Fast Fiction

যাকে নামাতে চেয়েছিল, সে-ই ওপরে উঠল

“ওই দিক না, এই দিক,” রাশেদা খালা হাত তুলে দারোয়ানকে থামালেন, তারপর মেহরিনের সামনে বাঁধা মখমলের দড়িটা সরিয়ে আবার টেনে দিলেন অন্য লাইনে। “কনের ঘনিষ্ঠদের পথ এটা। আপনি ওদিকে বসবেন, পেছনের সারিতে। নাম লেখা আছে।”

ঢাকার গুলশানের ভাড়াকরা বিয়েবাড়ির উঠানটায় আলো এমন ঝকমক করছিল যে অপমানও চকচকে দেখাচ্ছিল। ফোয়ারার ধারে গোল টেবিল, সিঁড়ির গোড়ায় ফুলের খিলান, আর মাঝখানে আগমনের ফাঁকা বৃত্ত—যেখানে কে আগে যাবে, কে কার পাশে দাঁড়াবে, সেখানেই আজ আসল বিচার। মেহরিনের হাতে ছোট ব্যাগ, ব্যাগের ভেতর দেরিতে ফেরত দিতে আসা চাবি—সাব্বিরের মিরপুরের ফ্ল্যাটের। তিন বছর ধরে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা ছিল, ঈদের দাওয়াত ছিল, অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিতে রাত ছিল; কিন্তু বিয়েবাড়ির দরজায় এসে তাকে আজ “আপনি” বলা হলো।

মেহরিন দড়ির এপাশে সরে গেল না। সামনের টেবিলে রাখা চায়ের ট্রেতে কাপ ঠান্ডা হতে হতে পাতলা চামড়া ধরেছে, নিচে গোল দাগ বসে আছে। সে সোজা চোখে বলল, “আমার নাম কোন কার্ডে লিখেছেন, দেখান।”

রাশেদা খালা ঠোঁট বাঁকালেন। “কার্ড দেখিয়ে মান-সম্মান হয় না। সম্পর্কের একটা সীমানা থাকে। সাব্বিরের এখন অনেক জায়গায় উঠাবসা। সবার সামনে ভুল ইঙ্গিত ভালো না।”

পেছনে ফিসফাস ছড়িয়ে গেল। কনের ফুফু, দুই কাজিন, মেকআপ-ঢাকা মুখে কয়েকজন মেয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। সাব্বির সিঁড়ির নিচে ফোন হাতে দাঁড়িয়েই ছিল; একবার চোখ তুলল, আবার নামাল। ওর এই নামানো চোখটাই মেহরিনকে শেষবারের মতো পরিষ্কার করে দিল—আজ যদি সে নিজে না দাঁড়ায়, কেউ দাঁড়াবে না।

রাশেদা খালা দারোয়ান-উশারকে বললেন, “ওকে বি-সেকশনে নিয়ে যান। বিয়ের আসর শুরু হলে ভেতরে ঢুকবে। এখন সামনের রাস্তা আটকে রাখার দরকার নেই।” কথার সঙ্গে সঙ্গেই এক তরুণ উশার ভদ্রতা-লাগানো কণ্ঠে হাত বাড়াল, “আপা, এইদিকে…”

মেহরিন হাত বাড়তে দিল না। “আমি যেখানে আমাকে নামিয়ে দিতে চান, সেখানে গিয়ে বসব না।” তার গলা উঁচু ছিল না, কিন্তু উঠানের বৃত্তে এত লোকের চোখ ছিল যে নিচু কথাও কাঁটার মতো গিয়ে বিঁধল। “আমাকে ডাকেননি—আমি তবু এসেছি, কারণ আমার কাছে ওর চাবি আছে। আর একটা কথা ফেরত দেওয়ার আছে। সেটা সামনেই দেব।”

নীলা, মেহরিনের ফুফাতো বোন, লোকলজ্জায় আধা পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করল, “চল না, পরে দিস—” মেহরিন চোখ না সরিয়েই বলল, “পরে দিলে আবার কেউ বলবে, কিছুই ছিল না।” নীলা থেমে গেল।

