শেষে কাজটা আমার হাতেই ফেরাল
প্লাস্টিকের টোকেনের ঝুনঝুন শব্দ তুলে রাশেদ স্যার মেহরীনের সামনে থেকে লাল ফাইলটা সরিয়ে বলল, “ওই কনসোলের দিকে যাবেন না। কাউন্টারে দাঁড়ান, নাম লিখেন। লাইভ ছাড় আমি দেব।”
সকালের ভিড় তখন ঢাকা শহরের ধোঁয়া-গরম বাতাসের মতো ঘন হয়ে কাউন্টারের সামনে জমে আছে। কৃষি-যন্ত্র সেবা কেন্দ্রের লোহার শাটার আধঘণ্টা আগে উঠেছে, তবু সামনে পনেরো জনের লাইন, কারও হাতে পাম্পসেটের ছবি, কারও কাঁধে খোলা গিয়ারের বস্তা, কারও ফোনের আলো তালুর ভেতর নিচু করে ধরা—কাজ থেমে গেলে মাঠে সেচ থেমে যাবে বলে সবাই একসঙ্গে তাড়াহুড়ো করছে। কাউন্টারের ডানপাশে মেরামত লেনের মুখে একখানা পাওয়ার টিলারের ড্রাইভ-অ্যাসেম্বলি টুল-রোলে বাঁধা, এখনই ঢোকার কথা ছিল। মেহরীনের ওড়নায় রাতের শিফটের ভাঁজ এখনো পড়ে আছে, কাঁধ শক্ত। সে জানে, ওই কাজটা আগে না ছাড়লে পেছনের সব অর্ডার গিয়ে জট বাঁধবে।
একজন বয়স্ক লোক, গায়ে ধুলোমাখা পাঞ্জাবি, কাউন্টারে ঝুঁকে বললেন, “মা, আমারটা জরুরি। আজই না ধরলে খুলনার গাড়ি ফিরতে পারব না।”
মেহরীন ফাইলটার দিকে হাত বাড়িয়েছিল। রাশেদ স্যার তার আগেই ফাইল তুলে তানভীরের হাতে দিল। “তানভীর করবে। নতুনদেরও শিখতে হয়।” তারপর গলাটা একটু নামিয়ে, কিন্তু শোনার মতো করেই বলল, “সব কাজ সবার জন্য না। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলে কেউ কাউন্টারের মাথায় উঠে বসে না।”
লাইন থেকে দু-একজন মুখ তুলল। এই শহরে কে কার খালাতো-ফুফাতো চেনে, সেটা কাজের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। মেহরীন এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর সে নাম লেখার খাতা নিজের দিক থেকে সরিয়ে দিল, আর পাশে রাখা আটকে থাকা ওয়ার্ক-স্লিপের স্তূপ টেনে কাউন্টারের কিনারায় সোজা করে রাখল। “ঠিক আছে,” সে ঠান্ডা গলায় বলল, “তাহলে এই টিলারের ছাড় তানভীর দিক। সামনে সবাই দেখুক।”
প্রথম পুরস্কারটা এতটুকুই—দায় সে নামায়নি। রাশেদ স্যার ভেবেছিল, মেহরীন গিলে নেবে; সে উল্টো সবার সামনে কাজটা কাদের হাতে গেল, সেটা দাগ কেটে দিল।
তানভীর ফাইল খুলেই থমকাল। নম্বর মিলাতে গিয়ে সে গ্রাহকের রশিদ আর ওয়ার্ক-স্লিপ উল্টো ধরে ফেলল। “এটার... আগে পরিদর্শন লাগবে,” সে বলল।
মেহরীন তাকাল না, তবু বলে দিল, “রাতে পরিদর্শন সিল পড়ে গেছে।”
তানভীর শুনেও শুনল না। কম্পিউটারের বদলে সে পাশের খাতায় খুঁজছে, তারপর ভুল গেটপাস নম্বর লিখে ফেলল। লাইনের পেছন থেকে একটা বিরক্ত গুঞ্জন উঠল। বয়স্ক লোকটা এবার হাত কাঁপিয়ে বললেন, “আমার ড্রাইভার বাইরে দাঁড় করায়া রাখছে। এই যে আপনারা সকাল সকাল নিলেন, এখন আবার কাগজ নাই?”
