর— আমরা তো আছি। মেয়েটা একটু সেনসিটিভ, তাই—”
মেহরিন এবার নিজেই এগিয়ে এল। নাঈমার হাত থেকে টোকেনটা সে কেড়ে নিল না; কেবল হাত বাড়িয়ে বলল, “ওটা আমার দায়িত্ব ছিল।” নাঈমা এক মুহূর্ত ধরে রাখার চেষ্টা করল, তারপর আঙুল আলগা হয়ে গেল। টোকেনের ধাতব খটাস শব্দ সবার কানে লাগল। মেহরিন সেটা আরমানের হাতে দিল।
আরমান টোকেন নিলেন, তারপর আশপাশে একবার তাকালেন। কারও দিকে না, কিন্তু সবাই বুঝল তাকানোটা সবার ওপর দিয়েই গেল। “গাড়ি বের করুন,” তিনি চালককে বললেন। তারপর খুব স্পষ্ট, খুব স্বাভাবিক স্বরে যোগ করলেন, “মেহরিন, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন। সামনে বসবেন। আজ থেকে আমার দিকের সব যোগাযোগ, যাতায়াত, সময়সূচি—আপনি দেখবেন।”
কথাটা এত পরিষ্কার ছিল যে কেউ ভানও করতে পারল না, ভুল শুনেছে। পেছনে সাব্বিরের ফোন হাত থেকে প্রায় পিছলে পড়ে বুকে ঠেকল। রুবাইয়া খালার ঠোঁটের রং হঠাৎ খুব গাঢ় লাগতে থাকল, যেন মুখের বাকিটা রক্ত হারিয়ে ফেলেছে। দৃশ্যমান ক্ষতি সেখানেই—নাঈমার হাত ফাঁকা, রুবাইয়া খালার “আমরা আছি” বাতাসে ঝুলে গেল, আর সাব্বিরের পরিবারের সামনে অন্য এক পুরুষ প্রকাশ্যে মেহরিনকে নিজের পাশে ডাকল, কাজের জন্যও, অবস্থানের জন্যও।
সাব্বির এবার এগিয়ে এল, দেরি করে ফেলা লোকের তাড়াহুড়ো মুখে। “এক মিনিট,” সে বলল, কণ্ঠ শুকনো। “মেহরিন আমাদের সঙ্গেই যাবে। পরে কথা হবে। মা একটু ভুল বুঝেছে—”
“পরে?” মেহরিন তার দিকে তাকাল। প্রথমবার। “যখন আমি চাবি ফেরত দিলাম তখন না। যখন টোকেন সরিয়ে নেওয়া হল তখন না। এখন সবার সামনে ডাক পড়ার পর?”
সাব্বির ফিসফিসে গলায় বলল, “এভাবে বলো না। আত্মীয়স্বজন আছে।”
“তাই তো বলছি,” মেহরিন উত্তর দিল। “আত্মীয়স্বজনের সামনেই শুনুন।” সে রুবাইয়া খালার দিকে হাত বাড়াল। “গেটের চাবি আপনার কাছে আছে। ওটা আপনি রাখুন। যেটা আমাকে দেরি করে ফিরিয়ে দিতে শেখালেন, সেটা আমি আর নেব না।”
রুবাইয়া খালা প্রথমে বুঝতেই পারলেন না, কী ফেরত দেবেন—ক্ষমতা, না ধাতব চাবি। তারপর আঁকড়ে ধরা ছোট রিংটা তাঁর মুঠোয় আরও কেটে বসল। তাঁর কণ্ঠে প্রথমবারের মতো ধার ভেঙে গেল। “মেহরিন, এমন করিস না মা। মানুষের সামনে—”
“মানুষের সামনেই তো করেছিলেন, খালা।”
গাড়িটা লেনে এসে দাঁড়াল। হেডলাইটের আলো সিমেন্টের ওপর লম্বা আয়তক্ষেত্র কেটে দিল। এক সহকারী স্বয়ংক্রিয় ভঙ্গিতে পেছনের দরজা খুলতে গিয়েছিল; আরমান হাত তুলে থামালেন। তিনি নিজেই সামনের দরজার দিকে ইশারা করলেন। “ওপাশে নয়,” তিনি বললেন, স্পষ্ট শোনা যায় এমন স্বরে। “আমার পাশে।”
এটাই ছিল উল্টে যাওয়া। শুধু যাওয়া নয়, কোথায় বসবে, কার পাশে দাঁড়াবে, কোন দিকটা তার—সবকিছু একসাথে পড়ে গেল নতুনভাবে। সাব্বিরের বাবা যিনি এতক্ষণ গলার জোরে জায়গা সামলাচ্ছিলেন, তিনি আর একটা কথাও খুঁজে পেলেন না। নাঈমা আপা শাড়ির আঁচল বারবার কাঁধে তুলেও ঠিকঠাক বসাতে পারছিল না। রুবাইয়া খালার কপালের টিপের নিচে ঘাম চিকচিক করছিল, অথচ রাতের হাওয়া বেশ ঠান্ডা।
সাব্বির শেষ চেষ্টা করল। “মেহরিন, অন্তত কাল কথা বলি। তুমি রাগ করেছ, বুঝতে পারছি।”
মেহরিন দরজার কাছে থেমে বলল, “রাগ না। জায়গা বুঝে নিয়েছি।” তারপর আরমানের দিকে না তাকিয়েই যোগ করল, “আমি যাব। কিন্তু একটা কথা আগে পরিষ্কার করি।”
সবাই আবার থামল। এই থামাটা আর আগের মতো ছিল না। কেউ তাকে আটকায়নি।
মেহরিন ঘুরে দাঁড়াল। “আজ থেকে আমাকে দিয়ে কারও মান বাঁচানোর কাজ হবে না। যেটা আমার দায়িত্ব, সেটা আমি নেব। যেটা নয়, সেটা কেউ আমার হাতে ঠেলে দেবে না, আবার কেড়েও নেবে না। চলুন।”
সে নিজেই সামনের দরজা খুলে বসল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা ফাঁপা নয়, ভারী হল। যেন বহুক্ষণ ধরে কেউ একটা সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখেছিল, এখন সেটা গিয়ে ঠিক জায়গায় আটকে গেল।
গাড়ি নড়ে উঠতেই কমিউনিটি সেন্টারের উঠোনের মুখটা আবার খুলে গেল। লোক সরে যাওয়ায় ফাঁকা জায়গা দেখা দিল, যেখানে একটু আগে সবাই মিলে একটা বলয় বানিয়েছিল। ওপরের ত্রিপলের কিনারা থেকে সরে আসা রাতের বাতাসে ছাউনির ছায়া ধীরে ধীরে মাটির ওপর ফিরে এল। উঠোনের ধূসর সিমেন্ট জুড়ে সেই ছায়া পিছলে এসে থামল, আর মেহরিন জানালার কাঁচে হাত না তুলেই সোজা সামনে তাকিয়ে রইল।