হাসিটা আগে ছিল, লজ্জা পরে
“ওদিকে না, পেছনের বারান্দা দিয়ে ঢোকো—জুতোও খুলে রাখো,” নাসরিন খালা হাত তুলে মেহজাবিনের পথ কেটে দিলেন, এমন ভঙ্গিতে যেন সে কোনো অতিথি না, রান্নাঘরের লোক। সামনে উঠোনে গাঁদা আর রজনীগন্ধার খিলান, ফটকে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মানুষ ঢুকছে, কনের মামারা সালাম নিচ্ছে, আর তাকে সবার সামনে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেহজাবিনের হাতে পাতলা কাগজে মোড়া একটা খাম শুকনো শব্দ করল। অন্য হাতে ধরা চায়ের কাপ এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে ওপরটায় আস্তরণ ফেলেছে; কাপটা নামানো হয়েছিল মিনিটখানেকের জন্য, এখনো প্রবেশমুখের টেবিলের কোণায় তার গোল দাগ পড়ে আছে।
নাসরিন খালা নিচু গলায় বললেন না, ইচ্ছে করেই উঁচু গলায় বললেন, “সবাইকে তো এক দরজা দিয়ে আনা যায় না। যার যতটুকু পরিচয়, ততটুকুই মানায়।”
ফটকের কাছে দাঁড়ানো দুই খালা-মামী একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসল। কেউ সরাসরি তাকাল না, কিন্তু সবাই শুনল। এ বাড়ির গায়ে মেহজাবিনের শ্রম লেগে আছে—দুই সপ্তাহ ধরে কনের গায়ে-হলুদের থালা, নিমন্ত্রণের তালিকা, হলুদের কৌটা, ফুলওয়ালার বকেয়া—সব সে সামলেছে। কারণ একসময় বলা হয়েছিল, “তুমি তো আমাদেরই মানুষ।” সেই “আমাদের” আজ দরজায় এসে সরে গেছে।
মেহজাবিন এক পা-ও সরল না। ঠান্ডা চায়ের কাপটা টেবিলের কোণ থেকে তুলে নিল, পাশের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বাক্সটা সরিয়ে জায়গা করল, তারপর নিজেই কাপটা নাসরিন খালার সামনে নামিয়ে রাখল। কাপে জমে ওঠা পাতলা আস্তরণ কেঁপে উঠল। “চা নিন,” সে শান্ত গলায় বলল, “আমি পেছন দিয়ে ঢুকলে সামনের অতিথিদের নাম কে ধরবে? আপনি?”
কথাটা চিৎকার ছিল না, কিন্তু উঠোনে ছোট্ট ফাটল ধরার জন্য এতটাই যথেষ্ট। সাজসজ্জার ছেলেটা ফুলের ঝুড়ি হাতে থেমে গেল। গেটের তালিকা হাতে থাকা স্কুলপড়ুয়া ভাতিজা চোখ তুলে নাসরিন খালার দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য খালার মুখে সেই নিশ্চিন্ত কর্তৃত্বটা কেঁপে উঠল।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিলেন। “তোমার কাজই তো নাম ধরা। কাজের লোক কাজ করবে, অতিথি অতিথির জায়গায় বসবে। এত বুঝতে শেখোনি এখনও?”
মেহজাবিন এবার পেছনের বারান্দায় যায়নি, কিন্তু সামনেও ঢোকেনি। সে ফটকের পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসল না, দাঁড়িয়েই বলল, “তাহলে স্পষ্ট বলেন, আমি এই বাড়ির কী? কাজের লোক, না আত্মীয়?”