রাশেদ স্যার মুখ শক্ত করে বলল, “চাপ দেবেন না। কাজ হচ্ছে।”
কাজ হচ্ছিল না। উল্টো পিছনে আরও তিনজন মাল নামিয়ে লাইনে দাঁড়াল। মেরামত লেনের মুখ বন্ধ থাকায় ভিতর থেকে শিউলী আপা বেরিয়ে এসে ফিসফিস না করে সরাসরি বলল, “রাশেদ ভাই, লেন ফাঁকা রাখা যাচ্ছে না। বাইরে জিনিস জমে গেছে।”
রাশেদ স্যার তার দিকে না তাকিয়েই হাত নাড়ল, যেন বাতাস সরাচ্ছে। “অপেক্ষা করেন।”
মেহরীনের তালুতে ধরা ফোনে একবার ক্ষীণ আলো জ্বলে নিভল—মা মেসেজ দিয়েছে, মামার বাড়ির এক খালামণি নাকি আবার জিজ্ঞেস করেছেন, “মেয়েটা এখনো ওই জায়গায় আছে?” সে ফোনটা উল্টো করে রাখল। এই কর্মস্থলে তার থাকা-না-থাকা নিয়েও যে ঘরে কথা ওঠে, তা রাশেদ স্যার জানে। জানে বলেই এই কথা বলে।
তানভীর এবার ভুল স্লিপে নীল সিল মারতে গিয়ে থেমে গেল। “স্যার, লেন নম্বর কোনটা দেব?”
রাশেদ স্যার ঝাঁঝিয়ে উঠল, “আমি একা সব বলব নাকি?”
সেই মুহূর্তেই ভিতর থেকে আরেকজন দৌড়ে এলো, হাঁপাতে হাঁপাতে। “সিলেটের ডিলার পাঠাইছে—হারভেস্টারের কন্ট্রোল বক্স। দুপুরের আগে ধরতে না পারলে ফেরত নিয়ে যাবে। আগে ছাড় লাগে।”
লাইন যেন এক ধাক্কায় সামনে ঝুঁকে পড়ল। নতুন জরুরি কাজ, আর সামনেরটাও আটকে। বয়স্ক লোকটা এবার কাউন্টারে কপাল ঠেকিয়ে বললেন, “আমাদের নিয়ে খেলা করেন না।”
মেহরীন এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ উঁচু হয়নি, কিন্তু কাউন্টারের ওপরের কাচে ঠুকে ফিরে এল, পরিষ্কার। “শিউলী আপা, টুল-রোলটা এখানে দিন। আর টিলারের ফাইলটা আমার দিকে।”
রাশেদ স্যার ঘুরে তাকাল, যেন সে সীমা পার হয়ে ফেলেছে। “কে বলল?”