সাব্বির এবার এগিয়ে এলো, কিন্তু সোজা মেহরিনের দিকে নয়—রাশেদা খালার কাঁধের পাশে গিয়ে নিচু গলায়, যেন ভদ্রতা বাঁচায়, বলল, “খালা, ওকে ওদিকে বসতে দিলে সমস্যা কী? অনুষ্ঠান তো—” “অনুষ্ঠানই তো,” খালা কেটে দিলেন। “আর তোমার চুপ থাকাই ভালো। বড়রা আছে।” সাব্বির আবার থেমে গেল। সেই থেমে যাওয়া দেখেই চারপাশের মুখগুলো নিশ্চিন্ত হয়ে উঠল; ভুল র‍্যাঙ্কের লোককে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সবাই বুঝে নিল।

ঠিক তখনই ভেতর দিক থেকে আরেক দল লোক নামল। আগে দুজন নিরাপত্তারক্ষী, তারপর ধূসর পাঞ্জাবি-পরা এক লম্বা মানুষ—কনের বড় মামা, খন্দকার সাইফুল্লাহ। ঢাকার বাণিজ্য আর জমির আড্ডায় যার নাম উঠলে লোকেরা চেয়ারের পিঠ সোজা করে বসে। আগমনের বৃত্তে তিনি পা রাখতেই উশাররা একসঙ্গে সোজা হয়ে গেল। রাশেদা খালার গলাও সঙ্গে সঙ্গে নরম হয়ে গেল। “ভাইয়া, এইদিকে, উপরের লাউঞ্জে—”

কিন্তু সাইফুল্লাহর দৃষ্টি সবার ওপর দিয়ে গিয়ে আটকে গেল মেহরিনের হাতে ধরা ছোট ব্যাগে। তারপর তার চোখ সরল মখমলের দড়ি, নামফলক-গোঁজা টেবিল, আর দাঁড় করিয়ে রাখা মেয়েটির মুখে। “কী হয়েছে?”

রাশেদা খালা আগে উত্তর দিলেন, “কিছু না ভাইয়া, পরিচিত মেয়ে। একটু ভুল বোঝাবুঝি। আমরা বসার জায়গা ঠিক করে দিচ্ছি।”

মেহরিন বলল, “আমার বসার জায়গা ঠিক করা হয়নি, আমাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।” বৃত্তটা খানিকটা শক্ত হলো। এইটুকুই ছিল প্রথম চির। কারণ এবার সবাই শুনল, আর অস্বীকার করা গেল না।

সাইফুল্লাহ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তার সঙ্গে থাকা উশার হঠাৎ রাশেদা খালার পাশে না দাঁড়িয়ে মেহরিনের দিকে শরীর ঘুরিয়ে দিল, যেন মাঝখানে বাতাসও তাকে ধাক্কা না দেয়। সে হাত তুলে অন্যদের থামাল। “একটু সাইড, স্যার যাচ্ছেন।” কিন্তু স্যারের পথ গিয়ে থামল মেহরিনের সামনে। সিঁড়ির প্রথম ধাপের দিকে যে ফাঁকা রাস্তা ছিল, সেখানে এক মুহূর্তের জন্য লাইনের মুখটাই বদলে গেল। যারা ভেতরে ঢোকার অপেক্ষায় ছিল, তারা চোখের সামনে দেখল—প্রথম প্রশ্নটা কাকে করা হলো।

“আপনি?” সাইফুল্লাহর স্বর কড়া না, কিন্তু শুনলেই বোঝা যায়, উত্তর অস্পষ্ট হলে কারও রেহাই নেই।

মেহরিন ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটা চাবি বার করল। পুরনো রিং, নীল প্লাস্টিকের মাথায় কালির দাগ। “সাব্বিরের। আজ ফেরত দিতে এসেছি। আর ফেরত দিচ্ছি আমার অপেক্ষাও। তার আগে আমাকে পেছনের সারিতে নামিয়ে দিতে চাইছেন।”

