নামটা এক লাফে ওপরে উঠল
“এই পথে না, আপা—ওপরে বরপক্ষ উঠবে,” উশার ছেলে রফিক হাত বাড়িয়ে মেহরিনের সামনে দড়ির ফাঁক টেনে বন্ধ করে দিল। নীল ফিতেয় ঝোলা তার কুঁচকে যাওয়া পরিচয়পত্র বুকে ঠকঠক করছিল, আর সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো খালাতো-ফুফাতো আত্মীয়স্বজনের চোখ একসঙ্গে ঘুরে এল মেহরিনের মুখে। সে যে আজ এই পথে উঠবে, এ কথা শুধু সে নয়, এই বাড়ির অর্ধেক মানুষই জানত। তবু তাকে পাশে, খাবার পরিবেশনের ট্রলির গা ঘেঁষে, সার্ভিস সিঁড়ির দিকে সরিয়ে দেওয়া হল যেন সে কেবল জানাশোনা কারও মেয়ে, বেশি হলে অতিথি।
মেহরিন এক মুহূর্তও মুখ নামাল না। কাঁধে ব্যাগের ফিতা বসে আছে সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে; অফিস থেকে বেরোনোর পর বদলানোর সময়ও পায়নি, হাতের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের ছোট বাক্সটা এখনো ব্যাগে। দুপুরে কৃষি ঋণ প্রকল্পের মাঠ-রিপোর্ট তুলে দিয়ে, সোজা মিরপুরের এই বিয়ে বাড়িতে এসেছে সে—কারণ আরিব নিজেই বলেছিল, “উপরে উঠবে, আম্মুদের সঙ্গে থাকবে।” সেই কথাটা সবার সামনে অস্বীকার করার সাহস নাদিমা ভাবির আছে, এ সে বুঝেছিল, কিন্তু এত সহজে নয়। মেহরিন দড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “সরান। আমাকে ডাকা হয়েছে।”
রফিক পিছিয়ে গেল না। তার আগেই পাশে ঝলমলে শাড়ি, ভারি গয়না, ঠোঁটে টানটান হাসি নিয়ে নাদিমা ভাবি এগিয়ে এল। “ডাকা হয়েছে মানে? মেহরিন, তুমি তো আমাদেরই মেয়ে, তা বলে সব নিয়ম ভেঙে?” সে এমন স্বরে বলল যেন আদর করছে, অথচ হাত বাড়িয়ে মেহরিনের কনুই ঘুরিয়ে দিল সার্ভিস করিডরের দিকে। “বউদের লাইন, কাছের খালা-মামিরা, তারপর অন্যরা। তুমি নিচে বসো। পরে ছবি-টবি হবে।”
এই “আমাদেরই মেয়ে” কথাটা মেহরিন বহুবার শুনেছে; যখন আরিব রাত দুটায় ফোনে বলেছে সে ক্লান্ত, শুধু মেহরিনই তাকে বোঝে; যখন আরিবের বাবার চিকিৎসার কাগজ সে দৌড়ে দৌড়ে জোগাড় করেছে; যখন রুবিনা খালা আধা-হাসি মুখে বলেছে, “মেয়ে তো ঘরেরই।” কিন্তু ঘরের মানুষকে কেউ সার্ভিস সিঁড়ি দেখায় না। মেহরিন এবার এক পা উল্টো দিকে না গিয়ে সরাসরি দড়ির খুঁটির দিকে হাত বাড়াল। দড়ি তুলল না, শুধু নিজের আঙুল সেখানে রাখল। “আমি নিচে বসব কি না, সেটা আমি ঠিক করব। কে কোথায় দাঁড়াবে, সেটা যে ঠিক করছে, সে সামনে এসে বলুক।”
দোতলার দিকে ওঠা লিফটের ধাতব দরজায় পুরনো মুছার দাগ, আঙুলের ছাপ। সেই ঝাপসা প্রতিফলনে মেহরিন দেখল, রুবিনা খালা থেমে গেছেন; আরিবের ছোট ফুপু ঠোঁট কামড়ে আড়চোখে তাকাচ্ছেন; আরিব নিজে ওপরে, সিঁড়ির মোড়ে, যেন নামবে কি নামবে না বুঝে উঠতে পারছে না। প্রথম ফাটলটা সেখানেই পড়ল—নাদিমা ভাবি দ্রুত রফিককে বলল, “এই দড়িটা তোলো না। সামনের চারটা আসন ঠিক করা আছে।” কথাটা যতটা মেহরিনকে, তার চেয়ে বেশি আশপাশের মানুষকে শোনানো।