মেহরীন এবার তার চোখে চোখ রাখল। “যে জানে কোনটা আগে ছাড়লে লাইন খুলবে, সে বলছে।”
কথা শেষ করেই সে কাউন্টারের পাশের সরু ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে মেরামত লেনের মুখে গেল। চাকার কালো দাগমাখা টুল-রোলটার হাতল ধরে টেনে এনে একেবারে কাউন্টারের সামনে রাখল। সবাই দেখল—সে লুকিয়ে নয়, কাঁধের জোরে, খোলা জায়গায় দখল নিল। শিউলী আপা এক সেকেন্ডের জন্য রাশেদের দিকে তাকিয়ে ছিল; তারপর মেহরীনের দিকে স্লিপ বাড়িয়ে দিল। এটাই ঘরের বিচার। কাজ যার হাতে নড়ে, টুলও তার দিকেই যায়।
রাশেদ স্যার তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “নিজে নিজে কিছু ধরবেন না।”
মেহরীন টিলারের রশিদটা কাউন্টারে চেপে ধরে বলল, “তানভীর, রাত্রির পরিদর্শন সিলের নিচে যে কোড, সেটা পড়েন। না পারলে চুপ থাকেন।” তারপর বয়স্ক লোকটার দিকে, “আপনার ড্রাইভারকে বলেন লেন-দুইয়ের সামনে আনতে। এখনই নামবে।”
তানভীর সত্যিই চুপ করে গেল। শিউলী আপা ভিতরের ছেলেকে ডাকল, “লেন-দুই খালি করো।” পেছন থেকে কেউ আর রাশেদ স্যারকে কিছু জিজ্ঞেস করল না; দুজন গ্রাহক সরাসরি মেহরীনের সামনে কাগজ বাড়িয়ে ধরল। কাউন্টারের বাতাস বদলাতে শব্দ লাগে না, দিক বদলালেই যথেষ্ট। রাশেদ স্যারের গলায় সেই চওড়া হুকুমের ভর আর থাকল না। সে বলল, “আগে এইটা শেষ—”
“আগে আটকে থাকা ছাড়,” মেহরীন তার কথার ওপরেই বলল। “তারপর সিলেটের বক্স। না হলে দুই দিকই থামবে।”
সে টিলারের স্লিপে লেন নম্বর লিখে দিল, ওয়ার্কশপ ছাড়ের সিল মারল, আর শিউলী আপার দিকে না তাকিয়ে শুধু আঙুল দেখাল। ভিতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে মাল টানা শুরু হয়ে গেল। বয়স্ক লোকটার মুখের ভাঁজ একটু নরম হল, কিন্তু তিনি ধন্যবাদ দেওয়ার সময় পেলেন না; কারণ সামনের কাজ আসলেই নড়ে গেছে।
এই পর্যন্ত এসে রাশেদ স্যার শেষ চেষ্টাটা করল। সে ড্রয়ার খুলে কালো ফিতায় ঝোলানো নিয়ন্ত্রণ-ব্যাজটা বের করে নিজের তালুতে চেপে রাখল। ওই ব্যাজ ছাড়া দ্রুত ছাড়ের অনুমতি খোলে না; সিস্টেমে নাম থাকে, দরজায়ও ওটাই দেখাতে হয়। সে ব্যাজ হাতে নিয়ে বলল, “পরেরটা আমি দেখব।”
ঠিক তখনই সিলেটের হারভেস্টার বক্সের কাগজ সামনে এল, আর শিউলী আপা খুব ছোট গলায়, কিন্তু ধারালো করে বলল, “এইটার কোড-ওভাররাইড লাগবে। আজকে কেন্দ্রের একমাত্র সক্রিয় অনুমোদন মেহরীনের নামে ছিল। রাতের শিফটে বদলানো হয়নি।”
এক সেকেন্ড। এতটুকু সময়েই লাইনের সব অস্বস্তি এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। রাশেদ স্যারের হাতের ব্যাজ এখন জিনিস, কর্তৃত্ব না। সে যদি আটকে রাখে, পরের জরুরি কাজ পড়ে থাকবে, সবার সামনে। সে যদি দেয়, তার নিজের গলাটাই খুলে যাবে। তানভীর নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। বয়স্ক লোকটা সরে না গিয়ে দাঁড়িয়ে। পিছনে নতুন আসা ডিলারের লোক ফোন কানে নিয়ে রাগত গলায় কাউকে বলছে, “এখনো ছাড় পাইলাম না।”