প্রশ্নটা এমন ছিল যে কেউ উত্তর দিতে চাইল না। নাসরিন খালা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে অন্য অতিথিকে ডেকে নিলেন, “এই যে ভাই, এদিকে আসেন, সামনের আসন খালি আছে।” আর সেই ফাঁকে মেহজাবিনের হাতে একটা মোটা খাতা আর কলম গুঁজে দিলেন। “এখানে দাঁড়িয়ে তালিকা দেখো। কারা ভেতরে যাবে, কারা উঠোনে বসবে, আগে আমাকে জিজ্ঞেস করে দেবে। নিজের মাথা খাটাবে না।”
তারপর আরও নিচে নামালেন। কনের সহপাঠী সাবিহা ভাবি এসে হাসিমুখে ভেতরে ঢুকতে চাইতেই নাসরিন খালা বললেন, “না না, ওকে ভেতরে নাও। মেহজাবিন, তুমি বরং জুতোর র্যাকটার দিকও দেখো। এত ভিড়ে হারিয়ে গেলে কিন্তু দায় তোমার।”
জুতোর র্যাক। তালিকা। ফটকে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে লোক সামলানো। যে মেয়েটা কনের মেকআপ আর সময় মেলাতে সকাল থেকে দৌড়েছে, তাকে এখন সবার সামনে দরজার নিচু দিকটায় গেঁথে রাখা হলো। উঠোনের মাঝখানে প্যান্ডেলের নিচে সাদা কভার দেওয়া চেয়ার, সামনে শীতলপাটি, বড়দের সারি। আর সে ফটকের সিমেন্টের কিনারায়, যেখানে ধুলো, জুতো, আর ভেজা ফুলের কাঁটা মিশে আছে।
“খালা,” সাবিহা ভাবি থমকে বলল, “মেহজাবিন তো—”
নাসরিন খালা তার কথা কেটে দিলেন। “বিয়েবাড়িতে কার কী জায়গা, সেটা বড়রা বুঝবে। তুমি ভেতরে যাও।”
সাবিহা ভাবি আর কথা বলল না। তার চুড়ির শব্দ ম্লান হয়ে ভেতরে মিলিয়ে গেল। মেহজাবিন খাতাটা নিল। নাম লেখার টেবিলের কোণায় পানের বাটা, ভাঁজ করা রুমাল, আর রসিদের খাম ঠেসে আছে। সে পাতাগুলো উল্টাল। প্রথম পাতায় কনের পক্ষ, দ্বিতীয় পাতায় বরপক্ষ, তৃতীয় পাতায় বিশেষ অতিথি। নিজের নাম নেই—অবশ্য থাকার কথাও নয়, যদি মানুষটাকেই তালিকার বাইরে ফেলে দেওয়া যায়।
গেটের ভিড় ঘন হলো। কেউ তাকে “মা” বলে নাম বলছে, কেউ “আপা” বলে কক্ষের খোঁজ চাইছে, কেউ আবার সোজা নাসরিন খালাকেই ডাকছে। মেহজাবিন নাম ধরে, সম্পর্ক ধরে, জায়গা বুঝিয়ে দিচ্ছিল; কাজটা সে-ই জানে বলে সবার চলাচল তার দিকে বেঁকে আসছিল। তবু নাসরিন খালা মাঝেমধ্যে এসে কাঁধের ওপর দিয়ে দেখে যাচ্ছিলেন, “ওদের ভেতরে না, পাশের দোতলায়। ওদের চেয়ার পেছনে। ওরা কৃষি ব্যাংকের অফিসার না, ওরা দূর সম্পর্কের।”
শুনতে শুনতে মেহজাবিনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। “দূর সম্পর্কের” কথাটার ভেতরে লুকোনো ছুরি সে বুঝল। তার বাবার খুলনার জমি বেচে ভাইয়ের পড়াশোনা উঠেছিল, মায়ের অসুখে ধার করা টাকা শোধ করতে সে ঢাকায় চাকরি নিয়েছে, আর এই নাসরিন খালার মেয়ে রিমির বিয়ের কেনাকাটায় শেষ তিন মাসের সঞ্চয়ও সে তুলে দিয়েছে—কেউ তাকে বাধ্য করেনি, কিন্তু সবাই ধরেই নিয়েছিল সে দেবে। কারণ সে “নিজের মানুষ”। খরচের সময় নিজের, সম্মানের সময় বাইরে।