এই প্রথম সাব্বির মুখ তুলে পুরোপুরি তার দিকে তাকাল। তাতে অনুতাপ ছিল, সাহস ছিল না।

রাশেদা খালা তাড়াতাড়ি বললেন, “মেয়েরা অনেক কিছু ভেবে নেয় ভাইয়া। ছেলেপুলের বন্ধুত্ব—” মেহরিন তার কথা কেটে বলল, “বন্ধুত্বে ঈদের সকালে তার মা আমাকে ফোন করে বাজারের তালিকা ধরাতেন না। বন্ধুত্বে কৃষি ব্যাংকের লোনের কাগজ বুঝে দিতে আমি তিনবার অফিস ছেড়ে যেতাম না। আর বন্ধুত্বে ফ্ল্যাটের চাবি বছর বছর অন্য কারও কাছে থাকে না।”

চারপাশে কারও গলার কাশি আটকে গেল। সাব্বিরের মায়ের মুখ বারান্দার ছায়া থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি এতক্ষণ ভেবেছিলেন ঘটনাটা ছোট করে গিলে নেওয়া যাবে; এখন দেখলেন, কথাটা উঠানে নেমে গেছে।

রাশেদা খালা শেষ চেষ্টা করলেন। টেবিলের উপর রাখা নামের কার্ডগুলো থেকে একটা তুলে এনে বি-সেকশনের দিকে ইশারা করলেন। “এখানে বসলে কার কী ক্ষতি? মেয়ে মানুষকে নিজের সম্মানও বুঝতে হয়।”

মেহরিন কার্ডটা নিল না। সে চাবিটা তুলে ধরল, তারপর এক পা এগিয়ে এসে আগমনের বৃত্তের মাঝের রেজিস্টার টেবিলে সেটা রেখে দিল। টুং করে শব্দ হলো। “আমার সম্মান আমি বুঝি বলেই পেছনে যাচ্ছি না। যেখানে আমাকে অস্বীকার করতে সুবিধা, সেখানে বসব না।”

এই দাঁড়িয়ে থাকা—ফিরে না যাওয়া, বসে না পড়া—উঠানের সব আলোকে খারাপ করে দিল। এখন যদি কেউ তাকে জোর করে সরায়, সেটা সবাই দেখবে। যদি তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, সেটাও সবাই দেখবে। আর সাব্বির যদি আবার চুপ থাকে, তাও সবাই দেখবে।

সাইফুল্লাহ টেবিলের কার্ডগুলোর দিকে তাকালেন। সামনের সারি, ভিআইপি লাউঞ্জ, পরিবারের ঘনিষ্ঠ, বিশেষ অতিথি—সব আলাদা করে সাজানো। তিনি হাত বাড়িয়ে একটা মোটা সোনালি বর্ডারের কার্ড তুললেন, যেটা রাশেদা খালা সম্ভবত কনের এক প্রবাসী আত্মীয়র জন্য আলাদা করে রেখেছিলেন। তারপর সবার সামনে সেটা উল্টে পেছনে কিছু লিখলেন টেবিলের কলমে। কলমের মাথায় পুরনো কালির দাগ, চাপ পড়ে আঙুলে ছাপ ফেলল। লেখা শেষে তিনি কার্ডটা রেজিস্টার টেবিলের সবচেয়ে সামনে গুঁজে দিলেন, ঠিক সিঁড়ির পথের মুখে।

“মেহরিন,” তিনি পরিষ্কার গলায় নামটা পড়লেন না, ঘোষণা করলেন। তারপর উশারকে বললেন, “উপরে কনের পরিবারের লাউঞ্জে প্রথমে যাবে। পথ খালি করো।”

শব্দটা উঠানে ধাক্কার মতো লাগল—প্রথমে যাবে। রাশেদা খালার হাতে ধরা বি-সেকশনের কার্ড কেঁপে নিচে পড়ে গেল। তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, “ভাইয়া, এতে ভুল বার্তা যাবে—” “ভুল বার্তা এতক্ষণ গেছে,” সাইফুল্লাহ এবার তার দিকে না তাকিয়েই বললেন। “এখন সোজা বার্তা যাবে।”