মেহরীন হাত বাড়াল। না চেয়ে নয়—নেয়ার মতো করে। “ব্যাজ।”
রাশেদ স্যার নড়ল না। মেহরীন এবার আরেক ধাপ এগিয়ে কাউন্টারের কাচের ফাঁক দিয়ে নিজের স্লিপ-রেজিস্টার তার দিকেই টেনে আনল। “ব্যাজ না দিলে এটাও বন্ধ,” সে বলল। “তাহলে সামনে যাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, সবাই শুনুক, আপনার হাতে থাকলেও কাজ ছাড়ে না।”
চাপ এবার তাকে বেছে নিল। রাশেদ স্যারের কপালে ঘাম চিকচিক করল। সে একবার লাইনের দিকে তাকাল, একবার শিউলী আপার দিকে। কেউ তার হয়ে কথা বলল না। শেষে যেন দেরি করে ফেরত দেওয়া চাবি ছুঁড়ে দিচ্ছে, সেই ভঙ্গিতে ব্যাজটা মেহরীনের তালুতে ছেড়ে দিল।
মেহরীন সেটা সঙ্গে সঙ্গে গলায় ঝুলিয়ে নিল না। প্রথমে সিলেটের ফাইল খুলল, কোড লিখল, অনুমোদনের সিল মারল, লেন নম্বর বসাল। তারপর ব্যাজটা বুকের ওপর ফিতায় ঝুলিয়ে শিউলী আপাকে বলল, “কন্ট্রোল বক্স লেন-এক। টিলারের পরে। তানভীর, রশিদের কপি আলাদা করো। ভুল করলে আমার কাউন্টারে দাঁড়িয়ে করবা, লুকায়া না।”
“জি,” তানভীর বলল, এত আস্তে যে শব্দটা শোনা না গেলেও মাথা নোয়ানোটা দেখা গেল।
রাশেদ স্যার এবার বলল, “মেহরীন, আমি তো শুধু—”
সে তার দিকে তাকালই না। পরের গ্রাহকের কাগজ নিয়ে বলল, “পরেরটা আনেন।”
যে লোকটা কিছুক্ষণ আগে ফোনে ঝাঁঝিয়ে কথা বলছিল, সে এবার কাগজটা দুই হাতে তুলে ধরল, যেন কাকে দিতে হবে তা বুঝে গেছে। কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো দুই গ্রাহক সরে জায়গা করে দিল। রাশেদ স্যার কাউন্টারের এক পাশে রয়ে গেল, কিন্তু আর তাকে পাশ কাটিয়ে কেউ কথা বলল না। কর্তৃত্ব হারালে মানুষ অদৃশ্য হয় না; শুধু তার মুখের সামনে দিয়ে কাজ অন্যদিকে চলতে থাকে।
দশ মিনিটের ভেতরে প্রথম আটকে থাকা টিলার মেরামত লেনে ঢুকে গেল, তার পরেই হারভেস্টার বক্স। বাইরে জমে থাকা লোহার গন্ধ, গরম তেলের কটু বাতাস, আর ভোরের থকথকে বিরক্তি একটু সরল। মেহরীন কাউন্টারের শেষ স্লিপে স্বাক্ষর করে ব্যাজটা বুকের ওপর ঠিকঠাক বসাল। কেউ তাকে অভিনন্দন দিল না; দরকারও ছিল না। কাজ নড়েছে—এই একটুকুই যথেষ্ট অপমান, যার হাত থেকে কাজ কেড়ে নিতে গিয়েছিল, তার জন্য।
তারপর সে টুল-রোলটা দুহাতে ধরল। মেরামত লেনের সরু করিডরে হালকা মেশিনের গুঞ্জন, মাথার ওপর টিউবলাইটের একটানা ভনভন। বুকের সঙ্গে ব্যাজ ঠেকে আছে। মেহরীন এক ধাক্কায় টুল-রোল এগিয়ে দিল; চাকার কাঁপুনি সোজা হয়ে গেল, লেনের মসৃণ সিমেন্টে গড়িয়ে সত্যি পথে চলতে শুরু করল।