বরের ফুপুদের একটা দল ঢুকতেই নাসরিন খালা দূর থেকে বলে উঠলেন, “মেহজাবিন, দাঁড়িয়ে থেকো সোজা হয়ে। এমন মুখ কোরো না যেন কষ্ট পাচ্ছ।”
এইবার কয়েকটা মুখ ঘুরে সরাসরি তাকাল। অপমানকে কেবল দেওয়া হয়নি, নামও বলে দেওয়া হলো। মেহজাবিন খাতা বন্ধ করল। “আমি কষ্ট পাচ্ছি কি না, সেটা আপনি এত ভাবছেন কেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
“কারণ তুমি দৃশ্য বানাতে ওস্তাদ,” নাসরিন খালা কড়া গলায় বললেন। “তোমাকে সুযোগ দিয়েছি বলেই আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছ। সীমা না জানলে বাইরে দাঁড়াতে হবে।”
বাইরে। শব্দটা ফটকের লোহার গ্রিলের মতো ঠান্ডা।
ঠিক তখনই উঠোনের ভেতর থেকে ইমামুল চাচা বেরিয়ে এলেন। বয়স হয়েছে, হাঁটেন ধীরে, তবু মানুষ থেমে যায় তাকে জায়গা দিতে। তিনি রিমির মৃত বাবার বড় ভাই, আর এই বিয়েতে তাঁর মাথা না থাকলে কারও মুখ নেই। নাসরিন খালার কণ্ঠস্বর বদলে গেল, “ভাই, আপনি ভেতরে যান, আমি সব সামলে নিচ্ছি।”
ইমামুল চাচার চোখ প্রথমে গেট, তারপর খাতা, তারপর মেহজাবিনের সামনে রাখা জুতোর র্যাকের দিকে গেল। “ও এখানে কেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
নাসরিন খালা হাসলেন, “ভিড় তো, একটু কাজে লাগাচ্ছি। মেয়ে মানুষ, কাজ করলে খারাপ কী?”
“কাজ?” মেহজাবিন উত্তর দেওয়ার আগেই ভেতর থেকে আরেকজন বেরিয়ে এল—রাশেদ।
তাকে দেখে অনেকের কাঁধ একটু সোজা হলো। বরপক্ষের সঙ্গে তার পরিচয় আলাদা, কারণ সে শুধু রিমির খালাতো ভাই নয়; ঢাকায় নিজের কোম্পানি দাঁড় করিয়েছে, গুলশানে অফিস, লোকজন তাকে নাম ধরে নয়, ভদ্রতা মেপে ডাকে। এই বিয়ের বড় খরচের একটা অংশও এসেছে তার হাত দিয়ে—যেটা নিয়ে নাসরিন খালা সবসময় এমনভাবে কথা বলেন যেন কৃতিত্বটা তাঁরই।
রাশেদের শেরওয়ানির হাতা গোটানো, মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কিছু সামলে এসেছে। সে ফটকের ভিড় ঠেলে সামনে এসে প্রথমে মেহজাবিনের হাতে খাতা দেখল, তারপর নাসরিন খালার মুখ। “আপনি ওকে এখানে বসিয়েছেন?”
“বসাইনি, দায়িত্ব দিয়েছি,” নাসরিন খালা জবাব দিলেন। “সবাই কি আর ভেতরের জায়গার লোক? যার যেমন মানায়—”
“খালা,” রাশেদ এবার খুব নিচু স্বরে বলল, কিন্তু তার সেই নিচু স্বরেই উঠোনের কয়েকজন থেমে গেল, “এই বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের প্রিন্ট ভুল হলে কে ঠিক করেছে?”
নাসরিন খালা ভুরু কুঁচকালেন। “সে নিয়ে এখন—”
“ফুলওয়ালা টাকা না পেলে গতরাতে কে নগদ দিয়েছে? রিমির গয়নার কাগজ কার কাছে ছিল? কাবিনের সাক্ষীর নাম কে বসিয়েছে?”