উপরে হলঘরের মুখে চারটে নামফলক রাখা, লাল-সোনালি কাপড়ে মোড়া চেয়ারের সামনে। “বড় চাচি”, “খালা রুবিনা”, “নাদিমা আপা”, আর একটাতে সাদা কাগজ উল্টো করে রেখে দেওয়া—লেখা আছে কি নেই, দূর থেকে বোঝা যায় না। মেহরিন সিঁড়ি না উঠলেও এতটা দেখতে পাচ্ছিল। নাদিমা ভাবি হাত তুলে বলল, “ওটা নীলার জন্য। মেয়ের দিকের সম্মান আছে।” নীলা—এক ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে—সন্ধ্যার পর থেকে ফিসফাসে ভাসছে, নাকি আরিবের জন্য তার কথা চলছে। ঘাম জমল মেহরিনের পিঠে, কিন্তু মুখ ঠান্ডা রইল।
রুবিনা খালা নিচে এসে একবার বললেন, “নাদিমা, মেয়েটাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখিস না।” নাদিমা ভাবি সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়তার ভাষা টেনে আনল, “খালা, বিয়ে বাড়ি, সবার সামনে সীমা লাগে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলেই তো বলছি—নিজের মানও রাখতে হয়।” খালা চুপ করলেন। চুপটা ছিল ছোট, কিন্তু যথেষ্ট। মেহরিন দেখল, কথাটা আটকাতে কেউ এগিয়ে এল না। ইচ্ছে করল চলে যায়। ওই ঠান্ডা খাবারের বাক্সটা ডাস্টবিনে ফেলে, গাড়ি ডেকে, আজকের মতো নিজের মান নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু ওপরে, মোড়ের ছায়ায় দাঁড়ানো আরিব নেমেও এল না, ফিরেও গেল না। এই অর্ধেক সাহসটাই সবচেয়ে অপমানকর।
মেহরিন ব্যাগ খুলে খাবারের বাক্সটা বের করল। প্লাস্টিকের ঢাকনায় ভেতরের ভাত একপাশে গিয়ে জমে আছে। সে সেটা পাশের ফুলওয়ালার টেবিলে রেখে দিল, এমনভাবে যেন ব্যস্ততার মধ্যে নামানো জিনিস। তারপর রফিকের গলায় ঝোলা কুঁচকে যাওয়া ফিতেটা চোখে পড়তেই বলল, “তোমাকে কে বলেছে আমি সার্ভিস সিঁড়ি ব্যবহার করব?” রফিক গিলল। “নাদিমা আপা—” “ভালো। তাহলে আমি তার মুখ থেকেই শুনব।” এবার আরিবকে নামতেই হল। সে দু-তিন ধাপ নেমে এল, কিন্তু নিচে নয়—ল্যান্ডিং পর্যন্ত। তার পাঞ্জাবির কাঁধে আতরের গন্ধ, চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া। “মেহরিন, একটু শান্ত হও। অনুষ্ঠানটা শেষ হোক—” মেহরিন তার কথা কেটে দিল। “আমি শান্ত আছি। আমাকে নিচের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটা কার?”
এই প্রশ্নের জবাবে হলঘরের মুখে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা সরে না গিয়ে বরং আরও খানিক থেমে গেল। সিঁড়ির ল্যান্ডিংটা হঠাৎ গলায় কাঁটার মতো সরু হয়ে উঠল; কে উঠবে, কে নামবে, কার জন্য কার কাঁধ সরে যাবে—সব এখন চোখে পড়ছে। নাদিমা ভাবি উপরে থেকে বলল, “এই মুহূর্তে ঝামেলা করো না। আরিব, ওকে নিচে নিয়ে যাও। মেয়েদের শোভা আছে।”
“আমাকে কে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা আরিব বলবে?” মেহরিনের স্বর উঁচু হল না, কিন্তু সিঁড়ির পাথরে লেগে স্পষ্ট উঠল। “নাকি তুমি বলবে? যাকে মাসের পর মাস ঘরের মেয়ে বলে ঘরের কাজ করানো যায়, তাকে আজ অতিথির চেয়েও নিচে নামিয়ে রাখবে—এটাই শোভা?”