এটাই শুধু ছিল না। তিনি পাশ ফিরেই সাব্বিরকে ডাকলেন, “তুমি পেছনে থাকো। অতিথির পথ আটকে রেখেছ অনেকক্ষণ।” এই এক বাক্যে দৃশ্যটা ভেঙে গেল। যাকে সামনে রেখে এতক্ষণ র‍্যাঙ্ক বানানো হচ্ছিল, তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো লাইনের বাইরে। সাব্বিরের মুখে রক্ত উঠে আবার সরে গেল। তার পাশে দাঁড়ানো দুই কাজিন স্বভাববশত তার আগে উঠতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ উশার ইতিমধ্যে মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাতে পথ খুলে দিয়েছে।

রাশেদা খালা এবার সরাসরি উশারকে ধমকালেন, “তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? আগে ভাইয়ার অতিথিরা—” উশার কেবল একবার সাইফুল্লাহর দিকে তাকাল। তারপর নিজের মেরুন কোটের হাতা গুটিয়ে দড়িটা তুলে ধরল মেহরিনের জন্য। রাশেদা খালার কথার ওপর আর কেউ কাজ করল না। এটাই ছিল তার আসল ক্ষতি—গলা ছিল, কর্তৃত্ব আর ছিল না।

মেহরিন কার্ডটার দিকে তাকাল। তার নাম সোনালি বর্ডারের সাদা কাগজে তাড়াহুড়োর কালি-ভেজা অক্ষরে লেখা। সে কার্ডটা তুলে নিল না, টেবিলেই থাকতে দিল, যেন সবাই পড়তে পারে। তারপর চাবিটার পাশে আঙুল রাখল, এক সেকেন্ড স্থির থেকে সেটাও ঠেলে দিল সাব্বিরের দিকে। “যেটা ফেরত দেওয়ার, দিয়ে দিলাম।”

সাব্বির এবার এক পা এগিয়ে এল। “মেহরিন, এক মিনিট—” সে তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “মিনিট শেষ।” তারপর উশারের খোলা পথের দিকে মুখ ফেরাল।

সাইফুল্লাহ নিজে আধা পা সরে দাঁড়ালেন, কিন্তু তার সরে দাঁড়ানোয় সম্মান ছিল, দয়া না। “যাও।”

এবার উঠানটাই শরীর বদলাল। যেসব মহিলা একটু আগে কাঁধ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা শাড়ির আঁচল টেনে ফাঁক করল। এক কিশোর কাজিন হাতে মোবাইল তুলতে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে ফেলল; কেউ তাকে তাকিয়ে দেখেনি, কিন্তু এমন দৃশ্যে কী রেকর্ড করা যায় আর কী যায় না, সে বুঝে গেছে। সাব্বিরের মা বারান্দার রেলিং ধরে রইলেন, নামলেন না। রাশেদা খালা ঝুঁকে পড়ে বি-সেকশনের পড়ে যাওয়া কার্ড তুলতে গিয়েও থামলেন, কারণ সেটা তুললে বোঝা যাবে কোন জায়গাটা তিনি মেহরিনকে দিতে চেয়েছিলেন।

মেহরিন ধীরে হাঁটল, তাড়াহুড়ো নয়, লজ্জায় পালানোও নয়। তার পায়ের হিলের শব্দ মার্বেলের ওপর শুকনো, মাপা। সিঁড়ির গোড়ায় এসে সে একবার মাথা ঘুরিয়ে শুধু এতটুকু বলল, “আজ থেকে আমাকে পেছনের সারিতে রাখার দরকার নেই। আমি নিজেই আসব না।” তারপর সে সিঁড়িতে পা রাখল।

উপরে ওঠার করিডরে হলুদ আলো মৃদু গুঞ্জন তুলছিল। নিচের শব্দ একটু ভোঁতা হয়ে এসেছে, কিন্তু পথের বদল চোখে লেগে ছিল স্পষ্ট। সামনের ল্যান্ডিংয়ে দুজন অপেক্ষমাণ অতিথি নিজেদের কথার মাঝখানেই সরে দাঁড়াল। উশার আগে এগিয়ে গিয়ে হাত তুলেছিল, তারপর মেহরিন উঠতেই তার মেরুন হাতাটা প্রথমে পথ থেকে সরে গেল—কাপড়ের কিনারা বাতাস কেটে পাশে নেমে গেল, আর খালি হয়ে থাকা সেই সরু পথ ধরে মেহরিন সবার আগে উপরের দিকে উঠে গেল।