প্রশ্নগুলো ধারাবাহিকভাবে আঘাত করল। গেটের সামনে দাঁড়ানো দুজন মামা পা সরিয়ে একটু পাশ হলো। সাবিহা ভাবি ভেতর থেকে আবার বেরিয়ে এসে এবার দূরে থামল না; সোজা মেহজাবিনের পাশে এসে দাঁড়াল। তার গায়ের ওড়নাটা মেহজাবিনের কাঁধে লেগে রইল। আরেকজন কাজের মেয়ে, যে এতক্ষণ জুতোর র্যাকের পাশে কুঁজো হয়ে ছিল, সে র্যাকটা টেনে অন্যদিকে সরিয়ে দিল। ফটকের সরু পথটা খুলে গেল।
এই ছোট ছোট সরে দাঁড়ানো, কাঁধের ঘোর, হাঁটার পথ বদলে যাওয়া—পুরো উঠোনের পড়া বদলে দিল। কিছু মানুষ আর নাসরিন খালার দিকে তাকিয়ে নির্দেশ নিল না; তারা খাতা হাতে মেহজাবিনের দিকে ফিরে নাম বলল। ইমামুল চাচা সোজা এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “তালিকাটা আমাকে দাও।”
মেহজাবিন খাতা বাড়িয়ে দিল। চাচা পাতা উল্টে দেখে একবার রাশেদের দিকে তাকালেন। তারপর সবার সামনে, গেটের খোলা জায়গায়, খাতাটা আবার মেহজাবিনের হাতেই ফিরিয়ে দিলেন। “এটা যার হাতে ঠিক আছে, তার হাতেই থাকুক।”
নাসরিন খালা এবার সত্যি থমকালেন। “ভাই, আপনি আমার কথার মানে—”
“মানে সবাই বুঝছে,” ইমামুল চাচা শুকনো গলায় বললেন।
উঠোনে তখন গুঞ্জন নেই, কিন্তু চলাচলের ভঙ্গি বদলে গেছে। যাদের একটু আগে ভেতরে পাঠানো হচ্ছিল, তারা এখন মেহজাবিনের সামনে এসে থামছে; যে পথ দিয়ে তাকে পেছনে পাঠানো হচ্ছিল, সেই পথেই দুজন বয়স্কা খালা এসে তাকে সালাম দিলেন। নাসরিন খালার মুখে হাসি আটকে থাকল, কিন্তু চোখে হিসাব বদলে গেল। তিনি বুঝলেন পুরনো ঢঙে আর টানা যাবে না।
তাই তিনি চাল বদলালেন।
“আচ্ছা, ঠিক আছে,” তিনি হঠাৎ নরম সুরে বললেন, যেন এতক্ষণ কিছুই হয়নি। “মেহজাবিন, তুমি মন খারাপ কোরো না। ভিড়ে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়। তুমি ভেতরে এসো, কনের ঘরে বসো। ফটকের দায়িত্ব আমি অন্য কাউকে দিচ্ছি।”
এই অফারটা এত সুন্দর করে দেওয়া হলো যে বাইরের লোক শুনলে মনে করবে মান ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আসলে এটা ছিল সরিয়ে দেওয়া—কেন্দ্র থেকে সরিয়ে ভিতরের বন্ধ ঘরে পাঠানো, যেখানে কেউ দেখবে না, শুনবে না। নাসরিন খালা হাত বাড়িয়ে খাতা নিতে চাইলেন। “দাও, এবার আমি দেখি।”
মেহজাবিন খাতা ছাড়ল না।
রাশেদ এক পা এগোল, কিন্তু সে থামল। এ মুহূর্তে অন্যের কণ্ঠে জেতা যাবে না; সেটা মেহজাবিনও বুঝল। সে খুব আস্তে বলল, “এখন মনে পড়ল, আমি ভেতরের লোক?”
নাসরিন খালার ঠোঁট শক্ত হলো। “এত নাটক করো না। যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে বিয়েবাড়ির মান থাকে না। আমি ডাকছি, এটাই অনেক।”
“শর্ত দিয়ে ডাকছেন,” মেহজাবিন বলল। “বাইরে অপমান, ভেতরে চুপচাপ বসে থাকলে তবেই মান?”
চারপাশে কিছু হাত থেমে গেল—কেউ পানির জগ নামাতে গিয়ে, কেউ শিশুকে টেনে আনতে গিয়ে, কেউ ফুলের ট্রে ধরে। নাসরিন খালা এবার খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন, “তুমি কী চাও? বলো। সবার সামনে বলো। কী পরিচয়ে তুমি এই দরজায় দাঁড়াবে?”