এবার আশপাশে গুঞ্জন উঠল না; বরং একটা বুড়ো কাশি থেমে গেল, এক বাচ্চাকে টেনে পাশ করা হাত থেমে গেল, আর রফিক দড়ির খুঁটি ধরে অনিশ্চিত দাঁড়িয়ে রইল। আরিব আরও এক ধাপ নামল। তার মুখে সেই পরিচিত টান—যখন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে, কিন্তু বোঝা যায় দেরি আর টিকবে না। নাদিমা ভাবি তা বুঝেই শেষ চাল দিল। সে নিজে নিচে নামল না; ল্যান্ডিংয়ের ওপরে দাঁড়িয়েই বলল, “সবাই শুনুন, বিয়ে বাড়ির লাইন নষ্ট করা যাবে না। যে যার জায়গায় থাকুক। আরিব, তুমি এখনই ওকে সরাও। না হলে তোমার আম্মুর সামনে খুব খারাপ দেখাবে।”
খারাপ দেখাবে—এই শব্দেই বাড়ির মানুষ সবচেয়ে দ্রুত মাথা ঘোরায়। আরিবের মা ওপরে পর্দার আড়াল থেকে নড়লেন; দুইজন ফুফু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন; নীলাকে বসানোর জন্য রাখা উল্টো নামফলকটা বাতাসে হালকা কেঁপে উঠল। নাদিমা ভাবির চোখে তখন জয়ের আগাম ঝিলিক। সে ধরে নিয়েছে, শেষ পর্যন্ত আরিব মুখ বাঁচাবে, মেহরিন নয়।
মেহরিন তখনই উঠল। কারও অনুমতি না নিয়ে, রফিকের দড়ির খুঁটি একপাশে ঠেলে, সোজা সিঁড়ির মাঝ বরাবর। একবারও ধাক্কা দিল না কাউকে, কিন্তু ওঠার ভঙ্গিটা এমন ছিল যে যার যেখানে দাঁড়ানো, তাকে নিজের শরীর সরাতেই হল। দ্বিতীয় মোড়ে এসে সে থামল না, সরাসরি ল্যান্ডিংয়ের মাঝখানে দাঁড়াল—ঠিক সেখানে, যেখানে নিচ থেকে ওঠা আর ওপর থেকে নামা স্রোত একে অপরকে কেটে যায়। তার অবস্থানেই পথ কেটে গেল। রফিক ওপরে দড়ি নিয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। নাদিমা ভাবি প্রথমবারের মতো পাশে সরে দাঁড়াল, কারণ মেহরিন সরে যায়নি।
আরিব তখন মাত্র এক হাত দূরে। এত কাছে যে মেহরিন তার পাঞ্জাবির হাতার মাড়ের গন্ধও টের পেল। সে আরিবের দিকে না তাকিয়ে বলল, “আমি নিচে নামব না। তুমি যদি মনে করো আমি বাইরে, এখনই বলো। সবাই শুনুক। আর যদি না মনে করো, তাহলে আমাকে পাশ কাটিয়ে আর কাউকে ওই সামনে বসাবে না।”
এইবার পালানোর রাস্তা আর ছিল না। নাদিমা ভাবি তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল, “ওই সামনে? কী পরিচয়ে? বিয়ে বাড়ি কি রাস্তা? যার সঙ্গে কথা হয়েছে, তাকে তো সবাইকে দেখিয়ে বসানো যায় না! আগে বড়রা ঠিক করবে, তারপর—”
আরিব এবার তার দিকে ফিরল। “ভাবি, থামেন।”
নাদিমা ভাবি থামল না। “না, আমি থামব না। আপনি যদি এখন ওকে ওপরে তোলেন, কালকে সবাই বলবে, ঘরের মুরুব্বিদের মাথার ওপর দিয়ে—”
“ভাবি।” আরিবের স্বর এবার নিচু, কিন্তু লোহার মতো। সে এক ধাপ এগিয়ে এসে মেহরিনের পাশে দাঁড়াল, সামনে নয়, পেছনেও নয়—পাশে। তারপর ওপরে রাখা সেই উল্টো নামফলকের দিকে হাত বাড়াল। রফিক দ্বিধায় সেটা নামিয়ে আনতেই আরিব কাগজটা সোজা করল। ফাঁকা। সত্যিই ফাঁকা। সাদা কাগজ, শুধু ক্লিপ লাগানো। মিথ্যা সম্মানের জন্য রাখা খালি জায়গা।
সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়েই সে রফিককে বলল, “কলম আছে?” রফিক কাঁপা হাতে বুকপকেট থেকে কলম বের করল। আরিব কাগজের ওপর বড় অক্ষরে লিখল—“মেহরিন”—তারপর নামফলকটা নিয়ে নিজে ওপরে গিয়ে সামনের চেয়ারের সামনে রাখল। নীলার জন্য সাজানো ফুলের ছোট বাটি সরিয়ে দিল, চেয়ারটা খানিক ঘুরিয়ে দিল, যেন সোজা তাকালে মেহরিনকে দেখা যায়। এই ছোট কাজগুলো এত স্পষ্ট, এত প্রকাশ্য ছিল যে আশপাশের মানুষ আর ব্যাখ্যার অপেক্ষা করল না।
নাদিমা ভাবির মুখের রং বদলে গেল। “তুমি কী করছ! মানুষজন আছে—” আরিব ফিরে এল না, সেখান থেকেই বলল, “মানুষজন আছে বলেই করছি। আর শোনেন—এখানে আমার ডান পাশে মেহরিন বসবে। নিচের লাইন, সার্ভিস সিঁড়ি, পরে ছবি—এসব নিয়ে আর কেউ কথা বলবে না।” তারপর সে নিচে, ল্যান্ডিংয়ের দিকে হাত বাড়াল, মেহরিনের দিকে নয়, পথের দিকে। “মেহরিন, ওঠো।”
এই ডাক প্রেমের নরম স্বর ছিল না; ছিল নাম ধরে জায়গা ঘোষণা। মেহরিন উঠতে গিয়ে দেখল, নাদিমা ভাবি অর্ধেক রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে। শেষ চেষ্টা। “এভাবে হবে না। আম্মুর সঙ্গে—” মেহরিন এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “খালাম্মার সঙ্গে পরে আপনি কথা বলবেন। আমার পথ আটকে না।” নাদিমা ভাবি এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর সরে গেল—সরে যেতে হল, কারণ পিছনে আরও তিনজন আটকে গেছে, আর আরিব তার জায়গা বদলায়নি। এই থেমে যাওয়াটাই ছিল দৃশ্যমান ক্ষতি: তার গলা ছিল আগের মতো, কিন্তু শরীর আর কাউকে চালাতে পারছিল না।
মেহরিন ওপরে উঠল। সে দেখল, রুবিনা খালা চেয়ারের পিঠ ছেড়ে দিয়েছেন; যে কাজিন এতক্ষণ নীলার জন্য জায়গা রাখছিল, সে ফুলের বাটি হাতে নিয়ে অন্যদিকে সরে গেছে; আর রফিক দড়িটা গুটিয়ে নিচ্ছে, যেন কখনও ওই লাইন ছিলই না। কিন্তু সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ছিল আরেকটা দৃশ্য—নাদিমা ভাবি নিজের রাখা আসনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে, বসছে না, কারণ এখন বসলে তার পাশের খালি জায়গা আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
আরিব চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল। “এখানে।” মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “আজ যদি আমি নিজে না উঠতাম, তুমি কিছু বলতে?” প্রশ্নটা ছোট ছিল, কিন্তু ধারালো। আশেপাশে যারা ছিল, তারা শুনল কি না, তা mattered না; আরিব শুনল। সে এক মুহূর্ত দেরি করে বলল, “আজ তুমি উঠেছ বলেই আমি দেরি করতে পারিনি।” মেহরিন বসার আগে নামফলকটা আঙুলে একবার ছুঁয়ে সোজা করে দিল। “তাহলে এবার দেরি করো না।”
এরপর শোভাযাত্রার ডাক পড়তেই নিচে-ওপরে চলাচলের নতুন সারি বাঁধল। ল্যান্ডিংয়ে নামার সময় আগের মতো আর কেউ তাকে পাশ কাটিয়ে সার্ভিস করিডরে ঠেলে দিতে এল না। সিঁড়ির বাঁকে শরীরের দূরত্ব বদলে গেছে—কে আগে, কে পরে, কে অপেক্ষা করবে, কার জন্য কার কাঁধ দেয়ালে ঠেকবে। মেহরিন আরিবের সমান্তরালে ল্যান্ডিংয়ে পা রাখতেই সামনে দাঁড়ানো রফিক নিজের উশারের সাদা হাতা আগে টেনে সরিয়ে নিল, সরু পথটা খালি করে দিল তার পাশ দিয়ে যাওয়ার জন্য।