প্রশ্নটা ছুরি হয়ে বেরোল। তিনি ভেবেছিলেন, মেহজাবিন থেমে যাবে। এই বাড়িতে তার রক্তের সম্পর্ক আছে, কিন্তু ঢিলে; স্নেহের সম্পর্ক আছে, কিন্তু লিখিত নয়; আর রাশেদের সঙ্গে যে অদ্ভুত, অর্ধেক-লুকোনো টানটা বছরের পর বছর ধরে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার চোখ এড়িয়ে থেকেছে, তা কেউ মুখে আনে না। কারণ মুখে আনলে দায় তৈরি হয়।
মেহজাবিন এবার দায়টাই সামনে তুলল।
সে খাতাটা বন্ধ করল, শুকনো কাগজের মলাট থেকে টুক করে শব্দ বেরোল। তারপর খাতাটা নিজের বুকের কাছে ধরে গেটের মাঝখানে এক ধাপ এগিয়ে দাঁড়াল, যেখানে ভেতরের উঠোন আর বাইরের গলির দৃষ্টি একসঙ্গে এসে পড়ে। “আমি কী পরিচয়ে দাঁড়াব?” সে বলল। “যে পরিচয়ে এই বিয়ের অর্ধেক কাজ আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই পরিচয়ে। যে পরিচয়ে টাকা চাইতে রাতে ফোন করেছিলেন, সেই পরিচয়ে। আর যে পরিচয়ে আজ আমাকে জুতোর র্যাকের পাশে নামিয়ে রাখতে চেয়েছেন, সেটা আমি আর নিচ্ছি না।”
নাসরিন খালা কটমট করে উঠলেন, “এইসব ঋণের কথা বলে কেউ আপন হয় না।”
“ঠিক,” মেহজাবিন মাথা নেড়ে বলল। “ঋণের কথা বলে কেউ আপন হয় না। কিন্তু আপন ভেবে যার কাছ থেকে সব নেওয়া হয়, তাকে দরজায় অপমান করলে সেও চুপ থাকে না।”
রাশেদের দিকে একবারও না তাকিয়ে সে ডান হাতে চাবির গোছাটা খুলে নিল—ভিতরের আলমারি, গয়নার ড্রয়ার, আর হিসাবের ক্যাবিনেটের চাবি। তিন দিন ধরে এগুলো তার কাছেই ছিল। সে নাসরিন খালার বাড়ানো হাতে চাবি ফেরত দিল না। সোজা গিয়ে ইমামুল চাচার সামনে রাখল। “আপনার ভাইয়ের মেয়ের বিয়ের জিনিসপত্র আমি পাহারা দিয়েছি। এখন আপনি শোনেন—এই বাড়ির উঠোনে আমি দয়া খেয়ে দাঁড়াইনি।”
নাসরিন খালা এগিয়ে এলেন, কণ্ঠে প্রথমবার ফাটল, “চাবি আমাকে দাও। তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।”
“সীমা কে কোথায় টানবে, সেটাই তো আজ ঠিক হচ্ছে,” মেহজাবিন বলল।
এবার রাশেদ এগিয়ে এল, কিন্তু কথা বলল না। শুধু নিজের পকেট থেকে আরেকটা ছোট খাম বের করে ইমামুল চাচার হাতে দিল। “কাবিননামার সাক্ষী আর হলের আগাম টাকার রসিদ,” সে বলল। “দুটোতেই মেহজাবিনের স্বাক্ষর আছে, কারণ আমি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সবার সামনে দিয়েছিলাম।”
এখানে প্রমাণের কাগজটাই মূল আঘাত ছিল না; আঘাত ছিল “আমি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম” কথাটায়। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখগুলো এবার একসঙ্গে রাশেদের দিকে ফিরল। এতদিন যে সম্পর্ককে আন্দাজে, হাসিতে, খোঁচায় রাখা হয়েছিল, সে হঠাৎ দায়িত্বের ভাষা পেল।
নাসরিন খালা মরিয়া হয়ে শেষ চাল দিলেন। “দায়িত্ব দিলে কী হয়? তাই বলে যে কেউ—”
মেহজাবিন এবার তার কথা কেটে দিল। প্রথমবার। পরিষ্কার, উঁচু, শীতল গলায়। “যে কেউ না। আমি। রাশেদের পছন্দের মানুষ আমি। আমার সঙ্গে তার বিয়ের কথা এই ঈদের পর বসে ঠিক হওয়ার কথা ছিল। দেরি করেছেন আপনারা, লুকিয়েছেন আপনারা, ব্যবহার করেছেন আমায় আপনারা। কিন্তু এই দরজায় আমাকে নিচে নামানোর অধিকার আপনাদের নেই।”
শব্দগুলো উঠোনের মাঝখানে গিয়ে থেমে থাকল না; সঙ্গে সঙ্গে মানুষজনের ভঙ্গি বদলে গেল। সাবিহা ভাবি পুরো শরীর ঘুরিয়ে মেহজাবিনের দিকে মুখ করল। ইমামুল চাচা চাবির গোছা নিজের পাঞ্জাবির পকেটে রাখলেন, নাসরিন খালার দিকে নয়। গেটের সামনে দাঁড়ানো দুই মামা সরে গিয়ে পথ খুলে দিল। যে কিশোর ভাতিজা এতক্ষণ নাসরিন খালার দিকে তাকিয়ে সংকেত নিচ্ছিল, সে খাতাটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে মেহজাবিনের কাছ থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় দাঁড়াল। নাসরিন খালার বাড়ানো হাত মাঝআকাশে ঝুলে রইল; কেউ সেই হাতে কিছু দিল না।
রাশেদ তখনই, একদম দেরি না করে, সবার সামনে বলল, “আমার পক্ষ থেকে আর লুকোনো নেই। খালা, আপনি যদি আজও ওকে শর্ত দিয়ে ঢোকাতে চান, তাহলে এই উঠোনে আমার নামে যে মান আপনি ধরে আছেন, সেটা এখনই নামিয়ে রাখুন। কারণ আমি যার পাশে দাঁড়াচ্ছি, তাকে ফটকে দাঁড় করিয়ে অপমান করা হবে না।”
নাসরিন খালা যেন হঠাৎ দাঁড়ানোর জায়গা হারালেন। “এভাবে বিয়েবাড়িতে—”
“বিয়েবাড়িতেই,” মেহজাবিন বলল। “কারণ অপমানটাও এখানেই করেছেন।”
তারপর সে খাতাটা গেটের টেবিলে রাখল না। টেবিলটা টেনে নিজের দিকে আনল, পানের বাটা আর রুমাল নড়ে উঠে ছোট্ট শব্দ করল। টেবিলটা এখন আর নাসরিন খালার দরজার পাহারা নয়; প্রকাশ্য প্রবেশের কেন্দ্র। মেহজাবিন খাতা খুলে কিশোরটাকে বলল, “নাম ধরো। বরপক্ষের বড়রা আগে, তারপর কনের মায়েরা। কেউ বাইরে দাঁড়াবে না।”
এই এক লাইনে সব উল্টে গেল। নির্দেশের অধিকার বদলাল। যে মেয়েকে একটু আগে জুতোর র্যাকের পাশে নামানো হয়েছিল, সে এখন প্রবেশের ক্রম বলছে। লোকজন তার কথামতো নড়ল। দুইজন বৃদ্ধা খালা প্রথমে নাসরিন খালার দিকে তাকিয়ে, তারপর না তাকিয়েই মেহজাবিনের দেখানো পথে ভেতরে গেলেন। সাজসজ্জার ছেলেটা খিলানের ফিতা সরিয়ে ফটক আরও চওড়া করল। সাবিহা ভাবি নিজের হাতে জুতোর র্যাকটা দূরে ঠেলে দিল। নাসরিন খালার কণ্ঠ বেরোল, কিন্তু আদেশের ধার ছাড়া—“শোনো, আমি তো শুধু—”
মেহজাবিন তার দিকে তাকাল না। “আমাকে আর পেছনের বারান্দা দেখাবেন না,” সে বলল। “এই দরজায় আমি লুকিয়ে ঢুকব না।”
উঠোনে তখন কারও হাত উঠছে না, নামছে। ছাউনির ধারে বাঁধা ত্রিপলের প্রান্তে বিকেলের হাওয়া লেগে নড়ল। একটু আগে যে জায়গায় মানুষের দৃষ্টি আটকে ছিল, সেখানে পথ খুলে গেছে। মেহজাবিন একবার সামনে পা বাড়াল, প্রধান ফটকের ঠিক মাঝখান দিয়ে, আর বলল, “আমি সামনের দরজার মানুষ। মনে রাখুন।”
ছাউনির কিনারা সরে গিয়ে উঠোনের ছায়া ধীরে ধীরে আবার দরজার ওপর নেমে এলো।